Magic Lanthon

               

ওমর ফারুক, নৃপেন্দ্রনাথ রায় ও মো. আসাদুল্লাহ

প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আবহমান; মানুষ, দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের অসাধারণ উপস্থাপন

ওমর ফারুক, নৃপেন্দ্রনাথ রায় ও মো. আসাদুল্লাহ

প্রতিটি মানুষ ক ও স্বতন্ত সামাজিক, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক প্রতিবেশ আর প্রদেয় পরিস্থিতির বিভিন্নতায় তার দেখার চোখ বিশেষ বৈশিষ্ট্য পায়। পরস্পরের এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতায় তাই আপেক্ষিক হয়ে ওঠে ভালো লাগা, মন্দ লাগার বিষয়গুলো। আমরা কেবল এই ভিন্ন ভিন্ন দেখার চোখকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি আবহমান এ। নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে দেখানো হয় সিনেমাটি। দর্শকদের বলা হয় এটি নিয়ে লিখতে, নিজের মত তুলে ধরতে। লেখা জমাও পড়ে কয়েকটি। সেই লেখাগুলোর মধ্য থেকে তিনটি লেখা ছাপানো হল ম্যজিক লন্ঠন এ।

 

সিনেমার নাম: আবহমান

পরিচালক: ঋতুপর্ণ ঘোষ

নির্মাণকাল: ২০১০ সাল, ভারত

সম্পাদনা: অর্ঘ্যকমল ঘোষ

সঙ্গীত পরিচালনা: ঋতুপর্ণ ঘোষ

চিত্রগ্রহণ: অভীক মুখোপাধ্যায়

প্রযোজনা: রাজেশ সাহনী মহেশ রামনাথন

ব্যাপ্তি: এক ঘন্টা ৫৭ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড

পুরস্কার: ২০১০ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র শাখায় ভারতের জাতীয় পুরস্কার 


আবহমান; মানুষ, দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের অসাধারণ উপস্থাপন

ওমর ফারুক

শিল্পের সমালোচনা হয় শিল্প দিয়েই| তাই শিল্প মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের সমালোচনা করা একটু কঠিনই| তার ওপর সমালোচক যদি হন একজন নবিশ লেখক| তারপরও চেষ্টা| প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় একটি ছবির সমালোচনা বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে| কখনো তার ভাব, ভাষা আবার বক্তব্যের আঙ্গিক বিচারে| আমি চেষ্টা করেছি সিনেমাটির বক্তব্য ধরেই এগোবার। সিনেমার ইমেজ, শব্দ-ভাষা যে টেক্সট হাজির করে, তার আলোকে অনুপস্থিত কোনো কোনো টেক্সটকে সম্পৃক্ত করে এখানে তা ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়েছে| তবে সিনেমাটিতে ব্যতিক্রমি ন্যারেটিভ ঢঙ ও ফ্ল্যাশব্যাকের অতি ব্যবহার সাধারণ দর্শক হিসেবে নানাভাবে আমাকে বিচলিত করেছে|

আবহমানের মূল চরিত্রগুলো হচ্ছে, আর্ট ফিল্ম নির্মাতা অনিকেত মজুমদার, তার স্ত্রী দীপ্তি ও ছেলে অপ্রতিম মজুমদার এবং অনিকেতের ছবি নটী বিনোদিনীর নায়িকা শিখা ওরফে শ্রীমতি সরকার|

অনিকেত, দীপ্তি ও অপ্রতিমের সংসার ভালোই চলছিল| অনিকেতের সঙ্গে দীপ্তির দ্বন্দ্ব শুরু হয় শিখাকে নিয়ে| অথচ শিখার শ্রীমতি হয়ে ওঠা দীপ্তির উৎসাহেই। অনিকেতের সঙ্গে ছেলে অপ্রতিমের সম্পর্ক বন্ধুর মতো। বন্ধুর বিপরীতে এক সময় জায়গা করে নেয় দ্বন্দ্ব। সে দ্বন্দ্বের দৃশ্যত কারণ ছেলের কাছে তার মায়ের অপমান। কিন্তু মূল কারণ হয়ত অন্যখানে। ছবির মূল বিষয় মানুষ, সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব চলেছে মানুষের সম্পর্কে, কখনো নিজের মধ্যে। এভাবে বিকশিত হয়েছে সমাজ। আবহমান কাল ধরে চলে এসেছে এ ধারা। এটিই ছবির মূল উপজীব্য। নটী বিনোদিনী সিনেমার বদৌলতে তারকা ইমেজ পায় শ্রীমতি সরকার। যে শ্রীমতি দীপ্তির এত কাছের, এক সময় তাকে নিয়েই দ্বন্দ্ব শুরু হয় অনিকেত-দীপ্তির মাঝে। ছবির ইমেজ ও শব্দ বিশ্লে­ষণ করে আপাত মনে হয়, অনিকেত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন শ্রীমতি সরকারের সঙ্গে।

নাচের একটি দৃশ্যে শিখা ওরফে শ্রীমতির চোখের চাহনি প্রথম আকর্ষিত করে অনিকেতকে। ওই যে বললাম দ্বন্দ্ব মানুষে-মানুষে, দ্বন্দ্ব মানুষ-সম্পর্কে কিংবা নিজের মধ্যে। তাই হয়ত বেশি দূর এগোতে পারেননি অনিকেত। রাশ্‌ প্রিন্টে বারবার শিখার সেই চোখের চাহনি দেখার জন্য তাকে স্ত্রীর কাছ থেকে ভর্ৎসনা শুনতে হয়েছে। শিখা ও অনিকেতের এই সম্পর্ক উপস্থাপনে পরিচালকের যে পরিমিতি বোধ তা প্রশংসার দাবি রাখে।

রাধা, বিনোদিনী ও শ্রীমতি তিনটি পরম্পরা। বিনোদিনী ও শ্রীমতি রাধার অন্য নাম। রাধা-কৃষ্ণ আর সিনেমার বিনোদিনী-জমিদার পুত্র ও শ্রীমতি-অনিকেত সম্পর্ক পরিচালকের তিনটি সময়কে তুলে ধরার চেষ্টা ভালো লেগেছে। একই সঙ্গে ভালো লেগেছে শ্রীমতিকে নিয়ে অনিকেত-অপ্রতিমের দ্বন্দ্বের জায়গাটা।

আপাত সেই দ্বন্দ্ব মনে হতে পারে এরকম যে, তার মায়ের অবস্থানের বিপরীতে হয়তো শ্রীমতি দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে বিষয়টা অন্যরকম। শ্রীমতিকে নিয়ে হয়ত অগোচরেই অপ্রতিমের মনে কিছু চিন্তা, কিছু স্বপ্নের বুনন হয়েছিল। তারই রূঢ় বহিঃপ্রকাশ হয়ত ছিল বাবার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পত্রিকায় লেখা। আসলে চলতি সময়ে আমরা আধুনিক থেকে আরও আধুনিকতর হচ্ছি। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের সম্পর্কের ধরন। বাবা-ছেলে, স্বামী-স্ত্রী কিংবা সংসারের বাইরের কোনো মানুষ; আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে ভিন্ন ঢঙে, ভিন্ন মাত্রায়। তাইতো পত্রিকার সম্পাদক ফোন করলে অনিকেত বলেন, Ô‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌তুমি কি আমার কাছে অনুমতি চাচ্ছ? একজন ছেলে তার বাবার সম্পর্কে যা জেনেছে তা নিয়ে লিখেছে তাতে অনুমতি নেওয়ার কী আছে?’ আধুনিকতার এই যে বহিঃপ্রকাশ, চাইলেই আমরা তা রোধ করতে পারব না। হয়ত রোধ করা ঠিকও হবে না। এটাই এগিয়ে চলা, আর শিল্পের মহত্ত্ব হয়ত এখানেই।

অন্যদিকে মৃত্যু সায়াহ্নে দীপ্তিকে বলেছিল অনিকেত Ô‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌কেমন লাগছে তোমার, আমার সঙ্গে কাজ করে?’। বাস্তব জীবন শেক্সপিয়ারের ভাষায় বিশাল রঙ্গমঞ্চ। আমরা প্রত্যেকে এখানে অভিনেতা। আসলেই সবাই অভিনেতা। তারপরও সব কিছুকে ছাপিয়ে আমরা হার মানি সম্পর্কের কাছে।

আসলে আবহমান কোন বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। ছবিটির টেক্সট বিশ্লেষণ করে আমরা পাই মানুষ, সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব এই তিনে মিলে বিকশিত হয়েছে সমাজ। এ ধারা আবহমানকালের। অনেক দ্বন্দ্বের কারণ দৃশ্যত হলেও এর শিকড় থেকে যায় অগোচরে। মানুষ বেশিরভাগ সময় আপাত দৃশ্যমান এসব কারণেই বিভ্রান্ত হয়, হয়ত ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। পরস্পরের আন্তঃসম্পর্কে যে দ্বিধার জন্ম, তাকে ক্রমাগত ডিঙিয়ে ব্যক্তি মানুষ নিজের অবস্থান পোক্ত করে সামাজিক কিংবা পারিবারিক ক্ষেত্রে।

চলচ্চিত্রকে বলা হয়ে থাকে সমাজের প্রতিচ্ছবি। সে হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষের আবহমান দেখলে মনে হয় এ যেন আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। শেষ বিচারে কাহিনী বিশ্লে­ষণে বলা যায়, পরিচালক যে বক্তব্যকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন তাতে তিনি সফল।

বাঁধা জীবনের চলচ্ছবি

নৃপেন্দ্রনাথ রায়

বিশ্বায়িত সমাজব্যবস্থার ক্রন্দনতালে এগিয়ে যাচ্ছে গণমাধ্যম আর সেই গণমাধ্যমের উৎপাদিত পণ্য, নব্য বাজারকেন্দ্রিক। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিশীলতা দাসত্ব করছে পুঁজির কাছে। পুঁজির টার্গেট বাজার। বাজারের টার্গেট ভোক্তা। আর টার্গেটকৃত ভোক্তাকে লক্ষ্য করে তৈরি হচ্ছে ভোগ্য পণ্য। এই শৃঙ্খল থেকে সিনেমাওয়ালারাও মুক্ত নয়। চলচ্চিত্রের ফ্যান্টাসি মনোবৃত্তিক দাসত্বকে দেয় মুক্তি। চলচ্চিত্রের শক্তিমান কাহিনী দর্শকদের কাছে গ্রীষ্মের রৌদ্র-তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো। পৃথিবীর ইতিহাসে চলচ্চিত্রের ইতিহাস এক অনবদ্য কাব্য। যুগে যুগে, কালে কালে ক্রমপরিবর্তনশীল সমাজে চলচ্চিত্র হচ্ছে ঊষর মরুভুমির বুকে তৃষ্ণার্ত পথিকের কাছে এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো। কিন্তু বিশ্বায়িত যুগ বাস্তবতায় প্রাযুক্তিক অগ্রগতির সাথে পুঁজির দৌরাত্ম চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে করেছে করায়ত্ত্ব। যা থেকে প্রথিতযশা ও শক্তিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষও মুক্ত নয়। তারপরও তার নির্মাণ বা সৃষ্টি আমাদেরকে দেয় সন্তুষ্টি।

কাহিনীর শুরু আর্ট ফিল্ম নির্মাতা অনিকেত মজুমদারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাকে শেষ শ্রদ্ধা বা শেষ এক নজর দেখার জন্য ওই বাড়িতে উপস্থিত হন শ্রীমতি সরকার; সিনেমার তারকা নায়িকা। পরিচিত সেই বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার পর জীবন বাঁকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার স্মৃতির মানসপটে দোলা দিতে থাকে। জনপ্রিয় এই নায়িকার তারকা হয়ে ওঠা অনিকেত মজুমদারেরই হাতে। নটি বিনোদিনী তে মূল চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উত্তর-কলকাতার শিখা নামের মেয়েটিই একসময় হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নায়িকা শ্রীমতি সরকার। নির্মাতার সাথে তার সম্পর্কের ক্রম-ঘনিষ্টতা সন্দেহের সৃষ্টি করে অনিকেতের স্ত্রী দীপ্তি আর ছেলে অপ্রতিমের ভেতর। পারস্পারিক সম্পর্কের এই দ্বন্দ্বকেই নির্ভর করে এগিয়েছে সিনেমা। এগিয়ে না বলে পিছানো বলা যায়, কেননা পুরো সিনেমার বেশিরভাগ অংশই ফ্ল্যাশব্যাকের আশ্রয়ে করা।

সিনেমাটিতে অতীত এবং বর্তমানের অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন নির্মাতা। কাহিনী এবং চরিত্রের পরম্পরা পুরো সিনেমায় কখনো গতি হারিয়েছে বলে মনে হয় নি। কিন্তু বর্তমানের সাথে অতীতকে এত বেশি নিয়ে আসা হয়েছে যে, হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলা দর্শক সহজে ফিরতে পারবেন না সিনেমায়। এর জন্য দর্শককে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে দেখতে হয় সিনেমাটি। যেখানে শুরু থেকেই এরকম একটা মানসিক চাপের মধ্যে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাতে করে মনে হয় নির্মাতা দর্শকদের কথা একবারও ভাবেন নি। আর ভাবলেও তারা হয়ত সাধারণ দর্শক নন; মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত রুচিবান দর্শক।

কিন্তু সেই নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকদের কাছেও কি নারী কেবলই সুচারু-গৃহিনী? ওই সমাজ বাস্তবতাতেও নারীর এরূপ উপস্থাপন স্বাভাবিক মনে হয় না। আর সমাজবাস্তবতা তুলে ধরলেই কি সিনেমা সিনেমা হয়ে ‌ওঠে? নাকি বিদ্যমান সমাজের বিভিন্ন বিষয়ের নানা দিক নিয়ে আলোচনা ও তার উপস্থাপন, প্রদর্শন শেষ পর্যন্ত যা বিদ্যমান বাস্তবতার সাথেই সম্পর্কযুক্ত হবে।

আবহমান এর প্রত্যেকটি চরিত্র সমাজ বাস্তবতার এক বাস্তব নির্মাণ। একজন ছবির নির্মাতাকে ছবি নির্মাণের স্বার্থে ছবির নায়িকাকে গুরুত্ব দিতে হয় বিভিন্নভাবে। অনিকেতও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। যদিও শ্রীমতিকে অভিনয়ের কলাকৌশল শিখিয়েছেন দীপ্তি। এবং তা বেশ যত্নআত্তির সাথেই। তারপরও সন্দেহের বীজ ঢুকতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় নি। সাধারণ বাঙালি নারীর মনস্তত্ত্বের যে গৎবাঁধা নির্মাণ তা থেকে বের হতে পারেন নি নির্মাতা। এটা সংসারে নারীকে অবহেলিত করে দেখানোর পুনঃনির্মাণের চেষ্টা বলা যেতে পারে। সংসার জীবনে সে শুধু দিয়েই যায়, কিছু পায় না; তার কোন আলাদা জগৎ নেই, স্বামীর সংসারই সবকিছু।

দীপ্তির সংলাপেও তার প্রকাশ,Ôতোমার নায়িকা হতে পারলাম না, প্রেমিকা তো হতে পারতাম, আমি বউ হয়ে রয়ে গেলাম’।কিংবা মা-ছেলের কথোপকথনে ছেলে মাকে বলছে, Ôবাবার তো একটা নিজের জগৎ আছে মা, তোমার তো কিছু নাই; তুমি আমাকে তোমার বন্ধু মনে কর’। আবার শাশুড়ির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দীপ্তির জবাব বেশ এগিয়ে নিয়ে যায় নারীকে। যেখানে সে তার নিজের যত্নের অপরিহার্যতার কথা বলে। মোটামুটি একটা বৈপরীত্যে থেকেও সমাজে নারীর সেই আগের অবস্থানেই পুনঃপ্রত্যাবর্তনের মত।

শিখার শ্রীমতি সরকার হয়ে ওঠার অন্তরালে অনিকেতের স্ত্রীর উৎসাহ উদ্দীপনার ঘাটতি ছিল না। যা বাঙালি নারী জাতিরই স্বভাবজাত নির্মাণ। কারণ পৃথিবীর যুগতালে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক নারী আরেক নারীর সঙ্গী। কিন্তু স্বার্থের চিরাচরিত দ্বন্দ্বে এরাই আবার একে অপরের প্রতিবন্ধক। যা বাঙালি নারী জাতিরই স্বভাবজাত বাস্তবতা। এ ধরনের উপস্থাপন প্রশংসনীয়।

জীবন সুর লহমায় নারী পুরুষের যাপিত জীবন এক রন্ধনশালা। রন্ধনশালায় রকমারি মসলার অনুপাতে একজন রাধুনী বা বাবুর্চি সুখাদ্য তৈরি করে; ঠিক তেমনি নারী পুরুষের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও বাস্তবতাগুলো বিনির্মিত হয়। যদি রান্নায় মসলার অনুপাত ঠিক হয়, তাহলে রান্নার প্রশংসা পায় রাধুনী। ঠিক জীবন-সংসার রন্ধনশালায় নারী পুরুষের রসায়ন নির্ভর করে কিছু মসলার উপর। যা হলো বিশ্বাস, সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও Sacrifice। যার মাঝেই নিরবিচ্ছিন্ন বা অনাদিকাল ধরে বহমান নদীর স্রোতধারার মতোই চলছে আমাদের সমাজ বাস্তবতা। যার এক মিশেল উৎপাদন আবহমান

অন্যদিকে অনিকেত-দীপ্তির সম্পর্ক টানাপোড়নের কেন্দ্রবিন্দু শিখা। সংসার জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের দূরত্ব হয় বিভিন্ন কারণে। কাহিনীতে অনিকেত একজন ফিল্ম নির্মাতা সেহেতু নায়িকাকে কেন্দ্র করে স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়ন হবে এটাই স্বাভাবিক। যা সিনে জগতের এক স্বাভাবিক উৎপাদন। দীপ্তির শক্তিমান অভিনয় এবং শারীরিক সৌন্দর্য দর্শককে অভিভূত করে ভরত নাট্যম নৃত্যের তালে। কিন্তু তিনিই আবার আর দশটা নারীর বেড়াজাল থেকে মুক্ত নয়। যা সংলাপে ফুটে ওঠে ‘ছেলের বয়সী একটা মেয়ের সাথে...’।

সিনে জগতের স্বাভাবিক গন্ডির যাঁতাকলে পিষ্ট কিছু জায়গা থেকে মুক্ত নয় আবহমান। যেমন অভিনয়ে নামতে হলে শরীর দিতে হয়। এরকম ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিখার একটি সংলাপের মাধ্যমে। যখন নির্মাতা কড়া মেক-আপের নিন্দা করে নায়িকা শিখার গালে হাত দেয়। এতে নায়িকা তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে, ‘গায়ে হাত দেয়ার এত শখ, তা আগে বললেই হতো, নিন যা করবার তাড়াতাড়ি করুন; এজন্য শাড়িতে পিন লাগাই নি’। নায়িকার এ ধরনের সড়সুড়িদায়ক সংলাপ সিনে জগতের প্রচলিত ধ্যান ধারণাগুলোকে ন্যায্যতা দেয়ার অপপ্রয়াস নয় কি? নায়িকা হতে হলে শরীর কি দিতেই হবে!

সিনেমায় অপ্রতিম পুঁজির বাজারে যুব সমাজের আদর্শ প্রতীক। বলা যায়, চিরাচরিত সমাজের এক যৌগিক নির্মাণ। যেন ভারতের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের যোগ্য প্রতিনিধি। নাগরিক জীবনের দায়গুলো নিয়ে তাকে তৈরি করা হয়েছে কাহিনীর স্বার্থে। বাবা-মায়ের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তাকে আমরা দেখি গিটার হাতে গানের জগতে ডুবে যেতে কিংবা খাওয়ার টেবিলে বসে ড্রিংক্‌স করতে। যা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরই জীবন ধারার এক চলমান নির্মাণ। সময়ের তালে তাকে আমরা দেখি বাবার স্ক্যান্ডালকে উন্মোচন করার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে যা উচ্চবিত্ত নাগরিক মননের এক বিদ্রোহী সন্তানের প্রতিচ্ছবি।

শিখা ও অনিকেত মজুমদার একই বৃক্ষের দুটি শাখা। কারণ সন্দেহের বেড়াজালে বন্দি দুজনার জীবন। তাদের ভেতর হয়ত অসম ভালোলাগার ব্যাপার ছিল কিন্তু তা অনিকেতের দিক থেকে একেবারেই নয়। এটাকে পেশাদারিত্বের আবরণে গড়া ভালোবাসার নির্মোহ জলচ্ছবি বললে কলঙ্ক ঢাকার চেষ্টা মনে হয় না। অথচ মিথ্যা এক দায়ভার নিয়ে অনিকেত চলে গেলেন পৃথিবীর মাঝ থেকে না ফেরার দেশে। সিনেমার পরের দিকে দেখা যায়, অপ্রতিমের প্রতি শিখার আবেগের প্রকাশ। যেখানে সে স্পষ্ট করেই বলে তার সাথে অপ্রতিম প্রেম করতে চায় কি না। হয়ত তাই নটি বিনোদনী বিনোদিনী দাসীর সাথে শ্রীমতি সরকারের এই তুলনামূলক সিনেমার নাম আবহমান

সিনেমার নির্মাণ, চরিত্র (বিশেষ করে অনিকেতের মা চরিত্র) অতীত-বর্তমানের মিশেলে অসাধারণ। কিন্তু গৎবাঁধা ধারণার বাইরে নয় বলেই মনে হয়েছে।

অসম্ভব শক্তিশালী কিছু চরিত্রের ছবিআবহমান

মো. আসাদুল্লাহ

আবহমান সিনেমাটি গত কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকবার দেখেছি এবং নোট নিয়েছি। কিন্তু, বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঠিক কোথা থেকে আলোচনাটি শুরু করব। কারণ, সিনেমাটিতে ফ্ল্যাশব্যাকের ব্যবহার এত বেশি যে ভালভাবে আয়ত্তে নিয়ে আসতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। তারপরও বারবার দেখেছি একটা অসম্ভব ভালো লাগা থেকে। সঙ্গে অবশ্য ভালো লাগাটা লেখায় প্রকাশের তাগিদও ছিল।

বহুবার সিনেমাটি দেখতে দেখতে নিজেই লক্ষ্য করলাম এ নিয়ে আমার আগ্রহের অন্যতম কারণ সিনেমার চরিত্রগুলোর দৃঢ়তা। ভেবে ভেবে অনেকবারই নিজেকে দাঁড় করিয়েছি ওই চরিত্রগুলোর জায়গায়। কখনো ভালো লেগেছে, কখনো চমকিত হয়েছি। তাই এ আলোচনায় আমি মূলত এই চরিত্রগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিনেমাটি মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি।

কিন্তু তার আগে একটু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি সিনেমাটির নাম নিয়ে। আবহমান শব্দটির শাব্দিক অর্থ চিরকাল বা অনাদিকাল। পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ সিনেমাটিতে যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন বা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সেগুলো এই সমাজের সদা চলমান ঘটনা। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। আবার কিছু বিষয় যুগের পর যুগ ধরে একইভাবে সমাজে টিকে থাকছে। আমার মনে হয়েছে, পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সিনেমাটিতে এসব বিষয় তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তার সফলতাও প্রায় শতকের কাছাকাছি।

কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রথমেই, খ্যাতিমান আর্টফিল্ম নিমার্তা অনিকেত মজুমদার। সিনেমার পুরোকাহিনী আবর্তিত হয়েছে তাকে ঘিরে। অত্যন্ত দৃঢ়চেতা; আত্মনিয়ন্ত্রিত পুরুষ অনিকেত। তারপরও ফিল্মের লোকদের গতানুগতিক যা হয়; অনিকেতের সাথে তারই একটি সিনেমার নতুন নায়িকাকে নিয়ে ছড়ায় স্ক্যান্ডাল। ফলে অনিকেত মজুমদারের শক্ত বন্ধনের পরিবারে অশান্তি নেমে আসে। অনেকগুলো পরিচিত সম্পর্কের মধ্যে তার প্রথম শিকার হয় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। অনিকেত তা সারানোর চেষ্টাও করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। আবার চেষ্টা করেন্ তাইতো স্ত্রীকে তার বলতে শোনা যায়, Ôআর যাই করো, এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেওনা’। একই সময়ে সম্পর্কের দড়িতে ঢিল পড়ে একমাত্র ছেলের সঙ্গে অনিকেতের। বাবা-ছেলের অসাধারণ সম্পর্কটি নষ্ট হয়েও কিসের জোরে যেন টিকে থাকে। একটু দেরিতে হলেও সেটি ফিরে আসে আগের জায়গায়। আসলে এটাই হয়ত চিরন্তন নিয়ম।

দ্বিতীয়ত, দীপ্তি। অনিকেতের স্ত্রী। যিনি একজন আধুনিক মা এবং স্ত্রীও বটে। তিনিই মূলত পুরো কাহিনীটিকে দ্বন্দ্বময় করে তুলেছেন। তার সব কিছুতে আপাত আধুনিকতার একটা ছোঁয়া থাকলেও তিনি কিন্তু খুব বেশি বের হতে পারেননি তার সীমাবদ্ধতা থেকে। কেবল দীপ্তি নয়, বেশিরভাগ নারীরাই অবশ্য তা থেকে বের হতে পারছেন না। এটাকে কিন্তু আমি তার দোষ বলছি না। পুরুষশাসিত যে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে ওই নারীর বেড়ে উঠা তা হয়ত তাকে অতদূর পর্যন্ত চিন্তাই করতে দেয় না। তারপরও ভুল ও দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দীপ্তির অভিনয়ের যে Ôদীপ্তি’ তার প্রশংসা না করে পারি না।

তৃতীয়ত, ছেলে অপ্রতিম। সুদর্শন। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারুণ্যের ছোঁয়া তার পুরো পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু তারও চিন্তা সময়ের কারণেই হয়ত সময়কে অতিক্রম করতে পারে নি। সময়ের পরিবর্তনে আবার কখনো পেরেছেন সময় থেকে এগিয়ে যেতে। সময়ের এই এগোনো পেছানো, কখনো অপ্রতিমকে করে তোলে বাবার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ, কখনো শ্রদ্ধায় নত। সময়ের এই খেলাকে আমার মনে হয়েছে আবহমান, এই আমাদের চিরদিনের পথ চলা।

চতুর্থত, শিখা ওরফে শ্রীমতি সরকার। বিজ্ঞাপন দেখে নায়িকা হতে আসেন অনিকেতের সিনেমা নটি বিনোদিনীর প্রথম দিনই শ্রীমতির বুদ্ধিমত্তা আকর্ষিত করে অনিকেত ও দীপ্তিকে। সেই শুরু। অনেক শ্লেষ, অপমান হজম করে এই শিখাই এক সময় হয়ে উঠেন শ্রীমতি সরকার। অবশ্য অনিকেতের সঙ্গে এক্ষেত্রে দীপ্তির অবদানও কম নয়। এক পর্যায়ে শিখা সম্পর্কের ফাঁক-ফোকরে ভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে চায় অনিকেতের সঙ্গে। সম্পর্কের সন্নিবেশে কারো একটু বেশি এগিয়ে যাওয়া, কারো নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখা- এই দুইয়ের সম্মিলন রক্ষা করে অনাহূত কিছু ঘটে যাওয়াকে। কিন্তু তারপরও কি সব শেষ হয়ে যায়, এসব কি আসলেই শেষ হবার?

পঞ্চমত, তিন প্রজন্মের সাক্ষ্য বহনকারী অনিকেতের বৃদ্ধা মা। সংকটের অনেকগুলো মুহূর্তে তার অবস্থান নিস্পৃহ হলেও তা জানান দেয় অনেক কিছুর। কখনো স্নেহ-মমতা, কখনো সময়ের দাবিতে উদাসীনতা।

এই যে এতসব চরিত্রের উত্থান-পতন প্রতিক্ষণে আলোড়িত করেছে আমাকে। সব চরিত্র কাল্পনিক (আবহমান এর আগে মুক্তি পাওয়া ঋতুপর্ণ ঘোষের সর্বশেষ ছবি) এর অসাধারণ সব সংলাপের রেশ কাটতে না কাটতেই আবহমান এর শক্তিশালী এ সব চরিত্র আমাকে বিমোহিত করেছে। জয়তু ঋতুপর্ণ!

 

লেখক: ওমর ফারুক, নৃপেন্দ্রনাথ রায় মো. আসাদুল্লাহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন