Magic Lanthon

               

জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রের বই

বিষয় চলচ্চিত্র, ফরমায়েশি লেখায় সময়ের অতিক্রম

জাহাঙ্গীর আলম

চলচ্চিত্র শিল্প কিনা এ নিয়ে এখন আর তেমন কোনো বিতর্ক নেই। চলচ্চিত্রকে আগে পপুলার আর্ট হিসেবেই দেখা হতো। দর্শক আকর্ষণের জন্য ফর্মুলাভিত্তিক বিষয়গুলো চলচ্চিত্রে প্রয়োগ করার দিকে দৃষ্টি রাখতেন পরিচালক। গভীর তথ্য,সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব,দোষগুণে মেশানো জটিল চরিত্র চলচ্চিত্রে স্থান পেত না। সত্যজি রায় যখন সিনেমা নির্মাণে আসেন,তখন এগুলো ছিল বড় আলোচনার বিষয়। চলচ্চিত্রের বিষয় নির্বাচন ও নির্মাণের মধ্য দিয়েই তিনি এর উত্তর দিয়েছেন। তবে কখনো কখনো লেখালেখির মাধ্যমেও সত্যজি এর চলচ্চিত্র ভাবনা ফুটে উঠেছে। তেমনই একটি বই বিষয় চলচ্চিত্র। এতে ১৮টি প্রবন্ধে তিনি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কারিগরি দিক,শিল্প ভাবনা,চরিত্র এবং তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

বিষয় চলচ্চিত্র বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘চলচ্চিত্রের ভাষা: সেকাল ও একাল’। এ প্রবন্ধে সত্যজি রায় সিনেমার ভাষা ও ব্যাকরণের উদ্ভব এবং এর বিবর্তনের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। সিনেমার সঙ্গে অন্য শিল্প মাধ্যম যেমন- স্থিরচিত্র,চিত্রকলা ও মঞ্চ নাটকের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। সিনেমার ভাষা নির্মাণে অগ্রণী পরিচালক ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ,সের্গেই আইজেনস্টাইন,জা রেনোয়া,ফ্রাঁসোয়া ক্রুফো,জাঁ লুক গদার প্রমুখের ভাষা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও তিনি তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে উত্তরণ ও সাদা-কালো থেকে রঙিন সিনেমার আবির্ভাবের কথা।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাশিয়া তথা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চলচ্চিত্র বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ‘সোভিয়েত চলচ্চিত্র’প্রবন্ধে সত্যজি রায় সেদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তুলে ধরেছেন প্রাক-বিপ্লব যুগে রাশিয়ায় চলচ্চিত্র শিল্পের উদ্ভব এবং বিপ্লবোত্তর যুগে এর বিবর্তন। বিপ্ল­বে বলশেভিক দলের জয়,বহু চলচ্চিত্র শিল্পীর ইউরোপ-আমেরিকায় পলায়ন এবং চলচ্চিত্রের জাতীয়করণ প্রভৃতি ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করেছেন। সোভিয়েত চলচ্চিত্রের তিন প্রতিভা সের্গেই আইজেনস্টাইন,পুদভকিন ও আলেকজান্ডার দোভোচেঙ্কোর এ শিল্পে জড়িত হওয়ার ঘটনা ও তাদের ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে এখানে ধারণা পাওয়া যায়। সরকারি হস্তক্ষেপের ফলে সোভিয়েত চলচ্চিত্রের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেটাও সত্যজি রায় এ প্রবন্ধে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

চলচ্চিত্র মূলত প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বাংলা চলচ্চিত্র প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে রয়েছে। সত্যজি রায় তার ছেলেবেলার বাংলা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ‘অতীতের বাংলা ছবি’প্রবন্ধে। এখনকার অনেকের মতো অল্প বয়সে তারও মনে হয়েছিল হলিউডের তুলনায় বাংলা ছবি নিস্প্রভ। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে এসে সত্যজি দেখলেন বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্বলতা কেবল প্রযুক্তিতে নয়,বরং মূল কারণ হিসেবে তিনি চিত্রনাট্য,অভিনয় ও পরিচালনার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সঙ্গে আরেকটি বিষয় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন,অতীতের সিনেমাগুলোতে বাঙ্গালী জীবনের স্বাভাবিকচেহারায় বিলেতি পালিশ দিয়ে উপস্থাপন। তবে ধর্মভিত্তিক ছবি বিদ্যাবতী বা চন্ডীদাস অথবা বাংলা উপন্যাস অবলম্বনেতৈরি চলচ্চিত্রে হলিউডের প্রভাব কম। এসব সিনেমায় আবার থিয়েটারের প্রভাব পড়েছে। সত্যজি এর মতে,এসব কারণে চিত্র ভাষার দিক দিয়ে অতীতের বাংলা চলচ্চিত্র উৎকর্ষ লাভ করেনি।


পথের পাঁচালির ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রের অভিনেত্রী চুনিবালা দেবীকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। তাকে নিয়ে কাজ করার সময় সত্যজিৎর এই কথাটাই বার বার মনে হয়েছে,এর সন্ধান না পেলে আমাদের পথের পাঁচালি হতো না।


পেশাদার ও শৌখিন দুই ধরনের শিল্পী নিয়েই সত্যজি রায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন মজার অভিজ্ঞতার কথা তিনি বইটির কয়েকটি প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে পথের পাঁচালির ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রের অভিনেত্রী চুনিবালা দেবীকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। তাকে নিয়ে কাজ করার সময় সত্যজি’র এই কথাটাই বার বার মনে হয়েছে,‘এর সন্ধান না পেলে আমাদের পথের পাঁচালি হতো না।’‘একথা সেকথা’প্রবন্ধে খ্যাতিমান অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ। চলচ্চিত্রের বাইরের চরিত্র সুবোধদাকে নিয়ে তার লেখাও পাঠককে কৌতুহলী করে তোলে। শিল্পী বিনোদ বিহারীকে নিয়ে সত্যজি রায় একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এটি তৈরির সময় শিল্পীর সঙ্গে কথোপকথন তুলে তিনি ধরেছেন ’বিনোদদা’প্রবন্ধে।

উপন্যাস বা ছোট গল্পের চিত্ররূপ দিতে গিয়ে সত্যজি রায় সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছিলেন। অপু-কাহিনীত্রয় বা রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের চিত্ররূপ দেওয়ার পর প্রতিবারই তাকে সমালোচকের তিরস্কার সহ্য করতে হয়েছে। বইটিতে ‘অপুর সংসার প্রসঙ্গে’ও ’চারুলতা প্রসঙ্গে’দুটি প্রবন্ধ রয়েছে। মূলত তার চলচ্চিত্রের সমালোচনার জবাবে তিনি এ দু’টি প্রবন্ধ লেখেন। তার মনে হয়েছে,‘চোখের সামনে চিত্ররূপ এবং হাতের কাছে মূল গল্পটি থাকার দরুন দুই-এর বৈসাদৃশ্যের সহজ ফিরিস্তি দিয়ে সমালোচক তার মূল দায়িত্বটুকু সম্পূর্ণ এড়িয়ে কতকগুলি অপ্রাসঙ্গিক আপাত সারগর্ভ কথার সাহায্যে কলাম ভরানোর কাজটি সেরে নিচ্ছেন।’তার মতে,পরিচালক ও দর্শকের মাঝখানে সেতু স্থাপন করা সমালোচকের একটি প্রধান কাজ। শিল্প সৃষ্টির তাগিদে বা পরীক্ষামূলকভাবে নতুন রীতি পরিচালক তার ছবিতে প্রয়োগ করতে পারেন। এটি অনেক সময় জনগণের জন্য সহজবোধ্য হয় না। সত্যজি এর অভিমত,এখানেই সমালোচকের এগিয়ে এসে শিক্ষকের ভূমিকাটিও গ্রহণ করতে হয়।

বিষয় চলচ্চিত্র বইটি শেষ হয়েছে ‘শতাব্দীর সিকি ভাগ’প্রবন্ধ দিয়ে। এখানে সত্যজি রায় তার নিজের চলচ্চিত্রের বিচার নিজেই করেছেন। তিনি জানান,চিত্র ভাষার দিক দিয়ে অরণ্যের দিনরাত্রি তার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। যদিও এ সিনেমা ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ সমাদর পায়নি। আর শুধু হৃদয়ের প্রভাব দিয়ে ছবির উৎকর্ষের বিচার হলে সত্যজি এর মতে পথের পাঁচালি তার সেরা ছবি। প্রবন্ধের শেষ পরিচ্ছেদে সৃজনশীল পরিচালকের স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার সন্দেহ,চিত্র নির্মাণের খরচ বৃদ্ধি,নির্ভরযোগ্য যন্ত্রপাতির অভাব,স্টুডিও,ল্যাবরেটরি ও প্রেক্ষাগৃহগুলোর দৈন্যদশা এবং হিন্দি ছবির প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠাবান পরিচালকেরও কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। সত্যজি বেঁচে থাকলে হয়ত প্রযুক্তির উন্নয়নে আবারও আশান্বিতহতেন। বিশেষত ডিজিটাল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে যখন অনেক সৃজনশীল পরিচালক নতুন নতুন বিষয়,ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

বিষয় চলচ্চিত্র বইটিকে বলা যেতে পারে ফরমায়েশি লেখা। কারণ সত্যজি এর ভাষায়,‘রচনাগুলোর অধিকাংশ দেশ পত্রিকার বাৎসরিক উপরোধের পরিণাম।’যত বড় লেখকই হন না কেন,ফরমায়েশি লেখা বেশির ভাগ সময়ই হারিয়ে যায়। তবে সিনেমাপ্রেমী বিশেষত যারা বিনোদনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের উদ্ভব,কারিগরি দিক,অন্য শিল্প মাধ্যম থেকে এর পার্থক্য এবং ভাষা ও আঙ্গিক জানতে চায় তাদের জন্য বইটি এখনো অবশ্যপাঠ্য।           

 

বিষয় চলচ্চিত্র

লেখক: সত্যজি রায়

প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

৪৫ বেনিয়াটোলা লেন,কলকাতা

 

লেখক : জাহাঙ্গীর আলম গণযোগাযোগ সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। বেশ কয়েক ধরনের চাকরির স্বাদনেয়ার পর অবশেষে তার বিষয় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন দৈনিক বণিক বার্তায়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন