Magic Lanthon

               

জান্নাত ঊর্মি ও তাহ্সিন আহমেদ

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ইতি মৃণালিনী : সাধারণ নারীর অসাধারণ বয়ান

জান্নাত ঊর্মি ও তাহ্সিন আহমেদ

পাঠকদের অনেকেরই নিশ্চয় বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) এর নিমগাছ গল্পটি পড়া আছে। গল্পটিতে সবাই নিমগাছের গুণের কথা বলে। এমনকি বিজ্ঞ থেকে অজ্ঞ, সবাই প্রয়োজনে গাছটি ব্যবহারও করে। এই গাছ বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশিই হন। বলে- ‘নিমের হাওয়া ভালো, থাক্, কেটো না।’ কাটে না, কিন্তু সেটির যত্নও কেউ করে না। অবশ্য কেউ কেউ গাছের চারিদিকে শান বাঁধিয়ে দেয়। কিন্তু তাও ব্যবহার হয় আবর্জনা ফেলার জায়গা হিসেবে। একদিন একটা নতুন ধরনের লোক এল নিমগাছ দেখতে। তিনি ছাল তুললেন না, পাতা ছিড়লেন না, ভাঙলেন না ডালও। শুধু মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। তিনি বলে উঠলেন, বাহ্, কী সুন্দর পাতাগুলি...কী রূপ! থোকা-থোকা ফুলেরই বা কী বাহার! খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেলেন তিনি। সবাই বলল, তিনি কবিরাজ নন, কবি। নিমগাছটার ইচ্ছে হলো লোকটার সঙ্গে যেতে। কিন্তু পারল না। কারণ মাটির ভিতরে তার শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তুপের মধ্যেই রইল গাছটি।

গল্পের শেষ লাইনটি এমন- ‘ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মীবউটার এক দশা।’

ইতি মৃণালিনী চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে এই গল্পের নিমগাছটির কথা কেন জানি বারবার মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্র মৃণালিনী সেই গাছের মতো কোথায় যেন আটকে পড়েছেন। অথচ চলচ্চিত্রে মৃণালিনীর সামাজিক যে অবস্থান, তাতে সেই শিকড় ছেঁড়ার কথা ছিল। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই মৃণালিনীরা তাদের এই শিকড় না ছেঁড়ার ব্যর্থতাকে একেবারেই খারিজ করে দেন।

ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী অপর্ণা সেন পরিচালিত ইতি মৃণালিনী চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় ২০১১ সালে। টালিগঞ্জের পঞ্চাশোর্ধ এক অভিনেত্রীর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রের কাহিনী এগিয়েছে। পরিচালক নিজেই মূল চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তবে অল্পবয়সী মৃণালিনীর চরিত্রে প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন অপর্ণার কন্যা কঙ্কনা সেন শর্মা। তাদের দু’জনের অভিনয় দেখে একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে ‘মা কা বেটি’।

মূল কথা শুরুর আগে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার; আলোচনা আসলে কোন দিকে এগোবে? খুব সাদামাটাভাবে বলতে চাই, এই চলচ্চিত্রের পরিচালনা, অভিনয়, আলোকসম্পাত, সম্পাদনা, আবহসঙ্গীত কিংবা শিল্প নির্দেশনা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো কথা নেই। আমাদের কথা মৃণালিনীকে নিয়ে। কিন্তু সেই মৃণালিনী কেবল চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী মৃণালিনী নয়, পোশাকের আড়ালে থাকা সাধারণ নারী মৃণালিনী।

১.

খ্যাতিমান অভিনেত্রী মৃণালিনী। দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে তার প্রাপ্তি কম নয়। সাথে অপ্রাপ্তিও অনেক। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর একরাতে মৃণালিনী সিদ্ধান্ত নেন আত্মহননের। টেবিলে স্লিপিং-পিল রেখে মৃণালিনী রাতভর লিখতে থাকেন সুসাইডাল নোট। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে চড়াই উৎরাইয়ের নানা পর্ব। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আসা পুরুষেরা তার ওপর যেন ভর করতে থাকে। অভির মৃত্যুর ঘটনা থেকে শুরু করে তরুণ পরিচালক ইমতিয়াজ নানাভাবে মৃণালিনীকে এগিয়ে নিতে থাকে রাতের সিদ্ধান্তের দিকে। এর বাইরেও আরেক পরিচালক সিদ্ধার্থ ও লেখক চিন্তন তার মধ্যে বঞ্চনা ও ভালোবাসার মিশ্রণ তৈরি করে।

অভি নকশাল রাজনীতিতে যুক্ত ছিল। একরাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সে; হাল আমলে যার পরিশুদ্ধ নাম ‘ক্রসফায়ার’। এরপরেই মৃণালিনীর চলচ্চিত্রে প্রবেশ পর্ব। প্রথম চলচ্চিত্রের সফলতায় তিনি জড়িয়ে পড়েন পরিচালক সিদ্ধার্থ সরকারের সাথে। সেই সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেও মৃণালিনীর ভাষায় ‘সামাজিক স্বীকৃতি’ ছিল না। তাদের একটা মেয়েও ছিল। ছিল বলছি এ কারণে যে, সোহিনী নামের মেয়েটি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যায়। সিদ্ধার্থ-মৃণালিনীর সর্ম্পকের মাঝে একসময় ঢুকে পড়ে চিন্তন। জীবনের একটি খারাপ সময়ে মৃণালিনী কাছে পায় চিন্তনকে।

এরপর অভিনয় জীবনের দীর্ঘবিরতি। ১৫ বছর পর আরেক পুরুষ ইমতিয়াজের অনুরোধেই মৃণালিনী ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। একসাথে কাজ করার সুবাদে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা পায়। তবে সেটিও বেশি দিন একভাবে এগোয় নি।

নানা মাত্রার সব পুরুষালি সম্পর্কের কাছে তুচ্ছ মৃণালিনী যখন সেই রাতে স্লিপিং-পিল হাতে শেষবারের মতো ভাবছেন; ঠিক তখনি মুঠোফোনে বেজে ওঠে ক্ষুদে-বার্তা প্রাপ্তির শব্দ। তাতে লেখা, ‘আমি আসছি’; বার্তাটি চিন্তনের। এই এক ‘আমি আসছি’ বার্তা সবকিছু উল্টে দিয়ে মৃণালিনীকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। তিমির রাত্রির ইতি টেনে ভোর হয়, মৃণালিনী বের হয় প্রাতঃকালীন হাঁটায়। রাস্তায় আকস্মিক আসামী ধরতে আসা পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয় মৃণালিনী।

২.

মৃণালিনী শিক্ষিতা, আধুনিকা। ধূমপান করছেন,  মদ্যপ হচ্ছেন, পার্টিতে যাচ্ছেন, বন্ধুদের সাথে রাতভর আড্ডা মারছেন। একইসঙ্গে ভাল লাগার মানুষটিকে সঙ্গ দিচ্ছেন শারীরিক-মানসিকভাবে। এভাবে মৃণালিনীর আপাত স্বাধীন জীবন চলতে থাকে। কিন্তু যে স্বাধীনতার ধুয়া তুলে মৃণালিনীর এই এগিয়ে যাওয়া তা পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতাকে ছুঁতে পারে নি।

আপাত আধুনিকতা, নারী হিসেবে তার জীবনাচারণকে হয়ত অনেকখানি সহজ করেছে। নানা জায়গায় তার অবাধ বিচরণকে স্বাভাবিক করেছে, কিন্তু নির্ভরশীলতার বাঁধন ছিন্ন করতে পারে নি। পরিস্থিতির কারণে, আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজেই নিজেকে অধঃস্তন করেছেন পুরুষের কাছে। সে কারণে কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক যাই হোক, মৃণালিনী বারবার খুঁজেছেন সামাজিক স্বীকৃতি। যা তাকে কোনোভাবেই সমাজের আর দশটা ‘সাধারণ নারী’র অবস্থান থেকে বের করতে পারে নি।

বাহ্যিক আধুনিকতার আড়ালে মৃণালিনী নিজেকে আটপৌরে জীবনে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিলেন যে, আত্মহননের সিদ্ধান্ত থেকে তিনি বের হতে পারেন নি। সে কারণে সুইসাইডাল নোটে তার শেষ কথাগুলো ছিল এমনÑ ‘আমি স্বেচ্ছায় আমার এ জীবন শেষ করে দিচ্ছি। কারো উপর কোনো অভিমান নেই আমার। কোনো অভিযোগ নেই কারো বিরুদ্ধে। কথাগুলো কি সত্যি বললাম? নাকি মৃত্যুর আগেও মুখোশগুলো খুলে ফেলতে বাধে আমাদের।’

অথচ দেখুন, একবিংশ শতকের এই ‘আধুনিক নারী’ কিন্তু একসময় অস্ত্র হাতে শিকারে নেতৃত্ব দিয়েছিল। মাতৃতান্ত্রিক সেই সমাজে মৃণালিনীদের হাতেই গড়ে উঠেছিল কৃষি। উপমহাদেশে আর্যদের আগমন, তাদের পশুপালন নারীকে কেন্দ্র থেকে সরাতে শুরু করে। যদিও নারী এখন সেই নিমগাছের মতো অনেক কিছুরই কেন্দ্রে আছে, কিন্তু কেন্দ্রাভিমুখী বলের সেই তোড় আর নেই। পুরুষ তাকে আষ্টেপৃষ্টে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছে যে, কবির সঙ্গে তার মন যেতে চাইলেও নিমগাছের মতো তার শিকড়ে টান পড়ে।

যে কারণে ধর্ষণের শিকার হয়ে নারী বিচার না চেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বামীর নির্যাতনে চোখ হারান। এই কারণেই মৃণালিনী মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও সত্য প্রকাশে ভয় পান। এই নারী, এই সমাজ, এই শিক্ষিত আর এই হলো আমাদের আধুনিকতা, আমাদের নারী স্বাধীনতা। ইতি মৃণালিনী ঠিক তেমন এক ‘আধুনিক’ নারীর গল্প।

৩.

মৃণালিনীর প্রথম প্রেম অভি। দু’জনেই পড়ত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেটা ১৯৭০-৭১ সাল। চারদিক তখন পুড়ছে নকশাল আন্দোলনের আগুনে। অভি নিজেও সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। আর মৃণালিনী ও অন্য বন্ধুদের আলোচনায় থাকে মায়াকোভ্স্কি, সত্যজিৎ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি নাম। সব মিলে সেলুলয়েডে জীবন্ত ১৯৭০-৭১।

অভি-মৃণালিনী ভিড় ঠেলে একসঙ্গে হাঁটে প্রেসিডেন্সি কলেজের গায়ে লাগানো ফুটপাত দিয়ে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অভি অনেকটা সময় কাটায় মৃণালিনীর নিবিড় সান্নিধ্যে। মৃণালিনীকে আদর করে ‘মিনু’ ডাকে অভি। মিনু ও অভির প্রেম ভাঙার অবসর পায় নি। তা পূর্ণতা পাবার আগেই মিনুর জীবন থেকে অভিকে ছিনিয়ে নিয়েছিল নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্র। এরপর মৃণালিনীর চলচ্চিত্রে প্রবেশ।

৪.

প্রথম চলচ্চিত্র রজনীতেই জাতীয় পুরস্কার পেয়ে যান মিনু। ওহ্, বলাই হয় নি, রজনীর পরিচালক সিদ্ধার্থও মৃণালিনীকে মিনুই ডাকত। প্রথম কাজেই এত বড় প্রাপ্তি, স্বাভাবিকভাবেই এসব ক্ষেত্রে যা হয়, সিদ্ধার্থের প্রতি একধরনের দুর্বলতা জন্মে মিনুর। সেটাই একপর্যায়ে রূপ নেয় প্রেমে। যদিও দুই সন্তানের জনক সিদ্ধার্থের পুরোদস্তুর সংসার আছে।

মিনুর প্রতি সিদ্ধার্থের প্রেম যতখানি মনের, তার চেয়ে অনেক বেশি শরীরের। তাইতো একরাতে সিদ্ধার্থের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মৃণালিনী যখন তার সহকারী কমলাদির কথা বলছিল, তখন সিদ্ধার্থের মনোযোগ ছিল মৃণালিনীর শরীরের দিকে। আর যদি সেটা না-ই হবে, তাহলে বারবার চাপ দেয়ার পরও সিদ্ধার্থ কিন্তু মৃণালিনীকে স্বীকৃতি দেয় নি অর্থাৎ বিয়ে করে নি। তাদের সম্পর্ককে জায়েজ করেছে লোকচক্ষুর আড়ালে মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর পরিয়ে। বিষয়টা এমনÑ তোমার সঙ্গে যে সম্পর্ক সেটা কেউ জানবে না, বাচ্চা-বউ থাকার পরও তোমাকে আমার প্রয়োজন, জীবনে কিছুটা ‘ভিন্ন স্বাদের’ জন্য।

অন্যদিকে ‘আধুনিকা’ মৃণালিনীর ঘুরে ফিরে সিদ্ধার্থের কাছে সেই এক কথা, তাদের সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতি। সিদ্ধার্থ যাই করুক, এই সবকিছুর বিপরীতে শুধু রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করলেই যেন সব সমস্যার সমাধান। তাতে দুই সন্তানসহ অন্য কোনো নারী যদি বঞ্চিতও হয় তাতে কিছুই আসে-যায় না মৃণালিনীর। নিজেরটুকু ঠিক থাকলেই হলো। যদিও মৃণালিনীর সহকারী অশিক্ষিত কমলাদি পর্যন্ত নারীত্বের এই অপমানটুকু বুঝেছিল।

মৃণালিনীর মা’কেও তার বাবা কালিঘাটের মন্দিরে নিয়ে বিয়ে করেছিল, রেজিস্ট্রি করে নি। দু’টি সন্তান হওয়ার পর মা’কে ছেড়ে তার বাবা চলে যায়। মৃণালিনীর মা ভাবতেন তার বিয়েটা যদি রেজিস্ট্রি হতো, তাহলে হয়ত মৃণালিনীর বাবা ছেড়ে যেত না। আজীবন তাকে কষ্ট করতে হতো না। একই ভয় ছিল ‘আধুনিকা’ মৃণালিনীরও। নারীর কাছে বিয়ে ব্যাপারটাই যেন কেবল সামাজিক স্বীকৃতি। এর বাইরে বিয়ে যে সমাজের একটি বড় ধরনের প্রথা, পরিবার নামের বৃহৎ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ, সেটা ছিল ম্রিয়মান।

পাশ্চাত্যের ঢঙে মৃণালিনী যদি সিদ্ধার্থের সঙ্গে লিভ-টুগেদার করতেন সেটা একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সিদ্ধার্থের পরিচ্ছন্ন ইমেজ থাকা জরুরি। অর্থাৎ, সে যখন যার সঙ্গে লিভ-টুগেদার করবে কেবল তার সঙ্গেই করবে। কিন্তু সেই ইমেজ সিদ্ধার্থের ছিল না। মৃণালিনী পরিচ্ছন্ন থাকলেও তার সাহস ছিল না লিভ-টুগেদার করার মতো। সিদ্ধার্থ-মৃণালিনী যেটা মূলত করেছেন সেটা একধরনের গোপন প্রণয়; যা ভালোবাসার চেয়ে জৈবিক টান দ্বারা বেশি প্রভাবিত।

দেখুন, আর তাই সিদ্ধার্থের চুরি করে মন্দিরে গিয়ে বিয়ে বিয়ে খেলতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা কেবল মৃণালিনীকে ও তার সন্তানকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে। অন্যদিকে ‘আধুনিকা’ মৃণালিনীর শারীরিক সম্পর্কে কোনো বাধা নেই। অন্য কাউকে বঞ্চিত করতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা কেবল সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে। এই আমাদের স্বাধীনচেতা মৃণালিনী, যার কাছে সন্তানের পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যিনি বাবার পরিচয় না থাকায় সন্তানকে লালন-পালন করার জন্য পাঠিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ায় ভাইয়ের কাছে।

কমলাদি একদিন শুটিংয়ে মৃণালিনীকে জানায়, তিনি শুটিং ইউনিটের লোকজনের কাছে জেনেছেন পরিচালকের স্ত্রী নাকি আবারও অন্তঃসত্ত্বা। কথাটি শুনে প্রথমে বিশ্বাস করেন নি মৃণালিনী। এ অবস্থায় মৃণালিনী সিদ্ধান্ত নেয় সিদ্ধার্থের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার। পরে সিদ্ধার্থ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এভাবে ‘আমি জানি না তোমায় কীভাবে এক্সপ্লেইন করব মিনু।...এটা, জাস্ট একটা অ্যাক্সিডেন্ট। মিনু, আমরা আর আজকাল এক ঘরে শুই-ও না। হঠাৎ ও একরাতে আমার ঘরে এল। ভীষণ আপসেট ছিল...টুটুলের অপারেশনের ব্যাপারে...তারপর... ইট জাস্ট হ্যাপেন্ড, কিন্তু বিশ্বাস করো।’

এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ নিজের সব দোষ আড়াল করে চিন্তনকে জড়িয়ে সন্দেহ করে। সিদ্ধার্থের এমন কথার বিপরীতে মৃণালিনী বলে, ‘তুমি আমাকে পাঁচ মাস পরে এসে বললে। তখন তো বলো নি। হয়ত বলতেও না, যদি তোমার বউ অ্যাক্সিডেন্টলি প্রেগনেন্ট না হতো।’

একপর্যায়ে মৃণালিনীর সংঙ্গে সম্পর্কে ছেদ ঘটে সিদ্ধার্থের। সিদ্ধার্থের কাপড়চোপড় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ভরে বিদায়ের শেষ আনুষ্ঠানিকতা সারতে থাকে মৃণালিনী। সেসময়ও মৃণালিনী শেষবারের মতো সিদ্ধার্থের কাপড়ের গন্ধ শুকে নেয়। হায়রে ভালোবাসা! হায়রে নারী! এ বিদায়ের আবেগ প্রকাশে বাথরুমের ভিতর থেকে মৃণালিনীর কান্নার শব্দ আসে। সেই কান্নায় নারীর স্মৃতিতে সেই পুরুষ বেঁচে থাকে অনন্তকাল। যে সম্পর্কের জন্য এই কান্না, সেই সম্পর্ক টিকে থাকে পুরুষের ইচ্ছের অধীন। এমনকি সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও সেই পুরুষের স্মৃতির অধীনেই কাটতে থাকে মৃণালিনীদের জীবন।

৫.

চিন্তনের সঙ্গে মৃণালিনীর দেখা হয়েছিল সিদ্ধার্থের একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দক্ষিণ ভারতের সাহিত্যিক চিন্তন নায়ারের ইংরেজি উপন্যাস RED EARTH নিয়ে রাধা তৈরি করছিলেন সিদ্ধার্থ। আর এর মূল চরিত্রে ছিলেন মৃণালিনী। সম্পর্কের শুরুটা সাদামাটা হলেও অন্যগুলোর চেয়ে এর মাত্রাগত দিক ভিন্ন ছিল। সিদ্ধার্থ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিপরীতে চিন্তন নতুন মাত্রা নিয়ে জায়গা করে নেয় মিনুর জীবনে। এদিকে মিনু-সিদ্ধার্থের সন্তান সোহিনী কিন্তু তখনো জানেই না সিদ্ধার্থ তার বাবা। অথচ সোহিনীকে নিয়ে মিনুর যে পৃথিবী সেখানে সিদ্ধার্থের উপস্থিতি অনিবার্য ছিল। হয়ত অবচেতনভাবেই চিন্তন সেখানে কিছুটা জায়গা করে নিয়েছিল। ফলে সোহিনীর সঙ্গেও চিন্তনের চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সোহিনীর মৃত্যুতে চিন্তন-মৃণালিনীর বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। সম্পর্কের এই গভীরতা আসলে মানবিকতা নাকি প্রেম, সেটি বোঝার জন্য দর্শককে সিনেমার শেষ পর্যন্ত যেতে হয়।

চিন্তন বিবাহিত। পঙ্গু স্ত্রী মীরাকে নিয়ে নিঃসন্তান চিন্তনের সংসার। সোহিনীর মৃত্যুতে বিপর্যস্ত মৃণালিনীকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিল চিন্তন। মাঝে মাঝে চিন্তন মৃণালিনীর সাথে দেখা করতে কলকাতায় আসত। মৃণালিনী তখন চিন্তনকে প্রশ্ন করত, ‘তুমি মীরাকে এই অবস্থায় ছেড়ে কলকাতায় চলে এলে?’ চিন্তন বলত, ‘হুম, Right then you needed me more. আমি তোমায় কতবার বলেছি মিনি, You believe in only one kind of love!’ আসলেই মৃণালিনী তার আগের পরের সব সম্পর্কগুলোকে ঘুরে ফিরে নিয়ে গিয়েছিল একই মাত্রার দিকে। যেন ভালোবাসা মানেই একমুখীনতা। তাই মিনু সম্পর্কে চিন্তনের এই অনুধাবন প্রথাগত নারী হিসেবে তার অবস্থানকে পাকাপোক্ত করে। এমনকি মিনু তার এই চিন্তা দিয়ে মূল্যায়ন পর্যন্ত করেছিল চিন্তনকেও।

জীবনে আগত অন্যান্য পুরুষদের মতো চিন্তনের কাছেও তাদের সম্পর্কের একটি নাম খুঁজছিল মৃণালিনী। কিন্তু চিন্তন তাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিল; ‘Why Do you think All love was end in marriage? তুমি জীবনে ক’টা সুখী বিয়ে দেখেছ? সাহিত্যের কথা যদি ধর...সত্যিকারের বড় সাহিত্যের কথা যদি ধর... ম্যারিড নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে ক’টা লেখা হয়েছে? হুম?’

মৃণালিনী বলে ‘I suppose you are right.’ চিন্তন বলে, ‘সিডের (সিদ্ধার্থ) কাছ থেকে তুমি সংসার চেয়েছিলে... domestic love. সিড সেটা দিতে পারে নি। He was weak. কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে, ও কখনো তোমায় ভালোবাসে নি। ওর মতো ভালোবেসেছিল। ওহ In his own flawed way . জীবনটা এত Random না! We only think we controlling our circumstances. আসলে কিছুই কন্ট্রোল করা যায় না! আমার আর মীরার কথা ধরো! আমরা কী ভেবেছিলাম When we got married... সে এভাবে crippled হয়ে যাবে? That she'd never be able to bear a child?’

মাঝে মাঝে ছেড়ে দিতে হয় মিনি... Just let go and take life as it comes. আরও এক রকমের ভালোবাসা আছে মিনি...হয়ত টের পাও না তুমি...যে ভালোবাসায় কোনো Expectation থাকে না, A love that frees You.’ মৃণালিনী বলে, ‘জানি....আর বলতে হবে না’। কিন্তু আসলেই মৃণালিনী সেটা জানে কি না তা দর্শককে ভাবায়। যুগে যুগে যে নারীকে ধারণ করেছে এই সমাজ; সেই নারীরা আদৌ সেই ভালোবাসা উপলব্ধি করার সুযোগ পায় কি না তা বিবেচনাও জরুরি। কারণ প্রথাগত নারীর যে জীবন, সেখানে সে দেখে জন্মাবধি বিয়ে, সন্তান, সংসারই তার প্রধান কাজ। এর বাইরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী যখন আগ্রহ দেখায় বই পড়া কিংবা অতিথিদের খাওয়ানোই, সেটা তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ির কাছে অনেকটা অনাহত মনে হয়। সংসারের বাইরে নারীর এই সামান্য চাওয়া-পাওয়াকে তারা কখনোই প্রাধান্য দেয় নি। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায়, যেন নারীর এই অবস্থান অনেকটা স্বশাসিত।

ইতি মৃণালিনীতে চিন্তনের ভালোবাসা মোটেও আর দশ জন পুরুষের মতো ছিল না। ছিল না মৃণালিনীর শরীর কিংবা কোনো বস্তুগত স্বার্থকে ঘিরে। প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যভাবে মৃণালিনীর সুখে-দুখে একমাত্র চিন্তনই ছিল তার পাশে। এর কারণ হয়ত চিন্তনের ভাষায় ভালোবাসার বহুমাত্রিকতা।

৬.

টানা ১৫ বছর অভিনয় জীবন থেকে দূরে সরে ছিলেন মৃণালিনী। এত বছর পর অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে তরুণ পরিচালক ইমতিয়াজ। প্রথমে রাজি না হলেও পরে ইমতিয়াজের কথা ফেলতে পারেন নি তিনি। কর্ণ-কুন্তি সংবাদ এর ইংরেজি সংস্করণে কেবল অভিনয়ই করলেন না, পরিচালককে চিত্রনাট্য লেখায় সহায়তাও করলেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল পরিচালক ইমতিয়াজ মৃণালিনীকে সহকারী পরিচালক হওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিলেন। যদিও ইমতিয়াজের এই প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মৃণালিনী। কিন্তু তার ‘প্রেম’এর জালের মধ্য থেকে বের হতে পারেন নি তিনি।

এই প্রেম ছিল মৃণালিনীর পরিণত বয়সের। এই বয়সে মানসিকভাবে ইমতিয়াজের উপস্থিতি মৃণালিনীর জন্য কখনো প্রয়োজনীয় মনে হলেও শারীরিকভাবে হয়ত ছিল না। তারপরও এরকম একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ভুল, নাকি প্রেমকে সেই একমাত্রিক অবস্থা থেকে দেখা; তা ভাববার অবকাশ রাখে। পর্দায় ইমতিয়াজ-মৃণালিনীর বেশির ভাগ উপস্থিতি দেখে যে কারো বুঝতে কষ্ট হয় না, উপরিতলে প্রেমের আবরণে ইমতিয়াজ আসলে মৃণালিনীর কাছে বারবার কী চেয়েছিল? মৃণালিনী নিজেকে সামলে রাখতেও পারেন নি। উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। জীবনের অন্তবিহীন পথ পেরিয়ে পরিণত বয়সে কেউ যদি নতুন কোনো মানুষের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, তখন সে সঙ্গে বয়ে আনে তার সারা জীবনের নানা ফসল, সবক’টা প্রেম, ভাঙা ঘর, সারা জীবনের সঞ্চিত বেদনা, ফেলে দেওয়া, কুড়িয়ে পাওয়া সবকিছু। এ যেন নতুনের হাতে সঁপে দেওয়া সমস্ত বেদনার ভার। মৃণালিনীও সেভাবেই তার সবটা সঁপে দিতে চেয়েছিলেন ইমতিয়াজকে। তাই মৃণালিনীর মনে বেজে উঠেছিল- ‘মনে হলো যেন পেরিয়ে এলাম অন্তবিহীন পথ/ আসিতে তোমার দ্বারে...।’

কিন্তু মৃণালিনীর সেই সকরুণ নিবেদনের যথার্থ মূল্য দিতে পারেন নি ইমতিয়াজ। তিনি তার প্রয়োজনে মৃণালিনীকে ব্যবহার করেছেন, প্রয়োজনে উপভোগ করেছেন। বিনিময়ে দিয়েছেন সস্তা স্তুতি। যদিও এই স্তুতির কোনোটিরই অযোগ্য মৃণালিনী ছিলেন না।

কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’র পর রক্তকরবী করার কথা ভাবেন ইমতিয়াজ। এবার নন্দিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি ‘প্রাচীনা’ মৃণালিনীকেই নির্বাচিত করেন। মৃণালিনী আশ্চর্য হন। এও কি সম্ভব? ইমতিয়াজের আবার সেই চিরচেনা স্তুতি, কেন নয়? ‘নন্দিনী ইজ অ্যান আইডিয়া...নন্দিনী কুড ভেরি ওয়েল বি এ ট্রেড ইউনিয়ন লিডার... নন্দিনী ইজ এইজ লেস... তোমার মতন...’। এই কথা শুনতে শুনতেই মৃণালিনীর মনে হয় ইমতিয়াজের চোখে সে হয়ে উঠেছে কালের স্পর্শের অতীত। তাকে কালোত্তীর্ণ করে, যেন আবার নতুন করে গড়ে তুলছেন ইমতিয়াজ। যেন তার পুনর্জন্ম হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃণালিনীকে ঘুণাক্ষরেও না জানিয়ে তরুণী উঠতি নায়িকা হিয়া মজুমদারকে ইমতিয়াজ ডেকে নেন রক্ত করবীর নন্দিনী চরিত্রের জন্য।

সংবাদ সম্মেলনে বসে ইমতিয়াজের এমন সিদ্ধান্ত জানতে পেরে স্তম্ভিত হন মৃণালিনী। বুঝতে পারেন নিজের ভুল। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন, এতদিন ইমতিয়াজ যা যা বলেছিল সবই কি তার মিথ্যা? সবই মায়া? সবই কি মুহূর্তের রঙিন বুদবুদ! আমাদের মৃণালিনীরা বহুবার এ ধরনের ইমতিয়াজদের রঙিন বুদবুদে মগ্ন হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। বিনিময়ে শুধু নিখাদ ভালোবাসাটুকু চাইলেও তার আশপাশে যেতে পারে নি। কখনো সে মৃণালিনীর মতো শিক্ষিতা আধুনিক, কখনো গ্রামের সেই প্রথাগত গৃহিনী কিংবা স্কুলপড়ুয়া কিশোরী- কেউই বাদ যায় নি এই বঞ্চনা থেকে।

মৃণালিনী এ আঘাত সইতে পারেন নি। যুগে যুগে মৃণালিনীরা এটা পারেন না। তারা এগুলোকে জীবনের শেষ সূর্যোদয় মনে করে নিজেকে অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। বেশিরভাগই বেছে নেয় আত্মহননের পথ। লিখতে বসেন তাদের সুইসাইডাল নোট।

৭.

পুরুষের প্রেমের কাছে বারবার নতজানু হয়ে সারা জীবন কী খুঁজে ফিরেছে মৃণালিনী? কখনো সত্তার উন্মেষ, কখনো সংসার, কখনো শিল্পী-সত্তার পুনর্জাগরণ, আবার কখনো বা শান্তি। জীবনভর যা খুঁজে ফিরেছে মৃণালিনী, তার কতটুকুর সন্ধান সে পেয়েছে, তার কাছেও তা প্রশ্নসাপেক্ষ। জীবনের কাছে মৃণালিনীর প্রত্যাশাগুলো ঘুরে ফিরে বারবার একই জায়গাায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশে সেই রাতেও তাই শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পায় নি মৃণালিনী। একই চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একই ধরনের ব্যর্থতা তাকে নতুন করে হতাশ করে। তার সিদ্ধান্ত তাই ক্রমেই এগিয়ে চলে আত্মহননের দিকে।

শেষ জীবনে আগত পুরুষ ইমতিয়াজের দেখানো স্বপ্নের বাস্তবতা যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন মৃণালিনী আবারও অনুভব করেন তার বিশ্বাসে ভুল ছিল। সমগ্র জীবনের স্মৃতির পাতা মেলে ধরলে শুধুই শূন্যতা প্রতিফলিত হতে দেখি মৃণালিনীর দু’চোখ জুড়ে, জীবনের চেয়ে মৃত্যুই অনেক বেশি স্বস্তিকর মনে হয়। তিনি অটল হন আত্মহননের সিদ্ধান্তে। স্মৃতির সঙ্গে বোঝা-পড়া করে এগিয়ে চলে সুইসাইডাল নোট লেখা। এই তখন আমাদের চিরচেনা মৃণালিনীর অবস্থা।

ঠিক তখন মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা আসে চিন্তনের; ‘আমি আসছি’। এত কিছুর পরও বন্ধু চিন্তনকেই তখন মৃণালিনীর কাছে একমাত্র সত্য মনে হয়। যে চিন্তন একজন পুরুষ; সিদ্ধার্থ কিংবা ইমতিয়াজ থেকে তার পার্থক্যের জায়গা খুব বেশি দূরে নয়। দর্শক তখন উপলব্ধি করতে থাকেন মৃণালিনীর এই বেঁচে থাকা বুঝি শুধুই একজন চিন্তনের জন্য, একজন পুরুষের জন্য! যে পুরুষই তাকে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।

চিন্তনের বার্তা পেয়ে হাতে নেয়া ঘুমের ওষুধ ফেলে দিতে গিয়েও থেমে যান মৃণালিনী। কী যেন ভেবে আবার পুরে রাখেন বোতলে। তবে বুঝতে কষ্ট হয় না, মৃণালিনী আবারও ফিরে আসতে পারেন এই অবস্থায়। হয়ত মৃণালিনী নিজেও সেটা জানতেন। মৃণালিনীরা এটা জানে। এজন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হয়।

৮.

ব্যক্তি সমাজের বাইরে নয়। তাই ব্যক্তির কোনো অপরাধ এবং তার দায়-দায়িত্ব সমাজের উপরই বর্তায়। এখন প্রশ্ন হলো ব্যক্তির এই অপরাধকে কি কেবলই ফৌজদারি হিসেবে দেখার অবকাশ আছে? সন্ত্রাসকে কি শুধু আইন দিয়েই দমন করা সম্ভব? এর কি কোনো বিকল্প নেই? কিন্তু এ কথাতো ঠিক যে, সন্ত্রাস বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, এর সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবন-জীবিকার লড়াই, সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতি মৃণালিনীতে আমরা দেখি, রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের সংজ্ঞায়িত ‘সন্ত্রাস’ এর বিচার করছে তাদের ‘আইন’ দিয়ে। আইন করে ‘আইন-বহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ড’ তারা জায়েজ করেছে ‘ক্রসফায়ার’ বলে।

আগেই বলেছি, ১৯৭০-৭১ এর সংঘাতময় নকশাল বাড়ি আন্দোলন দিয়ে এই চলচ্চিত্রের শুরু। এই আন্দোলনকে ঠেকাতে সেসময় রাষ্ট্র শুরু করেছিল আইন-বহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ড। যার শিকার হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র অভি। পিসীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে মাঠে দৌড়াতে বলে পিছন থেকে গুলি করে মারা হয়েছিল অভিকে। যার বিচার রাষ্ট্র উপেক্ষা করেছিল ‘ক্রসফায়ার’ বলে। একইভাবে সিনেমার শেষেও আরেক অপরাধীকে ধরতে গিয়ে পুলিশ গুলি চালায় তার ওপর। ভুল করে সেই গুলি গিয়ে লাগে মৃণালিনীকে। পুলিশ হয়ত বলবে এটা ক্রসফায়ার; অথচ বাস্তবে ছিল কাউকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা। যদিও হত্যার সেই লক্ষ্যটাও শেষ পর্যন্ত ভুল হয়ে যায়।

আসলে আমাদের কেবল ‘ভুল’ হয়। রাষ্ট্রের ভুল হয়, ভুল হয় রাষ্ট্রের ক্রীড়ানকদের, ভুল হয় প্রাধান্যশীল গোষ্ঠীর। কিন্তু এই ভুলের আর সংশোধন হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ‘ভুল’ কে আমাদের ভুলই মনে হয় না। যেমন ভুল করেছিল সিদ্ধার্থ, ইমতিয়াজ। কিন্তু তাদের কাছে এই ভুলের কোনো অনুতাপ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন মাঠে দাঁড়িয়ে অভিকে বলেছিল দৌড়াও, মৃত্যু তোমার পিছনে; ঠিক একইভাবে সিদ্ধার্থ, ইমতিয়াজ সেইরাতে মৃণালিনীকে বাধ্য করেছিল মৃত্যুর দিকে দৌড়াতে। যদি সে রাতে মৃণালিনীর মৃত্যু হতো, তবে সেটা সিদ্ধার্থ বা ইমতিয়াজের কাছে হতো ‘ক্রসফায়ার’; হত্যা নয়।

৯.

মৃণালিনীর উদ্দেশ্যÑ

‘আমাকে টান মারে রাত্রি-জাগা নদী

আমাকে টানে গূঢ় অন্ধকার

আমার ঘুম ভেঙে হঠাৎ খুলে যায়

মধ্য রাত্রির বন্ধ দ্বার

বাতাসে ছেড়া মেঘ

চাঁদের চারপাশে

সহসা ডানা বাঁধে

নীল সময়

বাহিরে এসে দেখি

পৃথিবী শুন্শান্

রাস্তাগুলি যেন আকাশময়

আমাকে টান মারে রাত্রি-জাগা নদী

আমাকে টানে গূঢ় অন্ধকার...’

 

লেখক : জান্নাত ঊর্মি ও তাহ্সিন আহমেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন