Magic Lanthon

               

কাজী মামুন হায়দার

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের মিছিল : নতুন  প্রদর্শনী, ভিন্ন চিন্তা

কাজী মামুন হায়দার


সংবাদটা শঙ্কিত হওয়ার মতো। যে দেশে একসময় হাজারের উপর প্রেক্ষাগৃহ ছিল, যেখানে প্রতি ঈদে এক ডজনের কমে সিনেমা মুক্তি পেত না; প্রতিটি সিনেমার প্রিন্ট করতে হতো কমপক্ষে অর্ধশত। সেই দেশে ঈদে মুক্তি পাওয়া মাত্র নয়টি সিনেমার জন্য ৬৪ জেলার মধ্যে ২২ জেলায় প্রেক্ষাগৃহ পাচ্ছেন না প্রযোজক পরিবেশকরা। তাই নয়টি সিনেমা মুক্তি দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিচ্ছেন মাত্র চারটি। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করলে ভাল বোঝা যাবে,নতুন যেকোনো সিনেমা মুক্তি দেওয়ার জন্য আগে প্রতিটি জেলা শহরে দু’টি করে সিনেমা হল ছিল। উপজেলা পর্যায়ে ছিল একটি। অথচ এখন দেশের ২২টি জেলা শহরে নতুন চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য কোনো প্রেক্ষাগৃহই নেই।

২০০৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে প্রেক্ষাগৃহ ছিল এক হাজার ২০০টি। বিভিন্ন কারণে অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহ দর্শকশূন্য হওয়ায় অনেক মালিক তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। গত কয়েক বছরে সারা দেশে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহ। প্রদর্শক সমিতির হিসাব অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বন্ধ প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা প্রায় ৫৫২টি। খোদ ঢাকা শহরের ৪৪টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি। যতদূর জানা যায়, গত অর্ধ দশকে দেশে নতুন করে একটি প্রেক্ষাগৃহও নির্মিত হয় নি। এ ধরনের একটা পরিস্থিতিতে, একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় সেটা হলো- একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হচ্ছে একথা ঠিক, কিন্তু সার্বিক পর্যালোচনায় চলচ্চিত্রের দর্শক কিন্তু একটুও কমে নি বরং বেড়েছে। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর চলচ্চিত্র প্রদর্শনে আগ্রহ, শুধু সিনেমা দেখানোর জন্য প্রত্যেক কেবল অপারেটরদের একটি করে ‘লোকাল চ্যানেল’ চালানো, ভিডিও দোকানের রমরমা ব্যবসা, তরুণদের মধ্যে ইন্টারনেট থেকে সিনেমা ডাউনলোড করার হিড়িক, বড় বড় শপিংমলে ভিডিও-সিডির দোকানের ভিড় দেখে না বোঝার কোনো কারণ নেই যে চলচ্চিত্রের দর্শক বেড়েছে। তাহলে কথা হলো, প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ হচ্ছে কেন? বাংলাদেশের সিনেমারই বা এ অবস্থা কেন?

এ ধরনের কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ছোট একটা গবেষণা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই গবেষণার উপজাত হিসেবে এ লেখাটির জন্ম। গবেষণাটি করার জন্য রাজশাহী জেলার সবগুলো উপজেলার প্রেক্ষাগৃহগুলোকে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ১৯৯৮ সালে পড়াশুনার সুবাদে যখন রাজশাহী শহরে আসি, তখন কেবল শহরেই প্রেক্ষাগৃহ ছিল চারটি। সিনেমার প্রতি কিছুটা আকর্ষণ থাকায় সবগুলো প্রেক্ষাগৃহেরই আমি দীর্ঘদিন নিয়মিত দর্শক ছিলাম। কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শহরের জমজমাট তিনটি প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে ফেলা হয়। এরকম একটা পরিস্থিতিতে আমি জেলার অন্য প্রেক্ষাগৃহগুলোর খোঁজ নিতে থাকি। সংবাদ পাই বেশিরভাগ প্রেক্ষাগৃহই বন্ধ হয়ে গেছে। আর যে কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ চালু আছে সেগুলোও মাঝে মাঝে বন্ধ থাকছে।

চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি একটা অন্যরকম আগ্রহ থেকে ইচ্ছে হলো, পুরো জেলার এসব প্রেক্ষাগৃহ মালিক, কর্মচারী, আশপাশের দোকানদার, কিছু দর্শকের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিন্তা, আশঙ্কা, অভিযোগ, প্রত্যাশাগুলো জানার। এই ইচ্ছা থেকে ২০১১ সালের অক্টোবরে আমি রাজশাহী জেলার প্রায় ২৫টি প্রেক্ষাগৃহ সরেজমিন ঘুরি। এ সময় কথা বলি ছয়জন প্রেক্ষাগৃহ মালিক, আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ১৫জন দর্শকের সঙ্গে। এই লেখাটি তৈরিতে এসব তথ্যের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

ছোট একটি পরিসংখ্যান, বড় ধরনের শঙ্কা

ছোট এ পরিসংখ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, আপাত এটি একটি জেলার প্রেক্ষাগৃহের চিত্র হলেও প্রতিনিধিত্ব করছে পুরো বাংলাদেশের। কারণ প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের যে মিছিল শুরু হয়েছে তা খুব ভালোভাবেই রাজশাহীতে আলোড়ন তুলেছে। ১৯৯১ সালের সরকারি একটি হিসাব অনুযায়ী রাজশাহী জেলায় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিল ৫৫টি। ২০১১ সালে সরেজমিন ঘুরে জেলায় প্রেক্ষাগৃহের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ২৫টি। এর মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে আটটি, বন্ধ হয়ে গেছে সাতটি, মাঝে মাঝে চলে আবার বন্ধ থাকে ১০টি। ১৯৮৮ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা প্রণয়ন ওয়ার্কিং গ্রুপ-এর তথ্যানুযায়ী আসন সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহটি ছিল রাজশাহীর বর্ণালী। এই প্রেক্ষাগৃহটির আসন সংখ্যা ছিল ১৩৭৩টি।

এতদিন পরে এসে এই তথ্যগুলি উপস্থাপন করছি দু’টি সময়ের তুলনা করার জন্য। ১৯৯১ সালের ৫৫টি প্রেক্ষাগৃহ এখন নেমে এসেছে ২৫টিতে। ২০০২ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত এই ২৫টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে আটটি। এর মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহটিও রয়েছে। ছোট এই পরিসংখ্যানটা দেখলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা যে কেউ পেতে পারেন। এখন উপজেলা ধরে একটি পরিসংখ্যান দেখা যাক।

রাজশাহী সদর: মোট প্রেক্ষাগৃহ ছিল ছয়টি। স্মৃতি, বর্ণালী, উৎসব ও লিলি নামের চারটি প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে ফেলা হয়েছে। উপহার ও রাজতিলক চালু আছে।

পবা: প্রেক্ষাগৃহ মোট দু’টি। মৌসুমী বন্ধ, বাবুল চালু রয়েছে।

চারঘাট: লিলি প্রেক্ষাগৃহটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

বাঘা: মনিকা ও লাকী নামের দু’টি প্রেক্ষাগৃহ চলছে ধুকধুক করে।

পুঠিয়া: দু’টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে রুবি চলছে, মুক্তা বন্ধ হয়ে গেছে।

দূর্গাপুর: ঝংকার ভেঙে ফেলা হয়েছে, নার্গিস মাঝে মাঝে চালু থাকে।

বাগমারা: শাপলা, ক্ষণিকা, আঙ্গুরা ও আশা এ চারটি প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ, আর অন্তরা চলে মাঝে মাঝে।

মোহনপুর: দিনান্ত নামের প্রেক্ষাগৃহটি চালু রয়েছে।

তানোর: রনি প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে গেছে, এখনো চালু আছে আনন্দ

গোদাগাড়ী: শ্যামলী প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর রতনা ভাঙ্গার কাজ চলছে।

সোনালি অতীত, একটি সংক্ষিপ্ত অভিযান  বিবর্ণ বর্তমান

সকাল আটটায় বিভাগের সিনেমাপাগল দুই শিক্ষার্থীকে নিয়ে যখন কাজলা থেকে মোটরবাইকে যাত্রা শুরু করি তখন রোদটা মিষ্টিই ছিল। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে সেই রোদই যে এত তীব্র হবে বুঝতে পারি নি। দেড় ঘণ্টা মোটরবাইক চালিয়ে সাড়ে নয়টায় যখন গোদাগাড়ীর বুজরুক রাজরামপুরের রতনা সিনেমায় পৌঁছলাম তখন বরেন্দ্র অঞ্চলের টানে সূর্য অগ্নিমূর্তি। একে গরম তার ওপর ওই প্রেক্ষাগৃহের ভগ্নদশা দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ২০১০ সালের শুরুর দিকে বন্ধ হওয়া এই প্রেক্ষাগৃহটি এখন ভাঙার কাজ চলছে। পাশের এক দোকানদার জানালেন, বন্ধ হওয়ার পর ২০১১ সালের প্রথম দিকে ভাঙার কাজ শুরু হয়। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহের দুই মালিকের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে মামলা হওয়ায় এখন ভাঙার কাজ বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও জানালেন, এই এলাকায় এটি প্রথম প্রেক্ষাগৃহ। একসময় খুব চলত। মানুষ সবসময় গমগম করত। কীভাবে ধীরে ধীরে যেন বন্ধ হয়ে গেল।

আশপাশের আরও দুই-একজনের সঙ্গে কথা হলো, তারা প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ায় বেশ খানিকটা আফসোস করল। ভাঙা প্রেক্ষাগৃহের ছবি তুলে ও আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা চললাম এই উপজেলার আরেক প্রেক্ষাগৃহ কাকনহাটের স্মৃতি সিনেমার দিকে। কাকনহাটে গিয়ে স্মৃতি সিনেমা খুঁজে পেতে আমাদের খানিকটা বেগ পেতে হলো। মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করলে তারা সবাই বলছিল, ‘সামনে ওই দোকানের পাশে যান।’ আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে প্রেক্ষাগৃহটি আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। প্রেক্ষাগৃহতো অপেক্ষাকৃত বড় স্থাপনা, তাই চোখে পড়ার কথা। কিন্তু আমরাতো আর জানি না প্রেক্ষাগৃহটি বহু আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহের জায়গায় এখন বেশ জঙ্গল, বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় কোনো প্রেক্ষাগৃহ ছিল। আশপাশের দোকানদাররা খুব বেশি তথ্য দিতে পারল না। প্রেক্ষাগৃহটি ২০০৭ সালের দিকে বন্ধ হয়, ভেঙে ফেলা হয় ২০০৮ সালে। মালিকের খোঁজ করে জানা গেল তাকে পাওয়া সম্ভব নয়।

বিষণ্ন মন নিয়ে কাকনহাট থেকে এবার যাত্রা শুরু তানোর উপজেলার দিকে। একদিকে রোদ অন্যদিকে ভটভটির উৎপাত আর প্রচণ্ড ধুলো, তিনজনের জীবন ওষ্ঠাগত। তানোরের আনন্দ সিনেমায় যখন আমরা পৌঁছলাম তখন প্রেক্ষাগৃহে ১২টার শো’র টিকেট বিক্রি চলছে। টানা দু’টি প্রেক্ষাগৃহের এমন অবস্থার পর এটি চালু দেখে কিছুটা ভাল লাগল। কথা হলো প্রেক্ষাগৃহের গেটম্যান ও টিকেট বিক্রেতার সঙ্গে। তারা জানালেন, প্রেক্ষাগৃহটির মালিক ছিলেন রাজশাহী শহরের এক ব্যক্তি, পরে তার কাছ থেকে ২০১০ সালে ঢাকার একজন এটি কিনে নেয়। এখন তিনিই চালাচ্ছেন। তবে কতদিন এভাবে চালাতে পারবেন এ নিয়ে তারা শঙ্কিত।

প্রেক্ষাগৃহটিতে চলছে আসিফ ইকবাল পরিচালিত তোমার বুকের মধ্যিখানে সিনেমাটি। ১২টার শোতে দর্শক সব মিলিয়ে গোটা বিশেক। ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা লোকটি জানাল, তারা এবার সিনেমা আনার পর নতুন এক ব্যবস্থা চালু করেছেন। সিনেমা দেখুন, টিভি জিতুন। তার মানে সিনেমা দেখে টিকেটের নম্বরটা দিয়ে সপ্তাহান্তে লটারি অনুষ্ঠিত হবে। সেই লটারির প্রথম পুরস্কার থাকবে একটি টেলিভিশন। এমন অভিনব ব্যবস্থার পরও তারা আশানুরূপ দর্শক পাচ্ছেন না বলে জানালেন।

আনন্দ সিনেমা থেকে এক মাইল দূরত্বের মধ্যে তানোরের আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ রনি সিনেমার অবস্থান। প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়ে গেছে বছর সাতেক আগে। সবুজ মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ইট-পাথরের কাঠামোটি ছাড়া প্রেক্ষাগৃহটির এখন আর কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। এখানে যে একসময় হাজারো মানুষের সমাগম ছিল সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। এক পথচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মূল মালিক অনেক আগেই সিনেমা হলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। স্থানীয় একজন এটি কিনে নেন। তবে কাঠামোর গায়ে এখন লেখা রয়েছে ‘এই জমি বিক্রয় হবে, যোগাযোগ করুন। ফোন...’

দীর্ঘক্ষণ রোদে থেকে ততক্ষণে আমাদের অনেকখানি অভ্যাস হয়ে গেছে। রোদের তীব্রতা আর তেমন কাবু করতে পারছে না। আমাদের বাইক এখন ছুটছে মোহনপুরের কেশরহাট পৌরসভার দিকে। দীর্ঘ এ পথ চলার সময় একটি বিষয় খুব গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করলাম; সেটি হলো রাস্তার দুই পাশে থাকা ছোট-বড় প্রায় সবগুলো চায়ের দোকানেই টিভি চলছে। আগ্রহ নিয়ে দু-একটি দোকানে বাইক থামিয়ে দেখলাম এসব টিভিতে কোথাও ডিভিডি কিংবা ডিশ-লাইনে দেখানো হচ্ছে চলচ্চিত্র। দর্শক বেশ আগ্রহ নিয়ে তা দেখছেও।

যাহোক, আমাদের সংক্ষিপ্ত অভিযানে আবারও ফিরে আসি। কেশরহাটের দিনান্ত সিনেমায় আমরা যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর দু’টা। সেখানে শাহীন সুমনের তুমি আমার প্রেম চলচ্চিত্রটি চলছে। পাশেই বরফ কলে প্রেক্ষাগৃহটির মালিক আবু হেনা মর্তুজা কামালের সঙ্গে কথা হয়। মালিক বাংলাদেশের সিনেমার বেশ খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হলো। অথচ তিনি প্রেক্ষাগৃহটি কিনেছেন মাত্র সাত মাস হলো। তিনি জানালেন, দুই হাত ঘুরে বর্তমানে তিনি প্রেক্ষাগৃহটির মালিক। এর আগে প্রথম মালিক ছিলেন রাজশাহীর একজন। সেই মালিক যশোরের বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ মনিহার সিনেমা হলের মালিক সিরাজুল ইসলামের কাছে এটি বিক্রি করেন। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে প্রেক্ষাগৃহটি চালান। লোকসান হওয়ায় এখানে তার প্রায় লাখ পাঁচেক টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন বাকি পড়ে। এরপর তিনি কয়েক মাস আগে ২৫ লাখ টাকায় প্রেক্ষাগৃহটি বিক্রি করে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। বর্তমান মালিক আরও জানালেন, তিনি আসলে প্রেক্ষাগৃহটি চালু রাখার জন্য এটি কেনেন নি। তার যে বরফ কলটি আছে সেটি মানুষের জায়গায়। তিনি কোরবানির ঈদের পর প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ করে দিয়ে সেখানে বরফ কল করবেন।

এরপর কথা হয় প্রেক্ষাগৃহটির ব্যবস্থাপকের সঙ্গে। তিনি জানান, ১২টার শোতে হলে দর্শক ছিল ১৫ জন। আমরা থাকতে থাকতে তিনটার শোর সময় হলো, লোক না থাকায় এই শো চালাবেন না বলে তিনি জানালেন। ব্যবস্থাপকের একটি হিসাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ হাজার টাকায় তারা তুমি আমার প্রেম সিনেমাটি এক সপ্তাহের জন্য ভাড়া করেছেন। তিন দিনে তাদের টাকা উঠেছে নয় হাজার। বাকি আছে তিন দিন। দর্শকের যে অবস্থা তাতে ওই তিন দিনে আসলের বাকি চার হাজার টাকা উঠবে বলে মনে হয় না। এর উপর কার্বন খরচ, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন, প্রচারতো আছেই। তাই নির্ঘাত এই সিনেমাটিতে তাদের হাজার পাঁচেক টাকা লোকসান হবে।

এবার যাত্রা বাগমারার মাদারীগঞ্জের আশা সিনেমা ও অন্তরা সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের দিকে। আশা বন্ধ হয়েছে ২০০২ সালে। প্রেক্ষাগৃহটিতে এখন বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যালয়। সাথে একটি সাইকেল মেকানিকের দোকানও আছে। আশা সিনেমা থেকে ১০০ গজ দূরে অন্তরা সিনেমা। একসময় ওই এলাকার সবচেয়ে চলতি প্রেক্ষাগৃহ ছিল এটি। কিন্তু এখন তার জীর্ণ দশা। আমরা গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তিনটার শো চলছে কি না। গেটম্যান বলল, লোক হয়েছিল গোটা পাঁচেক তাই শো চালান নি। সন্ধ্যার শোতে কিছু লোক হতে পারে, তবে নয়টার শো গত কয়েক দিন ধরে লোকের অভাবে বন্ধ থাকছে। আজও থাকবে।

প্রেক্ষাগৃহটিতে চলছে শাহাদাৎ হোসেন লিটনের প্রেমে পড়েছি সিনেমাটি। প্রেক্ষাগৃহ মালিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তারা নয় বন্ধু মিলে কয়েক মাস আগে মনিহার সিনেমা মালিকের কাছ থেকে এই প্রেক্ষাগৃহটি কিনেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি ভাড়া নিয়ে এখন প্রেক্ষাগৃহটি চালাচ্ছেন। তবে প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা করার জন্য তারা এটি কেনেন নি। কোরবানির ঈদের পর প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলা হবে। এরপর তারা এখানে মার্কেট করবেন।

মালিক অনেক আক্ষেপের সঙ্গে জানালেন, দেখুন সিনেমা হল চলবে কী করে! সন্ধ্যার পর রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে যত লোক টিভিতে সিনেমা দেখে, পুরো সপ্তাহজুড়ে অত লোক প্রেক্ষাগৃহে আসে না। সিনেমার এ সংকটের জন্য ডিশ-এন্টেনা দায়ী বলে তিনি দাবি করলেন। প্রেক্ষাগৃহটি ঘুরে দেখা গেল অবকাঠামো বেশ ভাল। বসার আসন, আশপাশ বেশ পরিচ্ছন্ন।

অন্তরা সিনেমা থেকে বেরোতেই বিকেলের সোনা রোদ আমাদের গায়ে এসে পড়ল। পরের গন্তব্য একই উপজেলার ভবানীগঞ্জের শাপলা সিনেমায়। প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ প্রায় পাঁচ বছর ধরে। পাশের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল প্রেক্ষাগৃহটির মালিক দু’জন। দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে চালানো ও পরে মালিকানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এটি বন্ধ হয়ে যায়। দৈত্যাকৃতি প্রেক্ষাগৃহটির সামনে এখন ইট-খোয়ার বিশাল স্তুপ। ভবানীগঞ্জ থেকে তাহেরপুরের ক্ষনিকা প্রেক্ষাগৃহের উদ্দেশে যাত্রা শুরু। তাহেরপুরে পৌঁছে প্রেক্ষাগৃহটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেককে জিজ্ঞাসা করার পর জানা গেল, প্রেক্ষাগৃহ ছিল ঠিকই কিন্তু এখন চিহ্নটুকুও নেই। তাই খোঁজায় ক্ষান্ত দিয়ে পা বাড়ালাম দূর্গাপুরের নার্গিস সিনেমা হলের দিকে।

নার্গিস প্রেক্ষাগৃহে যখন পৌঁছলাম তখন পুরো সন্ধ্যা। প্রেক্ষাগৃহের সামনের জায়গাটা এখনো বেশ জমজমাট। ভাবছিলাম দু’বছর বন্ধ থাকা (তবে ২০১১ সালের ডিসম্বরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রেক্ষাগৃহটি আবার নাকি চালু হয়েছে) এই প্রেক্ষাগৃহটির সামনে যদি এখনি এই অবস্থা থাকে, তাহলে যখন এটি চালু ছিল তখন কেমন রমরমা ছিল। সন্ধ্যার আধো আলো-ছায়ায় প্রেক্ষাগৃহটি দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল। দূর্গাপুর থেকে আমরা প্রথম দিনের অভিযানের ইতি টানলাম। অন্ধকারে আমরা যখন রাজশাহী ফিরছিলাম, তখন রাস্তার পাশে সেই চা-দোকানগুলোতে টেলিভিশনে সিনেমা দেখা মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।

দ্বিতীয় দিনে একটু দেরি করে নয়টায় যাত্রা শুরু করলাম। প্রথম লক্ষ্য চারঘাটের লিলি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের দিকে। প্রেক্ষাগৃহটির অবস্থান একেবারেই রাস্তার পাশে। পাশের এক দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওই দোকানদারই একসময় প্রেক্ষাগৃহটির সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি জানালেন, প্রায় ২০ বছর আগে প্রেক্ষাগৃহটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের সময় তিনি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি জানালেন, কী ভিড় ছিল এই প্রেক্ষাগৃহে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে সিনেমা দেখতে আসত। সারিতে দাঁড়িয়ে লোকজন টিকেট কাটত। রাস্তার পাশে হওয়ায় জ্যাম বেঁধে যেত। সেইসব দিন এখন কেবল স্মৃতি।

তিনি আরও জানালেন, মূল মালিক দুই বছর আগে প্রেক্ষাগৃহটি বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন স্থানীয় ১২ জন মিলে প্রেক্ষাগৃহটি কিনেছেন। তারা এখন আর প্রেক্ষাগৃহটি চালাতে পারছে না। প্রায়ই এটি বন্ধ থাকে। সর্বশেষ গত ঈদুল ফিতরে (২০১১ সাল) চলার পর থেকে প্রেক্ষাগৃহটি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। মালিকের ঠিকানা নিয়ে এরপর আমরা যাই তার বাড়িতে। গেরস্থবাড়ি, ছাদপেটা ঘর। পরিচয় পেয়ে যত্ন করে আমাদের বসালেন। প্রশ্ন করলাম কোনোভাবেই কি প্রেক্ষাগৃহটি চালু রাখা সম্ভব নয়? তিনি বললেন, আর না, কোনোভাবেই না। আমরা ভাগীদাররা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, লোকসান দিয়ে আর হল চালাব না।

লিলি থেকে যাত্রা পাশের উপজেলা বাঘমারার লাকী সিনেমা হলের দিকে। এই উপজেলায় দু’টি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে লাকী চালু করা হয়েছে। সেখানে চলছে মোস্তাফিজুর রহমানের বাংলার ডন সিনেমাটি। মালিক আব্দুর রশীদকে বাড়ি থেকে ডেকে কথা হলো। প্রেক্ষাগৃহটি চালু রাখার ব্যাপারে তিনি খুব আগ্রহী। কিন্তু একটা কথা বারবার বলছিলেন, লোকসান দিয়ে আর কতদিন চালু রাখব। সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা না হলে হয়ত প্রেক্ষাগৃহটি একেবারেই বন্ধ করে দিতে হবে বলে তিনি জানান।

কথা প্রসঙ্গে জানালেন, ১৯৯৬ সালে তিনি প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর কয়েক বছর খুব ভাল ব্যবসা করেছিলেন। তারপর থেকে কেবল লোকসান আর লোকসান। ব্যবস্থাপক জানালেন, ৪ অক্টোবর ২০১১ তারা চারটি শোর মধ্যে কেবল একটি শো (১২-৩টা) চালান। টিকেট বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১০০ টাকা। বাকি তিনটি শো দর্শকের অভাবে চালাতে পারেন নি।

লাকী থেকে হাঁটা দূরত্বে মনিকা সিনেমা হল। এটি এ এলাকার সবচেয়ে পুরনো প্রেক্ষাগৃহ। অবকাঠামো খুব একটা ভাল নয়। তবে মালিক প্রেক্ষাগৃহটি চালু রেখেছেন। কথা হয় মালিক ডা. কামরুল হাসানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ১৯৮৬ সালে বাবার আমল থেকে তারা এই ব্যবসা করে আসছেন। অন্যান্য ব্যবসা থাকলেও এই ব্যবসাটা ছাড়তে পারছেন না। কেমন জানি একটা মায়া পড়ে গেছে বলে তিনি জানান। ২ অক্টোবর ২০১১ থেকে প্রেক্ষাগৃহটিতে চলছে ইংরেজি ভাষার সিনেমা হ্যালো ডারলিং ও দ্য চ্যালেঞ্জ। এক টিকেটে দুই ছবি। দর্শক নাই বললেই চলে। প্রায় দিনই দু-একটি শো বন্ধ রাখতে হয়।

এর পরের উপজেলা পুঠিয়া। উপজেলায় ঢুকে প্রথমেই পাওয়া গেল রুবি সিনেমা হল। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮৮। প্রেক্ষাগৃহটির অবস্থা অনেকখানি জীর্ণ। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন ১২টার স্পেশাল শো’র প্রস্তুতি চলছে। লোক নেই বললেই চলে। টিকেট বিক্রেতা জানালেন, সব মিলে ২৫০ টাকার টিকেট বিক্রি করেছেন। সিনেমা চলছে এম এ রহিম পরিচালিত জাল। সিনেমাটি এই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয় ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে।

মালিক গত চার দিনের হিসাব দেখালেন আমাদের। প্রথম দিন অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর শো চলেছে দু’টি। আয় ৩৩৩৫ টাকা। ১ অক্টোবর চার শোতে আয় ২৬৬০ টাকা। ২ অক্টোবর ১৪০৪ টাকার টিকেট বিক্রি হয় তিন শোতে। ১৩৮০ টাকার টিকেট বিক্রি হয় ৪ অক্টোবর।

তিনি জানান, সিনেমাটির সাত দিনের ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। এছাড়া প্রচার খরচ এক হাজার, ঢাকা থেকে ছবি আনার জন্য ২০০ টাকা খরচ হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কর্মচারী, বিদ্যুৎ, কার্বন ও কাস্টমস মিলে প্রতিদিন খরচ ৮৫০ টাকা। এ হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে সাত দিনে সিনেমাটা চালালে লোকসান হবেই এবং হচ্ছেও তাই। তারপরও তারা প্রেক্ষাগৃহটি চালু রেখেছেন কেবল ভাল দিন আবার ফিরে আসবে এই আশা নিয়ে।

উপজেলার অন্য প্রেক্ষাগৃহটির নাম মুক্তা। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ প্রেক্ষাগৃহটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ২০১০ সালে। এর আগে মাঝে মাঝে চলত আবার বন্ধ রাখা হতো। প্রেক্ষাগৃহটির সামনে এখন বড় এক পোস্টারে লেখা ‘সিনেমা হলটি বিক্রয় হইবে, ফোন...।’

পুঠিয়া থেকে রাজশাহী বাইপাস হয়ে আমাদের এগিয়ে চলা শহরের সবচেয়ে কাছের উপজেলা পবার নওহাটার দিকে। সেখানে পাশাপাশি একই মালিকের দু’টি সিনেমা হল। মৌসুমি নামের সিনেমা হলটি ২০০৬ সালের দিকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রেক্ষাগৃহটির সব আসবাব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখন কেবল একটি প্রজেক্টর মেশিন আছে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই প্রেক্ষাগৃহটিতে গিয়ে দেখা যায় দারোয়ান পাহারা দিচ্ছে। সেখান থেকে আসি আমরা বাবুল সিনেমা হলে। এটি আমাদের দেখা জেলার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও অভিজাত প্রেক্ষাগৃহ। ঠিক মধ্যবিত্তের রুচির উপযোগী করে প্রেক্ষাগৃহটি বানানো। ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাজশাহী শহরের বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ বর্ণালী মালিক বাবুল চৌধুরী এটির বর্তমান মালিক। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রেক্ষাগৃহটির আগের নাম ছিল লিলি। ২০০৬ সালের দিকে বাবুল চৌধুরী এটি কিনে নিয়ে ব্যাপক সংস্কার করেন। পুরো প্রেক্ষাগৃহটি ঘুরে পরিচ্ছন্নতা ও রুচির ছাপ দেখা গেল। প্রেক্ষাগৃহটিতে এ সপ্তাহে চলছে কাজী হায়াতের ওরা আমাকে ভাল হতে দিল না সিনেমাটি। শহরের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে প্রযোজকদের সঙ্গে চুক্তিতে সিনেমা চলে।

এবার আমাদের লক্ষ্য শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলোর দিকে। যদিও রাজশাহী শহরে এখন সিনেমা হল বলতে সবে ধন নীলমণি একটি উপহার সিনেমা হল। বাকি তিনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। শহরের সবচেয়ে পুরনো প্রেক্ষাগৃহ স্মৃতি সিনেমা এখন কেবলই স্মৃতি। সেখানে চলছে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহীর ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাবের উদ্যোগে নাট্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে নির্মিত হয়েছিল ‘রাজা প্রমথনাথ টাউন হল’। প্রতিষ্ঠা থেকে সেখানে নিয়মিত বাংলা সাহিত্য ও নাট্যচর্চা হতো। ১৯১৯ সালের ২ এপ্রিল ভিক্টোরিয়া ক্লাবের কাছ থেকে হলটি কিনে নেয় রাজশাহী এসোসিয়েশন। স্বাধীনতার পর রাজশাহী এসোসিয়েশনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে স্মৃতি সিনেমা হল নামে সিনেমা প্রদর্শনী শুরু করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক আফরাউজ্জমান খান চৌধুরী ওরফে বাবুল ও তার ছোটভাই আব্দেল নাসের চৌধুরী ওরফে রুবেল। ২০০৭ সালে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে সেখানে বহুতল বিপনী ভবন নির্মাণ শুরু করে রাজশাহী এসোসিয়েশন। এখনো সেই নির্মাণ কাজ শেষ হয় নি।

এরপর আমরা যাই, নগরীর আলুপট্টির কল্পনা খ্যাত উৎসব সিনেমা হলে। প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বৃটিশ আমলে রাজশাহী সিন্ডিকেট নামে ১৬ বিনোদন-পিয়াসী ব্যক্তি এই প্রেক্ষাগৃহটি চালু করেছিলেন কল্পনা নামে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কল্পনা অংশীদাররা সবাই ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর রাজশাহী সিন্ডিকেটের ম্যানেজার দীনবন্ধু দেশে ফিরে যোগসাজশ করে প্রেক্ষাগৃহটির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন ঢাকার মোশারফ চৌধুরীর কাছে। তার মৃত্যুর পর সহোদর সাইফুল ইসলাম চৌধুরী নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন রাজশাহীর রাজপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমানের কাছে। তিনি কল্পনা পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন উৎসব। প্রেক্ষাগৃহটিতে ২০১০ সালের জুলাই মাসেও চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীর বোয়ালিয়া ভূমি অফিসের নথিপত্রে ঐতিহ্যবাহী কল্পনা প্রেক্ষাগৃহটির জমি সিন্ডিকেটের নামেই আছে। অথচ সরকারি প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলে সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের তোড়জোড় চলছে।

এরপর নগরীর কাদিরগঞ্জ ও আমবাগানের মধ্যবর্তী এলাকায় বর্ণালী সিনেমা হলে গিয়ে দেখা যায়, উঁচু দেয়ালে ঘেরা মাঠটিতে কাশফুল শোভা পাচ্ছে। সামনে বিশাল সাইনবোর্ডে লেখা ‘ডেসটিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার (ডিআইবিসি), রাজশাহী’র জন্য নির্ধারিত স্থান (প্রস্তাবিত), ক্রয়সূত্রে মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি-২০০০ লি.।  খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে নগরীর বাবুল ও রুবেল চৌধুরীর উদ্যোগে নির্মাণ করা হয় বর্ণালী প্রেক্ষাগৃহটি। পরে এই প্রেক্ষাগৃহের নামেই এলাকাটি পরিচিতি হয়। ২০০৯ সালে প্রেক্ষাগৃহটির জায়গা কিনে নেয় ডেসটিনি-২০০০ এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডেসিটিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার। ২০১০ সালের শুরুতে এটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। এখানে নির্মিত হবে ডেসটিনির বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।

এছাড়া শহরতলীর বাইপাস এলাকার লিলি সিনেমা হলে গিয়ে অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকার মানুষের একমাত্র বিনোদনের কেন্দ্র ছিল এই প্রেক্ষাগৃহটি। ২০১০ সালে প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলা হয়। এখন জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে।

লিলি থেকে যাত্রা নগরীর একমাত্র চালু প্রেক্ষাগৃহ উপহার এর দিকে। আমরা যখন পৌঁছি তখন ছয়টার শো’র প্রস্তুতি চলছিল। সিনেমার নাম এম বি মানিক পরিচালিত জান কোরবান। দর্শক মোটামুটি। নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থিত এই প্রেক্ষাগৃহটি ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করা হয়। নগরীর অন্য প্রেক্ষাগৃহগুলোর চেয়ে এটির সাউন্ড ও আসন ব্যবস্থাপনা অনেকখানি ভাল ছিল। এখনো প্রতি সপ্তাহেই এ প্রেক্ষাগৃহে নতুন চলচ্চিত্র লাগানো হয়। প্রেক্ষাগৃহটির সুপাইভাইজার দ্বীন মোহাম্মদ দীপু জানালেন, আগের মতো না চললেও এখনো তারা ভালোই ব্যবসা করছেন। তবে ডিশ-লাইন বন্ধ করে দিলে তারা আরও ভাল ব্যবসা করতে পারবেন। প্রেক্ষাগৃহটির মালিক ঢাকার সাজ্জিদ চৌধুরী। আপাতত প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ বা ভেঙে ফেলার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

এরপর আমাদের সর্বশেষ লক্ষ্য সিটি করপোরেশনের বাইরের একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ কাটাখালির রাজতিলক এর দিকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় প্রেক্ষাগৃহটি একসময় ভালোই চলত। এখন চলছে ধুকধুক করে। প্রেক্ষাগৃহটির প্রদর্শন ব্যবস্থা, সাউন্ড সিস্টেম মোটেও ভাল নয়। ব্যবস্থাপক জানালেন, তারা সব ধরনের সিনেমা আনার চেষ্টা করছেন। তবে দর্শক সমাগম খুব একটা ভাল নয়। গত ছয় মাসের মধ্যে মনের মানুষ ছাড়া আর কোনো সিনেমায় খুব একটা ব্যবসা করতে পারেন নি তারা। তবে প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলা কিংবা বন্ধ করার ব্যাপারে মালিকের কোনো চিন্তা নেই। রাজতিলক থেকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করি তখন রাত ১০টা ছুঁই ছুঁই। এর মধ্যে দিয়ে আমাদের দুই দিনের সংক্ষিপ্ত অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। বিবর্ণ অথচ বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা ফিরে আসি কর্মক্ষেত্রে।

টি-স্টলগুলো যেন মিনি প্রেক্ষাগৃহ

একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়া নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা বলছেন, দর্শক নেই; প্রেক্ষাগৃহ চালাব কী করে? প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ, আকার, ধরন নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। সিনেপ্লেক্স বানানোর কথা বলছেন কেউ কেউ। সঙ্গে ডিজিটাল সিনেমার প্রসঙ্গতো আছেই। অনেকে বলছেন বর্তমানের প্রেক্ষাগৃহের আকার হবে ছোট, সঙ্গে থাকবে কফি-সপ, ফাস্টফুডের দোকান; আসন সর্বোচ্চ শ’খানেক। সবই যুক্তিসঙ্গত। সিনেমার উন্নয়নে হয়ত এখন এ কাজগুলোর বিকল্প চিন্তা করা সম্ভবও নয়। কিন্তু এসব চিন্তা যখন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন নীরবে এসব চিন্তার কিছু বিষয় নিয়ে দেশে ‘‘বিপ্লব’ হয়ে গেছে। বিষয়টা পরিষ্কার করে বলি, আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলাম টি-স্টলে বসে সাধারণ মানুষের সিনেমা দেখার ব্যাপারে। আমার গবেষণা এলাকা পুরো রাজশাহী জেলা ঘুরতে গিয়ে একটি ব্যাপার খুব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, রাস্তার পাশের টি-স্টলগুলোকে আমার একেকটি ‘মিনি প্রেক্ষাগৃহ’ মনে হয়েছে। ঘোরার সময় অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এসব দোকান পর্যবেক্ষণ করা হয়। কথা বলেছি দোকানদার ও এসব দোকানের ক্রেতা অর্থাৎ দর্শকদের সঙ্গে।

প্রতিটি টি-স্টলের পাশে আলাদা করে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘর সাধারণত বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি; তবে দু-একটি ঘরে দু’চালা টিনের ছাউনি ছিল। ঘরের চারপাশে দেয়াল নেই। তবে মেঝে থেকে এক হাতের উচ্চতার মধ্যে মাটির তৈরি দেয়াল দিয়ে ঘরটা ঘিরে ফেলা হয়েছে। মেঝে কাঁচা। সেখানে চাটাই বিছানো। কিছু দোকানে অবশ্য চেয়ার-টেবিল বসানোও আছে। ঘরগুলোর রাস্তার বিপরীত দিকের অংশে একটি টেবিলে সাধারণত রাখা হয়েছে টেলিভিশন।

এসব দোকান আপাত টি-স্টল মনে হলেও অনেকটা মুদি দোকানের মতো। মুদি দোকানের মতো বলছি এই কারণে যে ওই জাতীয় কিছু সামগ্রীও পাওয়া যায়, আবার চাও বিক্রি হয়। টেলিভিশন দেখার ওই ঘরটি মূল দোকান থেকে একেবারে আলাদা। দর্শক চাটাই কিংবা চেয়ারে বসে টেলিভিশন দেখতে থাকে। খুব মজার বিষয় যেটি সেটা হলো, আপনি যদি ওই ঘরে বসে সিনেমা দেখতে থাকেন, তাহলে নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা পরপর এমনি আপনার সামনে চা চলে আসবে। টেলিভিশনে সিনেমা দেখলে আপনাকে ওই চা খেতেই হবে- এটাই যেন অলিখিত নিয়ম। দোকান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় একেবারে আপনাকে ওই চায়ের দাম দিয়ে আসতে হবে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আপনি অবসর সময় এখানে কাটাবেন, বিনোদন নেবেন অথচ কোনো অর্থ ব্যয় করবেন না তা কি হয়? আপাত দৃষ্টিতে চা দোকানের এই ফিল্মি-বিনোদন ফ্রি মনে হলেও এটা কিন্তু ফ্রি নয়।

দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব দোকানে দিনে ভিড় একটু কম থাকে। তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বেড়ে যায়। ভিড় থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। রাতের বেশিরভাগ দর্শক থাকে শ্রমিক। একটু গ্রামের দিকে হলে মূলত কৃষিশ্রমিক। এরা সারা দিন কাজ করে একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এসব দোকানে আসে বিনোদনের জন্যে। এছাড়াও কিছু বয়স্ক লোকজনও এখানকার নিয়মিত দর্শক। আর সঙ্গে তরুণরাতো আছেই।

দর্শকদের আসন গ্রহণ সংস্কৃতি সম্পর্কিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে সিনেমা হলগুলোতে বক্স শ্রেণী প্রায় উঠে যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ সিনেমা দেখতেন ফাস্ট ক্লাসের সিটে বসে। ফাস্ট ক্লাসের প্রতিটি সিট পরিপূর্ণ থাকত সন্ধ্যার প্রদর্শনীতে। সেকেন্ড ক্লাসে ভিড় জমতো ম্যাটিনি শোতে; এই শ্রেণীর দর্শকরা ছিল মূলত ছাত্র-যুবক। শ্রমজীবী মানুষেরা সিনেমা দেখত থার্ড ক্লাসে বসে। সাধারণত রাতের দ্বিতীয় শোতে এই আসনগুলোতে ব্যাপক দর্শক সমাগম ঘটত।’ ১৯৪৭ পরবর্তী কী, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ৯০ এর দশক পর্যন্ত সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে দর্শকদের এই বিভাজন চালু ছিল। একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো, সেটা হলো শ্রমজীবী সেই মানুষের কিন্তু সিনেমা দেখার আগ্রহ ও স্থান (থার্ড ক্লাস) পরিবর্তিত হয় নি। পরিবর্তিত হয়েছে কেবল সিনেমা দেখার জায়গা। প্রেক্ষাগৃহের বদলে তারা এখন সিনেমা দেখছেন টি-স্টলে বসে।

আর একটা বিষয়, সিনেমার দর্শক কিন্তু কমে নি। মানুষের সিনেমা দেখার তৃষ্ণা কিন্তু কমে নি। একবিংশ শতাব্দির শুরুর অর্ধ দশক পর্যন্তও এই দর্শক কিন্তু হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শক হল থেকে বেরিয়ে তাদের বিনোদনের বিকল্প মাধ্যম ঠিকই করে নিয়েছে। তার মানে দর্শকদের বিনোদন কোনোভাবেই থেমে থাকে নি।

আগেই বলেছি, এখন ‘পুরনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর উন্নয়ন এবং নতুন ধরনের ছোট ছোট ডিজিটাল প্রজেকশন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ প্রয়োজন। এসব প্রেক্ষাগৃহ হতে পারে ১৫০-২০০ সিটের। আর তার সঙ্গে থাকবে কফি, পিৎজা সপ, থাকবে ইন্টারনেট, থাকবে ডিভিডি ও মিউজিক সেন্টার। টিকিটের মূল্য হবে কম। যেকোনো বড় কিংবা ছোট শহরে এ ধরনের ছোট ছোট প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করতে হবে।’ পাঠক লক্ষ্য করুন, মজার ব্যাপার হলো আমাদের বিশেষজ্ঞ, জ্ঞানী-গুনীরা যখন ভাবছেন দেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে; তার আগেই কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষেরা তাদের বিনোদনকেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছে। কবে সরকার কিংবা অন্য কেউ তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা করবে এজন্য তারা বসে থাকে নি। আর দেশের বেশিরভাগ মানুষতো আর কফি, পিৎজা কিংবা বার্গারে অভ্যস্ত নয়, তাদের কাছে রঙ চা আর নোনতা বিস্কুটই অমৃত। তাই তারা তাদের মতো করে তাদের ‘প্রেক্ষাগৃহ বানিয়ে ফেলেছে। আসলে মানুষের বিনোদন চাহিদাকে কখনোই কোনোভাবেই আটকে রাখা সম্ভব নয়।

আর একটা ব্যাপার না বললেই নয়, অনেকে অর্থাৎ অনেক প্রেক্ষাগৃহ মালিক ও সংশ্লিষ্ট লোকেরা স্যাটেলাইট চ্যানেলের নেতিবাচকতার কথা বললেন। কিন্তু টি-স্টলের এসব ‘মিনি-প্রেক্ষাগৃহ’ এর বেশিরভাগেই স্যাটেলাইট টেলিভিশন চলছে না, চলছে ভিসিডি/ডিভিডি। দোকানদাররা জানালেন, তারা নিয়মিত ভিডিও দোকান থেকে তিন-চারটা ভিসিডি/ডিভিডি ভাড়া করে এনে চালান। প্রদর্শিত এসব সিনেমা একটা বড় জায়গা দখল করে রেখেছে ভারতের টালিগঞ্জের সিনেমা। আর প্রদর্শিত বাকি সিনেমাগুলো বাংলাদেশের এফডিসিকেন্দ্রিক।

সবার অঙ্গুলি স্যাটেলাইট চ্যানেলের দিকে

বুঝে বলুন, আর না বুঝে বলুন, প্রেক্ষাগৃহ সংশ্লিষ্ট সব লোকের (রাজশাহী জেলার সিনেমা হলগুলো ঘোরার সময় প্রেক্ষাগৃহ সংশ্লিষ্ট লোকজন, দর্শকদের সঙ্গে যেসব কথা হয়েছে সেখানে তারা খুব জোরালোভাবে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর দৌরাত্ম্যের কথা বলেছে) প্রথম অভিযোগ স্যাটেলাইট টেলিভিশনের দিকে। বেশিরভাগতো এক কথায় বললেন, সরকার স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সিনেমা দেখানো বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করলেই দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসবে। এমন অভিযোগ কিন্তু দেশের কেন্দ্রীয় প্রদর্শক সমিতির নেতাদেরও। প্রেক্ষাগৃহ সংশ্লিষ্টদের এমন যুক্তি খুব সঙ্গত না হলেও, একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়।

প্রথম কথা হলো, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় থাকা বেশিরভাগ সিনেমা হল ঘুরে সেখানে অবকাঠামো থেকে শুরু করে পরিবেশ-পরিস্থিতি যেমন দেখা গেছে, সেখানে মধ্যবিত্তের যাওয়া একটু কষ্টকরই। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বিশাল অংশ নারীদেরতো ওই পরিবেশে সিনেমা দেখা প্রায় অসম্ভব। তবে এই মধ্যবিত্ত ‘‘রুচিশীল’ দর্শক যে খারাপ সিনেমা বা প্রেক্ষাগৃহের কারণে সেখানে যাচ্ছেন না- এমনটা বলাও খুব শোভনীয় হবে না। কারণ বাংলাদেশের সিনেমার মধ্যবিত্ত দর্শক যে রুচির দিক থেকে খুব ভাল অবস্থায় আছে তা বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ সেই ৬০ এর দশক থেকে মধ্য ৯০ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত ‘রুচিশীল’ দর্শক যখন প্রেক্ষাগৃহমুখী ছিল, তখন বাংলাদেশী শিল্পসম্মত সিনেমা খুব বেশি ব্যবসা কিন্তু করতে পারে নি। বরং তার বিপরীতে ব্যবসা করেছে নাচে-গানে ভরপুর সিনেমাগুলো।১০

দ্বিতীয় কথা হলো, আগেই বলেছি নিম্নবিত্তরা তাদের সিনেমা দেখার জায়গা মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছে। তাই সংকট কেবল মধ্যবিত্তদের নিয়ে। এই মধ্যবিত্ত ‘রুচিশীল’ দর্শক এখন কোথায় যাবে? বস্তুত মধ্যবিত্ত এই শিক্ষিত শ্রেণী ‘দুধের সাধ ঘোলে মেটানো’র জন্য ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি সিরিয়ালের ফাঁদে আটকা পড়ছেন। ‘এইসব বানোয়াট কূটচালে ভরা চক্রান্ত-কুটিলতার কাহিনীজালে আর কুশীলবদের পোশাকি চাকচিক্যে ও বাহ্য স্মার্টনেসের জালে তারা বাঁধা পড়েছেন। এটা তাদের দৈনন্দিন খোরাক এবং ভয়ানক নেশার মতো আচ্ছন্ন করে রাখছে।’১১ এসব সিরিয়ালের প্রতি মধ্যবিত্তদের আকৃষ্ট হওয়ার পিছনে বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যর্থতার পাশাপাশি আরেকটি অন্যতম কারণ হলো, মধ্যবিত্ত বৈশিষ্ট্য আসলে যা চায়, তার একধরনের প্রতিফলন এখানে পাওয়া যায়। তাই তারা মনে করছে ভালোইতো ঘরে বসে বিনে পয়সায় ‘ফাটাফাটি’ বিনোদন।

তবে আসল কথা হলো স্যাটেলাইট টেলিভিশন কোনোভাবেই চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ নয়। ‘স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রসার যে সিনেমা শিল্পের অপৃসয়মানতার কারণ নয়, তা হলিউডি বা বলিউডের সিনেমা শিল্পবিস্তারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রসার বা অভিগম্যতা এসব দেশে বাংলাদেশের তুলনায় কোনো অংশে তো কম নয়, বরং বেশি বলা চলে।’১২ বর্তমানে অনেকক্ষেত্রে স্যাটেলাইট চ্যানেল চলচ্চিত্র শিল্পকে সহায়তা করছে। বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো সিনেমায় বিনিয়োগের একটা বড় অংশ ফেরত আসে এসব স্যাটেলাইট চ্যানেলে গান বিক্রির টাকা থেকে। মজার ব্যাপার হলো বলিউডে এখন একেকটা সুপার-ডুপার সিনেমার বয়স দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ।

সারা দেশে বিশাল পরিমাণ প্রেক্ষাগৃহে একযোগে বলিউডের এসব সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। এরপর টানা তিন-চার সপ্তাহ ব্যবসা শেষে তা নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। ব্যবসা শেষ, তারপর ওই সিনেমা আবার স্যাটেলাইট টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে। বলিউডের ইন্ডাস্ট্রি বড় হলেও ‘‘আমাদের জনসংস্কৃতির সঙ্গে মিল থাকার কারণে বলিউডের সিনেমা শিল্প বিস্তারের উদাহরণ দেওয়া বোধ হয় এখানে অধিক যুক্তিযুক্ত হবে।’১৩

তার মানে চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের দৌরাত্ম্য নিয়ে এত কথা সেটা আসলে অনেকটা ‘‘গদে আব্বাস’। আসলে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার কারণ মোটেও স্যাটেলাইট নয়। গত দু’দশকে বাংলাদেশের সিনেমা যেসব সংকটের মধ্যে দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে সেটা বিবেচনায় আনা জরুরি। মোদ্দা কথা হলো স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে চলচ্চিত্র কোনোভাবেই ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়াতে পারে নি। সরকার, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট লোকজন সবাই চলচ্চিত্রের কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়েছেন ঠিকই কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেন নি।

দেশের একমাত্র স্টুডিও এফডিসির কোনো উন্নতি হয় নি। সেটা এখন ‘চলচ্চিত্রের জাদুঘর’। যখন যে নায়ক একটু ব্যবসা করেছে তাকে নিয়ে মেতেছে প্রযোজক, পরিচালক। টাকা লগ্নি করেছে, হয়ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফেরতও পেয়েছে; কিন্তু সে নায়ক যদি ব্যর্থ হয় কিংবা কোনো কারণে মারা যায় তাহলে ইন্ডাস্ট্রির কী হবে সেটা তারা একবারও ভাবেন নি। ফলে সালমান শাহ্‌ ও মান্না মারা যাওয়ার পর ইন্ডাস্ট্রিকে চরম সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলে নি।

প্রত্যাশা এখন ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে, কিন্তু তাতে কী?

প্রতি সিনেমায় কিছু না কিছু লোকসান দিয়ে চালাচ্ছেন রাজশাহীর পুঠিয়ার রুবি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের মালিক। তার একটাই কথা, ‘ধরে আছি, নিশ্চয় সুদিন আসবে; সরকার কিছু করবে।’ প্রশ্ন হলো সেটা কী? ধরলাম সরকার প্রেক্ষাগৃহগুলোকে ডিজিটাল করার ব্যাপারে সহায়তা দিল, তা হলোও। কিন্তু সিনেমা কোথায়? সিনেমা বানানোও শুরু হলো, কিন্তু নায়ক কোথায়? কারণ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের বিশেষ একজন নায়ক দেশে না থাকলে এফডিসিতে কোনো কাজ হয় না। তার মানে কেবল প্রেক্ষাগৃহ ডিজিটাল করলেই কাজ হবে না। এর সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সবার আগে জরুরি হয়ে পড়েছে এফডিসির উন্নয়ন। তারপর অন্য কিছু। এছাড়া আমাদের চলচ্চিত্রের এখন যে অবস্থা তা উন্নত করার জন্য সরকারকে একটা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে যেতে হবে।

ইসলামি বিপ্লবত্তোর ইরানের কথা ধরুন। শাহ্‌ সরকারের সময় ইরানের নিজস্ব চলচ্চিত্র শিল্প বলে কিছুই ছিল না; যেটা ছিল সেটা হলিউডের। ইসলামি বিপ্লবত্তোর সরকার যেটা করল, সিনেমাকে সহায়তা করা শুরু করল। পরিচালকদের উৎসাহিত করল সিনেমা বানাতে, সেই সিনেমা বাইরের উৎসবে পাঠাতে। সরকার নিজ উদ্যোগে সারা দেশে নির্মাণ করল ৫০০টি প্রেক্ষাগৃহ। একই সঙ্গে দেশের ভিতর আয়োজন করা হলো চলচ্চিত্র উৎসব। অল্প সময়ের মধ্যে দেশীয় সিনেমার দিকে দর্শকদের আগ্রহ বাড়ল।

তেমনি আমাদের দেশে সময় এসেছে সরকারকে জোরালোভাবে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার। একদিকে সিনেমা বানানোর ব্যাপারে সরকারি বিনিয়োগ করা এবং অন্যদের উৎসাহিত করা। এর পাশাপাশি সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সিনেমা হলের উন্নয়ন ঘটানো। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে বহুতল ভবন কিংবা শপিং মল করা হচ্ছে, সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি করে সিনেপ্লেক্স বানানোর নির্দেশ দেয়া।

সরকার অবশ্য সম্প্রতি এ ধরনের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এফডিসি উন্নয়নে ৫৮ কোটি টাকা বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এই বাজেট শুধু এফডিসির উন্নয়নে ব্যবহার না করে প্রয়োজনে পেশাদার প্রযোজক ও সরকার যৌথ প্রযোজনায় ভাল কিছু ছবি নির্মাণে এগিয়ে আসতে পারে। পেশাদার প্রযোজকরা আসলে সিনেমা বানানোর ব্যাপারে এখন ভয় পাচ্ছেন। কারণ নির্মিত সিনেমা প্রদর্শন করবেন কোথায়, আর সে সিনেমা দেখবেই বা কে? তাই সিনেমা বানানোর ব্যাপারে তাদেরকে যতটা পারা যায় ঝুঁকিমুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ২৪ অক্টোবর ২০১১ এফডিসিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক ম হামিদ দু’টি বৈঠক করেন। প্রথম বৈঠকে প্রদর্শক ও প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারে সরকারি তহবিল থেকে ঋণ দেয়ার আশ্বাস প্রদান করা হয়। এছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে শপিংমল তৈরির যে প্রবণতা শুরু হয়েছে সে সম্পর্কেও নীতিমালা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।১৪

সিনেপ্লেক্সের সম্ভাবনা সম্পর্কে দেশের একমাত্র সিনেপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘‘দর্শকদের শুধু একটা শ্রেণীর মধ্যে আবদ্ধ না রেখে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদেরও সিনেমা হলকেন্দ্রিক করতে চেয়েছি। শুরুতেই আমাকে চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। সবাইকে বোঝাতে হয়েছে যে স্টার সিনেপ্লেক্সে আছে ভাল পরিবেশ, এখানে পরিবার নিয়ে আসা যায়। এ ব্যাপারটা বোঝাতে আমার প্রথম দুই বছর লেগেছিল। তবে তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি।’১৫

চলচ্চিত্র দুনিয়ার অন্যতম ইন্ডাস্ট্রি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিন্তু আমাদের চেয়ে খুব বেশি দিন আগে মাল্টিপ্লেক্স হয় নি। ২০০৩ সালে ভারতে প্রথম মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। নাম ছিল পিভিআর। বাংলাদেশে প্রথম মাল্টিপ্লেক্স নির্মিত হয় ২০০৪ সালে।১৬ সারা ভারতে ২০১০ সালে এসে মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০০টি।১৭ ছয় বছরের মাথায় ভারতের মাল্টিপ্লেক্স বেড়েছে প্রায় ৬৯৯টি, আর আমরা দ্বিতীয়টি করতে পারি নি।

সিনেপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান আরও বলেন, ‘‘নতুন মাল্টিপ্লেক্স তৈরি না হওয়ার কারণ- এর জন্য প্রচুর জায়গার প্রয়োজন। একটি মাল্টিপ্লেক্সের জন্য কমপক্ষে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার বর্গফুটসহ তিন তলা উঁচু জায়গার প্রয়োজন। বর্তমানে জায়গার যে দাম, তাতে নতুন মাল্টিপ্লেক্স করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে বেরোনোর একটাই উপায়, যদি সরকার জায়গা লিজ দেয়। শুধু মাল্টিপ্লেক্স করার জন্য ৫০ বা ১০০ বছরের লিজ। মাল্টিপ্লেক্স কেবল মার্কেটকেন্দ্রিক নয়। ভারতের মুম্বাই শহরের কয়েক মাইল দূরে দূরে একেকটি মাল্টিপ্লেক্স রয়েছে। সেখানে একসঙ্গে আটটি পর্যন্ত সিনেমা হল রয়েছে।’১৮ তার মানে প্রেক্ষাগৃহ ডিজিটাল কিংবা মাল্টিপ্লেক্স হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। চলচ্চিত্র শিল্প ও প্রেক্ষাগৃহের উন্নয়ন একই সঙ্গে করতে হবে। যেকোনো একটির উন্নয়ন অন্যটির জন্য সমস্যার তৈরি করবে।

এছাড়া রাজশাহী জেলা ঘুরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের কাছ থেকে একটি অভিযোগ জোরালোভাবে পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, তারা কোনো নতুন সিনেমা আনতে চাইলে বুকিং দেয়ার জন্য মিনিমাম গ্যারান্টি (এমজি) হিসেবে নির্দিষ্ট অংকের জামানত দিতে হয়। ব্যবসার যে অবস্থা তাতে তারা এই এমজি পদ্ধতিতে অনেক টাকা খরচ করে ভাল চলচ্চিত্র আনার সাহস করতে পারেন না। ফলে তারা অল্প টাকায় পুরনো চলচ্চিত্র এনে প্রেক্ষাগৃহ চালানোর চেষ্টা করছেন। কিছু দর্শকের নতুন সব সিনেমার প্রতি ঝোঁক থাকার কারণে তারা পাইরেসি হওয়া নতুন সিনেমাগুলো ডিভিডিতে দেখে নিচ্ছে। আর এ ছাড়া চা দোকানের মিনি প্রেক্ষাগৃহতো আছেই।

আরও দুটো কথা আছে

প্রেক্ষাগৃহ মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে আরও কয়েকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সমসাময়িক চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে মূল্যায়ন করার জন্য এ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। প্রথম যে বিষয়টি এসেছে সেটা হলো, ঘুরে ফিরে সেলুলয়েডে এক নায়কের উপস্থিতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিতেও এই সমস্যা আছে। কিন্তু আমাদের সংকটটা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অবস্থা এমন- সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান দেশে না থাকলে এফডিসিতে সব ধরনের শুটিং বন্ধ থাকে। পুঁজি হয়ে পড়েছে একমুখী। মূলত সালমান শাহ্‌’র সময় থেকে এই অবস্থার ভয়াবহতা শুরু। সালমানের মৃত্যুতে নায়ক মান্নার উত্থান। মান্নার মৃত্যু ও সেখান থেকে আজকের শাকিব খানের উত্থান। এর ফলে ২০০৮ সাল থেকে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শককে ঘুরে ফিরে ওই এক নায়ককে দেখতে হয়েছে। এক নায়কের একই ধরনের রোমান্টিকতা, একই ধরনের অ্যাকশন দেখতে দেখতে দর্শক রুচি হারিয়ে ফেলেছে।

এর উপর উন্মুক্ত আকাশের এই যুগে ভারতীয় নায়িকাদের ‘‘নায়িকাচিত শরীর’ (অর্থাৎ নায়িকার শরীরের মাপের এক ধরনের ডিসকোর্স পাশ্চাত্য থেকে উপমহাদেশ পর্যন্ত চালু হয়েছে) দেখে আমাদের দর্শকরা ‘‘বিমোহিত’। তাদের কাছে ‘মোটা শরীরের’ ঢালিউডি নায়িকাদের অবস্থান এখন বিরক্তির উদ্যোগ করে। অনেকের ভাষায়, আমাদের নায়িকাদের চেয়ে নাকি হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের এক্সট্রাদের আবেদন অনেক বেশি।

নায়কের সংকটের এই সময়ে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। এক নায়ক শাকিবের দাপটে যখন এফডিসিতে বাঘে মহিষে এক ঘাটে পানি খায়; তখন এর বিপরীতে দু-চার জন নায়ক তৈরির চেষ্টা করেছেন কয়েকজন নির্মাতা। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা খুব একটা সফল হয় নি। আর এক্ষেত্রে তাদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই ছিল টেলিভিশন নাটকের নায়কেরা, এরপর ছিল উঠতি জনপ্রিয় দু-একজন গায়ক। কিন্তু সমস্যা হলো, দেশের মানুষের দর্শক রুচি ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে সেখানে এক মনপুরা ছাড়া অন্য কোনো চলচ্চিত্র তেমন ব্যবসা করতে পারে নি। ফলে নাটকের এই ‘‘মহা মহা’ তারকারা চলচ্চিত্রে গিয়ে আর দাঁড়াতে পারছেন না। তাদের ওপর ভরসা থাকছে না প্রযোজক পরিচালকদের। ফলে যা হবার তাই; আবার সেই এক নায়কের কাছে ফিরে যাওয়া। আবার সেই একঘেয়েমি।

এর বাইরে পাইরেসি, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়গুলো বৃহৎ আলোচনার দাবি রাখে। তাই এ নিয়ে এবারের আলোচনায় আর কথা বাড়ালাম না।

শেষ হইবার আগে

এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যে যেভাবেই যত কথা বলুক; আমরা কিন্তু একটা ভাল দিনের খুব কাছাকাছি এসে পড়েছি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক বিধ্বস্ত সেনার নাম আমাদের চলচ্চিত্র। তাকে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে। এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু অনেকে সেই সুযোগটুকু নষ্ট করারও পাঁয়তারা করছে। নতুন সংকট এখন ভারতের চলচ্চিত্র আমদানি। অনেক কথা হচ্ছে, অনেক যুক্তি দেখানো হচ্ছে; কথা হচ্ছে প্রতিযোগিতা নিয়ে। দোহাই, মনে রাখবেন কোনো যুক্তিই ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই আমদানিকে জায়েজ করে না। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে, হোক; অনেক শিল্পী বেকার হচ্ছে, হোক। তাতে অনেক কিছু আসে-যায়, আবার কিছুই আসে-যায় না। তারপরও এখনো আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র’ বলেতো কিছু একটা আছে। আমরা কি সেটা একেবারে ধ্বংস করে দিতে চাই?

আমরা প্রতিযোগিতার কথা বলছি, আপনারাই বলুন একে-৪৭ হাতে থাকা কোনো আধুনিক যোদ্ধার সামনে কি খালি হাতে কোনো সৈনিকের দাঁড়ানো শোভা পায়? আর যদি কোনো সৈনিক নিশ্চিতভাবে মৃত্যুকে মেনে নেয় তাহলে হয়ত দাঁড়াতে পারে। বিপ্লব-পূর্ব ইরান ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কিন্তু তাই হয়েছিল। এই সময়ে এসে আমরা সেই পরিণতি চাই না। অথচ এখন সেই বন্দুকের নলের সামনেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি; নিশ্চিত মৃত্যু, কোনোরকম যুদ্ধ ছাড়া! যে যাই বলুক, আমরা আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের মতো করে বাঁচতে চাই; বাঁচবও। কারণ আমাদের আছে চলচ্চিত্রের প্রাণ, অর্থাৎ দর্শক। সেই দর্শক এখন যেখানেই থাক, ড্রইং-রুম কিংবা টি-স্টলে, তারা আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরে আসবে। তাদের ফিরে আসতেই হবে।

লেখক : কাজী মামুন হায়দার রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।  

kmhaiderru@yahoo.com

তথ্যসূত্র

১. ‘নতুন ছবি প্রেক্ষাগৃহ পাচ্ছে না’; প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১০।

২. ‘চলচ্চিত্র শিল্পের ঘোরতর দুর্দিন’; সমকাল; ৩ জুলাই ২০১১।

৩. স্থানীয় কেবল অপারেটররা রিসিভার ব্যবহার করে নিজেরা একধরনের চ্যানেল চালায়। এসব চ্যানেলে প্রায় দিনব্যাপি চলচ্চিত্র দেখানো হয়। এমনকি এখানে গ্রাহকদের কোনো নির্দিষ্ট সিনেমা চালানোর ব্যাপারে অনুরোধ করার সুযোগ থাকে।

৪.Statistical year Book 1991 and Preliminary Report: Population sensus 1991, Bangladesh Bureau of Statistics, Ministry of Planning; উদ্ধৃত, কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩: ৩৯৮); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৫.কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩: ৪০০); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৬.স্যালো ইঞ্জিনচালিত বিশেষ ধরনের এক যানের নাম ভটভটি। এলাকাভেদে একে ‘নসিমন’ ও ‘করিমন’ নামেও ডাকা হয়।

৭.‘সিনেমার দর্শক চরিত্র বদলে গেছে’; দৈনিক বাংলা; ঢাকা, ২ মে ১৯৯১, উদ্ধৃত, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩;৪০৩); বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৮.‘চলচ্চিত্র শিল্পের ঘোরতর দুর্দিন’; সমকাল; ৩ জুলাই ২০১১।

৯. ‘জেলায় জেলায় ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহ’; বাংলাদেশ প্রতিদিন; ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১।

১০.শুভ, শাতিল সিরাজ; ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দর্শক: রুচির বিচারে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সমান’; মাধ্যম, সম্পাদক-তুষার আব্দুল্লাহ, বর্ষ-১ম, সংখ্যা-১ম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪১৬, পৃ-৪৫-৫০, ঢাকা ।

১১. ‘চলচ্চিত্রশিল্প: পূর্ণ সংরক্ষণ নাকি সুস্থ প্রতিযোগিতা’; প্রথম আলো; ২২ মে ২০১০।

১২.নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক (২০০৮:১৬০-১৬১); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।

১৩.প্রাগুক্ত, নাসরীন (২০০৮: ১৬০-১৬১)।

১৪. ‘নতুন উদ্যোগে চলচ্চিত্রে আশার আলো’; কালের কণ্ঠ; ২৬ অক্টোবর ২০১১।

১৫. ‘প্রথম দিকে আমার পাঁচটি সিনেমা হল দিয়ে শুরু করার চিন্তা ছিল’; কালের কণ্ঠ; ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১১।

১৬. প্রাগুক্ত, কালের কণ্ঠ; ২৮ সেপ্টেম্বর২০১১।

১৭. ‘চলচ্চিত্রের চালচিত্র : বাংলাদেশ’; প্রথম আলো; ২৮ অক্টোবর ২০১১।

১৮.প্রাগুক্ত, কালের কণ্ঠ; ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১১।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন