Magic Lanthon

               

 আবু সাঈদ পলাশ ও মাহমুদুল হাসান পারভেজ

প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার : উপরিতলে নারী সমস্যার আবরণে ভোগবাদীতার বয়ান

 আবু সাঈদ পলাশ ও মাহমুদুল হাসান পারভেজ

বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র গত দুই দশক ধরে অশ্লী­লতা, গতানুগতিকতা ও বীভৎস সব দৃশ্যে ভরে গেছে- এমন মন্তব্য মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর। ‘ছোটলোকদের’ জন্য বানানো এসব সিনেমার নাম শুনলে তারা নাক সিঁটকাচ্ছেন। অন্যদিকে এই মধ্যবিত্তরাই ড্রইংরুমে বসে স্বপরিবারে দেখছেন ভারতীয় অর্ধনগ্ন আইটেম সঙ তাদের মাথা ব্যাথার একটা বড় কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বাংলা সিনেমা। তাদের চিন্তার সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের বাজার মুনাফাকেন্দ্রিক মূলধারার মিডিয়াগুলো, ‘তাদের নিয়ন্ত্রিত বুদ্ধিজীবী’ শ্রেণী ও সাংস্কৃতিক আমলারা। তারা বাংলা সিনেমাকে ‘সুস্থতা’ পরিমাপক মানদন্ডে ফেলতে সোচ্চার। চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, এদেশে বিকাশমান ভোক্তাসমাজ গঠন প্রক্রিয়ার সাথে এই ‘সুস্থতা’বর্গাকরণের বিশেষ যোগসূত্র আছে। এই বর্গাকরণের কল্যাণে জন্ম থেকেই ‘সুস্থতার সার্টিফিকেট’ নিয়ে যে সিনেমাগুলো মুক্তি পাচ্ছে, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার তাদের একটি।

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ও সানসিল্ক নিবেদিত থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার এর চিত্রনাট্য লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সারয়ার ফারুকী। আর পরিচালনা করেছেন ফারুকী নিজেই। মুক্তি পাওয়ার আগে থেকে এখন পর্যন্ত সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অনেক এবং হচ্ছে। এদের মধ্যে একপক্ষ বলছে, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার মূলত সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর শৈল্পিক উপস্থাপন। অন্যপক্ষ মনে করছে, এই সিনেমায় আমাদের বিদ্যমান সমাজ-সংস্কৃতিকে ধ্বংসের সব উপকরণে ঠাসা। এরকম সিনেমা দেশে হওয়া উচিৎ নয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধের দাবিতে মিছিল-মানববন্ধন করেছেন। এই দুই পক্ষের কোন পক্ষ ঠিক, তা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কারণ সিনেমাকে টেক্রট মনে করে ভাববার ও বুঝবার অধিকার দর্শকের আছে। সিনেমাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো বোদ্ধা আমরা নই। তবুও সাধারণ দর্শক ও মিডিয়ার ছাত্র হিসেবে সিনেমাটি সম্পর্কে কিছু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি। আমাদের এই ছোট্ট প্রবন্ধে সিনেমাটির কাহিনী (ন্যারেটিভ, নির্মাণশৈলী, ইমেজ) ধরে আলোচনা করব। এর দার্শনিক জায়গা ও শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা কিংবা এর কোন আর্থ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে কিনা তা দেখতে চাইব। সিনেমাটি ‘সুস্থ’ না ‘অসুস্থ’ তার রায় দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

সিনেমার কাহিনী মূলত রুবা নামের একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে। রুবা ও মুন্না এক সাথে থাকত। বন্ধুদের আড্ডায় মুন্না মদ খেয়ে মাতলামি করতে গিয়ে একজনকে খুন করে সে। এর শাস্তি হিসেবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে। এই সুযোগে শ্বশুর-শ্বাশুড়ি রুবাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। রুবা ওঠে সৎ বাবার বাড়িতে। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় ওই বাড়িও ছাড়তে বাধ্য হয় সে। সিনেমার শুরু এর পর থেকে।

দিন বদল হচ্ছে, আমরা আধুনিক হচ্ছি, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ছে- এই কথাগুলো এখন প্রচলিত। কিন্তু নারীর প্রতি আমাদের কৃতকর্ম, দৃষ্টিভঙ্গি কি আসলেই পরিবর্তিত হয়েছে? নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবছেনই বা কয়জন পুরুষ?


শিকলে বাধা নারী

দিন বদল হচ্ছে, আমরা আধুনিক হচ্ছি, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ছে- এই কথাগুলো এখন প্রচলিত। কিন্তু নারীর প্রতি আমাদের কৃতকর্ম, দৃষ্টিভঙ্গি কি আসলেই পরিবর্তিত হয়েছে? নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবছেনই বা কয়জন পুরুষ? আর তাই এই ‘আধুনিকায়নের’ যুগেও নারী অপমানিত, নির্যাতিত, নিগৃহীত। নিঃসঙ্গ নারীর জন্য পুরুষ প্রাধান্যশীল এই সমাজ কতটা প্রতিকূল, বেঁচে থাকার জন্য তাকে কত সংগ্রাম করতে হয় তা এই সিনেমার প্রথম অংশের বেশ খানিকটা সময় জুড়ে ফুটে উঠেছে।

যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় শহরের গলির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে রুবা। মুঠোফোনে কথা বলা একটি ছেলে তাকে দেখে প্রশ্ন করে, ‘একা একটি মেয়ে এত রাতের বেলা কী করতাছেন আপনি?’ আরো কয়েকটা প্রশ্ন করার পর রুবা বলে, ‘আপনি একা একটা ছেলে এখানে দাঁড়িয়ে কী করতাছেন?’ ছেলেটা বলে, ‘দেখেন ছেলে আর মেয়ে পুরা আলাদা। আপনি আমাকে প্রশ্ন করতাছেন কেন বারবার?’ রুবা তাকে অভদ্র বলে সেখান থেকে দৌঁড়ে পালায়। তারপর আবার কয়েকটা ছেলে রুবার পিছু নিলে রুবা সেখান থেকেও দৌঁড়ে আত্মরক্ষা করে। এবার রুবা দাঁড়ায় ফ্লাইওভারে। একজন মাইক্রোবাস আরোহী রুবাকে পতিতা মনে করে ডাকে, হাত ধরে টানাটানি করে। রুবা কোনো কথা না বলায় সে রুবার মুখে থুতু দিয়ে চলে যায়। এরপর আসে তিন জন পুলিশ। পুলিশ রুবাকে প্রশ্ন করে, ‘এই কে আপনি? এত রাতে একা একটা মেয়ে এখানে কী করেন?’ রুবা বলে, ‘দেশের কোন আইনে আছে একা একটা মেয়ে এত রাতে এখানে দাঁড়ায়ে থাকতে পারবে না? এটা কি শুধু ছেলেদের দাঁড়ানোর জায়গা?’ পুলিশ বলে, ‘আইন দেখতে চান, আইন দেখনেওয়ালা হইছেন? থানায় চলেন’। উপরের সংলাপ ও দৃশ্যগুলোর পর আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য নিয়ে মন্তব্য করা নিসপ্রয়োজন।

সিনেমার শুরুতে মুঠোফোনে কথা বলা ছেলেটি যে প্রশ্ন করে, ফ্লাইওভারে পুলিশও রুবাকে একই রকম প্রশ্ন করে। এতে মনে হওয়া স্বাভাবিক, পুলিশ ‘পুরুষ’ থেকে বের হয়ে ‘পুলিশ’ হয়ে উঠতে পারে নি। তার মানে তারা আগে পুরুষ, তারপর পুলিশ। পুরুষের এই পুলিশ না হয়ে উঠার কারণেই নিরাপত্তার জন্য থানায় গেলে চট্রগ্রামের সীমা চৌধুরী কিংবা দিনাজপুরের ইয়াসমিনকে ধর্ষিত হয়ে জীবন দিতে হয়। রাতে রাস্তা বা ফ্লাইওভারে দাঁড়ানো একলা মেয়েকে তারা পতিতা ভাববেন- এটাই যেন স্বাভাবিক। নারীর প্রতি এমন বৈষম্যমূলক আচরণ বা দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। কারণ পুরুষতান্ত্রিকতা নারীকে ‘বিষ্কার’ করে, নিজের মতো করে ‘শিখিয়ে-পড়িয়ে’ নেয়, পুরুষের উপযোগী করে গড়ে তোলে। আর এ প্রক্রিয়া সফল করার জন্য সমাজ নানান সময়ে নারীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। তুমি নারী, এটা করবে- উঁহু ওটা করবে না, এটা করা ঠিক- এই, ওটা করা ঠিক না, কিংবা এটা নিয়মে আছে- ওটা তো নিয়মে নেই। এই ধারার পরবর্তী পর্যায় হলো এটা মেনে নেয়া যে, ‘নারীর বিষয়ে পুরুষের যাবতীয় কৃতকর্ম প্রাকৃতিক হিসাব-নিকাশ মাত্র, প্রকৃতি এভাবেই নিয়ম বেঁধে দিয়েছে’। কিন্তু যা কিনা প্রাকৃতিক বলে ধরে নেয়া হয় তা প্রকৃতপক্ষে পুরুষের সৃষ্টি, পুরুষতন্ত্রের ছায়া। নারী যে পশু কিংবা পুতুল নয়, রক্তে মাংসে গড়া মানুষ তা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। আসলে ভুলে যাই কথাটি বললে বড় অন্যায় হবে। এই পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজ স্বজ্ঞানে নারীকে ভোগ উপযোগী করে তোলে। ‘পুরুষতন্ত্রের শিকার নারী-পুরুষ উভয়ই। সাধারণত পুরুষতন্ত্র পুরুষকে নির্মাণ করে কর্তা দাপুটে খাদক আর নারীকে নির্মাণ করে অধীনস্ত, নত খাদ্য’।

এক রাত থানা হেফাজতে থাকার পর রুবা তার খালাতো বোনের বাসায় ওঠে। কিন্তু খালাতো বোনের শ্বাশুড়ি একলা রুবাকে মেনে নিতে পারেন নি। বরং তার সম্পর্কে নানা রকম কটুক্তি করে। তিনি তার ছেলের বউকে বলেন, Ôকোত্থেকে একটা মেয়ে মানুষকে এনে এ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছ। ওকে যেতে বলছ না কেন? এ বাড়ির বাচ্চা-কাচ্চারা কী শিখবে? ’ ওই দিনই তিনি রুবাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। এক পর্যায়ে রুবা বাধ্য হয়ে খালাতো বোনের বাসা থেকে চলে যায়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন জায়গায় গেছে যে একজন নারী আর নারীর চোখ দিয়ে নিজেদের দেখতে পারে না। দেখে পুরুষের চোখ দিয়ে। পুরুষ দ্বারা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারী বঞ্চিত হতে হতে এমন একটা গণ্ডির মধ্যে এসে পড়েছে যে, পুরুষই নির্ধারণ করে দেয় একজন নারী, নারীকে কীভাবে দেখবে। অর্থাৎ এই দুর্বল নারী যখন ক্ষমতা পায় সেও ক্ষমতা ব্যবহার করতে চায় পুরুষের মতো করেই। অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ র মতো, ‘পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু হবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর’। তাহলে কি নারীর ক্ষমতায়ন হবে না? অবশ্যই হবে। সেটা ভিন্ন আলোচনা।

মোদ্দা কথা হলো, কোন দুর্বল যখন ক্ষমতা পায় সে ক্ষমতা ব্যবহার করে সবলের মতো করে। খালাতো বোনের শ্বাশুড়ি নিঃসঙ্গ রুবার অসহায়ত্বের কথাতো বোঝেই না বরং তাকে বাসা থেকে যেতে বাধ্য করে। অর্থাৎ ওই নারী (রুবার খালাতো বোনের শ্বাশুড়ি) নারীর অবস্থান থেকে রুবাকে চিন্তা করতে পারেন নি। মোবাইলে কথা বলা ছেলেটির প্রশ্ন, ফ্লাইওভারে মাইক্রোবাস আরোহীর পতিতা মনে করা, পুলিশের প্রশ্ন, অবিবাহিত রুবাকে বাড়ি ভাড়া না দেওয়া কিংবা খালাতো বোনের শ্বাশুড়ির ভূমিকা স্পষ্ট করে তোলে এই পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজ নারীকে কীভাবে দেখতে চায়।

বাহির বলে দূরে থাকুক, ভেতর বলে আসুক না!

থাকার জায়গা নিয়ে সংকটের চরম পর্যায়ে রুবা সাহায্য চায় বাল্যবন্ধু তপুর| তারা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। ফ্ল্যাটে ওঠার প্রথম রাতে তপু রুবার সাথে থেকে যায়। রাত গভীর হলে দুজন-দুজনের প্রতি শারীরিক টান অনুভব করতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে দুজন প্রাপ্ত-বয়স্ক নারী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি কামনা জেগে ওঠা স্বাভাবিক। ক্যামেরায় দুজনকেই অস্থির দেখা যায়। রুবা রুম থেকে বের হয়ে পানি খায়। তপুর রুমের দিকে একটু অন্য দৃষ্টিতে তাকায়। রুবা রুমে ঢুকলে তপু বের হয়। রুবার রুমের দরজায় উঁকি দেয়। কিছুই দেখতে না পেয়ে দরজায় নক করে। রুবা দরজা খুললে অপ্রস্তুত তপু তার মনের কথা বলতে পারে না। এভাবে কয়েকবার নক করার পরও তপু কিছুই বলতে পারে না। রুবা তপুর উদ্দেশ্য বুঝতে পারে কিন্তু সরাসরি সম্মতি দেয় না। তপু চলে গেলে রুবা বের হয়। এই দ্বিধা দ্বন্দের মাঝখানে রুবার ভেতরের রুবা বেরিয়ে আসে। বর্তমানের রুবা তপুর রুমের দিকে যেতে চাইলে সামনে এসে দাঁড়ায় কৈশোরের রুবা। তাকে বাঁধা দেয়। পর্দায় তাদের এই মানসিক দ্বন্দ্বকে ভাষা দিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে বাহির বলে দূরে থাকুক, ‘ভেতর বলে আসুক না! ভেতর বলে দূরে থাকুক, বাহির বলে আসুক না!’

বৈশিষ্ট্যগতভাবেই মানুষ দ্বান্দ্বিক। প্রদেয় পরিস্থিতি যখন ব্যক্তিকে কোনো এক নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করে। তখন ব্যক্তির নিজের সামনে দাঁড়িয়ে পরে তার বিবেক। সৃষ্টি করে মানসিক দ্বন্দ্বের। এই দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় সে নিজের কাছে জয়ী হয়; আবার কখনো হয় পরাজিত। রুবা যে তার মনের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে, সে কী করবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে; এর উপস্থাপন হয়েছে তার তিনটি সত্তার নির্মাণে। একটি মাস্টার শটে বর্তমানের রুবা, তার পেছনে কৈশোরের রুবা, তার একটু পেছনে শৈশবের রুবার অবস্থান এবং সার্বিক পরিস্থিতির যে চিত্রকল্প তুলে ধরেছে তার জন্য পরিচালক প্রশংসার দাবি রাখেন। রুবার মানসিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ করতে তার এই তিন সত্ত্বার উপস্থাপন সিনেমার আরো কয়েকটি জায়গায় চোখে পড়ে।

এক. তপু স্টুডিওতে গান রেকর্ডিং করার সময় রুবা তাকে ফোন করে বাসায় ডাকে। বলে, Ôতপু তুই কই? একা ভালো লাগতেছে না। তুই আজকে আয়’। তখন আবার রুবার সামনে আসে তার শৈশব ও কৈশোরের রুবা। কৈশোরের রুবা তাকে বলে, ‘তুমি তপুকে এখানে ডাকতে পার না’। বর্তমানে রুবা ও কৈশোরের রুবার মধ্যে বাকবিতণ্ডা চলে অনেকক্ষণ। এক সময় কৈশোরের রুবা তাকে মার কাছে ফিরে যেতে বলে। তখন বর্তমানের রুবা বলে, ‘তুমি জানো না আমি ওখান থেকে কীভাবে চলে এসেছি? আমি ওখানে 3rd class citizen হয়ে থাকতে পারব না’। কৈশোরের রুবা বলে, ‘এখানে তুমিতো 4th class citizen হয়ে আছ’। সে বর্তমান রুবাকে ধিক্কার দেয়। শৈশবের রুবা তাকে থামতে বলে।

 

দুই. মুন্না জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তাকে আর ভালোবাসতে পারে না রুবা। তার মনে তপুর কথা ঘুরতে থাকে। আবার আসে কৈশোরের রুবা। সে বর্তমানের রুবাকে বলে, Ôতুমি তোমার হাজবেন্ডকে চিট করতেছ। তোমার বডিটা এখানে পরে আছে আর তোমার মাইন্ড? তোমার মন পরে আছে তপুর কাছে।...তুমি এভাবে বসে না থেকে মাকে খুলে বলতে পারছ না। এটা পারিবারিকভাবে সেটেলড্‌ করতে পারছ না? শেষ করা সম্ভব নয়?’ নিজের বিবেককে অগ্রাহ্য করতে পারে না রুবা। যখনই সে মুন্নাকে ছেড়ে তপুর কথা চিন্তা করেছে বা তপুর কাছে যেতে চেয়েছে তখনই সে তার বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তারই উপস্থাপন রুবার তিনটি সত্তা। দ্বন্দ্বের এই উপস্থাপন অসাধারণ।

জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে পরাবাস্তব আবহ

রুবা নিজে আধুনিক হয়েও সাধারণ নারীর বিদ্যমান রূপ থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি। সারা জীবন সে তার মাকে ঘৃণা করেছে। কারণ, স্বামী-সন্তান রেখে পুরোনো প্রেমিকের হাত ধরে চলে গিয়েছিল তার মা। রুবার ধারণা সে কারণেই মারা গেছেন তার বাবা। কিন্তু সে কখনোই চিন্তা করে নি তার মা কোন পরিস্থিতিতে এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

জীবনের একটা পর্যায়ে এসে রুবাও তার মায়ের মতো জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। সেই জটিলতা মুন্না ও তপুকে নিয়ে। রুবা তখন মায়ের জীবনকে মূল্যায়ন করে নিজের জীবনের আলোকে। সে ভাবতে থাকে, মা কেন তার বাবাকে ছেড়ে এসেছিল? কোন পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজে একজন নারীকে তার স্বামী ছেড়ে আসতে হয়? তার মা কতটা নিরুপায় ছিল? নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখতে থাকে মাকে। সে বোঝে আমাদের পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে পুরুষ চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে কিন্তু নারী তা পারে না। একজন পুরুষ চাইলে একাধিক বিয়ে করতে পারে। কিন্তু নারী তার স্বামীকে ত্যাগ করলে সমাজ তাকে ঘৃণা করে। যেমনটি রুবা মেয়ে হয়েও তার মাকে করেছিল।

মায়ের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনে সৃষ্ট জটিলতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে রুবা তার ভুল বুঝতে পারে এবং মায়ের কাছে ফিরে যায়। ততদিনে তার মা পরপারে চলে গেছেন। ভুল স্বীকার করতে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি একটি অসাধারণ দৃশ্যের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। এক ধরনের পরাবাস্তব দৃশ্যকল্পের তৈরী করেছেন নির্মাতা। সেখানে মায়ের কাছে রুবার নিজেকে সমর্পণের জায়গাটুকু এবং তার যে সিনেমাটোগ্রাফিক উপস্থাপনা সেটি এককথায় অসাধারণ। দৃশ্যটি এরকম- সবুজ বিসতৃত মাঠ, চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন, সবুজ মাঠের মাঝে একটি দিঘী, দিঘীতে একটা নৌকা, দিঘীর ওপারে মা আর এপারে রুবা খাটে শুয়ে আছে। রুবা দেখতে পায়, মা তার তিনটি সত্তাকেই আদর করে খাইয়ে দিচ্ছে। রুবা খাট থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে দিঘীর পারে যায়, চিৎকার করে নিজের ভুলগুলোর কথা মাকে বলে। টপ ও লঙ শর্টে সবুজ মাঠ-চারিদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন, সেখানে মা-রুবা-দিঘী এবং তাদের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের যে মনোরম দৃশ্য তা দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।

পুরুষ কি যৌনতার বাইরে কিছুই ভাবতে পারে না!

নারী পুরুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পরিবার ও সমাজ এবং ভিন্ন ভিন্ন সব সম্পর্ক। পুরুষ কখনো বাবা, ভাই, স্বামী, প্রেমিক আবার কখনো বন্ধু। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে জৈবিক চাহিদা একটি কারণ। কিন্তু সেটিই মূল কারণ নয়। কিন্তু সিনেমায় পুরুষের যে উপস্থাপন তাতে দর্শকের মনে হতেই পারে, পুরুষ বোধহয় শারীরিক সম্পর্কের বাইরে অন্য কোন সম্পর্কে নারীকে ভাবতে পারে না। পুরো সিনেমা জুড়ে পুরুষ যেখানে-যেভাবে এসেছে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষকে কামুক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা ছিল। সিনেমার যে ইমেজসমূহ (ভাষাগত, দৃশ্যগত, শব্দগত) তাতে বোঝার বাকি থাকে না পুরুষ হচ্ছে একমাত্র Ôখাদক’ যার Ôখাদ্য’ নারী। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক নারী-পুরুষের সম্পর্ক কি শুধুই শারীরিক? পুরুষ কি কারো ভাই, কারো বাবা কিংবা কারো বন্ধু নয়? নাকি সিনেমাটিকে হালকা বিনোদন নির্ভর বা দর্শককে সুড়সুড়ি দেবার জন্যে শারীরিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে? সব জায়গাতেই ফ্রয়েডীয় মতবাদের উৎকট ব্যবহার। আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা কী মাত্রায় আছে সেটা বড় বিষয় নয়। কিন্তু সিনেমার ন্যারেটিভে পুরুষতান্ত্রিকতা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সব দোষ পুরুষের।

পাঠক ভুল বুঝবেন না। আমরা নারী কিংবা পুরুষের হয়ে কথা বলছি না। দর্শকের জায়গা থেকে শুধু বলছি, পুরো সিনেমা জুড়ে একটি দৃশ্য কি থাকতে পারে না, যেখানে পুরুষের ইতিবাচক ইমেজ আছে? তাহলে কেন নারী-পুরুষের এরকম উপস্থাপন? এটা কী শুধুমাত্র নারীর অধস্তনতা বোঝানোর জন্য, নাকি পুরুষ আধিপত্যকে নতুন করে নির্মাণের চেষ্টা? নাকি অন্য কিছু?

শ্লীলতা বনাম থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার

বাংলাদেশের মূলধারার সিনেমা নিয়ে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের Ôমাথাব্যাথা’ নতুন কিছু নয়। তাদের কাছে বাংলা সিনেমা আর অশ্লীলতা এক হয়ে গেছে। যে কারণে তারা ছিলেন হলবিমুখ পাশাপাশি অশ্লীলতা বন্ধের ব্যাপারে সোচ্চার। অশ্লীলতা বন্ধের আন্দোলনে তারা হয়তবা সফল হয়েছেন। তাদের সফলতায় মুলধারার সিনেমা নির্মাণের হার কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে! অন্যদিকে দর্শক কমে যাওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে সিনেমা হলের সংখ্যা। মধ্যবিত্ত রুচিশীল দর্শকের লাভ যেটা হয়েছে সেটা হলো, তাদের গোত্রভূক্তরা সিনেমা বানাতে এগিয়ে আসছেন। কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন, চলচ্চিত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যে অশ্লীলতা দূর করতে সিনেমা তৈরীতে তারা নিজেদের অবস্থান পোক্ত করছেন সেই অশ্লীলতা কি আসলেই বন্ধ হয়েছে? নাকি সুস্থ চলচ্চিত্রের নামে অন্য কোন ডাইমেনশনে Ôঅশ্লীলতা’ আসছে? রুচিশীল এই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর Ôসুস্থতার সার্টিফিকেট’ নিয়ে যে সিনেমা তৈরি হচ্ছে তা কি তাদের মস্তিস্ক উদ্ভুত Ôঅশ্লীলতা’র বাইরে? থার্ড পারসন সিঙ্গলার নাম্বার কিংবা একই নির্মাতার প্রথম ছবি ব্যাচেলর কি খুবই শ্লীল?

ব্যাচেলর সিনেমায় ব্যাচেলরদের ফ্ল্যাটে টেলিফোন সেটটার অবস্থান সোফার পাশে, ওপরে দেয়ালের গায়ে ন্যুড নারীর আবক্ষ পোর্টেট। পুরো সিনেমাতে যখনই ক্যামেরার চোখ পোর্টেটটির উপর ফোকাস করে তখনই দেখা যায় কোন না কোন ব্যাচেলর কোনো না কোনো কাম্য নারীর সাথে টেলিফোনে আলাপচারিতায় লিপ্ত। রুচিশীল দর্শকদের জন্য উপস্থাপিত ভিন্ন মেজাজের অশ্লীলতার সুন্দর উদাহরণ এটি। এরকম ডজনখানেক উদাহরণ ব্যাচেলর থেকে দেয়া যাবে। যাহোক আমাদের আলোচনা থার্ড পারসন সিঙ্গলার নাম্বার নিয়ে। এই সিনেমায় অশ্লীলতার সুনিপুণ ব্যবহার দর্শককে মুগ্ধ না করে পারে না। দর্শক তাড়িত হন কিংবা হন উদ্দীপ্ত। সে কারণে সিনেমা হলে সিনেমাটি দেখার মাঝে মাঝে হাততালি দিতে দেখা যায় দর্শকদের। ফ্ল্যাটে ওঠার প্রথম রাতে রুবার সাথে থেকে যায় তপু। রাত গভীর হলে পরস্পরের কাছে থাকার ইচ্ছা প্রবল হয়। দৃশ্যটি এরকম-ক্যামেরায় অস্থির দুজন। তপু দ্রুত হাঁটছে, মাথায় হাত বুলাচ্ছে বারবার। একে অপরের রুমের দিকে তাকাচ্ছে আকাঙ্খিত দৃষ্টিতে। আকাঙ্খার সর্বোচ্চ প্রকাশ বোঝাতে নির্মাতা হাতে তুলে দেন পানি। এত দূর পর্যন্তও ঠিক ছিল। কিন্তু একটু পরেই তপুকে দেখা যায় ব্যান্ডের তালে তালে বুকডন দিতে। হয়ত এরকম পরিস্থিতিতে নারী পুরুষের মধ্যে জৈবিক আকাঙ্খা জেগে ওঠা স্বাবাবিক। কিন্তু তাই বলে তার প্রকাশ এরকম! হাজার হলেও রুচিশীল মধ্যবিত্তদের জন্য মধ্যবিত্তদের দ্বারা নির্মিত সিনেমা!

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার বিদ্যমান সমাজকে পর্দায় এনে যে শিল্প তৈরি করে তাকে ব্রেখ্‌ট এর শিল্প ধারণার সাথে তুলনীয় করে দেখতে চাই। ব্রেখট বলেছিলেন, Ôশিল্প হচ্ছে সেই হাতুড়ি যা দিয়ে শিল্পী পরিচিত, চলতি বাস্তবতাকে ভেঙ্গে, দুমড়ে নতুন করে নির্মাণে সক্ষম’। অর্থাৎ শিল্পে বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য বাস্তবতার সাথে কিছু ফিকশন যোগ করতে হয়। প্রশ্ন আসে, তাহলে কি বাস্তব জৈবিক আকাঙ্খার সাথে ফিকশন হিসেবে এই বুকডনের উপস্থাপনা? নাকি দর্শককে আদিম রসদ জুগিয়ে সিনেমায় আকৃষ্ট করার চেষ্টা? একইভাবে বেশ কয়েকটি জায়গায় চটুল কথার উপস্থাপন দর্শককে প্রলুব্ধ করেছে।

এক. রাতের ফ্লাইওভার, একাকী দাঁড়িয়ে থাকা রুবাকে যৌনকর্মী মনে করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে এক মাইক্রোবাস আরোহী। রুবা নিশ্চুপ থেকে লোকটিকে উপেক্ষা করলে এক পর্যায়ে লোকটি রুবার মুখে থুতু দিয়ে চলে যায়। এই দৃশ্যটি দেখে রুবার প্রতি দর্শকের সহানুভূতি সৃষ্টি হবার কথা। কিন্তু না, তার বদলে হলের দর্শক হাততালি ও শিস দেয়। কিন্তু কেন? লোকটি রুবাকে বলে,‘এই কতো রে? চল, আয়-না, আয়-আয়, আয়-আরে আয়না-আয়’  রুবা লোকটির সাথে কথা না বলে সরে দাঁড়ালে লোকটি বলে, ‘এই শোন, এই...শোন না, আয়না-আয়, ভালো হোটেলে উঠামুনে আয়-আয়’। এই সুড়সুড়ি দায়ক কথা শোনার পর দর্শকের তো হাততালি দেওয়ারই কথা। তাই নয় কি?

দুই. পুরান ঢাকায় বাসা খুঁজতে যায় রুবা। সেখানে বাড়িওয়ালা রহমান সাহেবের চোখ দেখান নির্মাতা। অন্যদিকে ক্লোজ শটে রুবার বুক দেখানো হয় বার বার। রুবার বাসা না পাওয়ার কষ্ট যতটা না দর্শককে আহত করে, তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্দীপ্ত করে রুবার বুক। বউকে ফাঁকি দিয়ে রহমান সাহেব ছাদের কোনায় গিয়ে রুবার সাথে মোবাইলে ফিসফিস করে কথা বলে। রুবাকে বলে, Ôএকটা মাইয়া একটা পোলারে কী সাহায্য করতে পারে, তুমি বোঝনা?’ রুবা বলে, Ôচাচা আপনে তো পোলা না বৃদ্ধ’। আবার রহমান সাহেব বন্ধুদের আড্ডায় থাকার সময় মাথার টুপি খুলে রুবার রুমের দিকে যায়। দরজায় টোকা দেয়। রুবা দরজা না খুলে চাচিকে ডাকার ভয় দেখায়। বউয়ের ভয়ে রহমান চাচা নিচে নেমে আসেন। রহমান চাচা চরিত্রটির এমন আচরণকে নির্মাতা কী বলবেন?

তিন. বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পেছনের কাশবন। তপু আগে থেকেই কাশবনে ঢুকে থাকে। রুবা মোবাইলে কথা বলতে বলতে তপুর গাড়ীর সামনে যায়। তপু তাকে কাশবনের ভেতরে আসতে বলে। তখন রুবা বলে, ‘ওইখানে কেন? এই দিকে আয়’। তপু আস্তে করে বলে, ‘চুপ...এই দিকে আয়’। রুবা, ‘মানে ভেতরে ঢুকব? তপু, ‘আস্তে, এই দিকে আয়-আয়না। এই দিকে ফাঁকা আছে দেখ’। রুবা, কোন দিকে। আহ্‌! কী সমস্যা তপু?’ ‘এই দিকে কেন কথা বলতে হবে’। তপু, ‘আস্তে’। রুবা,‘তপু তুই কোন দিকে নিয়ে যাইতেছিস’। তপু ঠোঁটের উপর আঙ্গুল দিয়ে, ‘হিস্‌... খালি আয়’। রুবা,‘এই দিকে কোন দিকে?’ তপু রসিয়ে রসিয়ে বলে, ‘এই দিকেই তো আসল খেলা’। রুবা, ‘ওফ খোদা! তপু, আজকে সতীত্ব নিয়ে ফিরে যাইতে পারব তো?’ তপু অনেকটা বাংলা ছবির খলনায়কের মতো হেসে বলে, ‘সুন্দরী আজ তোমাকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না’। রুবাও হেসে বলে, ‘দেখ আমার হাত থেকেই তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না’। পরস্পরের এই কথোপকথনে হয়তবা কোন সুশীল মধ্যবিত্ত শ্রেনীর শ্লীলতা হানি হয় না। কিন্তু দৃশ্যে উপস্থিত ঘন কাশ. রুবার অনিশ্চয়তায় ভরা উৎকন্ঠা আর সতীত্ব হানির কথা শুনেও কি তারা গোঁ ধরে বসে থাকবেন! বলবেন, থার্ড পারসন সিঙ্গলার নাম্বার অশ্লীলতা মুক্ত?

চার. চাকরি দেওয়ার নাম করে মাঝবয়সী এক লোক রুবাকে গাড়ীতে নিয়ে ঘোরে আর শরীরী বাসনার একই ইংরেজি গান বার বার শোনাতে থাকে। রুবা বেশ কয়েকদিন লোকটার সাথে গাড়ীতে ঘোরাফেরা করে। গানের তালে তালে তাকে দুলতে দেখা যায়। এক সময় রুবা তার বসকে বলে, ‘আচ্ছা... আমার কাজ কী হবে?’ বস বলে, ‘ফাইল পত্র দেখবা, বিলপত্র দেখবা, এইতো’।রুবা, ‘আচ্ছা... আমার বেতন কত হবে?’ বস, ‘কত চাচ্ছ?’রুবা, ‘বিশ হাজার’। বস, ‘ডান বিশ হাজারই পাবা’। রুবা, ‘আর গান’। বস অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘গান?’  রুবা, ‘এই যে প্রতিদিন আমাকে একি গান শুনতে হয়। এর জন্য এক্সট্রা পেমেন্ট দিবেন না, এক্সট্রা ক্যারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস’। বস এবার হেসে বলে, ‘ও গানের জন্য আমি তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেব। অন্য কিছু করতে চাইলেও আমি তোমাকে টাকা দেব। তবে আমি তোমাকে অন্য কিছু করব না। কারণ আমি বিবাহিত। আমার নৈতিকতা আছে’। রুবা কন্ঠে মাধুর্য এনে বলে, ‘শুধু গান শুনলেই হয়ে যায় আপনার?’ পাঠক এই সংলাপগুলোকে আপনি কী বলবেন? মূলধারার বাংলা সিনেমার ভাষা কি এটাকেও ছাপিয়ে যায়?

থাকার জন্য বসুন্ধরার চেয়ে ভালো জায়গা ঢাকায় নেই

প্যারিসে ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় দেখালেন বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র। কিছুদিনের ব্যবধানে চলচ্চিত্র হয়ে উঠল সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম অঙ্গ। এই শিল্প-মাধ্যমেই সের্গেই মিখাইলোভিচ আইজেনস্টাইন নির্মাণ করেছিলেন ব্যাটলশিপ পটেমকিন (১৯২৫) এর মতো অসাধারণ ছবি। ঋত্বিক কুমার ঘটক তার অযান্ত্রিক (১৯৫৫) সিনেমায় দেখিয়েছিলেন মৃত্যু নয়, জীবনই সত্য। কিংবা সত্যজিৎ রায় তার পথের পাঁচালী (১৯৫৫) সিনেমায় সৃষ্টি করেছিলেন আবহমান গ্রামবাংলার চিরন্তন আর বাস্তব রূপ। চলচ্চিত্রকে শুধু শিল্প হিসেবে দেখার-এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যাবে।

কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় ভয় চলচ্চিত্র শিল্প-মাধ্যমটি সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত হওয়া নিয়ে। চলচ্চিত্র শিল্প মাধ্যম হলেও এতে পুঁজির বিনিয়োগ আছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্র নির্মাণে বৃহৎ পুঁজির দরকার। এবং সেই পুঁজি ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ এটিও ঠিক। কিন্তু চলচ্চিত্র যদি নিজেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে তাহলে সেটি শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে চলচ্চিত্র তখন আর শিল্প থাকে না, পরিণত হয় সাংস্কৃতিক পণ্যে।

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার এ দেখুন, পাবলিক প্লে­সে সমস্যা আছে বলে তপু রুবার সাথে দেখা করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাশবনে। তারা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে বসুন্ধরায় বিলাসবহুল ফ্লাট ভাড়া নেয়। তপুর দামী গাড়িতে ঘোরার সময় রুবা বলে, ‘বুঝলি? থাকার জন্য বসুন্ধরার চেয়ে ভাল জায়গা ঢাকায় নেই’। সিনেমার কেন্দ্রিয় চরিত্রগুলোর মুখ থেকে ‘বসুন্ধরার’ গুণগান বারবার শোনা যায়। এক্ষেত্রে পরিচালকের বসুন্ধরাপ্রীতির বিষয়টি চোখে লাগার মতো। যেমনটি ছিল তার প্রথম সিনেমা ব্যাচেলর এ। যেখানে হাসান ভাই স্ন্যাকসের দোকানে কোমল পানীয় খাওয়ার সময় শায়লাকে ফোন করে বলে, ‘... আই নো হাউ টু কিপ প্রমিজ... আমি তোমাকে কথা দিছিলাম যে কোনো আমেরিকান প্রোডাক্টস ইউজ করবো না, আমি এখন ইউরো লেমন খাইতেছি, ঠাণ্ডা!’ আমরা জানি, ব্যাচেলর ইউরোকোলা নিবেদিত ছিল। হয়ত সিনেমাটি নির্মাণে ইউরোকোলার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধাও পেয়েছিল নির্মাতা। তাহলে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার-এর ক্ষেত্রে এমন কিছু কি ঘটেছে?

শুধু বসুন্ধরা নয়, ট্রান্সকম-পণ্যের সরাসরি বিজ্ঞাপনও আছে সিনেমাটিতে। ট্রান্সকমের শো-রুমে টেলিভিশন কেনার পর বিক্রয়কর্মী রুবাকে বলে, ‘আপা এই নেন ওয়ারেন্টি কার্ড। পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি আছে। সারা দেশে আমাদের শো-রুম আছে’। সিনেমায় ট্রান্সকম টেলিভিশনের গুণকীর্তন করে নির্মাতা কী এই টিভির প্রতি আমাদের আগ্রহী করতে চাইছেন?

সিনেমার কহিনী এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ক্রমাগত এসেছে বিভিন্ন পণ্যের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথায় উঠে এসেছে সেই সব পণ্যের গুণকীর্তন। বলা যায়, পণ্যগুলোর উপযোগিতা বাড়াতে নির্মাতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। আর তাই ব্যস্ত ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী; একমাত্র বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বাসযোগ্য! ভালোভাবে থাকতে হলে তো বসুন্ধরাতেই থাকতে হবে, নাকি! এর বাইরে কিনতে হবে ট্রান্সকমের টেলিভিশন, গান শুনতে হলে আছে রেডিও ফূর্তি!

চলচ্চিত্র আর বিজ্ঞাপন দুটো ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন মাধ্যম। আমরা চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্রের মতো করে দেখি, বিজ্ঞাপনকে দেখি বিজ্ঞাপনের মতো। কিন্তু এ দুটিকে যদি এক করে ফেলি তাহলে উভয়েই অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। এক সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞাপন বিষয়ে মোস্তফা সারয়ার ফারুকী বলেন, ‘বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কোন ফিলোসফি নেই। আমি সবসময় একটা কথা বলি, বিজ্ঞাপনতো ভাই আর্ট না’।৪ মানলাম বিজ্ঞাপন কোন আর্ট নয় (যদিও আমরা মনে করি বিজ্ঞাপনও একটি আর্ট)। সিনেমাতো আর্ট ? তাহলে কি, সিনেমার ভিতরে বিজ্ঞাপন ঢুকিয়ে বিজ্ঞাপনকে তিনি আর্ট বানাতে চাচ্ছেন? যদি তাই হয় তাহলে এরকম উদ্দেশ্য সফল করার জন্য ফারুকী বাহবা (!) পেতেই পারেন। এখন প্রশ্ন সেই বাহবা (!) নিয়ে।

বিচ্ছিন্নতা, ভোগবাদীতা থার্ড পারসন

সিনেমা দেখে মনে হয়, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার একটি Ôবিশেষ’ রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিনিধিত্ব করেছে মাত্র। সিনেমার সামগ্রিকতায় বিচরণের ব্যর্থতা তার পুরোটা সময় জুড়ে। সে কারণেই এটা সিনেমা হয়ে ওঠার পথ থেকে সরে থেকেছে অনেক দূরে। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র রুবার ভেতরে যে মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা অর্থনৈতিক সংকট তার থেকেও অনেক বেশি সমস্যায় পড়ে বাস্তবের কোনো নারী। অথচ রুবার মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের চেয়ে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাজারি অর্থনীতির ইতিবাচক বয়ান। সেখানে রুবা কোন ছাত্রী-হোস্টেলে কিংবা কর্মজীবী নারীদের হোস্টেলে থাকার চিন্তা করতে পারে না। বিপরীতে তপুর সাথে বন্ধুতার সূত্রে বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে শেয়ার করে থাকে। আর তার মানসিক দ্বন্দ্বের শুরু সেখান থেকেই। নির্মাতা ফারুকী আর স্ক্রিপ্ট লেখাতে তার ‘সহযোদ্ধা’ আনিসুল হক সচেতনভাবেই যে এ সংকট সৃষ্টি করেছেন তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। কিন্তু এটা যদি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, কেন এই নির্মাণ প্রচেষ্টা?

বাস্তব নারীর সমস্যার সাথে রুবার সমস্যা সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু সমস্যা উত্তরণে রুবা যত সহজে উতরে যায়, বাস্তবে কি এমন হয়? কিংবা সব সমস্যার সমাধান করে কেন তাকে এই মানসিক দ্বন্দ্বে ফেলে দেওয়া? হয়ত এর সবগুলোর উত্তরে সিনেমার কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হবে। কিন্তু বসুন্ধরা আর ট্রান্সকমের বাইরে গিয়ে কী সিনেমার কাহিনী এগিয়ে যেতে পারতো না? পারতো না পুরান ঢাকার ‘রহমান চাচার’ ওই রকম চিত্রণ থেকে দূরে সরে থাকতে? কিংবা বসুন্ধরার বাইরে যেয়ে অন্য কোথাও রুবার থাকার জায়গা তৈরি করতে? এর কোনটাই কিন্তু হয়নি, সিনেমার প্রয়োজনেই। কেননা সিনেমাটি সচেতনভাবেই নির্মিত হয়েছে একলা নারীর পথ চলার সমস্যাকে উপজীব্য করে। সে কারণেই তাকে কিছু স্টেরিওটাইপ সমস্যায় ফেলে এগিয়ে নিয়ে গেছে বসুন্ধরা আর ট্রান্সকমের দিকে। নারীর ব্যক্তিক সব সমস্যার ‘ভিন্নরকম’ সমাধান করে তাকে ফেলে দিয়েছে মানসিক দ্বন্দ্বে। যে মানসিক দ্বন্দ্ব পাশ্চাত্য ঘরানায় লিভটুগেদারের ধারণায়ন থেকে তৈরি। কিন্তু সাধারণের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতার এত সব অসংগতি থাকা সত্ত্বেও কেনো এই ‘লিভটুগেদার’ সিনেমার বিষয় হয়ে ওঠে? একটু তলিয়ে দেখলে নির্মাতার এরকম বিষয় নির্বাচনের যৌক্তিকতা ধরা পড়ে যায়।

এরকম সম্পর্ক অর্থাৎ লিভটুগেদারে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ ইচ্ছে করলেই পারস্পারিক সমঝোতায় একসাথে বসবাস করতে পারেন। সেখানে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বললেই চলে। এখানে individual গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে মানবিক সম্পর্কগুলো ব্যক্তি-প্রাধান্যের কাছে হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন। এতে নীতি হিসেবে যেটা দাঁড়ায়, সেটা এমন- ইচ্ছে হলে সাথে থাকো, ভালো না লাগলে চলে যাও। একথা ঠিক ব্যক্তি অবশ্যই সবার আগে, সমাজের মৌলিক এককও ব্যক্তি। কিন্তু সে কোনোভাবেই সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়। কিন্তু আপনি চান বা না চান, লিভটুগেদার আপনাকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চায়, যেখানে ব্যক্তি একা হয়ে পড়ে। আর তা থেকে তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতার। এই বিচ্ছিন্ন মানুষ কারো কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করতে পারে না। আর তখন ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ব্যক্তির বিকল্প অন্যকিছু। তখনই বিকল্পের জায়গা দখল করে নেয় প্রাযুক্তিক সব উপকরণ। ব্যক্তি তার এই আপাত নিঃসঙ্গতা ভুলতে শরণাপন্ন হয় সেগুলোর ওপর। সেই সুযোগে বাজারি সমাজ হাত বাড়ায় তার দিকে। ফলে পণ্যের বিক্রি বাড়ে, হয় ব্যবসা।

অর্থাৎ ব্যক্তিকে যতভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যাবে, তত বাড়বে ভোগবাদি সব উপকরণের চাহিদা। আর সে কারণেই সব কিছুকে ছাপিয়ে সমসাময়িকতার প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে মুন্না, রুবা ও তপুর এ ধরনের সম্পর্কের উপস্থাপন। আর এটাকেই বাস্তবতায় রূপ দিতে চেয়েছে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার নিয়ে যে বিভাজন বা দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছে সেখানেই আবার ফিরতে চাই। আমরা আগেই বলেছি এ দুটো পক্ষের কোনো একটিকে সমর্থন করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। লেখার শেষে এসে কেউ যদি মনে করেন আমরা দ্বিতীয় পক্ষের সেক্ষেত্রে তাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, কোনো চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে আমরা যেমন মিছিল-মানববন্ধন সমর্থন করি না তেমনি চলচ্চিত্রকে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের উপকরণ হিসেবেও দেখতে চাই না। আমরা চাই, চলচ্চিত্র বিশুদ্ধ শিল্পমাধ্যম হিসেবে লগ্নিকৃত অর্থ তুলে আনার পাশাপাশি তার শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রাখবে।

 

লেখক: আবু সাঈদ পলাশ মাহমুদুল হাসান পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র পারভেজ লেখাপড়ার পাশাপাশি মঞ্চনাটকে কাজ করেন

 

তথ্যসূত্র

১. ভারতের বলিউডকেন্দ্রিক নির্মিত চলচ্চিত্রে ১৯৪০ দশকে শুরু হওয়া বিশেষ ধরনের সঙ্গীতনির্ভর উপস্থাপনা। এর সাথে দৃশ্যত সিনেমার কাহিনীর সংযোগ খুব একটা থাকে না। বিপরীতে এসব গানের কথায় থাকে চটুলতা, আর অভিনেতা-অভিনেত্রীর শরীরে খোলামেলা পোশাক। বর্তমানে এ ধরনের গান হিন্দির ভাষার সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

২. ইসলাম, উদিসা (২০০৫); ‘ধর্ষণ-সংবাদে লিঙ্গীয়-দৃষ্টিভঙ্গির বিচারমূলক পাঠ’; যোগাযোগ; সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি, পৃ-১২৩।

৩. মামুন, আ-আল (২০০৭); ‘বাংলা সিনেমার উদ্ধারপ্রকল্প: চন্দ্রকথা, ব্যাচেলরদের পোয়াবারো’;যোগাযোগ; সংখ্যা-৮, পৃ-১৪০।

৪. হোসাইন, সাজ্জাদ (২০১১); ‘শিল্প কারখানা...’; রাফকাট মোস্তফা সরয়ার ফারুকী; ঐতিহ্য, ঢাকা। সম্পাদিত এই বইটিতে পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন