Magic Lanthon

               

মাজিদ মিঠু ও মোহাম্মদ আলী মানিক

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রে মা : সর্বসহা সর্বহারা  জননী, তুমি মানুষ হওনি

মাজিদ মিঠু ও মোহাম্মদ আলী মানিক


দৃশ্যপট এক. বৃক্ষ-লতাহীন তুষারে ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে কিছু মানব মূর্তি। ওদের শরীর ঢাকা আছে বরফের মতোই সাদা বৃষচর্মে; তাদের হাতের অস্ত্রগুলিও যেন ধবধবে সাদা। এই পরিব্যাপ্ত শ্বেত তুষারের ক্ষেত্রে আন্দোলিত মূর্তিগুলিকে ঠিক চিনে ওঠা দায়! আরও কাছে গিয়ে দেখা যাক। সবার আগে রয়েছে একজন স্ত্রীলোক, বলিষ্ঠ তার দেহ, বয়স চল্লিশ কি পঞ্চাশ। বাঁ হাতে একটি ছুঁচলো তিন হাত লম্বা ভূর্জ গাছের মোটা কাঠ। ডান হাতে কাঠের হাতলে দড়ি দিয়ে বাঁধা পাথরের কুঠার; শিকারের জন্য ঘষে ঘষে শান দেওয়া হয়েছে। তার পিছনে চারজন পুরুষসহ আরও দুজন স্ত্রীলোক। তাদের হাতেও একই অস্ত্রাদি। দেখে মনে হয়, তারা সবাই যেন যুদ্ধে যাচ্ছে। পাহাড় থেকে নামার পথে প্রথম স্ত্রীলোকটি হচ্ছে মা।

দৃশ্যপট দুই. মধ্যরাত হতে চলল। আদরের সন্তানদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন। নিজে না খেয়ে বসে আছেন, কখন আসবে পতি। তাকে খাইয়ে তবে নিজে খাবেন। ইনিও একজন স্ত্রীলোক। আমাদের মা। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি সাধারণ দৃশ্য এটি।

খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে যে মা হাতে বল্ল­ম নিয়ে শিকারে নেতৃত্ব দিতেন, আজ সেই মা ঘরের কোণে বন্দী। এটি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক বিরাট অর্জন! আমাদের সমাজ, আমাদের সংস্কৃতিতে আজ মা অর্থ হলো একজন নারী, তিনি কারো স্ত্রী, কারো বোন, কারো মেয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজে তার নিজস্ব কোনো মর্যাদা তৈরি হয় নি বললে খুব একটা ভুল হবে না। স্বামী-সন্তানের জন্য তিনি সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করবেন। উজাড় করে দিবেন তার জীবন। তবেই তিনি মর্যাদাসম্পন্ন মা! নজরুলের কবিতার মতো-

সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার।

তুমি কোনদিন কারো করনি বিচার,

কারেও দাওনি দোষ। ব্যথা-বারিধির

কূলে বসে  কাঁদ’ মৌনা কন্যা ধরণীর

একাকিনী! যেন কোন পথ-ভুলে-আসা

ভিন-গাঁ‌‌'র ভীরু মেয়ে ! কেবল জিজ্ঞাসা

করিতেছে আপনারে, ‘এ আমি কোথায়’?

আমাদের চিরচেনা মা নজরুলের কবিতার পংক্তি থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারেন নি। আসলে পারেন নি বললে ভুল হবে, তাকে হয়ত এই শিকল ছিঁড়তেই দেয় নি আমাদের সমাজ। ‘যদিও আমাদের দেশে নারীকে মা হিসেবে সাধারণত সম্মান দেখাবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মানুষ ও ব্যক্তি হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মান তাকে সাধারণত দেয়া হয় না। এমনকি স্ত্রী হিসেবেও তিনি পান না তার প্রাপ্য সম্মান।’

আমাদের এই মা, মায়ের রূপ, নারীর রূপ সবকিছুই রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে বহুবার বহুভাবে। এই গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো চলচ্চিত্র। আজকের আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নির্মিত মা’র অতীত ও বর্তমান রূপ দেখার চেষ্টা করব। পাশাপাশি খোঁজার চেষ্টা করব প্রচলিত সমাজ কাঠামোর সাথে এই নির্মিত রূপের সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্য। এ লক্ষ্যে আমরা স্বাধীনতা পরবর্তী মা-কেন্দ্রিক কিছু বাংলা চলচ্চিত্রকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে দেলোয়ার হোসেন দুলালের বড় মা, আওকাত হোসেনের মায়ের দাবি, কাজী হায়াতের আম্মাজান, মনতাজুর রহমান আকবরের আমার মা  মায়ের চোখ, রাজু চৌধুরীর আমার মা আমার অহংকার, জাকির হোসেনের মা আমার স্বর্গ, শেখ নজরুল ইসলামের মা বড় না বউ বড়, দীলিপ বিশ্বাসের মায়ের মর্যাদা, রেজা লতিফের মা বাবার স্বপ্ন, ইলিয়াস কাঞ্চনের মায়ের স্বপ্ন ও জাহিদ হোসেনের মাতৃত্ব

আলোচনার শুরুতেই আদিম মায়ের রূপ সম্পর্কে কিছু বলা হয়েছে। এবার সেগুলোই একটু বিস্তারিতভাবে দেখার চেষ্টা করি। সেই যুগে অর্থাৎ যখন শ্রেণী, শোষণ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না; তখন নারী ছিল না পুরুষের অধীনস্ত। সমাজে নারীর মানসম্মান ও কর্তৃত্ব ছিল সবার ওপরে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি উদ্ভবের সাথে সাথে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নারী কিংবা মা হতে থাকে পুরুষের পদানত। ‘মায়ের সেই অধিকার বিচ্যূতি হওয়ার ঘটনাটি ছিল নারীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়। তখন থেকে ঘরের মধ্যেও পুরুষ কর্তৃত্বের লাগামটি টেনে ধরল। নারী পদানত হলো, আবদ্ধ হলো দাসত্বের শৃঙ্খলে। পরিণতিতে নারী হলো পুরুষের লালসার দাসীতে ও সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে।’

সময়ের পরিবর্তনে নারীর সেই অসহায়ত্ব সমাজে এখনো নানা রূপে নানা ঢঙে বিদ্যমান। যদিও এই সময়ে এসে সবখানে নারীমুক্তির হাওয়া বইছে। অনেকে বলছেন, একবিংশ শতাব্দিতে এসে সত্যিকারের নারীমুক্তি ঘটতে যাচ্ছে। একজন নারী, একজন মা ফিরে পাচ্ছেন তার হারানো মর্যাদা! বলা হচ্ছে, তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এ কাজে অন্যতম ভূমিকা রাখছে গণমাধ্যম। কিন্তু টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, চলচ্চিত্র- এসব গণমাধ্যমে নারীর ইতিবাচক উপস্থাপনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নেতিবাচক উপস্থাপনাও। কেউ বলছেন, গণমাধ্যম নারী স্বাধীনতার ধারক-বাহক। আবার কেউ বলছেন, এই গণমাধ্যমই নারীকে পণ্য করছে; যা বাজারে আলু-পটলের মতো বিক্রি হচ্ছে। আর এর ফায়দা লুটছে আজকের পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজ। ইতিবাচক-নেতিবাচক যে ইমেজেই নারী সমাজে নির্মিত হোক না কেন, একথা সত্যি যে সেখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে।

এক্ষেত্রে একক মাধ্যম হিসেবে আলোচনার দাবি রাখে চলচ্চিত্র। ভিন্ন ধরনের এক বাস্তবতা নিয়ে চলচ্চিত্র উপস্থিত হয় আমাদের সামনে। চলচ্চিত্র একই সাথে যেমন গণমাধ্যম, বিনোদনের মাধ্যম; তেমনি শিল্প ও ইন্ডাস্ট্রিও বটে। ফলে শিল্পের ব্যঞ্জনার পাশাপাশি ব্যবসায়িক একটি উদ্দেশ্যও কাজ করে চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে নারীর উপস্থাপন। অন্যান্য চরিত্রের মতো সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীর ভূমিকা চলচ্চিত্রে উঠে আসে। বাস্তব জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলচ্চিত্রে নির্মিত হয় মা, বোন, স্ত্রী, ভাবি, ননদ, জা, প্রেমিকা, গৃহপরিচারিকা ইত্যাদি চরিত্র। এদের মধ্যে মায়ের থাকে একটু আলাদা ইমেজ, আলাদা মর্যাদার আসন; যা অন্যান্য নারী চরিত্র থেকে ভিন্নরূপে নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। আর এটিই আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয়।

চলচ্চিত্র  নারী

একজন নারীকে তাড়া করেছে কিছু বদলোক। ইজ্জত-জীবন বাঁচাতে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন সেই নারী। সাথে গগণবিদারি চিৎকার, বাঁচাও-বাঁচাও। হঠাৎ উড়ে এসে হাজির হলেন একজন পুরুষ। আমাদের নায়ক! একাই দশ-বিশ জনকে মেরে উদ্ধার করলেন সেই নারীকে। নারী অসহায়-অবলা, তাকে রক্ষার জন্য আমাদের নায়ক ছাড়া আর কেউ যেন নেই। খুব কম সংখ্যক চলচ্চিত্রই পাওয়া যাবে, যেখানে নারীর এমন উপস্থাপনের দু-একটি দৃশ্য নেই।

বাংলা চলচ্চিত্রে নারী অধিকাংশ সময় এমনই কিছু গৎবাঁধা চরিত্রে উপস্থাপিত হয়। যার বিপরীতে পুরুষের অবস্থানও থাকে গৎবাঁধা। ‘মূল ধারার চলচ্চিত্রে নারী কখনোই তার মানবিক অস্তিত্ব নিয়ে বর্তমান নয়, তাদের নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্য বলতে কিছু নেই, কোনো কিছু বলতে দেওয়ার বদলে অন্যদের ইচ্ছে অনুযায়ী বক্তব্য তাদেরকে দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ নারীদের কোনো স্বাধীন কণ্ঠস্বর নেই।’

চলচ্চিত্রে নারীর যে উপস্থাপন তা অনেকখানিই আমাদের সমাজের প্রথাগত ও ধর্মীয় রূপের প্রতিফলন। পুরুষ প্রাধান্যশীলতার আবরণে চিত্রিত এইসব নারী। নারীকে যে ভূমিকাতেই দেখানো হোক না কেন, তার মূল ভিত্তি এই ধরনের রূপকে কেন্দ্র করেই ঘোরাফেরা করতে থাকে। নারীর স্থান ঘরে, প্রধান পরিচয় গৃহিণী। সন্তান লালন-পালনই তার কাজ। এর বাইরে চলচ্চিত্রে নারীকে আইনজীবী বা পুলিশের মতো চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে রূপ দান করা হলেও একটা সীমাবদ্ধতা থাকেই। বিষয়টা এমন- তুমি যাই করো, শেষ সফলতার জন্য তোমাকে পুরুষের কাছে আসতেই হবে। এমনকি পুলিশের পোশাক পরা ওই নারীর মধ্যেও যৌন আবেদনময়ীতা আরোপ করে পুরুষ। অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেও বিপদে নায়কই তাকে রক্ষা করে।

এছাড়া নারীর চিরায়ত রূপ মা, প্রেমিকা, বোন, শাশুড়ি, ননদ, নর্তকী, গৃহপরিচারিকা ইত্যাদিতো আছেই। তবে এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ নারীর অবস্থান নারীর বিপরীতে, অর্থাৎ নারীই নারীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাঁড়ায়। বিমাতা, সতীন, শাশুড়ি, জা, ননদ, ইত্যাদি সম্পর্কগুলোর প্রতি একধরনের কূট নারীরূপ আরোপ করা হয়, যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে।

এর বাইরে চলচ্চিত্রগুলোতে আরেক ধরনের নারীরূপ লক্ষণীয়। তা হলো পুরুষের পোশাকে বা ইমেজে নারীর বিভিন্ন কার্যক্রম। মূলত নারীকে এ সব চরিত্রে ক্ষমতাবান দেখাতে যেয়ে তাদের উপর একধরনের পৌরুষের কৃত্রিম বৈশিষ্ট্য আরোপের চেষ্টা লক্ষ করা যায়। মূলত এই করতে গিয়ে খাটো ও চাপা পোশাকে নারী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে যৌন আবেদনময়ী। যা ওইসব চলচ্চিত্রের অন্যতম আকর্ষণীয় একটা দিক।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে নারীর জন্য একমাত্র পূজনীয় রূপ হলো তার মাতৃত্ব, যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুত্রবতী মাতৃত্বই বেশি প্রাধান্য পায়। ‘বন্ধ্যা ও অপুত্রক নারী সবসময়ই হীনমন্যতায় ভোগে এবং শ্বশুরালয়ে চরমভাবে নিগৃহীত হয়। কোনো কোনো সময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বলে দেয়া হয় মৃত্যুবরণই তাদের শ্রেয়।’৫ চলচ্চিত্রে মমতাময়ী এই মায়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকেন পুত্রকাতর। যেন মমতাময়ী মায়ের ‘মমতা’তেও লৈঙ্গিক বৈষম্য। তবে মা-ছেলের এই সম্পর্ক নিয়ে ফ্রয়েডের বিশ্লেষণকে আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করছি না। ছেলেকে রক্ষার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকেন এই মা। আমাদের চলচ্চিত্রে ইতিবাচক মাতৃত্বের অর্থই হলো আত্মত্যাগ, সন্তানকে বাঁচাতে নিজের বলিদান ইত্যাদি। ‘আমাদের চলচ্চিত্রের অধিকাংশ মাতৃরূপ কৃত্রিম। সহজ স্বাভাবিক মাতৃরূপকে অস্বীকার করে এমন একটি একরৈখিক ও অতিরঞ্জিত মাতৃরূপের চিত্রায়ন ঘটায়, যা নারীত্বকে মহিমান্বিত করার পরিবর্তে বরং আরও সীমাবদ্ধ ও খণ্ডিত করে ফেলে।’

তার মানে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোতে মায়ের যে নির্মাণ, তা কোনোভাবেই প্রচলিত পুরুষ প্রাধান্যশীলতার বাইরে যেতে পারছে না। অথচ বলা হয়, চলচ্চিত্র সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। চলচ্চিত্রই নির্মাণ করবে মায়ের প্রকৃত রূপ।

বিধবা, বন্ধ্যা  মাতৃত্ব

স্বামীর চোখে ‘অস্বতী’ হয়ে এক মা সিদ্ধান্ত নেন আত্মহত্যার। কিন্তু বিবেকের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায় গর্ভের সন্তান। একসময় বাড়ি ছেড়ে তিনি চলে যান বহুদূর। স্বপ্ন দেখেন একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার। সন্তানকে বড় করে তোলাই হয় তার একমাত্র কাজ।  আওকাত হোসেনের মায়ের দাবি চলচ্চিত্রটিতে এভাবেই চিত্রিত হয়েছে মা চরিত্রটি।

একই রেখায় এগিয়েছে মাতৃত্ব। এখানেও দেখানো হয়েছে মাতৃত্বেই নারীর পরম স্বার্থকতা, জীবনের পূর্ণতা। এ জন্যই নারী মা হওয়ার জন্য অধীর হয়ে থাকেন। মাতৃত্বে সেই নারী সখিনা। স্বামী চোর, দারিদ্রতায় মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান তিনি। এই অভাবের সাথে যুক্ত হয়েছে সন্তান না হওয়ার দুঃখ। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর তার গর্ভে সন্তান আসে। অনাগত সন্তানকে ঘিরে তার মধ্যে বাসা বাঁধে নানা স্বপ্ন| জমাতে থাকেন বহু কষ্টে আয় করা অর্থ। একদিন সন্তানের জন্য জমানো অর্থে চোখ পড়ে স্বামীর| কিন্তু সখিনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্বামী পেটে লাথি মারে। এতে নষ্ট হয়ে যায় পেটের সন্তান, ভেঙে যায় এত দিনের স্বপ্ন| বেদনায় কাতরাতে কাতরাতে সেই নারী কেবল স্বামীর উদ্দেশে একটা কথাই বলেন, ‘তুই আমার সব শেষ করে দিলি।’

এভাবেই চলচ্চিত্রে অধিকাংশ মায়ের অন্যতম কাজ হয়ে যায় সন্তান জন্মদান ও তাদের লালন পালন করা। শত্রুপক্ষ স্বমীকে খুন করে। একমাত্র সন্তান বা একাধিক সন্তান নিয়ে মা পড়েন অথৈ সমুদ্রে। মানুষের বাসায় কাজ করেন, ইট ভেঙে সন্তানদের মানুষ করেন। আর যে মায়েরা মৃত স্বামীর সম্পদের মালিক হন, তারা সেই সম্পদ দিয়েই লালন পালন করতে থাকেন সন্তান। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেশিরভাগ মায়েরাই মৃত স্বামীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তার গুণকীর্তন করতে থাকেন। আমার মা, মা আমার  স্বর্গআমার মা আমার অহংকার এ চলচ্চিত্রগুলোতে মা’কে আমরা এভাবেই দেখি।

চলচ্চিত্রে নারীর আরেক রূপ তার বন্ধ্যাত্ব। বন্ধ্যাত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে থাকে ভর্ৎসনা। অনেকটা কালো মেয়ের কালো হওয়ার ‘অপরাধ’এর মতো। বিষয়টা এমন- ওই মা নিজেই যেন বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী। অথচ এতে কোনোভাবেই হাত থাকে না মায়ের। কিন্তু মায়ের এই স্বাভাবিকতাকে চলচ্চিত্রে কোনোভাবেই ইতিবাচক হিসেবে দেখানো হয় না। দেওয়া হয় না তাদের যথাযথ মর্যাদা। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই এই মা উপস্থাপিত হয় ‘অলক্ষী-অপয়া’ হিসেবে। বিপরীতে সম্মানিত করা হয় সন্তানবতী মাকে। চলচ্চিত্রে সমাজের এই প্রতিফলন বাস্তব হলেও মায়ের জন্য সুখকর হয় নি।

এমন দরদী ভবে কেউ হবে না

সুন্দরী তরুণীর প্রেমে পাগলপ্রায় তরুণ। যেকোনো মূল্যে প্রেয়সীকে পেতে চায় সে। কিন্তু প্রেয়সীর এক কথা, তরুণের মা জীবিত থাকতে সে কিছুতেই তাকে বিয়ে করবে না। তবে সে যদি তার মাকে হত্যা করে হৃৎপিণ্ড এনে দেখাতে পারে, তাহলে বিয়ে হতে পারে যেকোনো সময়; নতুবা নয়। প্রেমে উন্মাদ তরুণ তাতেও রাজি। মায়ের হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে সে উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়াতে থাকে প্রেমিকার বাড়ির উদ্দেশে। হাতে হৃৎপিণ্ড, ভ্রুক্ষেপ নেই কোনোদিকে। ছুটছে তো ছুটছেই। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় তরুণ, হাতের রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটি কেঁপে ওঠে, উদ্বিগ্ন করুণ স্বরে বলে, ‘ব্যাথা পেলি বাবা!’

চিরচেনা এই গল্পের মতোই মমতাময়ী আমাদের মা। চলচ্চিত্রে মায়ের নির্মাণও এরকমই। সন্তানের জন্য নিজের জান দিতে তিনি কুণ্ঠা করেন না। সন্তানের জন্য তার অসীম মায়া। অনেকটা জাকির হোসেনের মা আমার স্বর্গ চলচ্চিত্রের মতো। গল্পটা এমন- বিধবা মা তার একমাত্র ছেলেকে অতি আদরে বড় করে তুলতে জীবনের সবকিছু ঢেলে দেন। অসুস্থ অবস্থায় নিজে ওষুধ না খেয়ে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকে টাকা জমান। অবশেষে বিনা চিকিৎসায় মারা যান ধুকে ধুকে। এই যে মায়ের চিত্রায়ন, এখানে মাকে সর্বোচ্চ মমতাময়ী ও সন্তানের সুখের জন্য তার নিজের জীবনদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। মায়ের জন্মই যেন এ জন্য। অন্যভাবে বললে নারীর জন্মই যেন এ জন্য। সন্তানের অনাচার যেমন তিনি মুখ বুজে সহ্য করবেন, সহ্য করবেন স্বামীর অত্যাচারও। তার কিছুই বলার নেই।

‘মা যে মমতাময়ী তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু কথা হলো মাতৃত্বের গুণকীর্তন করতে করতে নারীর নারীত্বকে মাতৃত্বের খাঁচায় বন্দি করতে কী ধূর্ত প্রয়াসই না চালাচ্ছে আজকের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। সেই ধূর্ত প্রয়াসের ভিতর দিয়ে নারীকে কেবলই সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে কিনা তা দেখার বিষয়। মাতৃত্বের খাঁচায় পুরে পুরুষতন্ত্র যে নারীর মনুষ্যত্ব বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিতে চেয়েছে এবং নারীর মানবাধিকারই হরণ করে নিয়েছে, এ কথাও কি অস্বীকার করা যাবে?’৭  মোটেও না। মাতৃত্বের এই খাঁচাকে আরও খাঁচায় পুরেছে চলচ্চিত্র। আমাদের চলচ্চিত্র মায়ের এই প্রথাগত রূপকে নির্মাণ করেছে নানা রঙে, নানা কৌশলে। এর ব্যত্যয় হলেই বরঞ্চ রা রা ধ্বনি উঠেছে।

যাও পাখি বল তারে

‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশ্‌ত!’ ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে!’ ‘যাও পাখি বল তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’- ফ্রেমে বাঁধানো এসব কথার বাইরে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই বের হতে পারে নি নারী। স্বামীর কথার এক চুল এদিক ওদিক হওয়া যাবে না। কেননা মা তো পতিব্রতা গৃহিণী। সে কেন এর অন্যথা ঘটাতে যাবে? দেলোয়ার হোসেন দুলালের বড় মা চলচ্চিত্রটির এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের মাথায় একটি দৃশ্য এমন- ঘরে চাল না থাকায় অন্যের বাড়ি থেকে চাল নিয়ে ফিরতে রাত হলে স্ত্রী স্বামী অস্বতী বলে মারধর করে, তাকে মরতে বলে। পরিণতিতে তিনি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বাড়ি ত্যাগ করেন।

যাবার সময়ও স্বামীর পা ধরে তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘১২ বছর বয়সে তোমার কাছে এসেছিলাম, আল্লার পরে তোমাকেই বড় বলে জেনেছি। সেই তুমিই যখন অবিশ্বাস করলে তখন বেঁচে থেকে কী হবে? চলে যাচ্ছি, পারলে সব গুনাহ মাফ করে দিও।’ অধিকাংশ বাংলা চলচ্চিত্রে মা চরিত্রটিকে পুরুষের চোখে এভাবেই দেখানো হয়েছে।

কাজী হায়াতের আম্মাজান চলচ্চিত্রটির দেড় মিনিটের মাথায় একটি দৃশ্যে এমন- মা মেঝেতে বসে চাল বাচছেন, বিছানার উপর আরাম করে বসে থাকা স্বামীর সাথে মাঝে মাঝে কথা বলছেন সংসার নিয়ে। ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলে নারীকে পুরুষের পায়ের কাছে রাখার এ চিত্র কিন্তু শুধু সেলুলয়েডের খেলা নয়। মাকে এ অবস্থানে রাখার জন্য পুরুষতান্ত্রিক আদর্শের এক বাস্তব প্রয়োগ স্থান যেন আমাদের চলচ্চিত্র। তাইতো দেয়ালে লটকানো কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে ও তা প্রতিষ্ঠা করতে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করা হয় বারবার।

মায়ের নেই আপন কোনো ঘর

বেগম রোকেয়া আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘গৃহ বলিতে আমাদের (নারীদের) একটি পর্ণকুটিরও নাই। প্রাণিজগতের কোনো জন্তুই আমাদের মতো নিরাশ্রয়া নহে। হায়! সকলেরই গৃহ আছে- নাই কেবল আমাদের।’বাংলা চলচ্চিত্রে মায়েদের অবস্থা রোকেয়ার নারীদের মতোই। চুন থেকে পান খসলেই মাকে সবার আগে হারাতে হয় আশ্রয়। চলচ্চিত্রের অধিকাংশ মায়ের নিজের কোনো ‘ঘর’ নেই। ছোটবেলায় বাবা, যৌবনে স্বামী ও বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের আশ্রয়ে ও পরিচয়ে চিত্রিত হয় এই মার জীবন। মা মানেই যেন অসহায়ত্ব, যেন কেবলি নির্ভরতা।

ইলিয়াস কাঞ্চন পরিচালিত মায়ের স্বপ্ন সিনেমায় মায়ের উপস্থিতি আপাত ইতিবাচক। হঠাৎ মনে হয় নিজের পরিচয়ে পরিচিত এক মা।  কিন্তু  আসলে সেটা তার কোনো নিজস্ব পরিচয় নয়, বরং তার ছেলের ও স্বামীর অর্থ ও পরিচয়েই তিনি পরিচিত। আবার দীলিপ বিশ্বাসের মায়ের মর্যাদা চলচ্চিত্রটিতেও মায়ের যে পরিচিতি তা মৃত স্বামীর অর্থের কারণেই। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে মায়ের এতটুকু নিজস্ব পরিচয়ও নেই। মনতাজুর রহমান আকবরের আমার মা চলচ্চিত্রটিতে এটি সপষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন মা। সন্তানটি যখন পুলিশ অফিসার হয় তখন তার পরিচয়ে, তার আশ্রয়েই মা’র অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রটির শেষে যখন হারানো সন্তানকে মা ফিরে পেলেন, দেখা গেল তার সাথে পুলিশ অফিসার ছেলেটির দ্বন্দ্ব। একপর্যায়ে সন্তান মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় এই বলে যে, ‘একই ছাদের নিচে পুলিশ ও ক্রিমিনাল থাকতে পারে না।’ অতএব মা ফিরে পাওয়া সন্তানের সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

এই যে মায়ের চিত্রায়ন, এখানে মায়ের নিজস্ব কোনো স্থান নেই। একজন তাড়িয়ে দিলে আরেক জনের বাড়িতে তার আশ্রয়। চলচ্চিত্রে মায়ের এহেন নির্মাণ এমনি হয় নি। আমাদের সমাজে মাকে যেভাবে রাখা হচ্ছে চলচ্চিত্র তারই অনুকরণে চিত্রায়ন করছে মায়ের চরিত্র। মায়ের চোখ চলচ্চিত্রে মা অন্ধ, তার একটাই সন্তান, এই সন্তান ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই। সন্তানের আশ্রয়েই তার অবস্থান। তবে কী আমাদের সমাজে মায়ের কোনো নিজস্ব স্থান আমরা তৈরি করতে পারি নি?

মধ্যবয়সী নারী এখনো রয়েছে হাত বাড়িয়ে

শরীর খারাপ। বুকে যন্ত্রণা, কাশি। তারপরেও দিনরাত শ্রম দিয়ে কাপড় সেলাই করে চলেছেন; জমাচ্ছেন টাকা। ছেলে বড় হয়েছে। বি.এ. পাস করেছে। ভবিষ্যতে তার টাকার প্রয়োজন হবে। সব চিন্তা যেন ছেলেকে ঘিরে। এখনো সেই সন্তানকে মুখে তুলে ভাত খাওয়ান মা। জাকির হোসেনের মা আমার স্বর্গ চলচ্চিত্রে মা এর রূপ এমনই। চলচ্চিত্রের এই মায়েরা ধৈর্য্যশীল।

অন্যদিকে সন্তান অসুস্থ, রাত জেগে সেবা করছেন মা। সেবা করতে করতে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রথাগত সমাজে ওই সন্তানের পরিচয় বাবাকে দিয়ে হলেও সব দায়িত্ব যেন মার। বাবা শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েই ক্ষান্ত। চলচ্চিত্রের মায়ের এও এক রূপ। তিনি সেবাপরায়ণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছেলে-স্বামীকে হারিয়ে অন্যের সন্তানকে বুকে ধরে ধৈর্য্যধারণ করে আছেন মা। তার আশা অবশ্যই তিনি ফিরে পাবেন হারানো ছেলেকে। সে এক দীর্ঘ পরিক্রমা, এক দীর্ঘব্যাপ্তি। বিষয়ের উপস্থাপন এমন যে, একজন নারীর পক্ষেই শুধু এ কাজ করা সম্ভব। নারীর সমাজে অবস্থানই যেন ধৈর্য্যের প্রতীক হয়ে ওঠা। আমার মা চলচ্চিত্রে মায়ের ধৈর্য্যে এই সীমানাকে ছুঁতে চায়। সফলও হন তিনি; ২০ বছর পর মা ফিরে পান সন্তানকে। চলচ্চিত্রের এই ধৈর্য্যশীল মা বাস্তবে আরও অনেক বিষয়ে ধৈর্য্যশীল হয়ে ওঠেন। আসলে তাকে ধৈর্য্যশীল করে তোলা হয়। একই রকম ঘটনা আমরা দেখি মায়ের মর্যাদা চলচ্চিত্রে। সেখানেও হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজতে মায়ের ধৈর্য্যের কোনো শেষ নেই। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রত্যেকটি ঘটনার ধৈর্য্যধারণকারী মাকে কখনোই ব্যর্থ করা হয় না। তাকে এমনভাবে সফল করা হয় যে, এটাই যেন স্বাভাবিক বিষয়। সব মায়েদের এমন ধৈর্য্য ধরা উচিত, হোক সেটা স্বামী কিংবা সন্তানের জন্য।

স্বামী মদ্যপ, অন্য নারীতে আসক্ত; যেন তার কিছু করার নেই। আমরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দিই এভাবে- ‘ধৈর্য্য ধরুন, ঈশ্বরকে ডাকুন, আপনার স্বামী আপনার কাছে ফিরে আসবে।’অথচ সামান্য ‘পরপুরুষের’ সঙ্গে হেসে কথা বললে ‘পুরুষ-স্বামী’র তখন আর যেন ধৈর্য্য থাকে না। সমাজের ওই লোকগুলোই তখন বলে, ‘এটা ঠিক না, স্বামী যেটা পছন্দ করে না সেটা করো না।’

এই হলো চলচ্চিত্র ও সমাজ মিলে আমাদের ধৈর্য্যশীল, সেবাপরায়ণ মায়ের অবস্থা। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় ধৈর্য্য ধরেই আমাদের মায়েরা ‘ধৈর্য্যশীল’ হওয়ার অভিনয় করে যাচ্ছেন বা বাধ্য হচ্ছেন।

চোখ ভেসে যায় জলে

সর্বস্তরেই নারীর প্রতি নানা নির্যাতন চলচ্চিত্রের একধরনের ‘শোভাবর্ধন’ করে। তার নির্যাতনের ধরনের যেন অভাব নেই। কখনো স্বামী, কখনো স্বামীর অফিসের বড় কর্তা, কখনো বাড়িওয়ালা থেকে শুরু করে ‘নারী-শাশুড়ী’, ‘নারী-ননদ’ এদের কারো হাত থেকে রক্ষা পান না মা। এবং চলচ্চিত্রে এসবের উপস্থাপনও অনেকখানি রসিয়ে-রসিয়ে।

কাজী হায়াতের আম্মাজান এর মা কারখানার দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর অসহায়। এই সুযোগে চরিত্র নিয়ে কথা তোলেন বাড়িওয়ালা, ভাড়া দিতে না পারায় মুখের ওপর বলে যান নষ্টা মেয়ে। একপর্যায়ে ওই মা ছেলে-সন্তানসহ বাঁচার তাগিদে পাওনা টাকা আনতে যান স্বামীর অফিসে। টাকা না দিয়ে স্বামীর বড়কর্তা তাকে বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। ছেলের সামনে ধর্ষিত হয়ে মা এমনই মানসিক আঘাত পান যে; পরবর্তী জীবন ছেলের সঙ্গে কথা না বলেই কাটিয়ে দেন। ধর্ষণ, স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের এ রকমের ভুরিভুরি চিত্র আছে আমাদের চলচ্চিত্রে। কিন্তু সমস্যা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতিতে নারী বা মা নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না। যদি বেঁচে যান সেটাও কোনো পুরুষের সহায়তায়।

সবচেয়ে মজার যে বিষয়, সেটা হলো মায়ের বিপরীতে মাকে দাঁড় করানো। মা বড় না বউ বড় সিনেমায় আমরা এ ধরনের মা’দের পাই। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে মা ও বউ আপাত অবস্থান নিয়েই সমস্যার শুরু হয়। সংসারে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা কার অধিকার বেশি এগুলো সংকটের মূল কারণ হয়ে ওঠে। শাশুড়ীর সঙ্গে এক্ষেত্রে যুক্ত হয় ননদ আর বউয়ের সঙ্গে তার মা। শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে এসব ক্ষেত্রে বড় করে দেখানো হয় মানসিক নির্যাতনকে।

মায়ের মতো আপন কেহ নাই

মায়ের প্রতি সন্তানের অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখানো বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রে মাকে ‘শো-পিচ’ বানিয়ে সবার উপরে সাজিয়ে রাখা হয়। তাকে সবাই দেখবে প্রশংসা করবে, মা কাউকে ছুঁতে পারবে না, মাকেও কেউ ছুঁতে পারবে না। আম্মাজান চলচ্চিত্রে ছেলে তার মায়ের অসম্মানের বদলা নিতে হাজারটা খুন করে। মা কিছুই বলে না, কিন্তু প্রতিবার খুন করতে যাওয়ার সময় সে মায়ের অনুমতি নেয়। এমনকি মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে অন্যের বাগদত্তার প্রতি হাত বাড়াতেও কুণ্ঠা করে না। ইলিয়াস কাঞ্চনের মায়ের স্বপ্ন চলচ্চিত্রেও ঠিক একই ঘটনা। মায়ের স্বপ্নে দেখা মেয়েকে বিয়ে করার জন্য ছেলে বন-জঙ্গল একাকার করে, দেশদ্রোহীদের হত্যা করে নায়িকাকে নিয়ে আসে।

মনতাজুর রহমান আকবরের মায়ের চোখ চলচ্চিত্রে মায়ের চোখের অপারেশন করানোর জন্য সন্তানের থাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা। অবশেষে নিজের একটি চোখ দান করে মায়ের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে সন্তান। রাজু চৌধুরীর আমার মা আমার অহংকার এ মাকে বাঁচাতে অন্যায় পথে নামতেও দ্বিধা করে না সন্তান।

সব ক্ষেত্রেই বিষয়গুলো এমন যে, মাকে বাস্তব থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখা। তাকে একধরনের স্বর্গীয় আসনে বসানো। এর আড়ালে যেটা করা হয়, সেটা হলো তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া। অনেকটা লর্ড ক্লাইভের হাত ধরে বাংলার মসনদে মীরজাফরের বসার মতো। সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে তুমি, কিন্তু তোমার কোনো আকর্ষণ বল থাকবে না।

দীলিপ বিশ্বাসের মায়ের মর্যাদা চলচ্চিত্রে অফিসের কর্তাকে কেবল মা বলে ডাকার সম্মতি দেয়ার কারণে সেই মায়ের মেয়ের প্রেমিককে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করেন না। বাংলা চলচ্চিত্রে এই পুরুষদের তাদের মায়ের জন্য কতই না ভালোবাসা! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, চলচ্চিত্রের এই মাকে তারা শুধু মা হিসেবেই স্বর্গে তুলেছেন মানুষ করে মর্তে নামাতে পারেন নি।

হাজার চুরাশির মা 

‘তোমার পেটে যে সন্তান সে আমার কি না তাতেও আমার সন্দেহ আছে’- এমন অপবাদ দিয়ে মেরিকে ঘর থেকে বের করে দেয় তার স্বামী| প্রতিবাদে শুধু ঘর থেকে নয়, বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে চলে যান মেরি। মায়ের দাবি চলচ্চিত্রটিতে এমন রূপে দেখি এক মাকে। কিন্তু সমস্যা হলো মায়ের এ প্রতিবাদ তার স্বামীর উপর কোনো প্রভাবই ফেলে না। তার দিবা-রাত্রি চলতে থাকে আগের নিয়মেই। অন্যদিকে গর্ভবতী ওই মা পড়েন অথৈ সাগরে। এই সমাজ, এই রাষ্ট্রের কাছে তাকে প্রতিনিয়ত অনাহত হতে হয়। এখন কথা হলো, এ কেমন প্রতিবাদ? যে প্রতিবাদ বিরোধী পক্ষের উপর বিন্দুমাত্র অনুশোচনার জন্ম দেয় না। উল্টো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, প্রতিবাদ করাই যেন ভুল হয়েছে। আসলে চলচ্চিত্রিক এসব প্রতিবাদের ধরনও নির্ধারণ করে দেয় পুরুষ। মা ততখানিই প্রতিবাদী হন, যতখানি পুরুষ সহ্য করতে পারে।

চলচ্চিত্রের মায়েরা অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামী। মা নিজে ন্যায়নিষ্ঠ ও তার সন্তানকেও সেই আদর্শে গড়ে তুলতে চান। সন্তান যদি কখনো কোনো অন্যায় করে মা তাকে শোধরাতে চেষ্টা করেন। না হলে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আমার মা আমার অহংকার চলচ্চিত্রে সন্তান অন্যায় করলে মা আদালতে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার বিচার দাবি করেন। এভাবেই মাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উপস্থাপন করা হয়। দীলিপ বিশ্বাসের মায়ের মর্যাদা চলচ্চিত্রটিতে দ্বিতীয় নায়ক বাঁধন প্রেম করলে তার মা তাকে তিরস্কার করে। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই মাকে ন্যায়নিষ্ঠ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি করে উপস্থাপন লক্ষ করা যায়।

পরিশেষ

একথা অস্বীকার করছি না যে বাংলা চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত এই ‘মায়েরা’ বাস্তবতা বিবর্জিত। বরং একথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে, এটাই বাস্তব, সমাজের জন্য চরম সত্য। কিন্তু চলচ্চিত্রের কাজ কেবল বাস্তবতা তুলে ধরাই নয়; বিকল্প বাস্তবতা কিংবা বাস্তবতার যথার্থতা মূল্যায়ন করাও। অর্থাৎ আমরা বলতে চাই আমাদের সমাজে মা যে কেবল একজন নারী, মানুষ নয় তাও তুলে ধরা। অত্যন্ত প্রভাবশালী গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের অবশ্যই উচিত বাস্তব-অবস্থাকে ছাড়িয়ে একটা বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করা। কারণ শিল্পের কাজ সব সময় ইতিবাচকতার দিকে। শিল্প মাধ্যম হিসেবে আমরা চলচ্চিত্রের কাছে সেটা প্রত্যাশা করি।

 

লেখক : মাজিদ মিঠু  মোহাম্মদ আলী মানিক রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয়  প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী

mazid.mithu@gmail.com

manikmcjru@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. সাংকৃত্যায়নরাহুল; (১৯৬৩:১৯-২০); ভোলগা থেকে গঙ্গাচিরায়ত প্রকাশনকলকাতা

২. বেগমহাসনা; (২০১১:৪৭); ‘নারীরসম-অধিকার ও সুযোগ বাস্তবায়নে সমস্যা’; নতুন দিগন্তসম্পাদক-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীবর্ষ-সংখ্যা-ঢাকা

৩. ফ্রেডরিক এঙ্গেলসউদ্ধৃতরনোহায়দার আকবর খান (২০১১:৪৭); ‘নারীমুক্তিনারী আন্দোলন ও মার্কসবাদীরা’;কমরেডসম্পাদক-হায়দার আকবর খান রনোসংখ্যা-জুনঢাকা

৪. সুলতানাশেখ মাহমুদা (২০০২:১৯৮); ‘ঢাকারচলচ্চিত্রেনারীগণমাধ্যমওজনসমাজ’; সম্পাদিত-গীতিআরা নাসরীনমফিজুর রহমান ও সিতারা পারভীনশ্রাবণ প্রকাশনীঢাকা

৫. প্রাগুক্তসুলতানা(২০০২:১৯৯)     

৬. প্রাগুক্তসুলতানা(২০০২:২০০)     

৭. সরকার ,যতীন (২০১১:৩৯);পুরুষতন্ত্রেকারাবন্দীনারীরমাতৃত্ব’;ভাবনার মুক্তবাতায়ন,রুক্কুশাহ্‌ ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্সঢাকা


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন