Magic Lanthon

               

ম্যাজিক লণ্ঠন

প্রকাশিত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সত্যজিতের অনন্য নির্মাণ ‘হীরক রাজার দেশে’

ম্যাজিক লণ্ঠন

 

ছবির নাম: হীরক রাজার দেশে

পরিচালক: সত্যজিৎ রায়

নির্মাণকাল: ১৯৮০ সাল, ভারত

সম্পাদনা: দুলাল দত্ত

সঙ্গীত পরিচালক: সত্যজিৎ রায়

সিনেমাটোগ্রাফি: সৌম্যেন্দু রায়

ব্যাপ্তি: এক ঘন্টা ৫৮ মিনিট

 

এ এক বিচিত্র দেশ। যেখানে প্রজাদের বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে বশ করে শেখানো হয় ‘ভর পেট নাও খাই, রাজ-কর দেওয়া চাই’। পাঠশালায় গিয়ে স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের শেখান, ‘লেখাপড়া করে যেই, অনাহারে মরে সেই’ কিংবা ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’। এই দেশের নাম ‘হীরক রাজার দেশ’।

সেই দেশের বর্ষপূতি উৎসবে ডাক পড়ে সুন্ডি রাজার দুই জামাই গোপী ও বাঘার। তারা ভূতের কাছ থেকে পাওয়া অলৌকিক জুতার বলে চলে আসেন হীরক রাজার দেশে। সেখানে দেখা হয় পাঠশালার পন্ডিত মশাইয়ের সঙ্গে। তিনি রাজার সঙ্গে বিদ্রোহ করে পালিয়ে আছেন পাহাড়ের গুহায়।

পন্ডিত মশাইয়ের কাছে গোপী ও বাঘা জানতে পারেন, ভয়ঙ্কর অত্যাচারি হীরক রাজার কথা। যে শ্রমিকরা দিনভর পরিশ্রম করে খনি থেকে হীরক উত্তোলন করে, যে কৃষক ফসল ফলায়- তারা দুবেলা খাবার পায় না। রাজা বসে থাকে তার তোষামোদি মন্ত্রী, উজিরদের নিয়ে। তারা রাজার সব কথায় ‘ঠিক-ঠিক’ বলতে থাকেন। কেউ রাজার বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করলে তার ওপর নেমে আসে নির্মম অত্যাচার। এ থেকে রক্ষা পায় না বাউল চরণদাসের মতো এক সাধারণ গায়ক, খনির আধপেটা খাওয়া এক শ্রমিক।

আর সব চেয়ে মজার ব্যাপার হলো, রাজা লাখ টাকা খরচ করে পোষেন এক বিজ্ঞানীকে। তার ওপর দায়িত্ব থাকে ‘মস্তিস্ক প্রক্ষালন-যন্ত্র আবিষ্কারের। এক পর্যায়ে বিজ্ঞানী বানিয়েও ফেলেন সেই ‘যন্তর-মন্তর যন্ত্র’। যার মধ্যে কাউকে ঢুকিয়ে দিয়ে সহজে তাকে রাজার পক্ষে বশ করে ফেলা যায়। এমন অবস্থায় পন্ডিতমশাই হীরক দেশের প্রজাদের বাঁচাতে সহায়তা চান গোপী ও বাঘার। তারা দুজন পন্ডিত মশাইয়ের কথায় সম্মত হন। এরপর গোপী ও বাঘার সহায়তায় হীরক রাজাকে পরাস্ত করে তাকেই তার বানানো যন্ত্রে ঢুকিয়ে প্রজাদের পক্ষে মস্তিস্ক প্রক্ষালন করা হয়। এক পর্যায়ে বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বানানো হীরক রাজার বিশাল মূর্তি ভেঙ্গে ফেলে প্রজারা।

সিনেমাটি মূলত সত্যজিতের ১৯৬৮ সালে নির্মিত ‘গোপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবির সিক্যুয়াল। এ দুটি ছবি রূপকথাভিত্তিক এক অজানা অচেনা দেশের কাহিনী। দুটো সিনেমায় সঙ্গীত নির্ভর। বেশিরভাগ সংলাপ ছন্দে ছন্দে বলা হয়। অচেনা কিংবা অজানা দেশের কাহিনী মনে হলেও, একটু চিন্তা করলে বোঝা যায় এ কাহিনী যেন চিরন্তন। সব কালে সব দেশের শোষক ও শোষিতের অবস্থা বর্ণনার জন্য হীরক রাজার দেশে’র বিকল্প নেই। একটু ভাবলে দেখা যায়, আজকের দিনে নতুন মস্তিস্ক প্রক্ষালন যন্ত্র হলো গণমাধ্যম। সেই যন্ত্র আরও ভয়ঙ্কর এ কারণে যে, এখানে মস্তিস্ক প্রক্ষালন হওয়ার জন্য যন্ত্রের মধ্যে ঢুকতে হয় না। যন্ত্র সবসময় আমাদের কাছেই থাকে। পুজিবাদী সংস্কৃতি কৌশলে গণমাধ্যমকে আমাদের জীবনের অপরিহার্য উপাদানে পরিণত করেছে। আমরা কখনো সচেতন কখনোবা অবচেনভাবে সেই যন্ত্রের দ্বারা প্রক্ষলিত হতে থাকি।

স্থান কাল নিরপেক্ষ এই মিউজিক্যাল ছবিতে সময় সমাজ ও দেশের এ জরুরি প্রাসঙ্গিকতা আছে। এর গল্প রূপকথা, তাতে ফ্যান্টাসির ছাপ, এর সাফল্য গল্পকে ছাপিয়ে চলে যাওয়ায়, সেখানে অদ্ভূত রস, স্বাদ ও আবেদন, সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততা, বিচিত্র কল্পনাপ্রবণতা ও ধ্রুপদী মহত্ত্বের অনুরণন রয়েছে।

ছবির সঙ্গীতে লোক-সঙ্গীত ও রাগ সঙ্গীত, হিন্দুস্থানী ও কর্ণাটকী উভয়ই এবং বিদেশী অর্কেস্ট্রেশন সব কিছুর সুন্দর সংমিশ্রণ হয়েছে। সত্যজিৎ রায় সঙ্গীত রচনায় এখানে স্থানে স্থানে এমন উৎকর্ষ দেখিয়েছেন যে তাতে মনে হয় সত্যিই আমরা অচেনা কোনো দেশের সঙ্গীত শুনছি। অর্থাৎ এ ছবিতে প্রায় একটি নতুন সংস্কৃতিই তিনি তৈরী করেছেন সঙ্গীত দিয়ে।   

তবে সত্যজিৎ রায় বিশ্বাস করেন বিদ্রোহই আধুনিকত্বের একমাত্র সংজ্ঞা নয়। ফলে আমরা দেখি তিনি পদ্ধতির পরিবর্তনের চেয়ে ব্যক্তি মনের পরিবর্তনের উপরই যেন বেশি ভরসা করেছেন এই ছবিতে। তার যন্তর-মন্তর যন্ত্রের টার্গেট ছিল ব্যক্তি। তাইতো সিনেমার শেষে যখন প্রজারা মূর্তি ভাঙতে থাকে, যন্তর-মন্তর ঘর থেকে বের হওয়া রাজা তখন ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’ শ্লোগান দিতে দিতে নিজেই নিজের মূর্তি ভাঙ্গায় অংশ নেয়।  

সত্যজিতের অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে, পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), পরশ পাথর (১৯৫৮), জলসাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিনকন্যা (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), জন অরণ্য (১৯৭৫), শতরঞ্জ কে খিলাড়ী (১৯৭৭), জয়বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)। তথ্যচিত্র- সুকুমার রায় (১৯৮৭), বালা (১৯৭৬), ইনার আই (১৯৭২), সিকিম (১৯৭১), রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১)। এছাড়াও তিনি টু (১৯৬৪), পিকু (১৯৮০) ও সদ্গতি (১৯৮১) নামে তিনটি টেলিফিল্ম নির্মাণ করেন।

১৯২১ সালের ২ মে জন্ম নেয়া এ মহান পরিচালক চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে অস্কার পুরস্কার পান। একই বছরের ২৩ এপ্রিল ৫.৪৫ মিনিটে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন