Magic Lanthon

               

আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি’ : নয়া শিল্প আকাঙ্ক্ষার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ


ক্ষমতা সর্বব্যাপী, সর্বত্র তার বিচরণ। বিচিত্র অসংখ্য রূপে তার মূর্ততা। কখনো মালিকানা নামে, কখনো পুঁজি নামে, কখনো লৈঙ্গিক কর্তৃত্বের নামে, আবার কখনোবা ভাষা-সংস্কৃতি-আধিপত্য নামে তার বহিঃপ্রকাশ। নিও-লিবারেল যুগে ক্ষমতার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের রূপটিকে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের প্রয়াস, এই লেখা। সামপ্রতিক ‘বিতর্ক’  বিবেচনা করে মূলত ‘বির্তকের’ অধিপতি ডিসকোর্সের প্রতিনির্মাণ ক্ষেত্র হিসেবে চলচ্চিত্রকে বেছে নেয়া। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রচনা- কিছু সমস্যা থেকেই গেল। তারপরেও যে, ম্যাজিক লণ্ঠন এর তাগাদায় ‘কহিতব্য’ হাজির হলো, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ তার কাছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বন্ধুদের সহায়তার জন্য তাদের কাছে ঋণী থাকলাম। লেখাটিতে অনেক টীকা-টিপ্পনী দেয়ার প্রয়োজন ছিল হয়ত। পরবর্তী প্রকাশের আগে তার প্রতিশ্রুতি থাকল।

নয়া শিল্প আকাঙ্ক্ষা: নতুন শিল্প উদ্বোধনের রাজনীতি

কিংবা বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের কাজটা কী?

গহনের শুন্যতাই মানুষের মধ্যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। নতুন আকাঙ্ক্ষা থেকেই আসে নতুন শিল্পবোধের উদ্বোধন। যুগটা বাজারের, যুগটা পুনরুৎপাদনের। যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলাকে বিচার করেছেন ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। সিনেমা হয়ে উঠেছে তার একটি প্রসঙ্গ। ১৯৩৬ এর গোড়ার দিকে- ফ্যাসিবাদের রমরমার যুগে- ফ্যাসিবাদী প্রবণতার অনুগামী শিল্পতত্ত্বগুলোকে তিনি শুধু নাকানি চুবানি-ই খাওয়ান নি, নির্মাণ করেছেন নতুন শিল্পতত্ত্ব। তিনি অ্যাবেল গাঁস-স্যাভরিন মার্স-আলেকজান্ডার আনরক্স-এর মতো তাত্ত্বিকদের সনাতন শিল্পকলার চৌহদ্দিটাকে ভেঙে, শিল্পকলার রাজনীতিতে বৈপ্লবিক সম্ভাবনার ইশারা হাজির করেছেন। চলচ্চিত্রকে দাঁড় করিয়েছেন এক নতুন ব্যাখ্যার মুখোমুখি। যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্প তথা চলচ্চিত্র সাবেকি সব শিল্পতত্ত্বে যেন আস্তিনের শাপ হয়েই দেখা দিয়েছে। যেখানে সিনেমা কেবল ‘নিম্ন শ্রেণীর মানুষের বিনোদন’- ‘অশিক্ষিত’ ‘দুরারোগ্য’ ‘পীড়িত’ ‘মানুষের আশ্রয়’। ...‘সিনেমা এমন সব দৃশ্যের আকর, যা দেখার জন্য পর্যাপ্ত মনোযোগ আর বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন নাই।’ বেঞ্জামিন ঐতিহাসিক বিচারে তার অসাড়তা প্রমাণ করে দেখান চলচ্চিত্রের সামাজিক তাৎপর্যটা কোথায়।

আমরা জানি, প্রাচীনতম শিল্পকলা উদ্ভূত হয়েছিল ‘শাস্ত্রীয় আচার’-এর প্রয়োজনে- প্রথমে জাদুবিদ্যা এবং পরে ধর্মীয় উপলক্ষ্যে।...শাস্ত্রীয় আচারভিত্তিক বিবেচনা যত আবছাভাবেই হোক না কেন, এখনো চিনে নেয়া যায় সেকুলারায়িত আচারগুলোর মধ্যে-সৌন্দর্য-ভজনার এমনকি বাজে রেওয়াজগুলোর মধ্যে এর দেখা মিলবে। সৌন্দর্য-সম্পর্কিত সেকুলার আচারগুলো বিকশিত হয়েছিল রেঁনেসার কালে, আর জায়মান ছিল পরবর্তী তিন শতক ধরে। তখন পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল শাস্ত্রীয় আচারভিত্তিক বিবেচনার পতনদশা সমুপস্থিত। পুনরুৎপাদনের প্রথম প্রকৃত বৈপ্লবিক মাধ্যম হিসেবে আলোকচিত্রের উদ্ভব এবং একই সময়ে সাম্যবাদের আবির্ভাবের কাল থেকে শিল্পকলায় নতুন সংকটের সূচনা ঘটেছে। যদিও ব্যাপারটা পুরোপুরি খোলাসা হয়েছে আরও অন্তত একশ’ বছর পরে। এই সংকট ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদেরই সংকট।...একে আমরা বলতে পারি শিল্পকলার ‘বিশুদ্ধতা’র ধারণার আবরণে বিকশিত একপ্রকার নঞর্থক ধর্মতত্ত্ব, যা কেবল শিল্পকলার সামাজিক গুরুত্বই অস্বীকার করে নি, বিষয়ানুগ বিভাজন-রীতিকেও অগ্রাহ্য করেছে।

সামাজিক তাৎপর্যের মাজেজাটা কী? বেঞ্জামিনের মতে, বিশ্ব ইতিহাসে যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনই প্রথমবারের মতো শাস্ত্রীয় আচারের নিগড় থেকে শিল্পকলাকে মুক্তি দিয়েছে। ব্যাপক পুনরুৎপাদন শিল্পকলাকে বাধ্য করেছে তার সাবেকি ‘প্রামাণিক’ অধিপতি বৈশিষ্ট্যকে বর্জন করতে। শিল্প হয়ে উঠেছে একেবারেই পুনরুৎপাদনযোগ্য। বেঞ্জামিন উদাহরণ টেনেছেন আলোকচিত্রের নেগেটিভ দিয়ে; একটা নেগেটিভ থেকে অসংখ্য ছবি ছাপা সম্ভব। আর এ ক্ষেত্রে কোন কপিটি ‘প্রামাণিক’- সে প্রশ্ন অর্থহীন। তাই যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলায় প্রামাণিকতার ধারণা রদ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার ভূমিকাও গেছে পাল্টে। শাস্ত্রীয় আচারভিত্তিক হওয়ার পরিবর্তে, তা এখন অন্য এক চর্চাকে ভিত্তি মানছে- যার নাম রাজনীতি।

যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলার প্রতি মানুষের সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছে নতুন মাত্রা। ‘জনতার সম্পৃক্তিই তার জননী।’ এত বিপুল অংশগ্রহণ পাল্টে দিয়েছে খোদ অংশগ্রহণের ধরনটাকেই। বেঞ্জামিন এই অংশগ্রহণের রাজনীতিটাকে ধরেছেন চমৎকারভাবে।

সিনেমার পর্দা হল সেই জায়গা, যেখানে সমালোচকের সন্ধানী-দৃষ্টি আর আমজনতার গ্রহিষ্ণু মানসিকতা একত্রে কাজ করে। এর মূল কারণ, প্রত্যেক দর্শকের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া সমবেত দর্শকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হওয়ার মুহূর্তে এরা একে অন্যকে প্রভাবিত করে। অন্য যেকোনো শিল্পমাধ্যমের তুলনায় এই ব্যাপারটি সিনেমার ক্ষেত্রে বেশি ঘটে থাকে।

শিল্পকলার এই রাজনীতিতেই নতুন শিল্পবোধের উদ্বোধন। নতুন শিল্পেই আবার নতুন শিল্প উপভোগের সূত্রও নিহিত। অংশগ্রহণের রাজনীতি সামষ্টিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রশ্নাতীত করে তুলেছে। সামনে এনেছে সামষ্টিক উপভোগের প্রশ্নকে। বেঞ্জামিনের মতে, এতে করে শিল্পকলার সামনে সবচেয়ে জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে- উপভোগের খোরাক যুগিয়ে গণচিত্তের জাগরণ। প্রচণ্ড অভিঘাত সৃষ্টির সক্ষমতায় চলচ্চিত্র দর্শকের নতুন উপভোগ-প্রবণতাকে তৃপ্ত করে।

এই গণজাগরণের রূপ বৈচিত্র্য কী? বেঞ্জামিন দুইটা কনটেক্স থেকে মূলত এই গণজাগরণের স্বরূপটিকে চিত্রিত করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে, পুঁজির ক্রমবর্ধমান বিকাশে আরও বেশি মানুষের সর্বহারা শ্রেণীভূক্ত হওয়া এবং আমজনতার বাড়-বাড়ন্ত চায় বিদ্যমান সম্পত্তি কাঠামোর পরিবর্তন। অন্যদিকে দ্বিতীয়টিতে, ফ্যাসিবাদী শক্তি চায় বিদ্যমান সম্পত্তি কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে জনতাকে সংগঠিত করতে। আর এর জন্য সম্পত্তির বিদ্যমান বিন্যাসের মধ্যেই ফ্যাসিবাদ জনতার জাগরণ কামনা করে- জনতাকে বশীভূত করে রাখতে চায়। জনতার উত্থান সম্ভাবনা বিশেষ আচার বা নিগড়ে বাঁধতে চায়। তাই ফ্যাসিবাদে নান্দনিকতা রাজনীতির স্থলাভিষিক্ত হয়।

বাংলাদেশে গণজাগরণের মূল প্রসঙ্গ বা প্রধান এজেন্ডা কী? রিপাবলিক হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ এবং একাত্তর পরবর্তী ক্ষমতাতন্ত্রের স্বরূপের মধ্যেই এই প্রশ্নের মীমাংসা আছে। বাংলাদেশের অধিপতি বয়ানে বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হাজির হয়েছে একটা জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ হিসেবে। যুদ্ধের পরিণতিতে বাংলা ভূখণ্ডের মানুষের বিজয় চিত্রিত হয়েছে ‘জাতীয়তাবাদের’ বিজয় হিসেবে। একই সঙ্গে কর্তা এবং ভৃত্যকে এক বাক্সে পুরেছে এ ‘জাতীয়তাবাদ’। নিম্নবর্গ আর প্রান্তিক মানুষের জীবনবোধ-সংগ্রাম-সংহতি-ভালোবাসাকে হেচকা টানে মুছে ফেলে হাজির হয়েছে শাসক-শোষক-এলিট গোষ্ঠীর এক মহাবয়ান। কী শ্রেণী, কী লিঙ্গ, কী ভাষা-সংস্কৃতির আধিপত্যের প্রশ্নকে আড়াল করে এর গায়ে সেক্যুলার প্রলেপ লাগিয়ে এ সংক্রান্ত চিন্তা-চর্চাকে হাজির করেছে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’, ‘জাতীয় উন্নয়ন’ আর ‘জাতীয় মহত্ত্বের’ বুলিতে।

তাই জাতীয়তাবাদী দেমাগের নাগপাশ ভেঙে প্রান্তিক মানুষের উদ্বোধনই এখানের গণজাগরণ। আর এর জন্য দরকার অধিপতি জাতিরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক কর্তৃত্বের রূপগুলোকে চেনা এবং তার সমাজ গ্রাহ্যতাকে গুড়িয়ে দেয়া। আর্টের দুর্দান্ত প্রতাপশালী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের ঘাড়ে সে দায়িত্ব বর্তায় বটে। ‘জাতিরাষ্ট্র’ আর তার লুটেরা গুণ্ডারাজের হাত ধরে বেঁড়ে ওঠা এফডিসি-চলচ্চিত্রকে ‘মানুষ’ না করে ছেড়ে দিয়েছে। মানুষের জীবনবোধ ও সংস্কৃতির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে না-পারা এফডিসি-চলচ্চিত্রের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। এর নির্মাতা থেকে পরিবেশক এমনকি হল মালিকরা পর্যন্ত স্বীকার করছেন সে কথা। এফডিসি-চলচ্চিত্রের উপর মানুষের নিরাসক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে নতুন আকাঙ্ক্ষা। বিমুখতার মাত্রা এতটাই তীব্র যে, সময় দাবি করছে এক নতুন ‘শিল্পবোধের উদ্বোধন’। আর নতুন আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হাজির হয়েছে ‘শূন্যস্থান’ নির্মাণের প্রচেষ্টার মাধ্যমে। আর এফডিসি-চলচ্চিত্রের শেষকৃত্যের পর ‘শূন্যস্থান’  পূরণে রাষ্ট্র হাজির করেছে আগ্রাসী বলিউড-চলচ্চিত্র ‘আমদানির’ প্রশ্নে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বিপরীতে এ যেন ‘জাতীয়তাবাদের’ বেশাতি!

জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও যুক্তি চর্চা ধারায় ‘জাতীয় উন্নতি’ ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’ ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ এখন স্রেফ শ্লোগান। মুক্তবাজারের যুক্তিতে জাতীয়তাবাদের সারোৎসার যা কিছু, তা জৈব-জৈবনিক প্রক্রিয়ার যেন বিষ্ঠা কিংবা মলের মতোই পরিত্যাজ্য হয়েছে। তবে শ্লোগানধারী কেউ কেউ এই মহাপরাজয়কে মেনে নিতে কুণ্ঠিত হয়েছেন। বলিউড চলচ্চিত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি অব্যাহত রেখে আবারও গুণ্ডারাজের উচ্ছিষ্টভোগী এফডিসি-চলচ্চিত্রকে তাবাল দেয়ার চেষ্টায় মত্ত তারা; নতুন আকাঙ্খা-নতুন শিল্পবোধ তাদের এতটাই বেকায়দায় ফেলেছে।

বলিউড-চলচ্চিত্রের ‘আমদানি’র যৌক্তিকতা নিয়ে মেলা কথা খরচ করেছে এই ‘জাতীয়তাবাদীরা’। নিজেদের ঘরের ঐক্যের সংকটকে ঢাকতে বলিউড-চলচ্চিত্র ‘আমদানি’র প্রশ্নটিকে হাজির করেছে ‘সুশীল বিতর্ক’ হিসেবে। নতুন শিল্পবোধের উদ্বোধনের পক্ষে যারা, তাদের সামনে প্রধানত দু’টি কর্তব্য হাজির হয়েছে। প্রথমত, বলিউডি-চলচ্চিত্রকে মোকাবেলা করা। দ্বিতীয়ত, এই সুশীল বিতর্কের গোমরটা ফাঁস করে দেয়া।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : না শিল্প- না শিল্পখাত’, মাজেজাটা কী?

চলচ্চিত্রই একমাত্র শিল্পকলা যা তৈরির জন্য একদিকে জোরালো অবকাঠামো ও শিল্পখাত থাকতে হয়। আবার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেও এর পিছনে থাকতে হয় আরেকটি শিল্পখাত। একদিকে উৎপাদন কাঠামো অন্যদিকে পরিবেশন ও প্রদর্শনের কাঠামো। দুঃখের কথা, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে দ্বিতীয় কাঠামোটির কোনো অস্তিত্ব নেই। চলচ্চিত্র বাংলাদেশে না ‘শিল্প’, না ‘শিল্পখাত’।৪

একবারে মোদ্দা জায়গাটাই ধরেছেন ক্যাথরিন। ‘চলচ্চিত্র বাংলাদেশে না শিল্প, না শিল্পখাত’। কিন্তু প্রশ্নটা যদি এভাবে তুলি- শিল্পখাতে খোদ শিল্প বাঁচে কি না? শিল্পখাত কি শিল্প করতে পারে? গত শতকের টুইনটিজে আমেরিকায় ম্যাস কালচার গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গেল গেল রব তুলেছিল শিল্পকে ‘শাশ্বত’ গণ্যকারী নাৎসি নন্দনতত্ত্ববাদীরা। তাদের স্পষ্ট ঘোষণাই ছিল Film can not be art because they no longer possessed the `aura’ of authentic and genuine works of art. ওয়াল্টার বেঞ্জামিন নাৎসি নন্দনতত্ত্বের তাত্ত্বিক কাঠামোটার অসাড়তা প্রমাণ করলেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায়। শিল্পখাত-অবকাঠামো ও তার মালিকানা একটা বড় প্রশ্ন। পুঁজি-সভ্যতার অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যে উৎপাদিত চলচ্চিত্র ‘শিল্প’ নাকি ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’?  ফ্রাংকফ্রুট তাত্ত্বিক থিওডর এ্যাডোরনো ‘ডায়েলেক্টিকস অব এনলাইটেনমেন্ট’ বইটির পুনর্বিবেচনা নোটে ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

The cultural industry fuses the old and familier into a new quality. In all its branches, products which are tailored for consumption by masses and which to a great extent determine the nature of that consumption, are manufactured more or less according to plan.

সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি যে পণ্যকারী তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর পণ্যের লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা। এই মুনাফামুখীনতা প্রথমেই শিল্পকে বাগে আনে। তাকে হয়ে উঠতে হয় ‘বিশুদ্ধপণ্য’। এই ‘বিশুদ্ধতা’র গুণেই তার প্রসার। আর প্রসারেই প্রবৃদ্ধি। তাই ক্যাথরিন মাসুদ যখন ‘শিল্পখাতের’ কথা বলেন তখন আমরা বুঝি ইন্ডাস্ট্রিকে- যা কিনা ওই পণ্য উৎপাদনের যন্ত্র। আর যখন তিনি বলেন ‘শিল্প’- তখন আমরা বুঝি ওই ‘বিশুদ্ধতাকে’ যা কিনা পণ্যের প্রসারকে করে তোলে নিরন্তর। বাজারের যুগে ‘শিল্প’ আর ‘শিল্পখাত’ কে টিকতে হলে মেনে চলতে হয় ‘বিশুদ্ধতা’র উৎপাদনী অমোঘ আইনকে।

ইন্ডাস্ট্রি>বিশুদ্ধপণ্য>মুনাফা

>ইন্ডাস্ট্রির প্রবৃদ্ধি

বিশুদ্ধতা>প্রসার> মুনাফা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘শিল্প’ মানে ‘পণ্যমান’ নিয়ে ক্যাথরিন রুষ্ঠ। কলকব্জা বিকল রুগ্ন ইন্ডাস্ট্রির অস্তিত্বই তার কাছে বিলীন হয়ে গেছে ‘বিশুদ্ধপণ্য’ উৎপাদন হচ্ছে না বলে। কিন্তু কোন কারণে এখানকার ইন্ডাস্ট্রি এতটা রুগ্ন হলো? আর কেমন করেইবা তার কলকব্জা এতটা বিকল হলো যে, সে ‘বিশুদ্ধতা’ উৎপাদনে একেবারে বন্ধ্যার পরিচয় দিচ্ছে? পাঠক,  চলুন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা ঢালিউড তথা ঢাকাই সিনেমার গৃহ- এফডিসির দর্শন করি-

এফডিসির হাল হকিকত : জাতীয় সংস্কৃতির উদ্বোধন

নাকি হাতির পাঁচ পা দর্শন?

এফডিসি- ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দটা নিয়ে সমাজে বেশ ভক্তি আছে। শাসক-শোষক-ভদ্রলোক থেকে শুরু করে চাকর-বাকর-চাপরাশি-আমজনতা সবাই চায় ‘উন্নয়ন’। এর রূপ-বৈচিত্র পরখ করে দেখলেই স্পষ্ট হয় ‘ডেভেলপমেন্ট’ জিনিসটা প্রো-পিপল নাকি এন্টি-পিপল। ইতিহাসগতভাবে ‘উন্নয়ন’ নয়া উপনিবেশিক কর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর পশ্চিমা প্রভু-শাসন থেকে উপনিবেশগুলো ‘মুক্ত’ হতে শুরু করলে দরকার পড়ে নতুন ক্ষমতা-সম্পর্ক। যাতে পশ্চিমের ঈশ্বরতুল্য শাসন আরও বেশি গ্রহিষ্ণুতা নিয়ে বহাল থাকতে পারে। এই নতুন ক্ষমতা-সম্পর্কে ‘সদ্য স্বাধীন’ ‘জাতিরাষ্ট্র’গুলোই ‘অনুন্নত’। আর ‘উন্নত’ হলো প্রভু পশ্চিম। প্রকৃতি-মানুষ-সম্পদ ‘উন্ন্নত /অনুন্নত’র ভিত্তি না-ভিত্তি হলো পুঁজি-প্রযুক্তি-পণ্য। পুঁজির বিকাশ আর মুনাফার নেশাতেই এত এত পলিসি- কখনো ‘ঋণ’, তো কখনো ‘দারিদ্র বিমোচন’, তো আবার কখনো ‘সবুজ-বিপ্লব’। আর এসব পলিসির অ্যাপ্লিকেশনই ‘উন্নয়ন’।

এই ‘উন্নয়ন’ একদিকে যেমন পশ্চিমা কর্তৃত্বের অর্থনৈতিক হাতল, অন্যদিকে ‘জাতিরাষ্ট্রের’ শাসক-শোষক গোষ্ঠীর জন্য তা কেবল উচ্ছিষ্টভোগের নিরঙ্কুশ স্বৈরক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তিও বটে। Ôজনস্বার্থ বিকাও উন্নয়নের নামে’, ‘প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ বেচো উন্নয়নের নামে’, ‘তেল-গ্যাস বিকাও উন্নয়নের নামে’- ‘উন্নয়ন’ জনতাকে বাগে রাখার মোক্ষম মারিজুয়ানা। জনতা এতেই ভোলে, না ভুললে, না বাগে আসলে, তাদের সাইজ করো- সেটাও আবার সেই ‘উন্নয়নের’-ই নামে। শাসকের চোখটাই এমন। ‘জাতিরাষ্ট্রে’ ‘উন্নয়ন’ তাই একইসঙ্গে শাসকের শাসনযোগ্যতা ও শাসনগ্রাহ্যতা- দুটোরই ভিত্তি নির্মাণ করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ‘উন্নয়নের’ একই কাজ। ‘স্বাধীন’, ‘সার্বভৌম’ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাবের পরও এখানের শাসক পশ্চিমা ক্ষমতারই অংশ হিসেবে- তার উচ্ছিষ্টভোগকেই ক্ষমতার উৎস করেছে। জনসম্পদের উপর তাদের গোষ্ঠীগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চালিয়েছে লুটপাটের মচ্ছব। কায়েম করেছে নিপীড়নের গুণ্ডারাজ। আর এই স্বৈরতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করতে- প্রতিরোধহীন করতে হাজির হয়েছে ‘জাতিরাষ্ট্রের’ শ্লোগান- ‘জাতীয় উন্নয়ন’, ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ ‘জাতীয় সংস্কৃতি’।

এফডিসি রাষ্ট্রের এই ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ নির্মাণেরই একটা ইন্সট্রুমেন্ট। পাকিস্তানি আমলা-সামরিক-ভূস্বামী কর্তৃত্বতন্ত্রে তার যা কাঠামো-কাজ, ‘স্বাধীন’ বাংলাদেশে তার একই কাঠামো-কাজ। রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার সাথে ‘জাতীয় সংস্কৃতিকেও’ ‘স্বাধীন’ বাংলাদেশে নিরঙ্কুশ করতে চাওয়া হয়েছে; এফডিসি-চলচ্চিত্রের প্রসারকে বাধামুক্ত করতে। ’৭২ সালে বিদেশি চলচ্চিত্র ‘আমদানিতেও’ আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা।

কিন্তু এই ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ তো ফাঁপা। ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ ‘জাতীয় উন্নয়নের’ বুলি ছাড়া কিছুই হাজির করার মতো সামর্থ্য ছিল না তার। তাই সদ্য সমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধকে স্থূলভাবে পরিবেশন করে ‘জাতীয় ঐতিহ্যের’ ঝাণ্ডা তুলে ধরার চেষ্টা করলেও তাকে এক দশকের মধ্যে পুরোপুরি নেমে আসতে হয়েছে ছদ্ম-বাস্তব উৎপাদনে। আর এর জন্য বলিউড-ই ছিল তার মডেল। বাংলাদেশী সিনেমা তাবৎ অথরিটি নিয়ে উদয় হলেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনাগত সংকটের কারণে বারোটা বেজেছে এফডিসির। এবং সঙ্গে বাংলা সিনেমারও।

চেতনাগত সংকট যদি না-ও থাকত তা-ও কি ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ উৎপাদনের মতো কাঠামো এফডিসির ছিল? সাংবিধানিকভাবেই এফডিসি পুরোপুরি একটা আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এর গভর্নিং-বডি নির্ধারিত হয় বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট আইনের ধারা-৭ মোতাবেক। পদাধিকারবলে আট সদস্যের সাত জনই আমলা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তথ্য সচিব পদাধিকারবলে করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বাকিরা সদস্য। আইনে আমলাসজ্জিত এই গভর্নিং-বডিকেই দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ও সর্বময় কর্তৃত্ব। ধারা-৬ এ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এফডিসির গভর্নিং-বডির ক্ষমতা।

করপোরেশনের গভর্নিং-বডির আরেকজন সদস্য চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। চলচ্চিত্রের পরিচালক-কলা-কুশলী বা ক্রিয়েটিভ কাজের সাথে যুক্ত কেউই কিন্তু এর সদস্য নয়। যতসব আমলা, নন-ক্রিয়েটিভ লোকের বসবাস এখানে। তাই এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোটি খুবই মনোটোনাস। কাঠামোই বলে দিচ্ছে এটা একটা আমলা-শাসিত প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের চরিত্র থেকে কোনো ব্যতিক্রম এখানে নেই। দলবাজি-ঘুষখোরি-লুটপাট মিলে এটা পুরোপুরি লুম্পেনাইজড একটা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় লুম্পেনাইজেশন সবসময়ই সেক্টেরিয়ান লুম্পেনাইজেশকে তাবাল দেয়। তার সাথে গাঁটছাড়া বহাল থাকলেই তার পুষ্টি। ফলে রাষ্ট্রীয় লুম্পেনাইজেশনের মাধ্যমেই এফডিসিতে কায়েম হয়েছে এক গুণ্ডারাজ। এর সমর্থন পাই মাহবুব মোর্শেদের ব্লগ নোটের এই অংশে

গত ৪০ বছরে আমাদের সিনেমার ইতিহাস বুঝতে হইলে এফডিসিতে যাইতে হবে। খেয়াল করতে হবে, সিনেমা বানানো, সিনেমায় বিনিয়োগ ও সিনেমা দেখানোর পুরো ব্যাপারটা এই সময়ের মধ্যে কেমনে অশিক্ষিত-অপ্রশিক্ষিত গুন্ডা-পান্ডা-অপগন্ডদের হাতে চইলা গেছে।

মূলত এর ছাপ পড়েছে এফডিসি-চলচ্চিত্রে। তাই এফডিসির চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে বাইপ্রডাক্ট।

এফডিসি-চলচ্চিত্রের চিন-পরিচয় : সর্বহারা-লাখেরাজ সম্পত্তি

কিংবা নিম্নবর্গের কনজিউমার কালচার’!

আমাদের সিনেমা নিম্নবর্গের সংস্কৃতিতে পরিণত হইছে। মধ্যবিত্ত বড় হইছে, আর মার্কেটও বড় হইছে। আর সিনেমা কালক্রমে কালো টাকা গুত্তাপাত্তা আর চর্বিতচর্বন নির্মাতাদের নির্মিত নিম্নবর্গের সংস্কৃতি হিসেবে নৃতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হইছে।

সত্যি কি এফডিসি সিনেমা নিম্নবর্গের সংস্কৃতি? খোদ নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা বা সংস্কৃতি অনুসন্ধানের যে ধারা আছে, তার সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নাই? এফডিসি-সিনেমা নিম্নবর্গের কোনো নির্মাণ নয়- পুরোপুরি আরোপিত। দীক্ষায়ন সংস্কৃতির রাজনীতির ফল। ‘ছোটলোকের’ ঐক্য-সংগ্রাম-প্রতিরোধের বিপরীতে ‘ছোটলোকের’ ‘নেমকহালালি’ ‘মুখবুজে নিপীড়ন সহ্য’ এবং প্রতিরোধ দায়িত্ব ‘নিজ কাছ থেকে সরিয়ে উদ্ধারকর্তা হিরোর কাঁধে তুলে দেবার ভাবশিক্ষা উৎপাদন করে এই সিনেমা। আর থাকে বিনোদনের মোড়ক- বিনোদনে বুঁদ হয় নিম্নবর্গ। দীক্ষায়ন পুরোপুরি একটা রাজনৈতিক পদ্ধতি। কর্তৃত্বের পক্ষে ভাবশিক্ষা উৎপাদন ও প্রসারের নাম দীক্ষায়ন।

বিনোদনের রাজনীতিটা কী? বিনোদনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রম-নিপীড়নের সম্পর্ক। একটা শারীরিক খাটুনি, শরীরকে করে তোলে ক্লান্ত, মস্তিষ্ককে পীড়িত। ফলে শ্রম-নিপীড়নের কারণে অনুভূতিতে অভিঘাত না হলে সে সাড়া দেয় না। আর তাই ‘হাইফাই ভায়োলেন্স’ ‘নগ্ন-নান্দনিকতা’র এত কদর বিনোদন রাজনীতিতে। এফডিসি-চলচ্চিত্র মূলত বলিউডেরই বাইপ্রডাক্ট। বলিউডি বাস্তবতারই পুনরুৎপাদন করে সে। পার্থক্যটা হচ্ছে-

ঢালিউডের সাথে হলিউডের/বলিউডের পার্থক্য হল যৌনতা ও ভায়োলেন্স এরা বেশ সুদৃশ্য মোড়কে সুন্দর কারুকার্য করে হাজির করে। আর ঢালিউডের যেহেতু কারিগরি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য কম, ঢালিউড সেটা ‘র’ ফর্মে হাজির করে।১০

কিন্তু এই ‘র-ফর্ম’ বিশুদ্ধ-পণ্য তথা পণ্যের বিশুদ্ধতা হাজির করতে পারে না বলেই বিনোদনের সঙ্গে নিম্নবর্গের বিচ্ছিন্নতা ঘটে।

বলিউড : সর্বভারতীয়তার ন্যায় সংকটে ছদ্ম জাতীয়তার নির্মাণ

কিংবা কনজিউমারিজমের ঘাড়ে যখন টোটালিটারিয়ান কালচার

ভারত-সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তিটা তার বহুত্ববাদে। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের মধ্যেই তার গণশক্তির উদ্বোধন। এত ভাষা, এত বৈচিত্র্য, এত বহিঃপ্রকাশ তাকে এনে দিয়েছে নিজ সমাজে নিরন্তর লেনদেন-মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ। এই মিথস্ক্রিয়াই তাকে দাঁড় করিয়েছে নিজ নিজ পরিসরের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি তথা প্রগতির অবারিত সুযোগের সামনে। রবীন্দ্রনাথ তাই ভারতীয় সমাজে ‘মিলন’ দেখেছিলেন- খুঁজেছিলেন ‘বিভেদের মাঝে ঐক্য’।

গণশক্তির উদ্বোধন ভারতীয় কেন্দ্রীয় পুঁজি আর আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্ভর ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা এই গণশক্তি একদিকে যেমন ভাষা-সংস্কৃতির মুক্তিমুখীন উপাদানগুলোকে একত্রিত করে, অন্যদিকে তেমনি প্রশ্ন করে শাসনের শ্রেণী-গোষ্ঠী-কর্তৃত্বের কাঠামোকে। তাই গণশক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গান্ধী-নেহেরু-কংগ্রেসিদের সামনে খোলা রেখেছিল একটাই পথ- যার নাম সর্বভারতীয়তা। এই সর্বভারতীয়তা, ভারতীয় বহুত্ববাদ-বিনাশী শাসক আধিপত্যেরই মতবাদ।

সর্বভারতীয়তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বোধন নয়। তাকে নির্মাণ করতে হয়। এই নির্মাণের প্রধান উপাদানই হলো ‘হিন্দুত্ব’। ধর্ম-শাস্ত্রের ‘হিন্দুত্ব’ নয়- ‘হিন্দুত্বের ঐতিহ্য’।১১ দ্বিতীয়ত, হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা আচারনিষ্ঠ ভাষা হিসেবে হিন্দির রাষ্ট্রীয় ভিত্তি নির্মাণ। তৃতীয়ত, হিন্দুত্বের ঐতিহ্যকে ‘জাতীয় ঐতিহ্যে’র রূপদান এবং শ্রেণী-গোষ্ঠী-সমাজ নির্বিশেষে একটি টোটালেটারিয়ান কালচার নির্মাণ। স্বভাবতই সর্বভারতীয় সংস্কৃতি তাই আধিপত্যবাদী-সর্বগ্রাসী।

এই ছদ্ম জাতীয় সংস্কৃতির উৎপাদনে সবচেয়ে পারদর্শী সবচেয়ে মোক্ষম এবং সর্বব্যাপী ক্ষমতার অধিকারী ইন্সট্রুমেন্টই হলো বলিউড। পুঁজি-প্রযুক্তি আর নুমায়েশ তার শক্তি। গত শতকের টোয়েন্টিজে দাদা সাহেব ফালকের হাত ধরে পথ চলা শুরু হলেও পঞ্চাশের দশকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয় ভারতীয় হিন্দি সিনেমা। পঞ্চাশের দশকে রাজকাপুর-দীলিপকুমার-মধুবালা-বৈজয়ন্তী বালার কাঁধে ভর দিয়ে রচিত হয় ভারতীয় ফিল্মের ‘গোল্ডেন এজ’। আর এর মাত্র বিশ বছরের মধ্যে হলিউডকে পেছনে ফেলে বলিউড হয়ে ওঠে কোয়ান্টিটেটিভলি দুনিয়ার লারজেস্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

পুঁজি প্রযুক্তি আর নুমায়েশের অভীন্ন পথরেখা নির্মাণের মধ্য দিয়ে বলিউডের জায়ান্ট হয়ে ওঠা। ফ্রাংকেস্টাইন বলিউড ফুলে-ফেঁপে আরও বড় আরও দীর্ঘ হয়েছে তার টোটালিটারিয়ান ক্যারেক্টারের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এই টোটালিটারিয়ানিটির ভিত্তি সর্বভারতীয় ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ নির্মাণের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার হলো কনজিউমারিজম। ‘বাজারের যুগে সবই পণ্য, সবই মাল- শুধু বেচ আর মাল কামাও। মাল কামাও আর খাও। খাও আর ভোগ কর।’১২ এই হলো কনজিউমারিজমের মূল কথা। তবে একথা ঠিক বলিউড নয়, ভারতীয় সমাজে কনজিউমারিজমের জন্ম উপনিবেশের হাত ধরেই। রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে এই সম্পর্কে দুর্দান্ত ইশারা দিচ্ছেন সেলিম রেজা নিউটন।

এখন টাকা সম্পর্কে সকলেই অত্যন্ত সচেতন হয়ে উঠিতেছে। সেজন্য এমন একটা দীনতা আসিয়াছে যে টাকা নাই, ইহাই স্বীকার করা আমাদের পক্ষে সকলের কাছে লজ্জাকর হইয়া উঠিতেছে। ইহাতে ধনাড়ম্বের প্রবৃত্তি বাড়িয়া ওঠে, লোকে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয় করে, সকলেই প্রমাণ করিতে বসে যে, আমি ধনী। বণিক জাতি রাজসিংহাসনে বসিয়া আমাদিহগকে এই ধনদাসত্বের দারিদ্র্যে দীক্ষিত করেছে।১৩

রবীন্দ্রনাথের এই ধনদাসত্বে দীক্ষিত হওয়াকেই সেলিম রেজা নিউটন দেখেছেন ‘দীক্ষায়ন প্রকৌশল’ হিসেবে। এই দীক্ষায়নই কনজিউমারিজমের সর্বব্যাপিতা ঘোষণা করছে। ভারতের ভূখণ্ডগত বিশালতা আর বহুপক্ষীয় ক্ষমতাচর্চা তার অভ্যন্তরীণ পুঁজির বিকাশের পথে সহায়ক হয়েছে। ফলে পুঁজির বিকাশ আর কনজিউমারিজম চলেছে হাতে হাত ধরে।

বলিউড আগ্রাসন : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অভিঘাত

এবং নয়া শিল্প আকাঙ্ক্ষার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

বলিউড আগ্রাসন শুধু ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরই সর্বনাশ করে ছাড়ে নি, ভারতীয় সীমান্তের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে তার সাংস্কৃতিক সীমান্ত। দুনিয়ার ৩৯টা মুল্লুকে বলিউড-চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। প্রভাব পড়েছে ঐসব মুল্লুকের ভাষা-সংস্কৃতি এমনকী জনচেতনাতেও। নির্মিত হয়েছে নতুন ডিসকোর্স। ‘ডিসকোর্স একদিকে যেমন একটা আলোচ্যবস্তু নিয়ে কথা বলার নির্দিষ্ট উপায় নির্ধারণ করে। কথা বলা, লেখা, আচরণ প্রকাশের বুদ্ধিমত্তাজাত উপায় সংজ্ঞায়িত করে; অন্যদিকে অন্য উপায়ে কথা বলা, আলোচ্য বস্তু অনুযায়ী ভিন্নদর্শী আচরণ প্রকাশ এবং এ সংক্রান্ত জ্ঞান উৎপাদন বাতিলও করে দেয়।’১৪

তাই শুধু ‘সাইফাই ভায়োলেন্স’ আর ‘নগ্ন-নান্দনিকতায়’ বশ নয়- নিরঙ্কুশ বিনোদন নয়, বলিউড-চলচ্চিত্রকে পাল্টে দিয়েছে ভাষার মাধ্যমে অর্থ চর্চার ধরনকে। পাল্টে দিয়েছে খোদ ভাষার অভ্যন্তরীণ সম্পর্কগুলোকেও। পরিবর্তন কোনো দোষের জিনিস নয়। কিন্তু প্রশ্নটা পরিবর্তনের ‘নির্ধারক’ নিয়ে- তার কর্তাকে নিয়ে; এমনকি খোদ কর্তৃত্বকে নিয়েই।

কনজিউমারিজমের ঘাড়ে ভর করে গুলতানি মারা বলিউড- যা কিনা ভারতীয় আগ্রাসী ক্ষমতা আর পুঁজিরই মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান- বিশ্বায়ন মুক্তবাজার বা নিও-লিবারালিজমের নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে আর সর্বপ্রথম তার কর্তৃত্বের বলি হবে এখানকার নতুন শিল্প-আকাঙ্ক্ষা। তার পেটে ঢুকবে চলচ্চিত্রকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা নতুন শিল্পবোধের সম্ভাবনা; গ্রাস হবে বলিউড টোটালেটারিয়ান কালচারের।

ঠিক যেমনটি ঘটেছিল পলাশীর প্রান্তরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় শুধু এই ভূখণ্ডের সামন্ততন্ত্রের পরাজয় নয়। একইসঙ্গে সামাজিক উৎপাদনশক্তির পরাজয়ও বটে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা নেবার পর ক্লাইভের নিপীড়নে ছিয়াত্তরের মন্বত্বর, আর ভয়াবহ বন্যার প্রকোপ দেখেছে মানুষ। মঙ্গা-মোড়ক আর শাসকের নিপীড়নে সংস্কৃতির উপর জেঁকে বসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অভিঘাতের সাক্ষী হয়েছে সে।১৫

রঙ্গলাল সেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানকে ভারতীয় সমাজের ধনতান্ত্রিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হবার কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ‘পলাশীর যুদ্ধের পর বৃটিশ শাসকেরা দেশীয় ব্যবসায়ীদের উৎখাত করার জন্য ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের বেশি সুযোগ সুবিধা দিতে শুরু করে।...শুধু তাই নয়। বিত্তবান ব্যবসায়ীদেরও বিকল্প বিনিয়োগের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মূলধন প্রধানত জমিতে খাটাবার হিড়িক পড়ে যায় এবং এর ফলে একটি অভিজাত শ্রেণীর পরিবর্তে একটি নতুন ভূমিভিত্তিক অভিজাত গোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।’১৬

উপমহাদেশের ইতিহাসে এর নাম চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই বন্দোবস্ত প্রথার মধ্যে দিয়ে ‘ভূমিভিত্তিক অভিজাত গোষ্ঠীতে’ পরিণত হয় কলকাতার নতুন বেনিয়া-বাবুরা। নতুন সম্পত্তির মালিকানার ধরন তাদের পরিণত করে ‘অনুপস্থিত-জমিদারে’। এই বেনিয়া-বাবুদের হাতেই জন্ম নেয় কলকাতার নতুন নগরানা-সংস্কৃতি-বাবু কালচার। নববাবু বিলাস গ্রন্থে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যয় চমকপ্রদ সব বর্ণনা হাজির করেছেন। ‘ইংরেজ কোম্পানি বাহাদুর’ অধিক ধনী হওনের অনেক পন্থা করিয়াছেন। সুতরাং ‘মুৎসুদ্দীবৃত্তির দ্বারা’ ‘বাইজি নাচ-বেশ্যা গমন-পায়রা উড়িয়ে-বাদরের বিয়ে দিয়ে’ অর্থব্যয়। অমিতাভ চক্রবর্তী লিখছেন, ‘নগর সভ্যতার অপর একটি অবদান বারাঙ্গনা পত্নী। বাবু কালচারের যুগে এই শহরে বেশ্যা গমন সামাজিক মর্যাদা হানি ঘটানো না, বরং অন্যতম অভিজাত ক্রিয়া হিসেবে গণ্য হতে পারে। সেই কারণে নগরের মধ্যে অভিজাত পল্লীর কাছে এই পতিতা পল্লীগুলি অধিষ্ঠান করত।’১৭

এই বাবু কালচার শুধু বাবু মহলেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। ক্ষমতার সর্বব্যাপী চরিত্রের কারণেই ক্রমেই তা বশ করেছে পুরো নগরকে। হয়ে উঠেছে খোদ নগরায়নেরই উপাদান। বিনয় ঘোষ জানাচ্ছেন,

মুদ্রণের স্বাধীনতা অপব্যবহার করে অনেক মুনাফালোভী প্রকাশক রতিমঞ্জুরি বিদ্যাসুন্দর কামশাস্ত্র প্রভৃতি যৌন বিষয়ের সচিত্র বই ছেপে স্বল্পশিক্ষিত পাঠকের রুচি বিকৃতিতে সাহায্য করেছেন। রেভরারেন্ড লং তার ১৮৫৬ সালের বাংলা বইয়ের হিসেবের মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে অশ্লীল যৌনবিষয়ক একটি বই ২০ খানা চিত্রসহ এক বছরে ত্রিশ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।১৮

পাঠক শ্লীল-অশ্লীল আমাদের প্রশ্ন না। প্রশ্নটা কনজিউমারিজমের। এই কনজিউমারিজমের বিধ্বংসী প্রভাবে যেমন করে বাবু কালচারকে নিরঙ্কুশ করেছিল, বলিউড কনজিউমারিজমের হাত ধরে তেমন করেই, একটা ‘বলিবয় কালচার’ দাঁড়াবে তাতে সন্দেহ নাই। রাষ্ট্র আমাদের সেই নিয়তির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিপীড়ন-রাজনৈতিক অভিঘাত যেমন করে এখানে শিল্প-সংস্কৃতিকে রুদ্ধ করে ফেলেছিল, বিশ্বায়নের নামে, মুক্তবাজারের নামে বলিউডও তেমনি একটি রাজনৈতিক অভিঘাত হানবে বাংলাদেশের সমাজে। বিশ্বায়নের যুগে গণমাধ্যমের রাজনীতিকে খুব চমৎকারভাবে ধরেছেন চমস্কি। ভারত ভ্রমণে এসে ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাতকারে চমস্কি খোলাসা করেছেন সে রাজনীতিকে-

এ হলো বাণিজ্য সংস্থার দুঃশাসন। এরা হলো বিশাল কর্পোরেশন এবং অত্যাচারী ও সম্মিলিত এক গোষ্ঠী। তাদের মূল আগ্রহ হলো মুনাফা। কিন্তু এর চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থ হল এরা একটি সুনির্দিষ্ট ধরনের অডিয়েন্স তৈরী করতে চায়। যাদের জীবন-পদ্ধতি হবে কৃত্রিম চাহিদা-নির্ভর। তারা এমন অডিয়েন্স তৈরী করতে চায় যারা হবে নিঃসঙ্গ এবং বহুধাবিভক্ত যাতে করে আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করতে না পারে।১৯

স্যাটেলাইট-ভিডিও’র মারফতে বলিউড-চলচ্চিত্র বাংলাদেশে ঢুকেছে। আর তার প্রভাবও আমরা লক্ষ্য করতে শুরু করেছি। এদেশের অনেক শিশুই এখন বলিউডি-ভাষিক জগতের বাসিন্দা- বলিউড বাস্তবতায় নিমজ্জিত। এমন অনেক অর্থ আছে, যা তারা আর মাতৃভাষায় প্রকাশ করতে পারে না- চর্চাও করতে পারে না। চর্চা করতে হয় বলিউডি হিন্দিতে। বন্ধুদের মধ্যে অনেককেই দেখেছি, ওই দাপুটে সংস্কৃতির ভোগবাদী বাস্তবতাকে একটু একটু আয়ত্ত করতে। একটা শাব্দিক উদাহরণ দেয়া যাক। ‘ডিংডং’ শব্দটির অর্থ আমার কাছে আমাদের কাছে ঘণ্টার শব্দ। একসঙ্গে বন্ধুরা মিলে বলিউডি-চলচ্চিত্র ‘হাম তুম’ দেখতে গিয়ে এর ভিন্ন অর্থ আবিষ্কার করা গেল। ডিংডং শব্দটির উচ্চারণ এবং দৃশ্যে সাইফ আলী খানের চোখের ইশারায় এর অর্থ দাঁড়াল খুবই বিচিত্র। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এর অর্থ দাঁড় করালো ‘বন্ধুত্বের সম্পর্কে দুষ্টুমির ছলে সেক্স করা।’

কনজিউমারিজম এমন করে বাস্তবে হাজির করে তার অনুগামী অর্থ ও জীবন চর্চা। এ অবস্থায় বলিউড-চলচ্চিত্রের আগ্রাসন যত তীব্র থেকে তীব্রতর হবে, নতুন শিল্প আকাঙ্ক্ষা তত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে শুরু করবে। নতুন শিল্পবোধের উদ্বোধনের সম্ভাবনাও নির্বাসিত হবে হয়ত চিরতরে। আমরা আবিষ্কৃত হব এক সাংস্কৃতিক উপনিবেশে। তাই বলিউডকে মোকাবেলার প্রশ্নটি এখন মুখ্য প্রশ্ন। এই প্রশ্ন কোনো জটিল মীমাংসা নয়। বলিউড-চলচ্চিত্র মিডিয়ার সর্বব্যাপী চরিত্রের জন্য পৌঁছে যাবেই, তাই দরকার, একে সাংস্কৃতিকভাবে ক্রিটিক করা। মতাদর্শিকভাবে ওই ক্রিটিককে প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, বলিউড-চলচ্চিত্র ‘আমদানি’- ‘আমদানি’ যেখানে মুক্তবাজার আগ্রাসনের ইন্সট্রুমেন্ট- আর রাষ্ট্র হচ্ছে ওই ‘আমদানিকে’ নিরঙ্কুশ করার যন্ত্র- তার বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রাম হাজির করা।

ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি : প্রথম আলোর বিতর্ক উৎপাদন

যখন মুক্তবাজারের ওকালতি

ডিসকোর্স টপিক সিলেক্ট করে। ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি’ এটা কোন ডিসকোর্সের টপিক? খোদ ‘আমদানি’ প্রত্যয়টি কি মুক্তবাজারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কাছে সমর্পণের সাইন নয়? বলিউড-টোটালিটারিয়ান কালচারের ডিসকোর্সকে আশ্রয় করে টপিক সিলেক্ট করা যেত না? বলিউড সিনেমার আগ্রাসন হিসেবে বিষয়টি পাঠ করা হচ্ছে না কেন? একটা বিতর্ক, কতটা বিতর্ক- তাও নির্ধারিত হয় তার ডিসকোর্স দিয়ে। ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি বিতর্ক’- এর মাধ্যমে বিতর্ককে কি জিইয়ে রাখা হচ্ছে? ‘বিতর্কের’ পক্ষ কারা? পক্ষগুলো কোন ডিসকোর্সের প্রতিনিধিত্ব করে? তাদের মধ্যে বিবাদের কারণ হিসেবে কোন লাইন অব রিজন হাজির হয়? মূলত এসব প্রশ্নের মোকাবেলার অংশ হিসেবেই আলাদা একটা প্রবন্ধের জন্য নোট নিয়েছিলাম। তদন্তের টেক্সট ছিল প্রথম আলো। আপাতত এই লেখার সঙ্গে সেই নোটটা জুড়ে দিলাম, পাঠকের কথা ভেবে। একটু পরিমার্জনা করে।

৮ ডিসেম্বর ২০১১ প্রথম আলোতে ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র মুক্তি বিতর্ক’ শিরোনামে এ নিয়ে বিবাদমানদের মতামত ছাপা হয়েছে। সেটি নিয়ে এখনকার আলোচনা-

মুক্তি নাকি পরাধীনতা?

‘মুক্তি’ শব্দটিতে চোখ আটকে যায়। ‘মুক্তি’ শব্দটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের তথা আগ্রাসী বলিউডি সংস্কৃতির পসারকে ইন্ডিকেট করে। কেন ‘মুক্তি’? বিদেশি চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা ছিল; নিষেধাজ্ঞা উঠছে- তাই ‘মুক্তি’। অর্থাৎ এই ‘মুক্তি’ ‘মুক্তবাজারের’ ‘মুক্তি’- নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের মাধ্যম বাজার-রাজনীতির কর্তার পক্ষেই দাঁড়ায়। ‘মুক্তি’ শব্দের রেপ্রিজেন্টেশন তাই বলে।

বিতর্ক মাজেজা এবং বিবাদের রাখঢাক

‘বিতর্কের’ শুরুতেই প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নোট-

দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্তি পাচ্ছে ভারতীয় চলচ্চিত্র জোর। এরই মধ্যে ভারতীয় চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়া নিয়ে চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পীরা এর বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে ছবি মুক্তি দেয়ার সপক্ষে নেমেছেন সিনেমা হল মালিকরা। সংস্কৃতি কর্মীরাও তাঁদের মতামত দিয়েছেন। এবারের আয়োজন কারা কী বলছেন তা নিয়ে।২০

‘কারা কী বলছেন’ এটাই প্রথম আলোর ‘বিতর্ক’ বিভিন্নজনের মতামত হুবহু ছেপে দিয়ে তার নামকরণ করা হলো ‘বিতর্ক’। এটা যে ‘বিতর্ক’তা নিরঙ্কুশ করতে হাজির করা হয়েছে আবার ‘পক্ষ-প্রতিপক্ষকে’। একটি ‘পক্ষ’ প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পীরা। অন্য ‘পক্ষ’ সিনেমা হল মালিক-‘প্রদর্শক’রা। আর আছেন একাডেমিশিয়ান ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। প্রথম আলোর বর্ণনায় তারা হলো ‘মতামত’ দানকারী, ‘বিতর্কের’ ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ নয়। কিন্তু এই ‘বির্তক’ নির্মিত। মতামত দানকারীদের কাছ থেকে বক্তব্য নিয়ে তা পত্রস্থ করার মাধ্যমে এই বির্তক নির্মিত হয়েছে। বাস্তবে ইস্যুটি নিয়ে যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট তাদের বিবাদকেই বলা হচ্ছে ‘বিতর্ক’। এই ‘বিতর্ক’ তার মানে বিবাদের ‘সুশীল’ নির্মাণ।

পক্ষ ডিসকোর্স

‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুক্তি’র প্রস্তাবনার ‘পক্ষে’ কারা? সিনেমা হল মালিক বা ‘প্রদর্শক’রা । প্রস্তাবনার পক্ষে তাদের যুক্তি কী? আসলে যুক্তি, না স্বার্থ?

১. ভাল সিনেমা বাংলাদেশ হচ্ছে না- তাই ছবির দর্শক নেই, তাই লোকসান দিতে হচ্ছে।

২. ভারতীয় সিনেমা স্যাটেলাইটে আগে থেকেই প্রদর্শিত হচ্ছে, সিনেমা হলে প্রদর্শিত হলে সরকার রাজস্ব পাবে।

৩. ভারতীয় সিনেমা এলে দেশী সিনেমা প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে।

‘লোকসান’ ‘রাজস্ব’ ‘প্রতিযোগিতা’ অর্থনৈতিক স্বার্থকেই ইন্ডিকেট করে। হল মালিকের একজন সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেই ফেলেছেন, ‘এক হাজার ২০০ সিনেমা হল ছিল...সেখান থেকে কমতে কমতে ৫০০ তে নেমে এসেছে।’ কারণটা কী? মুখ ফসকে বলেই ফেলেছেন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি কে এম মঞ্জুর, ‘এখন যদি কোনো ডেভেলপারকে বলি যে, আমাদের জায়গাটি নিন, তাহলে এক কোটি থেকে ১৫০ কোটি টাকা পাবে।’ গত ২০ বছরে হল মালিকরা কেন হলের জায়গা-জমি বেঁচেছেন তা স্পষ্ট হলো। ডেভেলপার তাকে বেশি টাকা দিতে পারে। বাজার অর্থনীতিতে আধিপত্য আগে ‘ক্ষুদ্রকে’ খায়- তাই হচ্ছে। এখন্র ‘ক্ষুদ্র’রা, হল মালিকরা ওই বাজার অর্থনীতির ‘ছোটপক্ষ’ হতে চাইছেন। তাদের যুক্তির ডিসকোর্স মুক্তবাজারের। প্রথম আলোর ‘বিতর্ক’ নির্মাণের মাধ্যম যে মুক্তবাজারের পক্ষ নিয়েছে, তা আরও একবার বোঝা গেল।

বিপক্ষ ডিসকোর্স

‘ভারতীয়’ চলচ্চিত্র মুক্তি প্রস্তাবনার বিপক্ষ প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পীরা। তাদের যুক্তি কী?

১. দেশী চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

২. চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা বেকার হয়ে পড়বে।

৩. দেশপ্রেম।

এখানেও স্বার্থের প্রশ্ন। স্বার্থগুলোর অন্তত প্রথম দু’টি অর্থনৈতিক। ‘দেশী চলচ্চিত্রের ধ্বংস’- এর অর্থ হলো তাদের ফিল্ম আর বাজারে চলবে না- কেউ কিনবে না। বেচাকেনা না হওয়া মানেই চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হওয়া। এই যুক্তির প্রথম স্বীকার্য হলো- বাজার ছাড়া চলচ্চিত্র বাঁচে না। দ্বিতীয় স্বীকারয হলো- বাজার ছাড়া চলচ্চিত্র বাঁচে না; তার মানে যুক্তিটা বাজারের স্বার্থেই। তাদের যুক্তির মধ্যে ‘জাতীয়তাবাদের’ গন্ধও আছে। ‘দেশপ্রেম’; ‘বিজয়ের মাসে ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি’ প্রত্যয়গুলো তারই প্রমাণ। কিন্তু এই ‘জাতীয়তাবাদ’ রাষ্ট্র প্রশ্রয়ে লালিত পালিত। তাই সে ‘প্রটেকশন’ চায়।

এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্তরা ৮০’র দশক থেকেই বলিউডের বাইপ্রডাক্ট ফিল্ম বানাচ্ছে। বলিউড বাস্তবতার স্থূল পুনরুৎপাদন করেছেন তারা। সৃষ্টি হয়েছে একটা বলিউডি বাস্তবতার আবহ। এই আবহের হাত ধরেই যে, ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুক্তি (আসলে আগ্রাসন) তা প্রথম আলোর বিতর্ক’ নির্মাণে ঢাকা পড়ে। ঢাকা পড়ে জাতীয়তাবাদীর রাষ্ট্রীয় উচ্ছিষ্টভোগও।

তাহলে কী দাঁড়ালো? প্রথম আলো প্রথমত, মুক্তবাজারের অধিপতির পক্ষে। দ্বিতীয়ত, সে মুক্তবাজার বনাম ‘জাতীয়তাবাদের’ একটা বিতর্ক জিইয়ে রাখার মাধ্যমে গোষ্ঠীস্বার্থের বিবাদকে সুশীল করতে চায়। তৃতীয়ত, বির্তককে জিইয়ে রেখে, ভোক্তা তৈরি-একটা বাজার-তৎপরতা।

প্যারাডক্স  অ্যাক্টিভিজম

প্রথম আলোর বিতর্কে অন্যতম ‘তার্কিক’ আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ফাহমিদুল হক। যোগাযোগ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। ওই পত্রিকার পাঠক হিসেবে, তার হাত ধরেই আমার-আমাদের সামনে মিডিয়া-ক্ষমতা-কালচারের প্রশ্নটা এসেছে। সত্যি বলতে কী, তার লেখা অনুবাদ, সমালোচনা দেখতে-দেখতে, শিখতে-শিখতে আমি হয়ে উঠছি। এই লেখার যুক্তি গঠনেও তার ওই কাজগুলোর ভূমিকা রয়েছে।

‘বিতর্কে’ কী বললেন ফাহমিদুল হক?

১. কতকগুলো কারণে আসলে ভারতীয় ছবি এদেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের পক্ষে আমি।

২. ভারতীয় ছবি এলে আমরা এখানে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাব, ভাল ছবি দেখতে পারব।

৩. আর সিনেমা হলগুলোকে বাঁচাতে হবে।

প্রথম আলোর নির্মাণে ‘চলচ্চিত্র গবেষক ও শিক্ষক’ ফাহমিদুল হকের ‘লাইন অব রিজন’, সিনেমা হল মালিকদের ‘লাইন অব রিজনের’ সঙ্গে মিলে যায়। ফাহমিদুল হক সামিল হন ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুক্তি’ প্রস্তাবনার পক্ষ ডিসকোর্সে­- মুক্তবাজারের ডিসকোর্সে। তার সম্পাদিত, যে-যোগাযোগ পত্রিকার হাত ধরে বাংলাদেশ প্রথম ‘মুক্তবাজার সাংবাদিকতা’র ক্রিটিক হাজির হলো, তিনি নিজে সেই ডিসকোর্সের বাসিন্দা হন কী করে? খটকা লাগল।

এর কিছুদিন পরে তার ব্লগ থেকে এ নিয়ে তার নোট উদ্ধার করলাম। নোটটা আগের, ২৯ এপ্রিল, ২০১০ এর। সেখানে তার সুর ভিন্ন। তার বক্তব্য ভিন্ন। ‘ভারতীয় নয় বিদেশী ছবি আমদানি নোটে কী বলছেন ফাহমিদ?

‘আমার বিবেচনায়, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমান বিদেশি ছবি (কেবলই ভারতীয় বা হিন্দি নয়) আমাদের দেশে আমদানি করা যেতে পারে।’২১

এবারের সুর পুরোটাই পাল্টে গেছে। প্রথম আলোর নির্মিত ‘বিতর্কে’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের যুক্তি আর তার যুক্তি একই। রামেন্দু মজুমদার বলেছেন,

‘ঢালাওভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবি আনার পক্ষে নই আমি।...বছরে দশটি ভারতীয় ছবি এদেশে আসতে পারে। সেগুলো রুচিসম্মত ভালো ছবি হতে হবে।’২২

মুক্তবাজারের ডিসকোর্স থেকে ফাহমিদুল হকের এ আলোচনা ভিন্ন। ‘জাতীয়তাবাদী’ ডিসকোর্সেরই পক্ষেই কথা বলেছেন তিনি। তবে লাইন অব রিজন চলচ্চিত্রের প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পীদের মতো নয়। এই ‘জাম্প’ কী প্রতিপন্ন করে?

ফাহমিদুল হক ভ্রমে পড়েছেন। এই ভ্রম অধিপতি ডিসকোর্সকে গ্রহণ বা নাকোচ করার বিষয়ে নয়। একেবারে প্রতিরোধের, প্রতিনির্মাণের ডিসকোর্সকে চিনতে না পারার ভ্রম। টেক্সুয়াল এনালাইসিস হয়ত টেক্সটের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা আধিপত্যকে চিনতে সহায়তা করে; রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা, আধিপত্যের ভিত্তি আর গুমোরকে ফাঁস করে; কিন্তু প্রতিরোধের-প্রতিনির্মাণের শর্ত হাজির করার পরও, সক্রিয়তার-তৎপরতার তথা অ্যাক্টিভিজমের পথ বাতলে দেয় না। আর ফাহমিদুল হক রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন না বলেই- এমন ভ্রম।

পরিশিষ্ট

নতুন শিল্প আকাঙ্খা, নতুন শিল্পবোধ উদ্বোধনের প্রথম শর্ত। আর এই উদ্বোধনের জন্য দরকার সক্রিয় নির্মাণ আন্দোলন। সরকারি বা কর্পোরেশনের মালিকানার ভিত্তিতে নয়; জনগণের পক্ষে, জনগণের পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত একটা ‘গণঅংশগ্রহণমূলক’ চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাদী দুনিয়াতেই এর বহু উদাহরণ আছে। আর্জেন্টিনার সিনে-লিবারেকশন এইরকম একটা সংগঠন। তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্রের সমালোচনা তত্ত্বের খোঁজ করতে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্রের পর্যায় তথা গতিমুখকে চিহ্নিত করেছেন টিসোম গ্যাব্রিয়েল। গ্যাব্রিয়েল দেখিয়েছেন কেমন করে ‘গণঅংশগ্রহণমূলক’ ব্যবস্থাটা গড়ে ওঠে; কেমন করে চলচ্চিত্র পরিচালক আর দর্শক একই ঘরের বাসিন্দা হয়ে ওঠে।২৩ আমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আমাদেরকেই খুঁজতে হবে আমাদের পথ। গড়ে নিতে হবে নিজেদের মুক্ত বিকাশের ক্ষেত্র।

লেখক : আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বর্তমানে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে আন্তর্জাতিক বিষয়ক বার্তাকক্ষ সম্পাদক হিসেবে কর্মরত; এছাড়াও তিনি কর্তৃত্ব-বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী

arifrezamahmud@gmail.com

তথ্যসূত্র

১.বেঞ্জামিন, ওয়াল্টার (১৯৩৬); ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা’; অনুবাদ : জাকির হোসেন মজুমদার ও মোহাম্মদ আজম; যোগাযোগ, সম্পাদক- ফাহমিদুল হক ও আ. আল মামুন; সংখ্যা- ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

২.প্রাগুক্ত: বেঞ্জামিন, ওয়াল্টার (১৯৩৬)।

৩.বিস্তারিত দেখতে পারেন: ফেরদৌস, সাইদ (২০১১); ‘বাদ পড়াদের ফিরে দেখা ইতিহাস রচনায় প্রান্তজনের খোঁজ’; প্রবল প্রান্তিক-১০, , সম্পাদক- রেহনুমা আহমেদ, পাবলিক নৃ-বিজ্ঞান, ঢাকা।

.  ‘চলচ্চিত্রের চালচিত্র : বাংলাদেশ’; প্রথম আলো, ২৮ অক্টোবর ২০১১।

৫.Adorno, Theodor w. (1975); Cultural Industry Reconsidered.http:// www.icce.rug.nl

৬. www.bfdc.gov.bd

৭.মোর্শেদ, মাহবুব  (২০১১); ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহা্র’;  http://somewhereindblog.net

৮.প্রাগুক্ত; মোর্শেদ, মাহবুব  (২০১১)।

৯.নিউটন, সেলিম রেজা (২০০৩); ‘বাজারের যুগে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আম্মু-আব্বু-সমাচার অথবা বাংলাদেশে বিদ্যমান মহাজনী মুদ্রণের পলিটিক্যাল ইকোনমি’; যোগাযোগ; সম্পাদনা- ফাহমিদুল হক; সংখ্যা- ৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

১০.মোস্তফা, কল্লোল (২০১১); ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের আমদানি বির্তক’; http://www.droho.net

১১.বিস্তারিত দেখতে পারেন: চট্টপাধ্যায়, পার্থ (২০০০: ১৩১); ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’, ইতিহাসের উত্তরাধিকার; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

১২.প্রাগুক্ত; নিউটন, সেলিম রেজা (২০০৩)।

১৩. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০০: ৫২৮); ‘বিলাসের ফাঁস সমাজ’; রবীন্দ্র রচনাবলী, খণ্ড পুর্ণমুদ্রন, পৌষ ১৪০২, কলকাতা, বিশ্বভারতী।

১৪.হল, স্টুয়ার্ট (১৯৯৭): ‘রেপ্রিজেন্টেশন’; অনুবাদ- ফাহমিদুল হক; যোগাযোগ; সম্পাদক- ফাহমিদুল হক ও আ. আল মামুন; সংখ্যা- ৮; ফেব্রুয়ারি ২০০৭।

১৫.বিস্তারিত দেখতে পারেন: Carl Marx (1853): The East India company Its history and result. http//.www.marxists.org

১৬.সেন, রঙ্গলাল (১৯৮৫:৬২); বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাস; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

১৭. অমিতাভ চক্রবর্তী (১৯৯৬:৩০); ভারতীয় মহাবিদ্রোহ  পূর্বাপার বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোক; মুদ্রাকর, কোলকাতা।

১৮. ঘোষ, বিনয় (১৯৮১:১৪৮); মুদ্রণ  সংস্কৃতি দুই শতকের বাংলা মুদ্রন  প্রকাশনা; সম্পাদনা- চিত্তরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা।

১৯. চমস্কি, নোম (১৯৯৬); গণমাধ্যম  বিশ্বায়ন: নোম চমস্কির সাক্ষাতকার, অনুবাদ- ওজায়ের ইবনে ওমর; যোগাযোগ; সম্পাদনা- ফাহমিদুল হক; সংখ্যা-৫, জানুয়ারি ২০০৩, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

২০.  ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রের মুক্তি বিতর্ক’ প্রথম আলো; ৮ ডিসেম্বর, ২০১১।

২১. হক, ফাহমিদুল; ২৯ এপ্রিল, ২০১০; ‘ভারতীয় নয় বিদেশী ছবি আমদানি ; http://somewhereindblog.net

২২. প্রাগুক্ত; প্রথম আলো; ৮ ডিসেম্বর, ২০১১।

২৩.গ্যাব্রিয়েল, টিসোম এইচ. (২০০৯); ‘তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্রের সমালোচনা তত্ত্বের খোঁজে’, অনুবাদ- ফয়সাল রহমান, চলচ্চিত্র বুলেটিন; সম্পাদনা- জুবায়ের আল মাহ্‌মুদ নাদিম ও অন্যান্য, ২য় সংখ্যা চলচ্চিত্র আন্দোলন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন