Magic Lanthon

               

ইমরান হোসেন মিলন

প্রকাশিত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

রানওয়ে‌‌‌‌‌‌‌‌'র প্রদর্শনী, একজন সিনেমারফেরিওয়ালা ও কিছু ভিন্ন প্রশ্ন

ইমরান হোসেন মিলন

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় আবিষ্কার করলেন শিল্পের নবীনতম শাখা চলচ্চিত্র।এর কিছু আগে যখন তারা বুঝতে পেরেছিলেন সিনেমা আবিষ্কার এখন কেবল তাদের কাছে সময়ের ব্যাপার, ঠিক তখনই কিছু লোককে ক্যামেরা ও প্রজেক্টর চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই, সিনেমা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে ওইসব লোক ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়। সিনেমা তৈরির পরের বছর ঠিক তেমনটি করেও ছিলেন তারা। নিজস্ব যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওইসব লোক টিকিটের বিনিময়ে লুমিয়েরদের তৈরি সিনেমা প্রদর্শন শুরু করেছিল বিশ্বের নানা প্রান্তে। সময়টা ছিল ১৮৯৬ সাল। আর এখন ২০১১। সিনেমা শিল্পে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। হলিউড, বলিউডের মতো বড় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো ছোট দেশও সিনেমা শিল্পে অগ্রগতি লাভ করেছে। লুমিয়ের ভ্রাতাদের আবিষ্কারের বয়সও পার হতে চলল সোয়া এক শতক।

ঠিক এই সময় এসে বাংলাদেশের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ তার নির্মিত রানওয়ে সিনেমা নিয়ে শুরু করলেন লুমিয়ের ভ্রাতাদের মতো প্রদর্শনী। সিনেমা প্রদর্শনের জন্য লুমিয়ের ও তাদের কর্মচারীদের মতো তারেক মাসুদও নিজস্ব যন্ত্রপাতি, তার লোকজন ও রানওয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে (৮০ দশকে এই তারেক মাসুদরাই বিকল্প ধারা নামে যে আন্দোলন শুরু করেন, সেটার বৈশিষ্ট্য ছিল ১৬ মিলিমিটারে সিনেমা নির্মাণ করে সিনেমা হলের বাইরে বিকল্প প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। তবে তারাই এখন বলছেন, যে বর্তমানে বিকল্প ধারা আর নেই)। নিজেকে বলছেন ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘সিনেমার ফেরিওয়ালা‍‌‌‍। একই সঙ্গে তিনি নিজের এ ধরনের কাজকে তুলনা করেছেন ‍'উল্টোপথে যাত্রা‍‍‍ এর সঙ্গে।

অনেকের মনে হতে পারে আলোচনা আসলে কী নিয়ে রানওয়ে না রানওয়ের প্রদর্শনী। বিষয়টা পরিস্কার করা প্রয়োজন। রানওয়ে সিনেমা ভালো কী মন্দ তা নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার জন্য আমার এ লেখা নয়। আমার আলোচনার বিষয় হলো, তারেক মাসুদের মতো একজন পরিচালককে (তারেক মাসুদের মতো পরিচালক বলছি এ কারণে যে তিনি পরিচালক হিসেবে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার মাটির ময়না সিনেমাটি বিশ্বের ধ্রুপদী ১০০ সিনেমার তালিকায় স্থান পেয়েছে) কেনো সিনেমা নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টিকেট বিক্রি করতে হয়। কেন ঘুরে ঘুরে আমন্ত্রণ জানাতে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে বিভাগে গিয়ে। (রানওয়ের পোস্টার)

এক.             

তারেক মাসুদ পরিচালিত রানওয়ে সিনেমা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখি হয়। এ সব লেখালেখি যতটা না রানওয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি সিনেমাটির প্রদর্শনীর ভিন্নতা নিয়ে সেসব লেখা পড়ে আমি এ বিষয়ে লিখতে আগ্রহী হই। ভিন্ন ধরনের এ প্রদর্শনী নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে আমার মনে।

 প্রথমত, সিনেমা হলে ছবিটি মুক্তি না দিয়ে তারেক মাসুদ কেন নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী করছেন। এটা কি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য খারাপ দিক নয়? এতে হল মালিকরাতো ব্যবসা করতে পারছেন না।

 দ্বিতীয়ত, সিনেমা হলে মুক্তি না দেওয়ায় একেবারে সাধারণ যে দর্শক তারা সিনেমাটা দেখতে পারছেন না। কারণ যেসব স্থানে, বিশেষ করে যেসব অডিটরিয়ামে সিনেমাটি দেখানো হচ্ছে, সেসব স্থানে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের প্রবেশাধিকার থাকলেও নিচবিত্তরা 'সাহস‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍'ই পান না। আর একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো সাধারণ দর্শক কিন্তু এখনও হলেই সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত। তারা হলের বাইরে কেবল টেলিভিশন কিংবা আগের দিনের ভিসিআর, এখনকার দিনের সিডি কিংবা ডিভিডিতে সিনেমা দেখতে আগ্রহী থাকে। হঠাৎ করে কোনো অডিটরিয়ামে তাদের জন্য সিনেমা দেখাও অস্বস্তিকর|

তৃতীয়ত, বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখার অবকাশ আছে। একজন পরিচালক তার নির্মিত সিনেমা নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বলছেন ‘আপনারা আসুন সিনেমাটি দেখুন। অনেকে মনে করতে পারেন, এটাতো বিজ্ঞাপনের ভালো পদ্ধতি। মানুষকে আগে এভাবে সিনেমা দেখিয়ে পরে আনুষ্ঠানিকভাবে হলে মুক্তি দিলে ভালো ব্যবসা হবে।

চতুর্থত, কোনো একটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ঠিক কতটা খারাপ অবস্থা হলে তারেক মাসুদের মতো একজন পরিচালককে সিনেমা নিয়ে মানুষের কাছে গিয়ে টিকিট বিক্রি করতে হয়। বিষয়টি ভাবার সময় এসেছে বলে আমার মনে হয়।

পঞ্চমত, এর আগেও তারেক মাসুদ মুক্তির গানমুক্তির কথা সিনেমা দুটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষকে দেখিয়েছেন।অনেকে বলতে পারেন, তিনি তো এর আগেও এমনটি করেছেন। কথা ঠিক, কিন্তু আমার মনে হয় সেই প্রেক্ষাপট আর আজকের দিনে রানওয়ে প্রেক্ষাপট এক নয়। মুক্তির গানমুক্তির কথা ছিল একটু অন্য রকম সিনেমা (অন্য রকম বলছি এ কারণে যে, আমাদের দর্শকরা ঠিক সিনেমা হলে গিয়ে গাঁটের টাকা খরচ করে যে ধরনের সিনেমা দেখেন এ দুটি সিনেমা ঠিক তার আশপাশেও যায় না। ওই দুটি সিনেমা ঐতিহাসিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।) তাই এ দুটি সিনেমা একটু বেশি মানুষকে দেখানোর জন্য একজন পরিচালক এ ধরনের উদ্যোগ নিতেই পারেন। কিন্তু তার সঙ্গে রানওয়ে সিনেমার প্রদর্শনীর তুলনা করলে চলবে না।

ষষ্ঠত, সাধারণভাবে কোন ছবি সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ছবি মুক্তি দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকা এবং বিভাগীয় শহরগুলোর প্রেক্ষাগৃহকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পরে পর্যায়ক্রমে তা মুক্তি দেয়া হয় সারা দেশের অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহে। কিন্তু রানওয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রথমে কোনো প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি দেওয়া হয় নি। পরিচালক নিজ উদ্যোগে ছবিটি দেখানোর ব্যবস্থা করেন। একই সাথে চলতে থাকে বাংলা সিনেমা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে মতবিনিময়। এর কিছুদিন পর রানওয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হয়, সেটাও ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি প্রেক্ষাগৃহে।

প্রিমিয়ারের পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ভিন্ন যাত্রা শুরু হয় রানওয়ের। পরে একে একে ছবিটি প্রদর্শিত হয় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা সদর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর, নড়াইল, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে। এরই এক পর্যায়ে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের বেতিলের স্বপ্নপুরীপ্রেক্ষাগৃহে।

দুই.

গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিনেমায় বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আর পুঁজি বিনিয়োগের বিপরীতেই থাকে মুনাফার অর্জন। বর্তমান সময়ে তাই ছবিকে ব্যবসা সফল করার জন্য এর সাথে সংশ্লিষ্টরা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন। বেশি দূরে নয় ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের দিকে তাকালে এ সম্বন্ধে আমরা একটা পরিস্কার ধারণা পেতে পারি। সিনেমা তৈরিতে ভারতের অবস্থান যেমন শীর্ষে, দর্শক সংখ্যাও তেমন সবার চেয়ে বেশি। কিন্তু তারপরও একটি নতুন সিনেমাকে ব্যবসা সফল করতে সংশ্লিষ্টরা নানা প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন।

সামপ্রতিক এক হিসেবে দেখা গেছে, ভারতে অনেক সিনেমার প্রচার ব্যয়, সিনেমাটির নির্মাণ ব্যয়ের চেয়েও বেশি। বিজনেস ওয়ার্ল্ডকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার বলিউড অভিনেতা ও প্রযোজক অজয় দেবগন বলেন, এখন একটি সিনেমার প্রচার ব্যয় বাবদ ছয় থেকে ১৫ কোটি রুপির মতো খরচ হচ্ছে। আর চার কোটি রুপিতে নির্মিত সিনেমার প্রচার ব্যয় ছাড়িয়ে যাচ্ছে ছয় কোটি রুপিকে।

আমাদের দেশের প্রযোজক পরিচালকদের এতো অর্থ নেই, তাই কি রানওয়ের এই ভিন্ন চিন্তা? সিনেমাটি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় তারেক মাসুদ কোনো স্থানেই দুই-তিন দিনের বেশি প্রদর্শনী করেন নি। তার বক্তব্য হলো, যতই চাহিদা থাকুক আমরা তিন দিনের বেশি কোথাও প্রদর্শন করছি না। এর মাধ্যমে আমরা একটা ওয়ার্ম আপ করছি। আমরা চাই রানওয়ে ছবিটি পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক পরিবেশকরা ওই জেলাতেই মুক্তি দেবে তারেক মাসুদের কথায় কিন্তু ব্যবসার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু রানওয়ে নিয়ে ওয়ার্ম আপ করে তিনি সেই চাহিদা কাদের মধ্যে তৈরি করতে চাচ্ছেন? আমাদের দেশে সিনেমার বিশাল দর্শক শ্রেণী হলো তারাই, যারা রিকশায় করে অন্যকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে আসে, রিকশায় যাত্রী হয়ে নয়। তার প্রমাণ আছে ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডামের নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী লোটে হুকের গবেষণায়।৯ আর তাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম সিনেমা হল। যদিও এখন তারা কিছু বিনোদন টেলিভিশন থেকেও পাচ্ছেন। কিন্তু তারপরও তারা সিনেমা দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহকেই যথাস্থান মনে করেন। তারা প্রেক্ষাগৃহে ছবি প্রত্যাশা করে। এখন কথা হলো, যে শ্রেণী অডিটরিয়ামে গিয়ে রানওয়ে দেখছেন তাদের সঙ্গে ওই সাধারণ মানুষের সম্পর্ক নেই বললেই চলে।ফলে ওই শ্রেণী কীভাবে বিশাল এই দর্শক শ্রেণীকে কোনো সিনেমা সম্পর্কে উসকে দেবে। নাকি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীকে টার্গেট করেই সিনেমাটি বানিয়েছেন তারেক মাসুদ? এ ধরনের নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সিনেমাটিকে ঘিরে।

বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প গত এক দশক ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তা চরমে। ব্যাপারটা অনেকটা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো। অনেকদিন পর দু-একটি সিনেমা ছাড়া দর্শক হলমুখো হচ্ছেন না। আবার সিনেমার প্রতি যে সব আকর্ষণ মানুষকে দলে দলে হলমুখো করে বাংলাদেশের সিনেমায় অন্তত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণী সে আকর্ষণ থেকে বহু কাল ধরে বঞ্চিত। যার প্রভাব এখন সিনেমা শিল্পে স্পষ্ট।

বছর তিনেক আগেও দেশে যেখানে বছরে ৯০ থেকে ১০০টি সিনেমা মুক্তি পেতো তা এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১০ সালে সব মিলিয়ে ছবি মুক্তি পেয়েছে ৫২টি। শুধুমাত্র ছবি মুক্তি বা তৈরি কমে গেছে তা নয় কমেছে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যাও। দেশে এক হাজারটি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে ৭০০টিরও কম।১০ দিনে দিনে সিনেমা হল শুধু বন্ধই হচ্ছে। এ অবস্থায় সিনেমা শিল্প টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কেননা সিনেমার সাথে অর্থনৈতিক দিকটি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সিনেমা তৈরির খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। বাড়তি খরচ উঠাতে অনেক পরিচালক বেছে নিচ্ছেন কোন না কোন প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর। আর যারা পাচ্ছেন না তারা শুধু প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তি দিয়ে টাকা তুলে আনতে পারছে না। আর লাভের মুখ দেখাতো অসম্ভব।

এ ধরনের একটি সংকটে তারেক মাসুদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন প্রদর্শনীর। কিন্তু তা বাংলা সিনেমার জন্য কতটা মঙ্গল বয়ে আনবে তা দেখার বিষয়।

চার.

বাংলাদেশে সিনেমার ইতিহাস অর্ধশত বছর (স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর মিলে) পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু ভালো সিনেমা। অনেকগুলো জয়ও করেছে নানা আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এ ছবিগুলোর বেশির ভাগই সাধারণ দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে দেখতে পায়নি। পরিচালক তারেক মাসুদের মাটির ময়না সিনেমার কথাই ধরা যাক। সিনেমাটি ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক মুভির তালিকায় স্থান পেয়েছে। অথচ মাটির ময়না দেশের বেশির ভাগ প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি দেয়া হয়নি। একইভাবে গোলাম রব্বানী বিপ্লবের স্বপ্ন ডানায় সিনেমাটির কথা বলা যায়র। মাটির ময়না মুক্তির পর সরকার কর্তৃক প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা, পরবর্তীতে অস্কারে মনোনয়ন সহ নানা কারণে তা দেখা থেকে সাধারণ দর্শক বঞ্চিত হয়েছে। একই ভাবে নানা কারণে পুরস্কার প্রাপ্ত মোরশেদুল ইসলামের চাকা, তারেক মাসুদের অন্তর্যাত্রা, আবু সাইয়ীদের নিরন্তর অনেকেই দেখতে পায়নি। ছবিগুলো নানাভাবে বাক্স-বন্দি হয়ে পড়েছে। সামপ্রতিক সময়ে ভালো ছবিকে বাক্স-বন্দি করার একটা প্রবণতা বাংলাদেশে লক্ষ্য করার মতো।

তারেক মাসুদ কি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছেন? তারেক মাসুদ বলছেন,রানওয়ে করার সময় সিদ্ধান্ত নিই, এই ছবিটির পরিণতি আমরা মাটির ময়না‌‌' মতো হতে দেব না। কারণ আমরা দেখেছি সৃজনশীল ছবিগুলো বিচিত্রভাবে বাক্সবন্দি হয়ে যায়।১১ কিন্তু তারেক মাসুদের কথা আর কাজের মধ্যে আমরা কোনো সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছি না। রানওয়ের অনানুষ্ঠানিক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে জানুয়ারি ২০১১ তে। আর আনুষ্ঠানিকভাবে ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি দেয়া হয়েছে মাত্র একটি প্রেক্ষাগৃহে। এরপর গত কয়েক মাসে আর কোনো প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয়নি। ১২ মে ২০১১ তারেক মাসুদ সংবাদপত্রে এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, আগস্টে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ব নতুন ছবি ও নতুন করে সিনেমা হলে রানওয়ে‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌' মুক্তি নিয়ে।১২ তার মানে একটিমাত্র হলে সিনেমাটি মুক্তি দিয়ে পরবর্তী ছয় মাস আর কোনো কথা নেই। কিন্তু উনি বলছেন, রানওয়ের ভিন্ন প্রদর্শনী করে তিনি মানুষকে ওয়ার্ম আপ করছেন, এরপর বাণিজ্যিক পরিবেশকরা ওই জেলাতে ছবিটি মুক্তি দেবে।১৩ ফলে ওয়ার্ম আপের কারণে মানুষ ছবিটি দেখতে উৎসাহিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিনেমা দেখিয়ে দর্শককে ওয়ার্ম আপ করছেন জানুয়ারিতে আর খেলতে নামছেন আগস্টে। এটা গন্ডারকে কাতুকুতু দেওয়ার মতো হলো না?

পাঁচ.

আরেকটি বিষয় বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তারেক মাসুদ রানওয়ে নিয়ে বলছেন এভাবে, যেসব জরুরি বিষয় নিয়ে ছবি বানিয়েছি তা এখনই তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে দেখানোর তাগিদটাও আছে।১৪ আমিও মনে করি শুধু তরুণ না, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জঙ্গি ডিসকোর্স নিয়ে নির্মিত এ সিনেমাটি সবাইকে দেখানো দরকার। কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর জেলায় দেখিয়েই এ দায়িত্ব শেষ। নাকি তারেক মাসুদ এবার নিজেই রানওয়েকে বাক্স বন্দি করার চিন্তা করছেন?

ছয়.

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে সামপ্রতিক সময়ে মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে টেলিভিশনে ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। এক্ষেত্রে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ছবি প্রযোজনা করছে। এরা দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে বলে দাবি করছে। তারা ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার  করে  নামে মাত্র দু-একটি প্রেক্ষাগৃহে ছবিগুলো মুক্তি দিচ্ছেন। কারণ বিজ্ঞাপনের বদৌলতে পুঁজি ফেরতের চিন্তা তাদের মাথায় নেই। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রানওয়ের পরিচালক যে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করে এভাবে ছবিটিকে কোরবানি দেননি, এজন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার।

সাত.

রানওয়ে সিনেমার ভিন্ন ধরনের প্রদর্শনীর ফলে বিশেষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সিনেমা হল। এমনিতেই প্রেক্ষাগৃহগুলো দর্শক সংকটে ভুগছে। আর এ অবস্থায় প্রেক্ষাগৃহের বাইরে প্রদর্শনী, স্বাভাবিকভাবেই দর্শক সংকট বাড়িয়ে তুলবে। যারা রানওয়ে ছবিটি হলের বাইরের প্রদর্শনীতে দেখেছেন, তারা হলে গিয়ে আবার ছবিটি দেখবে এটা আশা করা নিছক বোকামি ছাড়া কিছু নয়। অথচ তারেক মাসুদ বলছেন, সিনেমা হল না বাঁচলে সিনেমাও বাঁচবে না। সিনেমাকে বাঁচানোর জন্যই কিন্তু আমি হলের বাইরে ছবি দেখাচ্ছি।

এটা ঠিক ভিন্ন প্রদর্শনীর চিন্তাটি একটি আন্দোলন হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টি বোঝা গেল না, বল আসলে কার কোটে কিন্তু যে যাই বলুন এ কথা ঠিক যে, সিনেমা হলকে বাঁচানোর জন্য হলে ছবি মুক্তি দেয়ার বিকল্প নেই। তিনি কি সিনেমা হলকে বাঁচানোর জন্য রানওয়ে হলে মুক্তি দিয়ে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার, অপেক্ষা, গেরিলা, মনের মানুষ এর মতো প্রচার চালাতে পারতেন না?

আট.

দেশের সিনেমা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে আপামর সাধারণ দর্শক। গণদর্শক ছাড়া কোন সিনেমা সফল ব্যবসা করতে পারে না। রানওয়ে সিনেমা হলের বাইরে প্রদর্শিত হওয়ায় এই গণদর্শক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রাজশাহীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ অডিটরিয়ামে তিন দিন রানওয়ের প্রদর্শনী হয়। নিজের আগ্রহ থেকে দুটি স্থানেই আমি সিনেমাটি দেখতে গিয়েছিলাম। সবগুলো প্রদর্শনীতে আমি পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকার চেষ্টাও করি। এসব প্রদর্শনীতে দর্শক সাড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনীতে রীতিমতো সারিতে দাঁড়াতে হয়েছে ছবিটি দেখার জন্য। একটি বিষয় এখানে লক্ষ্যণীয়, দুটি স্থানেই প্রায় সব দর্শক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট ও মেডিকেলের শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী ছাড়া যে সব দর্শক ছিল তাদের বড় অংশই ছিল উচ্চবিত্ত শ্রেণী। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাইরে আমার তেমন কাউকে চোখে পড়েনি। তাহলে রানওয়ের উল্টোপথে যাত্রা কাদের কে নিয়ে?

নয়.

রানওয়ের পরিচালক তারেক মাসুদ তার উল্টোপথে যাত্রা শুরু করার পেছনে কিছু যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি বলছেন, ঢাকার বাইরের লোকদের বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা হল।১৫ অথচ সামপ্রতিক ঢাকার বাইরে সিনেমা মুক্তি না দেওয়ার কারণ বলা হচ্ছে দর্শকরা সিনেমা বুঝে না। সেই ধারণা ভাঙতে রানওয়ের উল্টোপথে যাত্রা।

তারেক মাসুদ আরও বলছেন, অনেক দূরের জেলা থেকে যেমন ঢাকাতে মানুষ আসে ভালো ছবি দেখতে তেমনি ঢাকায় মানুষ একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য হলেও ঢাকার বাইরে গিয়ে ছবিটি দেখে আসবে।১৬ এক সময় ছিল যখন ঢাকায় মানুষ খুব আগ্রহ সহকারে সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেত। ঢাকার বাইরের মানুষ একসময় ঢাকাতে যেত সিনেমা দেখতে। এখন সেই দিন শেষ। টেলিভিশন, ডিভিডির বদৌলতে এখন ঢাকার মানুষ ঢাকাতেই সিনেমা হলে যায় না। আর ছুটির দিনের কথা বলছেন, সেদিন তাদের সময় কোথায়, যে ঢাকার বাইরে গিয়ে একটু সিনেমা দেখে আসবে। তারা সাপ্তাহিক ছুটির এই দিনগুলোতে আরও বেশি ব্যস্ত বাজার, পরিবার, সন্তান নিয়ে। তাই অসহনীয় এই নগরীতে তাদের জন্য বাইরে বের হওয়ায় এখন দায়। তাহলে কেন পরিচালকের এই উল্টোপথে যাত্রা করা?

লেখক: ইমরান হোসেন মিলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী

তথ্যসূত্র

১. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৬: ৪৪৪); চলচ্চিত্রের অভিধান; বাণীশিল্প, কলকাতা।

২. ম্যাজিক লণ্ঠনর চলতি সংখ্যার সাক্ষাতকার বিভাগে বিকল্প ধারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মোরশেদুল ইসলামের সাক্ষাতকার ছাপানো হয়েছে। সেখানে এ ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

৩. ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১, রাজশাহীতে রানওয়ের প্রদর্শনী শুরু হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ছবিটি দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে আসেন তারেক মাসুদ। এসময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য দেয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি নিজেকে সিনেমার ফেরিওয়ালা হিসেবে দাবি করেন।

৪. উল্টো পথে যাত্রা শুরু করেছি; প্রথম আলো; ১২ জানুয়ারি ২০১১।

৫. ক্ল্যাসিক ছবির মর্যাদা পেল মাটির ময়না; প্রথম আলো; ৯ মার্চ ২০১১।

৬. আপনি কি জানেন? প্রথম আলো; ৮ এপ্রিল ২০১১।

৭. এক ছবির প্রচার ব্যয় পনের কোটি রুপি; কালের কন্ঠ; ২৬ ডিসেম্বরi ২০১০।

৮. আমরা ওয়ার্ম আপ করছি; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

৯. ছয়টা গান+দশটা মারপিট+একটা প্রেম= বাংলা ছবি? প্রথম আলো; ২৭ আগস্ট ২০০৯। (লোটে হুক তার গবেষণায় বলেন, এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, যারা বলে যে মধ্যবিত্ত হলে যায় না, তারা আসলে কে? আমার ধারণা, তারা হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপরের দিককার মানুষ। তারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। শুধু তারা হলে যাচ্ছে না বলেই সারা বাংলাদেশের মানুষ হলে যাচ্ছে না এটা কি ঠিক? নিম্ন মধ্যবিত্ত আর খেটে খাওয়া পরিশ্রমী মানুষ, এরা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশ।)

১০. চলচ্চিত্রে ধস; প্রথম আলো; ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১।

১১. প্রাগুক্ত; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

১২. গোলটেবিল বা সমাবেশ করে কিছু হয় না; কালের কন্ঠ; ১২ মে ২০১১।

১৩. প্রাগুক্ত; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

১৪. প্রাগুক্ত; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

১৫. প্রাগুক্ত; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

১৬. প্রাগুক্ত; কালের কন্ঠ; ৬ জানুয়ারি ২০১১।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন