Magic Lanthon

               

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির

প্রকাশিত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’

সংকটে ঢাকাই চলচ্চিত্রের গান

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির


‘Softly, in the dusk, a woman is singing to me;

Taking me back down the vista of years, till I see...’

- D. H. Lawrence.

 

দি রেইন বা যখন বৃষ্টি নেমেছিল (১৯৭৬) নামে ঢাকার এক বিখ্যাত চলচ্চিত্রের স্বনামখ্যাত গানগুলোর একটির কথা ছিল এ রকম-

‘পরদেশী মেঘরে আর কোথা যাসনে

বন্ধু ঘুমিয়ে আছে দে ছায়া তারে’

গানটির চিত্রায়ণ না দেখলেও, কেবল শুনেই এমন দৃশ্যকল্প তৈরি করা সম্ভব; কোনো একজন সুদর্শন যুবা খোলা আকাশের নিচে, ঘাসের বুকে গা মেলে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার অনুরাগী সুন্দরী গলা খুলে মেঘকে ডাকছে, ‌ ‘...আয়রে মেঘ আয়রে’; যেন রোদ পড়ে বন্ধুর ঘুম না ভাঙে। ঘুম যদি ভাঙেই তবে সেই মেঘে বৃষ্টি নেমেই ভাঙুক।

বৃষ্টির শব্দ প্রায়ই ছন্দ মেনে চলে। গানের সুরের মতো। বৃষ্টির নকীব, দূত বা ‘হেরল্ড’ যাই বলিনা কেন, তার নাম মেঘ। মেঘ ছাড়া বৃষ্টি হয় না। আবার সব মেঘে বৃষ্টি হয় না। কোনো কোনো সময় মেঘের নাম ছায়া। কোনো সময় তার নাম তুলা, নয়তো ভেলা। এমনি মেঘের মতো বহু চেতনার মন নিয়ে হাজার-শত বছর ধরে গান বেঁধে আসছেন সুরস্রষ্টারা।

ঢাকার ছবির কয়েক দশকের ইতিহাসে যতখানি স্মরণ করার মতো এর কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য, পরিচালক, অভিনেত্রী-অভিনেতার পরম্পরা; তার চেয়ে কোনোভাবেই নিচে নামানো যায় না প্লেব্যাক জগতকে। সুরকার, গীতিকার, গায়িকা বা গায়ক; এখানেও একটা আলাদা পরম্পরা আছে, আছে  প্রাপ্তি, আছে গর্ব ও সম্পদ। একই সঙ্গে এখানেও আছে আলাদা করে পুষে রাখার মতো হতাশা বা দুর্যোগের অস্তিত্ব। যা মেঘের বিভিন্ন রূপের মতো নানা সময় ভিন্ন ভিন্ন ধারায় খেলা করেছে। কালের বিবর্তনে একে একে জন্ম নিয়েছে নানা সংকটের। ইতিহাস, সংকট আর সম্ভাবনার যথাসম্ভব উল্লেখ করাটাই ভূমিকা ও পরবর্তী বর্ণনার উদ্দেশ্য।

বাংলা চলচ্চিত্রের গানের বিগত দিন

. প্রথম দশা: ইতিহাস

‘সঙ্গীত পরিচালনায়: শ্রী সমর দাশ

সাহায্য করেছেন: দেরাজ উদ্দিন

কণ্ঠসঙ্গীতে: মাহবুবা হাসনাত ও আব্দুল আলীম’

১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসের ৩ তারিখে মুক্তি পায় এই ভূ-খণ্ডের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ মুখোশমুখ মুখোশ এর কাহিনী শুরুর আগে পর্দায় এর সঙ্গীতকার, তার সহকারী ও দুইজন গায়কের নাম উপরের কায়দায় লেখা ছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে- ‘গীতিকারের নাম কোথায়?’ গীতিকারের নাম দেখানো হয় অন্যত্র। সেটা নৃত্য পরিচালক, রূপসজ্জাকারের নামের উপরে। খানিকটা অস্পষ্ট আর কাব্যিক নামটি হয়ত কারও ছদ্মনাম ‘সারথি’।

মুখ মুখোশের একটি মনে রাখার মতো গান হলো মাহবুবা হাসনাতের কণ্ঠে ‘মনের বনে দোলা লাগে, আসল দখিন হাওয়া’। অনুমান করা যায়, ৫০ এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এই গান, পরবর্তী গানের ক্ষেত্রে খুব বেশি একটা অবদান হয়ত রাখে নি। তবে শুরুটা ছিল, শুরুর মতোই। এরপর ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজধানীর বুকে একটি বিশেষ গানের জন্য আজও কিংবদন্তি চলচ্চিত্র হয়ে আছে। এই ছবিতে তালাত মাহমুদের কণ্ঠে ছিল ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে’। সুরকার রবিন ঘোষ, সহকারী ফেরদৌসি রহমান। এই ছবির গানগুলো লিখেছিলেন কে জি মোস্তফা।

রবিন ঘোষ এবার ঢাকার উর্দু ছবি চান্দার জন্যে সঙ্গীতায়োজন করলেন। ‘আঁখিয়া তোরি রাহনি হারে’, ‘ও পারদেসিয়া’ গানে মুগ্ধ করল ফেরদৌসি রহমানের কণ্ঠ। আর ষাটের দশকের গানে অপরিহার্য হয়ে উঠলেন তিনি। এই সালের অন্য একটি ছবি নতুন সুর বেশ উল্লেখযোগ্য। কারণ ওই ছবিতে ফেরদৌসি রহমানের সহশিল্পী হিসেবে গান করে বাংলা ছবির প্লেব্যাক আঙিনায় পা রাখেন সাবিনা ইয়াসমীন। পরবর্তীতে যিনি ঢাকার সিনেমার গানে সর্বাধিক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গায়িকা।

১৯৬৩ সালে জহির রায়হানের কাঁচের দেয়াল ছবিতে খান আতাউর রহমান ওরফে খান আতা সঙ্গীতের কাজ করলেন। গান লিখলেন, এমনকি গাইলেন-

‘শ্যামল বরণ মেয়েটি, ডাগর কালো

আঁখিটি, না না তার নাম বলব না’

১৯৬৪ তে এল সুভাষ দত্তের সুতরাং কাহিনীর পাশাপাশি এই ছবির জন্য গান লিখলেন সৈয়দ শামসুল হক। ‘তুমি আসবে বলে, ভালোবাসবে বলে’, ‘আজকে বুবুর গায়ে হলুদ’ ও ‘চাঁদ বাঁকা জানি’। এতে সঙ্গীতের কাজ করেছিলেন সত্য সাহা। ফেরদৌসি রহমান আর মুস্তফা জামান আব্বাসী ভাই-বোন মিলে বেশ মজার এই গানটা করেন-

‘চাঁদ বাকা জানি, গাঙ বাঁকা মানি,

তাহার চেয়ে আরও বাঁকা

তোমার ছলনা’।

১৯৬৫ সালে মুক্তি পেল রূপবান নীনা খানের গানে মুগ্ধ, সুজাতার দু:খে ব্যাকুল, হলমুখী অসংখ্য মানুষ। মূলত সঙ্গীতনির্ভর রূপকথাভিত্তিক এই ছবির গানগুলো ছিল প্রায় একই সুরের, কাহিনীভিত্তিক। যেমন: ‘আমার নিদারুণ শাম’, ‘শোনো তাজেল গো’, ‘বাড়িরও না দখিন পাশে গো’ ইত্যাদি। সত্য সাহার সঙ্গীতে এই ছবিতে আরও গান করেন আব্দুল আলীম, ইসমত আরা, কুসুম হক ও নজমুল হোসেন ।

১৯৭০ সালে মুক্তি পায় গান নিয়ে গর্ব করার মতো বেশ কিছু ছবি একই অঙ্গে এত রূপ, আপন পর, দর্পচূর্ণ, যোগ বিয়োগ, মধু মিলন, পিচ ঢালা পথ এবং স্বরলিপি| এর মধ্যে স্বরলিপি ছবিটি অন্য একটি কারণে মনে রাখার মতো। এই ছবিতে গান গেয়ে কোনো বাংলা ছবির জন্য প্রথম প্লেব্যাক করেন তখনকার উর্দু সিনেমার ব্যস্ত কিশোরী গায়িকা রুনা লায়লা। গান লেখেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুবল দাসের সুরে রুনা লায়লার এ গানটি লাহোর গিয়ে রেকর্ড করে আনা হয়। তবে এই সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি বলতে হবে জীবন থেকে নেয়া কে। জহির রায়হানের ক্ল্যাসিক এই ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নেন খান আতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বদেশ পর্যায়ের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি এই ছবিতেই প্রথম ব্যবহার করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ সহ এই ছবির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ছিল খান আতার নিজের গাওয়া ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’।

. দ্বিতীয় দশা: ইতিহাস প্রায়-বর্তমান

১৯৭১ সালটা আমাদের জন্য পুরোপুরি ইতিহাস নয় কখনই। কারণ আমাদের অস্তিত্ব এখনও তাকে ধারণ করে বর্তমান। তবু তো অতীত, আজ থেকে ৪০ বছর আগের সময়। স্বাধীনতার পরে ওরা এগারো জন নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। সেখানে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটির চিত্রায়ণ হয় বেশ আবেগি ঢঙে। গানের বক্তব্য মিশে যায় সুরের সাথে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে সঙ্গীতের জন্যে স্মরণীয় চলচ্চিত্র হলো- খান আতা’র আবার তোরা মানুষ (১৯৭৩), শহীদুল হক খানের কলমীলতা (১৯৭৪), হারুন অর রশীদের মেঘের অনেক রং (১৯৭৬)।

সেই সময়েই কাজী জহির নির্মাণ করলেন প্রেমের ছবি অবুঝ মন (১৯৭২)। এতে সাবিনা ইয়াসমীন গাইলেন-

‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়।

চলার পথে ক্ষণিক দেখা,

একি শুধু অভিনয়’।

সাবিনা ইয়াসমীনের এই তুমুল জনপ্রিয় গান শুধু তার ক্যারিয়ারে নয়, বাংলা প্লেব্যাক জগতের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। এই গানের মধ্য দিয়ে সাবিনা এ জগতে তার অবস্থান যেন সদর্পে পাকা করে নেন। পরের বছর রংবাজ ছবিতে গাইলেন ‘সে যে কেন এলো না’। মানুষ তখন থেকেই এই গায়িকার নাম মাথায় রেখে গান শোনা শুরু করল। রংবাজ চিরাচরিত রোমান্টিক জগত থেকে বের হয়ে ঢাকার ছবিতে অ্যাকশনের যে ধারার সূচনা করে, যে রং লাগায়, গানগুলোও সে যাত্রায় সঙ্গী হয়ে ওঠে। যেমন,

‘হৈ  হৈ হৈ রঙ্গিলা, রঙ্গিলা রে,

রিমঝিম এ বরষায় মন

নিলা রে’।

১৯৭৫ সাল থেকে প্রবর্তিত হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। প্রথম বছর চরিত্রহীন ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পান যৌথভাবে দেবু ভট্টাচার্য ও লোকমান হোসেন ফকির। সুজন সখি ছবিতে খান আতার সুরে গান গেয়ে শ্রেষ্ঠ গায়ক গায়িকার পুরস্কার পান আব্দুল আলীম ও সাবিনা ইয়াসমীন। ১৯৭৬ সালে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রথম একজন নারী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান, ফেরদৌসি রহমান। তবে চলচ্চিত্রের গানের জন্য সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি আসে ১৯৭৭ সালে চালু হওয়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ যখন ঘোষণা করা হলো। সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম, চিত্রকলায় জয়নুল আবেদীনের পাশাপাশি সঙ্গীতে একজন প্লেব্যাক গায়িকা, রুনা লায়লাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।

১৯৭৭ সালে সীমানা পেরিয়ে ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা গায়ক ও সুরকার ভূপেন হাজারিকা। এখানে আবিদা সুলতানার Ôবিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে ‘মেঘ থমথম করে’ উল্লেখ করার মতো গান। ১৯৭৮ সালে সাহিত্য থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের সারেং বউ উপন্যাস থেকে কবরী, ফারুককে নিয়ে বানানো হলো সারেং বউ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনায় হাত দিলেন আলম খান। সুর করলেন ‘রে নীল দরিয়া’। তার ব্যতিক্রম ছন্দের সঙ্গীত আলোড়িত করল সবাইকে।

এবার বাংলা সিনেমার গানের জগতের আলোচিত আর সমালোচিত আশির দশক। এ দশক শুরু হতে হতে সিনেমার গানে নিজেদের আসন বেশ জোরালোভাবেই পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমীন। একের পর এক জাতীয় পুরস্কার পেয়ে আলোচিত সাবিনা। অন্যদিকে ভারত আর পাকিস্তানের অডিও বাজারের বাম্পার হিট দুটো অ্যালবাম উপহার দিয়ে, দেশের বাইরে একের পর এক সফল কনসার্ট করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে চলেছেন রুনা। তখনকার দিনে তাঁদের বৈরিতা নিয়ে নানা রটনা প্রচলিত ছিল। ৭০ এর দশকে আজিম পরিচালিত প্রতিনিধি ছবিতে সত্য সাহার সুরে একটি শ্রোতাপ্রিয় গানে দুজনের কণ্ঠ পাওয়া যায় ‘তুমি, তুমি বড় ভাগ্যবতী’। এরপর হয়ত তাদের আর এক করা সম্ভব হয় নি। ১৯৮২ সালের ১৩ মে প্রকাশিত সিনেমা সাপ্তাহিক পূর্বানীতে Ôরুনা লায়লা এখন কতখানি জনপ্রিয়’ শিরোনামে তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে। প্রশ্নোত্তরের এক পর্যায়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘আমি ওর (সাবিনা ইয়াসমীন) গানের প্রশংসা করি সব সময়ই। চমৎকার ওর গলা। কিন্তু একবার ও আমাকে দুঃখ দিয়েছিল...সেইম উইথ সৈয়দ আব্দুল হাদী। আমি হাদী সাহেবের সঙ্গেও কোনদিন গান করব না’।৪

১৯৮২ সালে বড় ভালো লোক ছিল ছবির জন্য আলম খান শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পান। একই ছবিতে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানটি গেয়ে সেরা গায়ক ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হন এন্ড্রু কিশোর। রাজশাহী থেকে আসা, পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার প্লেব্যাকের সবচেয়ে ব্যস্ত এই গায়কের প্রথম প্লেব্যাক ছিল এটি। ১৯৮৭ রাজলক্ষী শ্রীকান্ত ছবির জন্য পুরস্কৃত হন সাবিনা ইয়াসমীন। রাজলক্ষী  শ্রীকান্ত  ছবিতে রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘বাজুবান্দ খুল খুল যায়’, ‘ইয়ে নসীব হামারে’ হিন্দি গানের ব্যবহার দেখা যায়। ১৯৮৯ মুক্তি পায় বেদের মেয়ে জোছনা সংগীত পরিচালনা করেন আবু তাহের। গল্পের সাথে কথার মিল রেখে গীত রচনা করেন ছবির পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল।

নব্বই দশকে গানের জন্য ঢাকার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হল-চাঁদনী, চোখে চোখে, দাঙ্গা, বিশ্বপ্রেমিক, স্বপ্নের ঠিকানা, স্বপ্নের পৃথিবী, প্রথম প্রেম, হারানো প্রেম, তোমাকে চাই, অন্তরে অন্তরে, দেনমোহর, ঘর দুয়ার, আদরের সন্তান, সাগরিকা, হৃদয় আমার, বিক্ষোভ, আনন্দ অশ্রু, মহামিলন, তুমি আমার, প্রিয়জন, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, হৃদয়ের আয়না ইত্যাদি। ১৯৯৭ সালে রুনা লায়লা অভিনয় করেন চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত শিল্পী চলচ্চিত্রে। প্রথমবারের মতো এক ছবিতে একই সাথে পাঁচজন সঙ্গীত পরিচালক একত্রিত হন- সুবল দাস, আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, আলী হোসেন আর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বিটিভিতে রুনার গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শোনাবো’ সহ বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, জাপানি ইত্যাদি ভাষায় গাওয়া ১৮টি গান ব্যবহৃত হয় শিল্পী  ছবিতে। এর মধ্যে একটি গানের কথা ছিল এরকম-

‘কে জানে কতদূরে সুখের ঠিকানা?

প্রতিদিন দেখা হয় তোমার আমার

তবুও রয়েছি মোরা অচেনা’।

 

বাংলা সিনেমায় ক্ল্যাসিকাল গানের অপ্রতুল ব্যবহার : কারণ ফলাফল

ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বসন্ত বাহার, মেঘমল্লার, কাফী, ভৈরবী, আহির-ভৈরব, কলাবতী প্রভৃতি রাগ-রাগিনী সমৃদ্ধ ক্ল্যাসিকাল গানের ভুবন চিরকালই সঙ্গীত চর্চাকারীদের জন্য প্রেরণার। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, নিধুবাবু, শচীন দেব বর্মন প্রমুখ সঙ্গীতকার তাদের গানের ডালা ভরেছেন এইসব শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শাখা-ঝরা ফুল দিয়ে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আর ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ এর মতো শুদ্ধ সঙ্গীতের বরপুত্রদের বংশে জন্মগ্রহণ করেন শেখ সাদী খান। তিনি এদেশের প্লেব্যাক জগতের অন্যতম কিংবদন্তি সঙ্গীতকার। আশির দশকে তিনি মহানায়ক ছবির জন্য সুর করলেন। সুবীর নন্দী, হৈমন্তী শুক্লা আর রুনা লায়লাকে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গান গাওয়ালেন। গানগুলো শ্রোতাপ্রিয় হলো। শ্রোতাপ্রিয়তার কথা এখানে একটু বিশেষ করে উল্লেখ করার কারণ শেখ সাদী খান এই ছবির গানগুলো করার সময় মাথা পেতে নিয়েছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আশীর্বাদ। বিশেষ করে বলতে হয় সুবীর নন্দীর গাওয়া-

‘আমার এ দু’টি চোখ পাথরতো নয়

তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়?

কখনও নদীর মতো

তোমার পথের পানে বয়ে

বয়ে যায়’।

এই গানটির কথা। সত্য সাহা আশির দশকে আনারকলি ছবির সঙ্গীতের দায়িত্ব নেন। ববিতার ঠোঁটে একটি গান করতে হবে আবেগী অপেক্ষার। সেইমতো গাজী মাজহারুল আনোয়ার লিখলেন-

‘আমার মন বলে তুমি আসবে,

হৃদয়ের বসন্ত বাহারে

প্রেমের অভিসারে আসবে’।

গানটির কথার স্থায়ীতেই একটি রাগের নাম পাওয়া গেল, বসন্ত বাহার। সত্য সাহাও খানিকটা রাগ-সিক্ত একটা সুর বসালেন গানটিতে।

২০০৬ সালে মুক্তি পায় তৌকির আহমেদ পরিচালিত ও অভিনীত রূপকথার গল্প নিধুবাবুর লেখা একটি টপ্পা গানের সঙ্গীতায়োজন করে বারী সিদ্দিকী নিজেই গাইলেন-

‘কার তরে নিশি জাগো রাই?

তুমি যার আশায় বসে আছো

তার আসার আশা নাই’।

গানটি পুরোপুরিই ক্ল্যাসিকাল গান এবং বাংলা ফিল্ম এর জগতে এমন পুরোমাত্রার ক্ল্যাসিকাল গানের ব্যবহার বেশ বিরল। এই গানের গায়িকা রুনা লায়লাকে বাংলাদেশের অনেক শ্রোতাই প্লেব্যাকের চটুল গায়িকা বলে চেনে মাত্র। অথচ এই রুনা লায়লাই যখন ভারতে বা পাকিস্তানে গান করেন, তার গানের সিংহভাগই দখল করে রাখে ক্ল্যাসিকাল নির্ভর গান। ১৯৭২ সালে রুনা উর্দু চলচ্চিত্র বাজার এ অসাধারণ একটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত-নির্ভর গানে কণ্ঠ দেন ‘তাকাল্লুফ বার তারাফ হামকো, সারে বাজার নাচেঙ্গে’। একই বছর পাকিস্তানি সঙ্গীতকার নিসার বাজমির সুরে রুনা লায়লা উমরাও জান আদা ছবিতে ‘আপ ফারমায়ে’, ‘কাটে না কাটেরে রাতিয়া’ প্রভৃতি ক্ল্যাসিকাল-উদ্ভুত গানে কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাপ্রিয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুনাম অর্জন করেন। বাংলাদেশে তিনি এ ধরনের গান সেই তুলনায় পাননি বললেই চলে। রুনা লায়লার সত্যিকারের দক্ষতা এদেশে মলিন হবার কারণ হয়ত দেশের প্লেব্যাক জগতে ক্ল্যাসিকাল গানের ব্যবহার অনেক কম। কারণ এদেশে শুধু সিনেমায় নয়, প্রায় সবক্ষেত্রেই গায়কির গুরুত্ব ভারত এবং পাকিস্তানের মতো নয়। তবে ক্ল্যাসিকাল ভিত থাকলে গানে এক ধরণের গতি পাওয়া যায়, গায়কির নৈপুণ্য খেয়াল করার সুযোগ আসে। আর সত্যিকারের দক্ষতা নিয়ে, সিনেমার পরিপার্শ্ব মাথায় রেখে কাজ করলে যে এই ধরনের গানও অসম্ভব জনপ্রিয় হতে পারে তার প্রমাণ সুবীর নন্দীর ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, রুনা লায়লার Ôআমার মন বলে তুমি আসবে’, আবিদা সুলতানার ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’।

এই ধরনের গান কম ব্যবহৃত হওয়ার আরও একটি কারণ হয়ত, নিখুঁত কণ্ঠের প্রতি এক ধরণের উদাসীনতা। আমরা নব্বই দশক থেকে এমন অনেক কণ্ঠে হামেশা গান শুনে আসছি, যে কণ্ঠে নৈপুণ্য তো দূরের কথা, শিল্পীসুলভ তারল্য পাওয়াও মুশকিল। অথচ গান জনপ্রিয় হয়েছে, শিল্পীর কদর বেড়েছে! কোনরকম তাল, লয়, সারেগামা জ্ঞান হলেই গান রেকর্ড হয়েছে, প্লেব্যাক করা গেছে, ক্ল্যাসিকালে অভিজ্ঞতা বা চর্চার দরকার পড়ে নি। ফলাফল যা হবার তাই, এদেশের গানের জগতে সুন্দর কণ্ঠের, চর্চিত গায়কির অভাব বোধ করেনি কেউ।

জনপ্রিয়তার সমান্তরাল বিপরীতে মানের বিচার

জনপ্রিয়তার কথা আসলেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভুল ধারণা জন্ম নিতে পারে, এমনকি সচরাচর নেয়ও। সিনেমার গানের মানের ক্ষেত্রে শ্রোতাপ্রিয়তাকে অনেক সময় প্রধান নেতিবাচক বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্তত ঢাকার সিনেমার গানের ক্ষেত্রে মনে করা হয়, জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সিনেমার গানের মান একদম পড়ে গেছে।

.

এক সময় মনে করা হতো প্রেক্ষাগৃহ হলো মধ্যবিত্ত অর্থাৎ সাধারণ মানুষের বিনোদনক্ষেত্র; কিন্তু এখন মনে করা হয় এই জায়গাটা অনেকটা নিম্নবিত্তদের জন্য। আর যেহেতু বাংলা ক্ল্যাসিকাল আর সেমি-ক্ল্যাসিকাল গানগুলো ভারী কথা বা গভীর ভাবের, এমনকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের বেশির ভাগ গানও সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত মানুষদের কাছে অধরা থেকে যায়; তাই সিনেমার গানকে অবশ্যই সাধারণের পছন্দের মতো করে তৈরি করতে হয়। পুরো উপমহাদেশেই এই প্রবণতা প্রচলিত। এই প্রবণতা থেকেই অনেক সময় জনপ্রিয় আধুনিক বা ফোক গানকে সিনেমায় ভুক্তি দেয়া হয়। যেমন পাকিস্তানি চলচ্চিত্র দিলান দে সাউদে তে সিন্ধি আর পাঞ্জাবি ভাষার ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় গান ‘দামদাম মাস্ত কালান্দার’অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতে সুপার রুনা অ্যালবামের জনপ্রিয় ডিসকো গান Ôদে দে পেয়ার দে’শারাবি ছবিতে কিশোর কুমার আর আশা ভোঁসলেকে দিয়ে নতুন করে গাওয়ান সঙ্গীত পরিচালক বাপ্পি লাহিড়ি।

ঢাকার সিনেমায় এই রকম উদাহরণ হলো আগুন জ্বলে ছবিতে বেবী নাজনীনের আধুনিক গান ‘এলোমেলো বাতাসে’, জেমসের ‘মীরাবাই’, মাকসুদের ‘তোমাকে দেখলে একবার’, স্বপ্নের পৃথিবী ছবিতে রুনা লায়লার Ôজ্যোতিষী গো জ্যোতিষী’, প্রিয়া তুমি কোথায় নামের ছবিতে আসিফের একই শিরোনামের গান।

.

ঝুমুর, দাদরা, কার্ফা, কাহারবা ইত্যাদি বিভিন্ন তালের মধ্যে কাহারবা তালের জনপ্রিয়তা বেশি। দেহতত্ব, দেশপ্রেম, মাতৃপ্রেম, সাধারণ অর্থে প্রেম ইত্যাদি ধরনের গীতিকথার মধ্যে শ্রোতাপ্রিয় হয় শেষেরটা। সুরের ক্ষেত্রে তো বলা চলে এই উপমহাদেশে ‘সিনেম্যাটিক’ নামে একধরণের ধারার প্রচলন আছে। আধুনিক গানের মধ্যে যার অবস্থান আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। সবচেয়ে বড় কথা এই ধারার শ্রোতার সংখ্যা অজস্র। তাদের কথাতো অবশ্যই মাথায় রাখতে হয়, আর তা অনুচিত কিছু না, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে। শ্রোতার চাহিদা সঠিক পরিমাণে, সহজ পথে বুঝতে পারা বাণিজ্যের সবচেয়ে দরকারি দিক।

যারা সিনেমার গানে কাজ করতে আসেন, তারা রক্ষণশীল গুণমুখীতা ছেড়েই আসেন। পাঁচজনের মন ভরে আর পাঁচজনের কুঞ্চিত ভ্রু সহ্য করার মতো প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। তবে সমস্যা হয় যখন শ্রোতা আর গীতরচয়িতা-সুরস্রষ্টা-গায়িকা-গায়ক আর শ্রোতার মাঝখানে যোগাযোগ-ব্যবধান প্রকট হয়ে ওঠে বা একধরনের ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে। যেমন, ‘এই বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেওনা’গানটির শ্রোতাপ্রিয়তায় বিভ্রান্ত হয়ে ‘বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ভীষণ শীত শীত লাগছিল’র মতো গানের সৃষ্টি হয়েছে।

.

জনপ্রিয়তাই যখন একমাত্র গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তখন এ ধরনের পথবিভ্রান্তি অস্বাভাবিক নয়। শ্রোতাপ্রিয়তা বলতে সঙ্গীত পরিচালকেরা কেবল একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর প্রতিক্রিয়াকে বোঝেন। আর এই পথবিভ্রান্তির কারণে তারা সিনেমায় গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা বড় সুযোগ হারান। অনেক চলচ্চিত্রেই পারিবারিক কাহিনীর পাশাপাশি প্রেম-অভিসার-বিরহ, পার্টি বা বারের আনন্দ বেদনা উদযাপনের দৃশ্য থাকে। পারিবারিক ক্ষেত্রে সম্মিলনী বা জাগরণী গান ব্যবহারের সুযোগ থাকে। প্রেম-অভিসারের ক্ষেত্রে সুযোগ থাকে রোমান্টিক, মেলোডিয়াস গান ব্যবহারের; বিরহী আবহে বা আবহ সঙ্গীত হিসেবে ক্ল্যাসিকাল ভিত্তিক গান ব্যবহার সম্ভব হয়। পার্টি বা বারে ডিসকো বা রক ব্যবহার অবাস্তব হবে না। কিন্তু আমাদের সঙ্গীতস্রষ্টাদের মধ্যে কয়জন সব ধরনের দর্শকের কথা মাথায় রেখে গান সৃষ্টি করেন? এমনকি কয়টা ছবিতে এই সমন্বয়ের সুন্দর প্রয়োগ আছে?

সংকটের মূল জায়গা বা সম্ভাবনার শুরু হওয়ার মতো ক্ষেত্র

সংকট-সময়ের নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই। কোনোকিছু শুরুর আগেই শুরু হয় সংকট। আবার শেষ হলেও সংকটের রেশ কখনও কখনও কাল অতিক্রম করে কালোত্তীর্ণ হয়। সংকট অনেক সময় সংক্রামক। কিন্তু এমন কিছু সংকটের দেখা পাওয়া যায়, কালেভদ্রে যেসব সংকট নিজেরাই বহন করে সম্ভাবনার বীজ। আমাদের সিনেমার গানে সংকট ছিল অনেক আগে থেকেই, থাকবে। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে (আনুমানিক) যে ধরনের মহামারি আকারের শূণ্যতা দেখা দেয়, এর মাঝে কি কোনোভাবে কোনো সম্ভাবনার আশা আছে?

. সুরকার গীতিকার সংকট

সুরেলা, কালজয়ী, মর্মছোঁয়া গানের এক সময় প্রাচুর্য ছিল ঢাকায়। রেডিওর বড় বড় প্রায় সব সুরকারই ঢাকার সিনেমার সাথে জড়িত ছিলেন। সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান, খোন্দকার নুরুল আলম, আনোয়ার পারভেজ, সুবল দাস, দেবু ভট্টাচার্য, আলী হোসেন, শেখ সাদী খান, সমর দাস, লোকমান হোসেন ফকির, রবিন ঘোষ, আলাউদ্দিন আলী, আজাদ রহমান, আলম খান, সুজেয় শ্যাম, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলসহ আরও অনেক সুরময় সুরকারের নাম করা সম্ভব ছিল। বর্তমানে সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান, আনোয়ার পারভেজ, সুবল দাস, দেবু ভট্টাচার্য প্রমুখ সুরসাধকেরা আর আমাদের মাঝে নেই। বাকি যে কয়জন এখনও কর্মক্ষম তাদের কাছ থেকে আমরা কতখানি পাচ্ছি? তারা আগের মতো কি আর কালজয়ী সুরের জন্ম দিচ্ছেন? তাদের অল্পকাজ বা অপ্রত্যাশিত নিম্নমানের কাজের পিছনে হয়ত দুই তিনটা অন্য সংকটের প্রভাব আছে, যেমন: শিল্পী সংকট, শ্রোতা সংকট আর তারুণ্যের সংকট।

ফেরদৌসি রহমান, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, মাহমুদুন্নবী, আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, বশীর আহমেদ, খুরশীদ আলম, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, সুবীর নন্দীর পরে কয়জন নির্ভরযোগ্য আর চর্চিত গায়কির অধিকারী কণ্ঠশিল্পীর দেখা মিলেছে এই ঢাকায়। সুরকারদের সুর, সুন্দর কণ্ঠ আর সুন্দর গায়কি ছাড়া আসলে সত্যিকারের সুর হয়ে ওঠে না। তাদের সুর বুঝে গাওয়ার মতো শিল্পীর  প্রয়োজন মেটানো এখন দুর্বহ হয়ে উঠেছে।

শ্রোতার সংকট এখন আমাদের দেশের জন্য, আমাদের দেশের সুরকারদের জন্য এখন অনেক বড় একটা সমস্যা। নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে আমাদের দেশে শুরু হয় স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখার সুযোগ, সঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীত-প্রীতি। ২০০০ এর পর থেকে তা আরও বিকট আকার ধারণ করে। বর্তমানে একদম সুযোগ সুবিধাহীন নিভৃত পল্লী ছাড়া প্রায় সব এলাকাই এই ভারতীয় সঙ্গীত-গোঁড়ামির দখলে। আমাদের সুরকারেরা অনুপ্রেরণা নেওয়ার মত জনবল আর পান না। বাইরের গান শোনা কখনই পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। যখন আমাদের গানের স্বর্ণযুগ ছিল তখনও ভারতীয় আর অন্যান্য দেশীয় গানের চল ছিল। তবে সমস্যা হলো আমাদের বর্তমানের শ্রোতারা অন্য দেশের গান শোনার আগেই নিজেদের সঙ্গীতকে অবজ্ঞা করতে শেখে।

আমাদের গুণী সুরকারদের এখন আর তরুণ বয়স নেই। বৃদ্ধকালে অনেকেই কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সিনেমার গান তৈরির মতো ফরমায়েশী কাজে দীর্ঘদিন আগ্রহ ধরে রাখার মতো বিভব সবার মাঝে পাওয়ার আশা করা যায় না। একটা ইন্ডাস্ট্রিকে তাই অবশ্যই তরুণদের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু আমাদের তরুণ সুরকারদের নিয়ে সিনেমার গান এগোতে পারছে না। একটু খোলাসা করে বললে বলা যায়, ইমন সাহা, এস আই টুটুল, হাবিব, বালাম প্রমুখ সুরকারেরা তাদের নিজেদের সৃষ্টিকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রেখেছেন। সুরে কোনো বৈচিত্র্য নাই। তারা দুয়েকটা ভালো সুর করে ওই সুরগুলোকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছেন।

গীতিকারের ব্যাপারটা অনেকটা মেধা সংক্রান্ত। সুন্দর গানের কথায় সুন্দর সুর বসানো যায়। আমাদের এখানে গীতিকারদের এখন দুইটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়ে গেছে। একটা শ্রেণী আশির দশক থেকে শুরু হওয়া Ôদিলে জখম হলো উহু আহা’, ‘এই জোয়ানির কসম লাগে’, ‘কুংফু জানি কারাটে জানি’, ‘কুয়ার ব্যাঙে ফাল দিছে’ মার্কা গানের ধারা ধরে রেখেছে। অন্য একটি ধারায় আছে সুন্দর সুন্দর শব্দের সমন্বয়ে তৈরি অর্থহীন রোমান্টিক গান।

এক সময় অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ সাহিত্যিকেরা বাংলা ছবির গান লেখার ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন। সুতরাং, বড় ভালো লোক ছিল, আশীর্বাদ প্রভৃতি ছবিতে ‘তুমি আসবে বলে, কাছে ডাকবে বলে’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’ ইত্যাদি সুন্দর আর জনপ্রিয় গানের লেখক সৈয়দ শামসুল হক কর্মক্ষম থাকলেও আর সিনেমার জন্য গান লেখেন না। একজন ভালো কবি সিনেমার গান লেখার মধ্যে হয়ত সম্মানের বা প্রাপ্তির কিছু দেখেন না। অথচ এরকম কয়েকজন গীতিকবিকে আমাদের খুব বড় বেশি প্রয়োজন।

. শিল্পী সংকট

আমাদের দেশে ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, Ôতুমি যে আমার কবিতা’, ‘ওরে ও পরদেশী’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘ও রে নীল দরিয়া’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ ইত্যাদি জনপ্রিয় আর ক্ল্যাসিক পর্যায়ের গানের বিভিন্ন ধরনের রিমেক ও রিমিক্স ভার্সন বিভিন্ন সময়ে বের হয়েছে ব্যাপক পরিমাণে। এগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ গান বেশ নিম্নমানের গায়কিতে গাওয়া। একটু সচেতনভাবে শুনলে বা আসল রেকর্ডটা শোনা থাকলে গানগুলোর গায়কির দুর্বলতা বেশ কানে বাজে। অনেক সময় যন্ত্রসাধিত গলা আর অসঙ্গত বাদ্যের ব্যবহার গানের প্রায় সবখানিই নষ্ট করে ফেলে। স্বাধীনতার আগে বা সত্তর দশকের প্রথম দিকে যখন আব্দুল আলীম, ফেরদৌসি রহমান, মাহমুদুন্নবী, বশীর আহমেদ, খোন্দকার ফারুক আহমেদ, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আঞ্জুমান আরা বেগম গান করতেন তখন শিল্পী সংকট ছিল না বললেই চলে। সত্তর দশকের শুরুতে আর মাঝামাঝি সময় থেকে আরও দুটি কণ্ঠ নিয়মিতদের তালিকায় যুক্ত হলো, সাবিনা ইয়াসমীন আর রুনা লায়লা। আশি আর নব্বই দশক মোটামুটি একচেটিয়াভাবে দখল করে রাখলেন এই দুই দক্ষ গায়িকা।

কিছু অসাধারণ দেশাত্মবোধক গান বাদে সাবিনা ইয়াসমীনের শিল্পীজীবনের অধিকাংশই গানই সিনেমার। তিনি ১৯৬২ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অসংখ্য সুরেলা গান গেয়েছেন, সুনাম হয়েছে, কিংবদন্তি গায়িকায় পরিণত হয়েছেন। আরেক কিংবদন্তি গায়িকা রুনা লায়লা উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু প্রভৃতি ভাষার সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন, অনেক বিখ্যাত গানের শিল্পী তিনি। অন্যান্য দেশে এবং গানের অন্যান্য ধারায় তিনি খ্যাতিমান। তবে তিনিও তার ক্যারিয়ারের একটা বড় অংশ ব্যয় করেছেন ঢাকার সিনেমায় গান গেয়ে।

এত অবদানের পরেও ঢাকার সিনেমার গানের নিচমুখীতার পেছনে এই দুই গায়িকার দায় এড়ানো সম্ভব না। দুই শিল্পীর মধ্যে পারস্পরিক মন্দ সম্পর্কের পাশাপাশি, গানের সংখ্যাভিত্তিক প্রতিযোগিতাও হয়ত সেসময় ছিল। তারা নির্দ্বিধায় নিচমানের কথা, নকল সুরের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাদের এই উদাসীনতা মন্দকে, মানের নিচতাকে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল। তাদের বিরুদ্ধে তখনকার দিনে এমন গুজবও ছিল যে, তারা সুরকারদের অন্য শিল্পীদের দিয়ে গান করাতে দেন নাই। ১৯৮১ সালের ১ মে তারিখে প্রকাশিত সিনেমা সাপ্তাহিক চিত্রালীর প্রচ্ছদ কাহিনী ছিল ‘তিন কন্যার মনে আছে একই বেদনা: রুনা, ববিতা, রোজিনা’শিরোনামে। এক পর্যায়ে প্রতিবেদক লিখছেন, ‘রুনা লায়লা কথায় কথায় জানতে চেয়েছিলেন ঢাকার ছবিতে ক্লাব সঙ ছাড়া কি আর কোন গান থাকে না?’

অ্যাকশনধর্মী ছবি বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার ছবিতে ব্যবহৃত হতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্লাব সঙ। সেইসব গানের কথার যেমন বেহাল দশা, অনেক গানের সুরও ছিল নকল অথবা খাপছাড়া। যেমন, Ôবুম বুম বুমা’, ‘টাকার খেলা বড় খেলা, রূপের খেলা খোলামেলা’, ‘যৌবন নামের এক ফুল ফোটে’ ইত্যাদি। ক্যাবারের গান ছাড়াও কিছু নিচমানের গান ছিল, যেগুলো আবার লোকপ্রিয়তার জোরে পার পেয়ে যায়। ‘তোমাকে চাই আমি আরও কাছে’, ‘তুমি চোর আমি রূপের রানী’, ‘রূপে আমার আগুন জ্বলে’, ‘ঝুলে পড়ো ঝুলে পড়ো’, ‘প্রেম করিতে মানা, আমি মিস রুনা’, ‘তুমি আজকে যাও বন্ধু কাল এসো তাড়াতাড়ি’, ‘ও রঙিলা কই গেলা’ -এসব গানের তবু অনেক শ্রোতা ছিল এক ধরনের ছন্দের খাতিরে।

আশির দশকের এসব গান পার করে নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকে শুরু হলো অশ্লীল গানের রমরমা যুগ। সেসময় রুনা লায়লার আবেদনময়ী গায়কি ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার হতে লাগলো। তার কণ্ঠ থেকে আমরা শুনতে লাগলাম, ‘বিচ্ছু আমার গায়ে কামড় দিলরে’, ‘কে নেবেরে কে নেবে আমি সোনার চাক্কা’, ‘ওরে ও দুষ্টু পানি, এখন আমার ভরা জওয়ানি’, ‘কার বা কাছে করি নালিশ বুকে চেপে বালিশ’ইত্যাদি কুরুচিপূর্ণ গান। অনেকেই রুনা লায়লার এইরূপ প্রশ্রয়ে অবাক হয়ে গেলেন। রুনা লায়লার পাশাপাশি সাবিনা ইয়াসমীন ‘বৃষ্টিরে বৃষ্টিরে আয়না জোরে’র মতো কিছু গান গাইলেন। দুইজনে তখনও প্রচুর নকল গানে কণ্ঠ দিচ্ছেন। শাকিলা জাফর, কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, ডলি শায়ন্তনীর মতো উঠতি গায়িকারা এই দুই বড় গায়িকার অনুসরণে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তারা পেশাদার গায়িকা, সব গান গাইবেন- এমনই হয়ত স্বাভাবিক সিনেমার মান খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, তার সাথে তাল মিলিয়ে সিনেমার গানের মান যেভাবে পড়ে যাচ্ছিল, সেখানে রুনা-সাবিনা আর কতখানি কী করবেন? তবু এত বড় দুইজন গায়িকার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ আশা করছিলেন অনেকেই। অবশেষে ২০০০ সালে তাদের প্রতিবাদ করতে দেখা গেল। তারা দু’জনই আলাদা আলাদা ভাবে ঘোষণা দিলেন সিনেমায় আর নিয়মিত গাইবেন না।

এতে সংকট আরও বাড়ল। তাদের ছেড়ে দেওয়া জায়গায় যারা এসে দাঁড়ালেন, তারা আরও বেশি করে নকল সুর আর নিচমানের গান গাইতে লাগলেন। সৃষ্টি হলো সুন্দর কণ্ঠের শূন্যতা। অদক্ষ আর অনভিজ্ঞ লোকেরা সিনেমার গানের শ্রোতা আর সুনামের পরিমাণ নিয়ে গেলেন শূন্যের কাছাকাছি। ঢাকায় বৈচিত্র্যময় গলার শিল্পীর অভাব বোধ হতে লাগল বেশ প্রকটভাবে।

. সঙ্গীতায়োজন আর রেকর্ডিংয়ে সংকট

যারা পাকিস্তানের মিউজিক নির্ভর ধারাবাহিক অনুষ্ঠান কোক স্টুডিও দেখেছেন বা ভারতের লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমারের স্টেজ প্রোগ্রাম কিংবা গান রেকর্ডিংয়ের ভিডিও দেখেছেন; তারা অবশ্যই দেখে থাকবেন কী প‌রিমাণে আর কত রকমের বাদ্যযন্ত্র একটা গানের সাথে ব্যবহার করা হয়। তবেই গানে সত্যিকারের সুর, দোলা বা ছন্দ আসে। বাংলাদেশে আলম খান সারেং বউ, দুই জীবন, অন্তরে অন্তরে, নাগ পূর্ণিমা ছবিতে অন্য ধাচের সঙ্গীতায়োজন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সত্য সাহার গানে বাদ্যযন্ত্র আর কণ্ঠের সম্মিলন মানুষকে যারপরনাই মুগ্ধ করত। আলাউদ্দিন আলীর করা ‘নানী গো নানী বলি যে আমি’, ‘বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িত গেলাম’, ‘প্রেমের আগুনে জ্বলে গেলাম সজনী গো’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর, মেলেছে ডানা’প্রভৃতি গানের তবলাপ্রধান অনন্য সঙ্গীতায়োজন শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল।

আজাদ রহমান এপার ওপার ছবির ‘ভালোবাসার মূল্য কতো’, যাদুর বাঁশি ছবির ‘আকাশ বিনা চাঁদ যেমন বাঁচিতে পারে না’গানের জন্য অন্যধারায় সঙ্গীতায়োজন করেন। ‘আকাশ বিনা চাঁদ’গানটি লেখেন চিত্রালীর তৎকালীন সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী। বাংলাদেশের সিনেমার গানের সঙ্গীতায়োজন আর রেকর্ডিং ব্যবস্থার দৈন্যদশা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার পাক্ষিক বিনোদন ম্যাগাজিন ‘আনন্দ বিচিত্রা’কে আহমেদ জামান চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতার দুই দশক পরেও আমাদের ভূখণ্ডে আমরা আধুনিক রেকর্ডিং সিস্টেম গড়ে তুলতে পারি নি। ‘ইএমআই’রেকর্ডিং আমাদের দেশে আসতে চেয়েছিল। স্বাদেশিকতার কথা বলে তাদের আসতে দেওয়া হয়নি।” অথচ ঠিকই ভারতের উপর নির্ভর করতে হতো ভালো রেকর্ডিং আর কারিগরি সহায়তার জন্য। এফডিসির সাউন্ড কমপ্লেক্স কোনোদিনই সেই পরিমাণে সমৃদ্ধ ছিল না।

এখনকার দিনে যেসব তরুণ সঙ্গীতকার সিনেমার জন্য কাজ করছেন তাদের কারিগরি সমস্যায় খুব একটা পড়তে না হলেও তাদের সঙ্গীতায়োজনের বড় ত্রুটি হলো অত্যধিক মাত্রায় কম্পিউটার নির্ভরতা। তারা মিউজিক, রেকর্ডিং আলাদাভাবে করেন ঠিক আছে, কিন্তু সেগুলোর সমন্বয় কতখানি শৈল্পিক হয়? অনেকে আবার লাইভ মিউজিক করেন। কিন্তু বাদ্যযন্ত্র এবং যন্ত্রী দুইই কম ব্যবহার করেন। ফলে সম্ভাবনার জায়গাগুলো মোটেও তৈরি হয় নি, যা আমরা চোখে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলতে পারব। সংকটাপন্ন বলে যে জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হলো সেখান থেকেই সম্ভাবনার শুরু করা সম্ভব। এ সম্পর্ক সচেতন হলেই একমাত্র সেখান থেকে বের হয়ে এসে সম্ভাবনার শুরু করা যাবে।

যেমন- অভিজ্ঞ সুরকার যারা এখনও জীবিত আছেন, কর্মক্ষম আছেন তাদের দিয়ে উঠতি তরুণ আর সম্ভাবনাময় পরিচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা যথেষ্ট কাজে দেবে বলে মনে হয়। কারণ উঠতি সম্ভাবনাময় অনেকেই সিনেমার কনটেক্সট বুঝে উঠতে পারেন না। তাছাড়া পদ্ধতিগতভাবে এগোনোর ক্ষেত্রে প্রবীণদের সহযোগিতা বরাবরই নবীণদের জন্য অধিকার। সুরকার আজাদ রহমান একসময় মত প্রকাশ করেছিলেন, ‘আমি নিজে পদ্ধতিগতভাবে ‌‌শিক্ষা পেয়েছি বলেই আমাদের সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা আমি বুঝি’।৮ একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ ছবিতে আবহ সঙ্গীতের গুরুত্বটাকে অনেক সময় অবহেলা করা হয়’। আবহ সঙ্গীতে সৃজনশীলতা বজায় রেখে কাজ করার মতো অনেক স্বাধীনতা থাকে। কাহিনী, চরিত্র আর অবস্থা বুঝে সুন্দর আবহ সঙ্গীতের ব্যবস্থা একটু চেষ্টা করলেই করতে পারেন আয়োজকরা। এক্ষেত্রেও সম্ভাবনার বিশালতা আছে।

গায়ক বা গায়িকার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাগুলোর মৃত্যু হয় তাড়াহুড়োর ফলে। সারেগামা করলেই বা মাসের পর মাস প্রশিক্ষণ নিলেই শুধু গান শেখা হয় না। ভালো গান শুনতে হয় প্রচুর, কঠিন কঠিন গান শুনে গাইতে হয়। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সিডি-ডিভিডি, মোবাইল, কম্পিউটার বা ইন্টারনেটের দরুণ ভালো ভালো গান সংগ্রহ করা। আর শোনাটা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।  প্লেব্যাকে সিনেমার কনটেক্সট বুঝতে পারা, আবেগ প্রকাশ করা, পরিষ্কার গলায় গাওয়া ইত্যাদি অনেক গুণ লাগে। কেউ যদি শিল্পী হিসেবে সত্যিকার মনোযোগী হয়ে সিনেমার গানে অসম্ভব পারদর্শী, উপমহাদেশখ্যাত শিল্পীদের রেকর্ডগুলো মন দিয়ে শোনে তাহলে আয়ত্ত্বে আনতে পারবে এ সংক্রান্ত গুণগুলো। পুরোনো সিনেমার গান শোনার সময় শিক্ষানবিশ শিল্পীদের সবচেয়ে বড় খেয়াল রাখতে হবে গায়কির দিকে। তাছাড়া রুনা লায়লা বা সাবিনা ইয়াসমীন এখনও চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত। শিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োজনে ঢাকায় তাদের মুখোমুখি হওয়াও একজন উঠতি গায়ক বা গায়িকার জন্য অসম্ভব কিছু না।

১৯৫৬ সাল থেকে সবাক ছবির শুরু, প্লেব্যাকের সত্যিকারের শুরু বলতে গেলে তখনই। তারপর দশকে-দশকে, সুরকারে-সুরকারে, গীতিকারে-গীতিকারে, গায়িকা-গায়কে এসেছে বৈচিত্র্য। আবার কখনও একঘেয়েমিতায় জমাট বেধেছে। কখনও মনে হয়েছে যেন বিপ্লব এল। তবে একথা সত্যি যে ২০০০ সালের পরে বাংলাদেশের সিনেমার পাশাপাশি সিনেমার গানের জগৎ যে দশার মধ্যে দিয়ে এক দশক পার করেছে এর নাম বলতে গেলে বিপর্যয় বা দুর্যোগ। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। তাই পূর্ব সতর্কতা বা নিরাপদে দূরে সরে যাওয়া আমাদের কাজ নয়। যতখানি সম্ভব ভালোবাসা বাড়াতে হবে। আগ্রহ আর সৃজনশীলতার বিকল্প নেই। সাফল্য জানতে হবে, সীমাবদ্ধতা মানতে হবে। জনগণকে মাথায় রেখে মানের বিচার করতে হবে। সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রেখে এক্সপেরিমেন্টাল বা নিরীক্ষাধর্মী কাজ ভিন্ন আর কী করার আছে?

লেখক: আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স লেখালেখি করেন।

 

তথ্যসূত্র

১. মুখ মুখোশ, সিনেমার ডিভিডি এখন কিনতে পাওয়া যায়; ডিভিডি: নিউ গল ভিডিও, ঢাকা।১

২. পাক্ষিক তারকালোক; পৃ-২২, ১-১৪  ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫

৩. উইকিপিডিয়ায় এ সংক্রান্ত ভুক্তি; http://en.wikipedia.org/wiki/Independence_Day_Award)|

৪. সাপ্তাহিক পূর্বানী; পৃষ্ঠা- ২, ১৩ মে ১৯৮২, ঢাকা।

৫. পাকিস্তানী মুভি ডাটাবেজ; http://www.pakmdb.com/dbasev.php?type=S&q=1&q=Runa+Laila&Submit=Submit)|

৬. চিত্রালী; ২৮ বছর পূর্তি সংখ্যা, পৃ-২।

৭. আনন্দ বিচিত্রা; সংখ্যা ৯৭, ১৬-৩১ অক্টোবর, ১৯৯০।

৮. চিত্রালী; বর্ষ ২৮, সংখ্যা ২১, ১২ জুন, ১৯৮১।

 

সহায়ক গ্রন্থ

১. ইসলাম, শেখ আমিনুল (সম্পাদিত, ২০১১); এক মুঠো চলচ্ছবি; প্রতীতি, ঢাকা।

২. Cinema of Bangladesh; উইকিপিডিয়ায় বাংলা চলচ্চিত্র সম্পর্কিত ভুক্তি;

BD Avi Gj:http://en.wikipedia.org/wiki/Cinema_of_Bangladesh|

৩.The Brief History of Bangladesh Cinema, Anupam Hayat, Wayback Machine Internet Archive, :http://web.archive.org/web/20041212203749/http://www.bangladesh.net/cinema/page12.htm|

৪. অফিসিয়াল ওয়েব সাইট, তথ্য মন্ত্রণালয়; গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; ইউ আর Gj: .moi.gov.bd|

৫. পাক্ষিক তারকালোক; ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮, পৃষ্ঠা-২২, ১-১৪, ঢাকা।

৬. উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা পুরস্কার সংক্রান্ত ভুক্তি; http://en.wikipedia.org/wiki/Independence_Day_Award

৭. সাপ্তাহিক পূর্বানী; ১৩ মে ১৯৮২, পৃষ্ঠা-২, ঢাকা।

৮. পাকিস্তানি মুভি ডাটাবেজে রচনা লায়লা সংক্রান্ত ভুক্তি।

http://www.pakmdb.com/dbasev.php?type=S&q=1&q=Runa+Laila&Submit=Submit|

৯. পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা; সংখ্যা ৯৭; ১৬-৩১ অক্টোবর, ১৯৯০, ঢাকা।

১০. সাপ্তাহিক চিত্রালী; ২৮ বছর পূর্তি সংখ্যা; ১ মে, ১৯৮১, পৃষ্ঠা-২ ঢাকা।

১১. সাপ্তাহিক চিত্রালী; বর্ষ ২৮ সংখ্যা ২১; ১২ জুন; ১৯৮১, ঢাকা।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন