Magic Lanthon

               

রুবেল পারভেজ

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেশে দেশে ‘ইলমাজ গু‘নে’

রুবেল পারভেজ


বিপ্লবীরা স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। সাধারণত এমনই ঘটে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে; শুধু অস্ত্র দিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করছেন না সংগ্রামী, বিপ্লবীরা। দেশের মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা, আশা, আকাঙ্খা ও বিবেকের চিন্তার মুক্তির জন্য বিকল্প মাধ্যম হিসেবে তারা এখন গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছেন। গণমাধ্যম এখন দেশে দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল, ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখার বিরুদ্ধে প্রবল এক প্রতিরূপ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র্র এখন প্রায়ই তটস্থ থাকে গণমাধ্যম কখন তাদের থলের বিড়াল বের করে দেয়।

মূলধারার গণমাধ্যম রেডিও, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট নামে অভিনব এক মাধ্যম। যা এই সবগুলো মাধ্যমকে একত্রতো করেছেই, একই সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করেছে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে। যাহোক, মূলধারার মাধ্যমে ফিরে আসি। এগুলোর মধ্যে দেশে দেশে আন্দোলন, সংগ্রামে যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল কিংবা রাখছে সেটি চলচ্চিত্র। বৈশিষ্ট্যগত কারণেই এ মাধ্যমটির প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে দর্শকদের মাঝে থাকে। আর সেটিই একে অন্য মাধ্যম থেকে করেছে অনন্য।

রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনকে তুলে ধরার পাশাপাশি চলচ্চিত্র যুগে যুগে ভূমিকা রেখেছে রাষ্ট্রের উন্নয়নে। চ্যাপলিন থেকে জাফর পানাহি; রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে কেউ কার্পণ্য করে নি। আবার বিপ্লবত্তোর সোভিয়েত রাশিয়ায় চলচ্চিত্র ব্যবহার হয়েছে সার্বিক উন্নয়নে। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে সবচেয়ে বেশি যেটা হয়েছে সেটা হলো রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সেন্সরশিপ আরোপ করেছে, রুদ্ধ করেছে এর অগ্রগতির পথ।

সুজান হেওয়ার্ডের মতে, ‘কালে কালে চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপের প্রয়োগ হয়েছে তিনভাবে- যৌনতা, সহিংসতা ও রাজনীতি। প্রথম দুই ক্ষেত্র নিয়ে চিন্তিত থাকে তারা, যারা কমবয়েসী ছেলে-মেয়েদের চলচ্চিত্রের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে চান। আর তৃতীয় বিষয়টি নিয়ে মাথাব্যাথা থাকে সরকারের।’ কারণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উঠে আসে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রকৃত বাস্তবতা।

ঠিক এমন কাজটিই দেশে দেশে করেছিলেন দেশপ্রেমিক সাহসী কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা। দেশপ্রেমিক এই বিপ্লবী মানুষগুলো চলচ্চিত্রকে হাতিয়ার করে তাদের দেশের চলমান পরিস্থিতিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। ফলে সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ায় চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়ে ওঠেন সমাজ ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের দর্পণ। চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুব্ধ করেন শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে, সাহস যোগান স্বপ্ন বাস্তবায়নের। বিপরীত দিকে ক্ষমতার ভীত নড়বড়ে করে দিচ্ছে দেখে স্বৈরশাসক ও কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রযন্ত্র চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাইকেই শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।

ফলস্বরুপ চলচ্চিত্র ও এর নির্মাতাদের দমনে যা যা প্রয়োজন শুরু হয় তার প্রয়োগ। বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রনির্মাতাদের গ্রেফতার, নির্যাতন, কারাদণ্ড দেওয়া হলো, তাদের সিনেমা তৈরির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলো, দেশত্যাগে বাধা দেওয়া হলো, আবার কাউকে দেশের মধ্যেই একঘরে করে রাখা হলো। অর্থাৎ তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছুই নেই যা করা হলো না। লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এমনকি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও এর সাথে সংশ্লিষ্টরা হয়ে পড়েন সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের শিকার। তুরস্কের ইলমাজ গু‘নে, ইরানের জাফর পানাহি, মোহাম্মদ রাসুলভ, মোহসেন মাখমালবাফ, আব্বাস কিয়োরোস্তামি, আফ্রিকার উসমান সেমবেন, সুলেমান সিসে, লাতিন আমেরিকার ফার্নান্দো সোলানাস, অক্টাভিয়া গেটিনো এমনকি বাংলাদেশের জহির রায়হান, তারেক মাসুদ’র মত চলচ্চিত্র নির্মাতারা সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম রোষানলে পড়েছেন। অধিকার হারিয়েছেন বাক স্বাধীনতার, নিষিদ্ধ হয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে। এমনই কিছু পরিচালক, তাদের সংগ্রামের প্রেক্ষাপট ও সমকালীন বিশ্ব নিয়ে আমার এ লেখা।

.

ফ্রান্সের প্যারিস। ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪  দেশত্যাগী ও নিঃস্ব অবস্থায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন একজন মানুষ। সংবাদটি শুনে মনে হতে পারে, অসহায়, সহায়-সম্বলহীন কোনো মানুষের কথা। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এর উল্টো। দেশত্যাগী ও নিঃস্ব ওই মানুষটি আর কেউ নন, তুরস্কের বিখ্যাত পরিচালক ইলমাজ গু‘নে। যিনি দিনের পর দিন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে লড়াই করেছেন প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ও তার রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে।

১৯৩৭ সালে তুরস্কের আদানায় দরিদ্র পরিবারে যখন কিংবদন্তি এই মানুষটির জন্ম তখন তুরস্কে রাজনৈতিক পালা বদল চলছিল। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও তেমন মজবুত ছিল না। চারদিকে কেবল শুধু নেই আর নেই। এমনই পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকা গু‘নে দেখতে থাকেন সমাজের চলমান অরাজকতা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, ক্ষমতাসীন দলের দমন-পীড়ন। হয়ত এসময়ের মধ্যেই তার বুকের ভেতরে জন্মাতে থাকে বিদ্রোহের আগুন।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা গু‘নে যৌবনে ভর্তি হন আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশুনা করেন আইন ও অর্থনীতি বিষয়ে। মনের ভিতর যার চলচ্চিত্র তিনি কীভাবে অন্য বিষয়ে স্থির হবেন। চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহী গু‘নের বয়স যখন ২১, তখনই তার প্রবেশ চলচ্চিত্রে। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তুরস্কের আধুনিক চলচ্চিত্রধারার শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ‘সুদর্শন অভিব্যক্তি, অভিনয়শিল্প এবং চরিত্রায়নে অসামান্য দক্ষতা তাকে রুপালি পর্দার ‘কদাকার রাজা’ হিসেবে স্ক্রিন আইডলে পরিণত করে।’

১৯৬০ এর দশকে তুরস্কের রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছলে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার জন্য সরকার বিরোধীদলের উপর হামলা, নির্যাতন শুরু করে। ভয়ংকর এই পরিস্থিতির অভিজ্ঞতাই গু‘নেকে পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। তিনি বুঝে ফেলেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরকারের সব ষড়যন্ত্র। এতদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটালেন তিনি। সাধারণ শোষিত মানুষের চরম দুর্দশা, তাদের মৌলিক অধিকার ইত্যাদি সবকিছু যখন ভুলুণ্ঠিত হতে লাগল ঠিক তখনই গু‘নে ‘ইক্যুয়েশনস উইথ থ্রি স্ট্রেনজারস’ নামে এক কমিউনিস্ট উপন্যাস লিখে ফেলেন। এ উপন্যাসে উঠে আসে রাষ্ট্রযন্ত্রের কূট-কৌশলীদের আসল রূপ। ফলে গ্রেফতার হন গু‘নে।

এ ঘটনা জীবনে প্রথমবারের মতো জেলে যাওয়া ইলমাজের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়। সাহিত্য নয় এবার তিনি পরিকল্পনা করেন সেলুলয়েডে রাষ্ট্রের কূট-কৌশলীদের মুখোশ খুলে ফেলার। সময় নষ্ট না করে গু’নে জেলখানার বন্দি সময়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে নিজেকে রপ্ত করতে থাকেন। আর জেল থেকে মুক্তি পেয়েই ১৯৬৫ সালের দিকে নিজেই খুলে বসেন একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। আর তা থেকেই ১৯৭০ সালে নিজে নির্মাণ করেন UMUT চলচ্চিত্রটি। প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই শাসক শ্রেণীর চরম শত্রুতে পরিণত হলেন গু‘নে।

এ সময়টাতে তুরস্কের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। চারদিকে বেড়ে যায় গুপ্তহত্যা, রাহাজানি, গুম, গ্রেপ্তার। এ পরিস্থিতিতে আবারও ক্ষেপে গেলেন গু‘নে। ১৯৭১ সালে নির্মাণ করলেন অপর (Umutsuzlar)| তার ছবিতে শোসকশ্রেণীর কুচক্রী ষড়যন্ত্র, সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপপ্রয়াস সরাসরি উঠে আসত। এর আগে কেউই গু’নের মতো এ সাহস দেখাতে পারেন নি। ফল একই; আবার সরকারের সাথে কলহ।

১৯৭২ সালে এক বিদ্রোহী ছাত্রকে আশ্রয় দেওয়ার অজুহাতে সরকারি বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। আবার জেলখানা। আবার চলচ্চিত্র নিয়ে জোর পড়াশুনা, স্ক্রিপ্ট লেখা। মজার ব্যাপার হলো গু‘নে কারাগারকে লাইব্রেরির মতোই ব্যবহার করেছিলেন। আর এবার জেলখানায় যাওয়ায় গু‘নের যেন একটু বেশি সমস্যা হলো, কারণ তার উদ্বেগ (Endsize), হতভাগ্য (Zavallilar)  বন্ধু (Arkadas) নামের চলচ্চিত্রগুলোর কাজ তিনি পুরোপুরি শেষ করতে পারেন নি। কিন্তু এ সমস্যাও কাটিয়ে ওঠেন ইলমাজ। বিশ্বস্ত সহযোগী সেরিফ গোরেন, আতিফ ইসলাম, যেকি অকতেন এর সঙ্গে কথা বলে তাদের এসব কাজ শেষ করার দায়িত্ব দেন। বিশেষ করে সেরিফ গোরেন তার চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নে যথেষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

দুই বছর জেল খাটার পর ১৯৭৪ এ মুক্তি পেয়ে তার কাজের গতি যেন আরও বেড়ে গেল। পুরো সময় জুড়ে তিনি শুটিংয়ের নির্দেশনা, স্ক্রিপ্ট লেখা ইত্যাদি কাজে নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললেন। সাথে দেশের পরিস্থিতি, চলমান প্রেক্ষাপট কোন দিকে যাচ্ছে সেদিকে গভীর নজর রাখতে থাকলেন। সবকিছু তার মতো করেই চলছিল। এর মধ্যে একদিন শুটিংয়ের ফাঁকে রেস্টুরেন্টে এক ডানপন্থী বিচারকের সাথে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন গু‘নে। রাগ শামাল দিতে না পেরে তিনি একপর্যায়ে তাকে গুলি করে বসেন। এই অপরাধে আবার কারাগারে পাঠানো হয় গু‘নে কে। এবার সাজা ১৯ বছরের। আবার সেই জীবন। একের পর এক স্ক্রিপ্ট লেখা। এবার জেলখানায় পুরোদস্তুর অফিস বানিয়ে ফেললেন তিনি। একাধারে স্ক্রিপ্ট লেখা, সেগুলো বাইরের পরিচালককে দিয়ে শুট করানো, রাশ প্রিন্ট দেখে চিত্রায়ন ঠিক করা ইত্যাদি সব কাজই তিনি নিয়মিত করতেন জেলে বসে। ১৯৭৮ সালে নির্মিত হলো তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি পাল (Suru)| ৭০’র দশকের সামন্ত সমাজ, নগরায়ন, অসম ব্যবস্থাপনা, রাজনীতি, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন, দারিদ্রতা, অসহায় মানুষের সংগ্রাম ও পরাজয় উপজীব্য ছিল এই চলচ্চিত্রে।

এর পরের বছর ১৯৭৯ সালে তিনি তৈরি করলেন Dusman (শত্রু)। এখানেও তিনি তার স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক বিবেচনাবোধকে ভিন্ন গল্পে ধারণ করলেন। তুলে আনলেন একমুখী অর্থনীতির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব, সর্বহারা শ্রমজীবী মানুষের জীবন। ভালোবাসা, পরিবার, বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সবই যেন অসম্ভব এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থায়। তার সিনেমার বিষয়বস্তুই প্রমাণ করে তিনি আসলে কত বেশি সমাজসচেতন ও দূরদর্শী ছিলেন।

তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৮০ সালে। এ সময় দেশের পরিস্থিতি ভয়ানকভাবে খারাপ হতে থাকে। স্বাধীন মত প্রকাশের সব রকম ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয় সামরিক শাসকের হাতে। এরকম পরিস্থিতিতে ১৯৮১ সালে জেল থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে পরবাসী হন গু‘নে। এখানে এসেই শুরু করলেন তার সহযোগীদের চিত্রায়িত yol চলচ্চিত্রটির কাজ। সম্পাদনার জন্য চলে গেলেন সুইজারল্যান্ডে। yol (যাত্রা) মুক্তি পেল ১৯৮২ তে। এই চলচ্চিত্রে উঠে এল এক কয়েদির জীবন, তুলে ধরলেন তার প্রতি রাষ্ট্রের নির্দয় আচরণ। এই চলচ্চিত্রের পর বিদেশের মাটিতেও জীবন সংশয় হয়ে উঠল গু‘নের। এবার তুরস্ক সরকার এতই ভয়ংকর হয়ে উঠল যে তাকে হত্যা করার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করল। হয়ত চলচ্চিত্রের জন্য জীবনের এমন সংশয় পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম লোককেই মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

গুপ্তঘাতক যখন এভাবে তাড়া করছে, তখন বিপ্লবী এই মানুষটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে yol এর প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন। ফ্রান্স সরকার তখন বাধ্য হয়েই তাকে দেহরক্ষী দিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবে হাজির করেছিল। এমনকি ইন্টারপোলের হুলিয়া উপেক্ষা করে পুরস্কার গ্রহণের পর উৎসবস্থল থেকে উধাও হয়ে যান।

এ রকম পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের তৎকালীন সরকার তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। তাদের সহযোগিতায়  কারাগারের সেই তিক্ত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮৩ সালে গু‘নে নির্মাণ করেন দেয়াল (Duvar)| এটিই ছিল তার নির্মিত সর্বশেষ ছবি।

সামরিক সরকার যতদিন তুরস্কে ছিল ইলমাজ গু‘নের নামই উচ্চারিত হতে দেয় নি সেই দেশে। সরকার তার পরিচালিত ও অভিনীত ১১টি চলচ্চিত্র ধ্বংস করে ফেলে। বাতিল করে তার নাগরিকত্ব। এমনকি তুরস্কে তার লিখিত কিছু পড়া ও প্রকাশও ছিল নিষিদ্ধ। দেখুন, কেবল চলচ্চিত্রের মতো একটা শিল্প মাধ্যম নিয়ে কাজ করায় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের কতোই না ভয়! চলচ্চিত্র যে শুধু বিনোদন নয়, মুক্তির পথ, জনগণের দাবী আদায়ের মাধ্যম, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূট-কৌশল প্রকাশ, সবশেষে মুক্তি ও স্বাধীনতা আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে গু‘নে তা প্রমাণ করেছিলেন।

.

বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্র নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত দেশটির নাম ইরান। সমসাময়িককালে চলচ্চিত্রের ভাষাকে রুদ্ধ করার সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি এই দেশটির। শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণের অপরাধে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকতে হচ্ছে দেশটির দুইজন পরিচালককে। ঘটনার সমাপ্তি এখানেই নয়, একই সঙ্গে সরকার তাদের বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য রচনা ও বিদেশ ভ্রমণের ওপর আরোপ করেছে ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা। ইসলামি বিপ্লবত্তোর ইরানি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের যে শুভসূচনা হয়েছিল এর মধ্যে দিয়ে তা আহমেদিনেজাদ সরকার ভূলুণ্ঠিত করে দেয়। কারণ আর কিছুই নয়, ইরানে বর্তমানে যা ঘটছে জাফর পানাহি ও মোহাম্মদ রাসুলভ নামের এই দুই পরিচালক তা তুলে ধরেছিলেন সেলুলয়েডে। সরকার ভাবল, এই চলচ্চিত্র গণমানুষের ক্রোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা ক্ষমতাচ্যূত হতে পারে, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হতে পারে। তাই চলচ্চিত্রকে থামাতে হবে, থামাতে হবে তার পরিচালককে। যুগে যুগে রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক যেভাবে চলচ্চিত্রকে থামাতে চেয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ইরানের চিত্রও এর থেকে খুব বেশি ভাল ছিল না। এমনকি বিপ্লব পরবর্তী কয়েক বছরও ছিল ইরানের চলচ্চিত্রের জন্য অমানিশার কাল। ৭০’র দশকে ইরানি চলচ্চিত্রের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সোহরাব শহীদ সেলসের আবির্ভাব। এরপর থেকেই সরকারের সঙ্গে চলচ্চিত্রের দ্বন্দ্বের বিষয়টি বিশ্ববাসির কাছে প্রকাশ পেতে থাকে। তার নির্মিত ওয়ান সিম্পল ইনসিডেন্ট (১৯৭৩), স্টিল লাইফ (১৯৭৫), ইন এক্সাইল (১৯৭৫) চলচ্চিত্রগুলো বাস্তবতাকে দেখার এক ধরনের চোখ হিসেবে দর্শকদের সামনে উপস্থিত হয়। এতে যেটা হয়, ইসলামি বিপ্লবের পর স্বদেশ ছাড়তে বাধ্য হন সেল্‌স। শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সেল্‌স নির্বাসিত জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। তবে সেল্‌সের এই নির্বাসন বৃথা যায় নি। চলচ্চিত্র দিয়ে বাস্তবতাকে দেখার যে চোখ সেল্‌স দিয়ে গিয়েছিলেন তার অনুসরণ করতে থাকেন পরবর্তীকালে ইরানের অন্য দুই বিখ্যাত পরিচালক আব্বাস কিয়োরোস্তামি ও মোহসেন মাখমালবাফ।

এর বাইরেও বাহরাম রেইজি, দারিউস মেহেরজুই, আমির নাদরি, রোকসান বানি এটমাড-এর মতো বিখ্যাত পরিচালকদের হাতে ইরানের চলচ্চিত্র বিশ্বে খ্যাতির শিখরে পৌঁছতে থাকে। তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে ইরানের শিল্প, সাহিত্যের আধেয়ের প্রয়োগ দেখা যায়। চলচ্চিত্রে উঠে আসতে থাকে মানবিকতা, সাম্য, ধর্মীয় অনুশাসনের বিপরীতে উদার মানবিক ধর্মনিরপেক্ষতার মতো বিষয়গুলো। এভাবে আস্তে আস্তে চলচ্চিত্র হতে থাকে সমাজের মুক্তিকামী মানুষের মত প্রকাশের হাতিয়ার। ফলে সরকারের সাথে দেশটির চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।

জীবনের অনেক চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ৮০’র দশকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন মোহসেন মাখমালবাফ। দেশের অগনিত সমস্যা, সরকারের দুর্নীতি, সরকারবিরোধী বক্তব্যসহ সমাজের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তিনি তুলে ধরতে থাকেন চলচ্চিত্রে। আর এতেই সরকারের চরম রোষানলে পড়তে হয় তাকে। তার নির্মিত টাইম অব লাভ (১৯৯০), দ্য নাইটস অব জায়ান্দেরুড (১৯৯১) সহ একাধিক ছবি বিভিন্ন মেয়াদে সরকার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি। নিজের চলচ্চিত্রকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে চষে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কিংবদন্তি বিপ্লবী চে গুয়েভারা যার আদর্শ তিনিতো এমনটি করতেই পারেন। কোনো শক্তি তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের এ বিপ্লব থেকে দমাতে পারে নি। ১৭ বছর বয়সে বিপ্লবের জন্য অস্ত্র লুট করতে গিয়ে পুলিশকে ছুরিকাঘাত করা ওই কিশোর মধ্যবয়সেও অব্যাহত রেখেছেন তার সংগ্রাম।

মাখমালবাফের এক দশক পর কিয়োরোস্তামির হাত ধরেই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন পানাহি। পূর্ব আজারবাইজানের মিয়ানেহ্‌ শহরে ১৯৬০ সালে ১১ জুলাই  জন্ম নেয়া এই বিপ্লবী মানুষটি ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে। যদিও সেই যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে। যুদ্ধফেরত পানাহি তেহরানের কলেজ অব সিনেমা এবং টেলিভিশনে পড়াশুনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কিয়োরোস্তামির থ্রো দ্য অলিভ ট্রিজ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পান পানাহি। এর পরের বছর তিনি নিজেই নির্মাণ করেন দ্য হোয়াইট বেলুন। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানজনক ক্যামেরা ডি’অর লাভ করে। অল্প সময়ে ইরানের নতুন ধারার সিনেমায় অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিচালক হয়ে ওঠেন পানাহি। তার নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে দ্য মিরর (১৯৯৭), দ্য সার্কেল (২০০০), ক্রিমসন গোল্ড (২০০৩), অবসাইড (২০০৬)। তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু সরাসরি ইরানি সমাজ নিয়ে সরাসরি বা অনুচ্চভাবে ক্রিটিক্যাল। তাই সরকার ও পানাহির মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল শুরু থেকেই। এ কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকবার। ২০১০ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ছিলেন কারাগারে। সেখানে অনশন করে পরে জামিনে মুক্তি পান। একই বছর দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিসন্ধি নিয়ে সমাবেশ ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়াসহ বেশকিছু বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয় পানাহির বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর পানাহির বিরুদ্ধে ছয় বছরের কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত। একই সাজা হয়েছে তার দীর্ঘদিনের সহকারী ও আরেক ইরানি পরিচালক মোহাম্মদ রাসুলভের।

কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে শেষ চিঠিতে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে জানিয়েছেন, ‘ওদের বিচারে দোষী সাব্যস্ত আমাকে কাটাতে হবে শব্দহীনতার ২০ বছর। তা সত্ত্বেও আমার কণ্ঠ চিৎকার করে যাবে এমন এক কালের জন্য, যে কালে আমি আমরা সহিষ্ণু হতে জানব। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে থাকব এবং একে অন্যের জন্য বাঁচব।’

দিন দিন চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে ইরান সরকারের দমন-পীড়ন যেন বাড়ছেই। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১১ ইরান সরকার ছয়জন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাকে গ্রেপ্তার করে। তাদের ভাষ্য মতে, নাসের সাফারিয়ান, মুজতবা মিরতাহমাছেব, হাদি আফারিদেহ, মোহসেন সাহোরমাজদার, কাতাইয়ুন সাহাবি, মেহেদাত জাহেদিয়ান নামে এই ছয়জন পরিচালক বিবিসি সার্ভিসের পক্ষে কাজ করেছে। ইরানে বিবিসি সার্ভিস নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও বিবিসি দাবি করছে, এই ছয় পরিচালক আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনোভাবেই তাদের সঙ্গে যুক্ত নয়। বিবিসি মূলত ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির ওপর এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করছিল।

সর্বশেষ যে ঘটনাটি ঘটেছে সভ্য সমাজে তা মেনে নেয়া একটু কষ্টকরই। গত ৮ অক্টোবর, ২০১১ মারজিয়েহ ভাফামেহের নামে এক অভিনেত্রীকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৯০টি বেত্রাঘাতের আদেশ দিয়েছে দেশটির আদালত। ইরানে শিল্পীদের উপর যে সরকারি বিধি-নিষেধ আরোপ আছে, সেটাকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিযোগে ভাফামেহেরকে এই শাস্তি দেয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় তেহরানের এক অভিনেত্রীর জীবনকাহিনী নিয়ে মাই তেহরান ফর সেল নামে ওই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল। রক্ষণশীলদের সমালোচনার মুখে গত জুলাইয়ে ভাফামেহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি চলচ্চিত্রটি ইরানে প্রদর্শনের জন্য অনুমতি দেয়া হয় নি। যদিও ইন্টারনেটের বদৌলতে চলচ্চিত্রটি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হচ্ছে।

একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, এই ইরান সরকারই কিন্তু ইসলামি বিপ্লবত্তোর চলচ্চিত্রকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। এর পিছনে কারণ হয়ত একটা আছে। সেটা হলো, ‘যদি ইসলামি বিপ্লব শিল্প ভাবনা প্রকাশে বাধাই পায়, যদি মধ্যযুগীয় শাসন সত্যিই কায়েম হয়ে থাকে তাহলে এত মানবিক, সমাজবাস্তবতার এত উপস্থাপনা কী করে ইরানের চলচ্চিত্রে সম্ভব হল? অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের চলচ্চিত্রকে তুলে ধরার এসব সরকারি উদ্যোগ ছিল তাদের এক ধরনের জনসংযোগ-ব্যবস্থারই অংশ- এর চাইতে আর বেশি কিছু নয়।’ তার মানে ইরান সরকার সিনেমার উন্নয়নে যা যা করণীয় তা করছে। অন্যদিকে সিনেমা নিষিদ্ধ, পরিচালকদের গ্রেফতার, নির্যাতন করছে। পাঠক একটু খেয়াল করুন, চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ওই সরকারের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা চলচ্চিত্রের আধেয় নিয়ে। সেই আধেয় যখন সরকারের স্বার্থের প্রতিকূলে যাচ্ছে, তখনই রোষানলে পড়ছে চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। যেমনটি পড়েছিল ইলমাজ গু‘নে।

.

আফ্রিকা। নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না, দুর্ভিক্ষের শিকার মানুষের কঙ্কালসার শরীর, আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো সন্ত্রাসের দাপটে চারিদিকে হত্যা, রাহাজানি. ধর্ষণ, প্রাচীন দাসপ্রথাকে জিইয়ে রাখা ইত্যাদি। ফরাসি শাসনের সূচনা, দু’টি বিশ্বযুদ্ধ, ইউরোপিয়ানদের দ্বারা বিভক্তিকরণ, ধনিক শ্রেণীর বর্বরতা ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় আফ্রিকাকে করেছে ছিন্নভিন্ন। এরপরও কিছু মানুষ স্বাধীন, সুন্দর আফ্রিকা গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। এই মানুষেরা শুধু অস্ত্র কিংবা রাজনীতি দিয়েই নয়, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সামনে তাদের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেছেন। তবে এ কাজটা যে তাদের জন্য খুব সহজ ছিল - এমনটা নয়।

ধনিক শ্রেণী, স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে চলচ্চিত্র-পাগল মানুষগুলোকে কোনো না কোনোভাবে সরকারের হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। চলচ্চিত্র-পাগল বিপ্লবী এই মানুষগুলোর মধ্যে উসমান সেমবেন, সুলেমান সিসে, বেন বারকা, ইয়ুসুফ শাহিন, ফ্লোরা গোমেজ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাদের নির্মিত প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের চলমান দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের স্বৈরাচারী নীতি সবকিছুই ফুটে উঠেছে। এ কারণেই পরিচালক উসমান সেমবেন বলেছিলেন ‘আফ্রিকাতে ছবি করাটা একটা রাজনৈতিক কাজ’। ১৯২৩ সালে সেনেগালে জন্ম নেয়া উসমান সেমবেন শুধু সিনেমার মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত অবস্থা, সাধারণ ভাগ্যবিড়ম্বিত দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের জীবনের কথাই তুলে ধরেন নি। শ্রমিকদের দাবি আদায়ে ইন্দো-চায়না যুদ্ধে মার্সেলি ডকে লড়াই করেছেন। আফ্রিকার কলোনিয়াল যুদ্ধের বিরুদ্ধে মহড়ায় অংশও নিয়েছেন তিনি।

ফাদার অব আফ্রিকান ফিল্ম নামে খ্যাত সেমবেন নির্মিত Xala, Ceddo সহ প্রতিটি চলচ্চিত্রে দেশের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামী জীবনের কথা, মানসিক ও আর্থিক দাসত্ব, নিম্নশ্রেণীর মানুষের সাথে বুর্জোয়া সমাজের প্রতারণা, আফ্রিকান সরকার ও আরব শাসকবর্গের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বিরোধী বক্তব্য উঠে এসেছে। সাদারা যখন কালো মানুষদের ওপর প্রচণ্ড রকম অত্যাচার করত, তখন সেমবেন এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাংস্কৃতিক ময়দানকেই যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে মনে করতেন। যার কারণে তাকে বিভিন্ন সময়, বিভিন্নভাবে ক্ষমতাবানদের রোষানলে পড়তে হয়েছে। যদিও তাকে গ্রেপ্তার বা নির্যাতন করা হয় নি। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণে তাকে বাধা দেয়া হয়েছে।

আসলে উসমান সেমবেন কিংবা সুলেমান সিসে’রা যে সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সেটাই একটা বড় বিপ্লব। নির্যাতন না থাকলেও অশিক্ষা, বর্বরতার মতো প্রতিবন্ধকতা কোনোভাবেই এর থেকে কম নয়।

আফ্রিকার আরেক কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সুলেমান সিসে। মালির বাকমোতে জন্ম নেয়া সুলেমান তার নির্মিত ফাইভ ডেজ ইন  লাইফ, লাইট, দ্য উইন্ড, টাইম, টেল মি হু ইউ আর চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন স্বাধীনতাউত্তর আফ্রিকাতে পুরুষপ্রাধান্যশীলতা, নারী নির্যাতন, সরকারের খামখেয়ালি রাষ্ট্র পরিচালনা, নব্যধনীদের উৎপাত, সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়সমূহ। যে কারণে তাকেও পড়তে হয়েছে সরকারের চরম রোষানলে। ফলস্বরূপ তাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন। তারপরও দেশের জন্য তার আন্দোলন এতটুকু সময়ের জন্য হলেও থেমে থাকে নি, নির্মাণ করেছেন আরও সাহসী ছবি।

এভাবে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আফ্রিকান চলচ্চিত্রকাররা তাদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে দেশের, দেশের নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণাগ্রস্থ জীবন, রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের সকল প্রকার অন্যায় কার্যক্রম তুলে ধরেছেন। যা এক কথায় অতুলনীয়।

.

সংগ্রামী মানুষের আরেক বিশ্বের নাম লাতিন আমেরিকা। দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী জনতার লড়াই, স্বাধনিতা লাভের পর সামরিক শাসনের স্বেচ্ছাচারিতা, জনবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে তাদের নিরন্তর সংগ্রাম ইত্যাদি সবকিছুই ওই অঞ্চলটির জনগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এই গণআন্দোলন ও সাংস্কৃতিক প্রয়াসের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িত ছিল চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এখানকার মানুষ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে, তাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এখানেও সরকারের রোষানল থেকে মুক্তি পায় নি চলচ্চিত্র ও এর সাথে সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে আর্জেন্টিনার পরিচালক গ্লাজের ও অভিনেতা ট্রক্সলারের মতো বিভিন্ন কলাকুশলীকে নিজ নিজ দেশে গ্রেফতার, শারীরিক নির্যাতন এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। হেক্টর অলিভেরা, সেনজিয়েস, সার্জিয়ো গিরিল, ফার্নান্দো সোলানাস, অক্টাভিয়া গেটিনো প্রমুখ চলচ্চিত্রনির্মাতারা রাজনৈতিক সিনেমা তৈরির দায়ে সরকারের কড়া বিরোধিতার সম্মুখীন হন।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ারে ১৯৩৬ সালে জন্ম নেয়া ফার্নান্দো সোলানাস পরিচালনার পাশাপাশি একজন চিত্রনাট্যকার এবং রাজনৈতিক নেতা। ১৯৬২ সালে সিওইর আনদানফো নামে স্বলদৈর্ঘ্য পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন সোলানাস।  ১৯৬৮ সালে নিজের প্রযোজনায় নির্মাণ করেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র লা হোরা দি লয় হরনাস। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি লাতিন আমেরিকাতে নব্য উপনিবেশবাদ ও অরাজকতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭০ সালে আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্র শিল্পের অভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী সোলানাস কিংবদন্তি রাজনৈতিক নেতা পেরনকে সমর্থন দেয়ায় রাইট উইংস্‌ ফোর্সেস’র হুমকির সম্মুখীন হন। এসময় সোলানাসের চলচ্চিত্রের একজন অভিনেতাকে গুপ্তহত্যা করা হয়। অপহরণ করা হয় সোলানাসকে। মূলত তার প্রত্যেকটি সিনেমাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্যকেন্দ্রিক। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনা সরকারের একজন কড়া সমালোচক। দমন-পীড়নের একপর্যায়ে ১৯৯১ সালের ২১ মে সোলানাসের ওপর বড় ধরনের হামলা করে সন্ত্রাসীরা। ছয়টি গুলি করে তার পায়ে। তারপরও থেমে থাকেন নি তিনি। নির্মাণ করেছেন একের পর এক চলচ্চিত্র।

শুধু সোলানাসই নয়, তার দীর্ঘদিনের সহযোগী অক্টাভিয়া গেটিনো স্পেন থেকে আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন শুধুমাত্র ওই দেশের মানুষের জীবন, সংগ্রাম, রাষ্ট্রযন্ত্রের অরাজকতা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে। তিনিও বাদ যান নি সরকারের ক্রোধ থেকে। তার চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে সরকারের চাপে তিনি পেরুতে চলে যেতে বাধ্য হন।

.

‘আপনি শিল্পজগতের একজন অভিভাবক হিসেবে পরিচিত। তাই আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আমাদের কাছে চলচ্চিত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরূপ।’ নবজাত সোভিয়েত রাষ্ট্রের কর্ণধার লেনিন তার শিক্ষামন্ত্রী আনাতোলি লুনাচারস্কিও এর সঙ্গে কথোপকথনে এ উক্তিটি করেছিলেন ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯১৭’র অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরবর্তী সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিপ্লবের পর ১৫টি অঙ্গ প্রজাতন্ত্র নিয়ে গঠিত বিশাল ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে গঠিত হওয়া রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সে অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রবাহিত হলো নতুন খাতে। কায়েম হলো সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা। সে সময় ‘নতুন এ রাষ্ট্রের কর্ণধার লেলিন চলচ্চিত্রকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরূপ’ হিসেবে স্বীকার করে নেন।’ রুশ চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য তিনি ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত করলেন বিশ্বের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্র ‘অল ইউনিয়ন স্টেট ইন্সটিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি’ যা সংক্ষেপে VGIK নামে পরিচিত।

শুরু হলো সম্ভাবনার এক নতুন সকাল। লেনিন নিজেই বিপ্লবের চেতনা ও বিপ্লবী মন্ত্র সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পরিচালক ভের্তভকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন ‘সিনেমার কাজ হলো বিপ্লবী-চেতনাকে সদা জাগ্রত রাখা’। এভাবে তার সরাসরি  উৎসাহে অনেক প্রতিভাবান ও উৎসাহিত যুবক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মাণ করতে থাকেন একের পর এক সিনেমা। তারা রাশিয়ার চলচ্চিত্রকে বিশ্বসভায় গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। এ সময় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নিষ্পেষণের মধ্যেও সোভিয়েত চলচ্চিত্র এগিয়ে গিয়েছিল অনেক দূর।

লেনিনের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বহিঃরাষ্ট্রের সাথে ক্রমশ বাড়তে থাকা সংকট ইত্যাদি দেশকে ক্রমশ অস্বস্তিকর ও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রে উঠে আসতে থাকে সমাজবাস্তবতা, রাজনীতি, অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র। যে রাষ্ট্র চলচ্চিত্র নিয়ে এত উদার তারাও মেনে নিতে পারে নি তাদের অর্থাৎ সরকারের স্বার্থবিরোধী এসব বক্তব্য। ফলে বাড়তে থাকে সরকারের সাথে চলচ্চিত্র পরিচালকদের অন্তঃকলহ। চলচ্চিত্রের বাস্তবতা, সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা, সরকারি স্বার্থ ও শিল্পীর স্বাধীনতার দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনে মন্থর হয়ে পড়ে চলচ্চিত্রের গতি।

সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ শুরু করে চলচ্চিত্রের উপর। সেন্সর করতে থাকে সিনেমা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কর্তৃপক্ষ তাদের ইচ্ছেমতো চলচ্চিত্র নতুন করে সম্পাদনা করিয়ে ছাড়পত্র দিত। কখনো কখনো সরকারি হুকুমমতো ‘মাস্টারপিস’ সিনেমা বানাতে হতো পরিচালকদের। প্রতিটি মুহূর্ত নজরদারির মধ্যে কাটাতে হতো চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু এত কিছুর পরও সের্গেই আইজেনস্টাইন, গার্ডিন, আলেকজান্দার ড্রানকভ, আলেকজান্দার পানতেলিয়েভ, ফ্রেডারিখ এর্মলার, লেভ কুলেশভ, ভের্তভ, মিখাইল রম’র মতো দেশপ্রেমিক পরিচালকরা নির্মাণ করেছিলেন অসাধারণ সব চলচ্চিত্র।

 

.

১৯৭০ এ জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন জহির রায়হান। ’৬০ দশক জুড়ে যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলন আমাদের দেশে হয়েছিল তার একটি প্রতীকী দলিল ছিল এই চলচ্চিত্রটি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে চলমান গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ছিল এদেশের প্রথম রাজনৈতিক সিনেমা। জহির রায়হান তার এই চলচ্চিত্রে পরাধীন দেশে সামরিক শাসকের বর্বরতা, তাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের লড়াই, স্বাধীনতাকামী শ্রেণীসমাজের ওপর বৈষম্য ইত্যাদি সবকিছু তুলে ধরেছিলেন।

কিন্তু একটি পরাধীন দেশে জহিরের জন্য এ ধরনের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ এত সহজ ছিল না। তৎকালীন সরকার এ মাধ্যমটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এমন কিছু নেই যা করার চেষ্টা করে নি। কিন্তু সাহসী ও বিপ্লবী জহির রায়হানকে তারা কোনোভাবেই থামাতে পারে নি। একপর্যায়ে জহির রায়হান কৌশলে এই মাধ্যমটি ব্যবহার করে আসল সত্য প্রকাশ করার পরিকল্পনা করতে লাগলেন। চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের কাহিনী বলার মধ্য দিয়ে তিনি পুরো দেশের অবস্থা তুলে ধরার পরিকল্পনা করলেন। আরেক বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা আমজাদ হোসেনের সহযোগিতায় তৈরি করলেন চিত্রনাট্য। এরপর শুরু হলো জীবন থেকে নেয়ার কাজ।

চলচ্চিত্রটির শুরু থেকে মুক্তি পর্যন্ত কম বাধা বিপত্তি পোহাতে হয় নি জহির রায়হানকে। একবার সেনা সদস্যরা চলচ্চিত্রটির শুটিং স্পট ঘিরে ফেলে, এরকম স্বীকারোক্তি নিল যে, ‘ছবির মুক্তির পর দেশে যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে তার দায়-দায়িত্ব বর্তাবে পরিচালকের কাঁধে।’ ছবিটি সেন্সরে জমা দেয়া হলে তা দেখে আরো বিগড়ে যায় সদস্যরা। তাদের ভাষ্য ছবিটির একটি চরিত্রতে নাকি সামরিক শাসকের চেহারা দেয়া হয়েছে, যা নাকি আইয়ুব খানকে ইঙ্গিত করে। শুধু এই একটি অজুহাতে ছবিটির ছাড়পত্র দেয়া হলো না। বলা হলো এটি সরকার বিরোধী চলচ্চিত্র।

পরবর্তীতে সেন্সর বোর্ডে থাকা কয়েকজন বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কাছে জহির রায়হান আবেদন জানালে তারা ছবিটি মুক্তির ব্যবস্থা করে। মুক্তির পরপরই ঘটল আরেক ঘটনা। পাকিস্তানি সেনারা প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে ঘুরে চলচ্চিত্রটির প্রিন্ট জব্দ করল। বলা হলো ছবিটি দিয়ে বাঙালির বিদ্রোহকে উস্‌কে দেয়া হচ্ছে। এই একটি কথাতেই সরকার জনরোষের মধ্যে পড়ে গেল। প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে আবার চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার।১০

সেই জহির রায়হান ’৭১ এ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে নির্মাণ করলেন প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড। চলচ্চিত্রটিতে উদ্বাস্তুদের মানবেতর জীবন দেখানোর পাশাপাশি গণহত্যা বন্ধের জোরালো দাবি জানানো হয়। এরপর তিনি নির্মাণ করলেন প্রবাসী সরকারের কর্মকাণ্ডভিত্তিক ছবি  স্টেট ইজ বার্ন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই একজন বিপ্লবীর মতো জহির পরিকল্পনা করতে থাকেন চলচ্চিত্রকে কীভাবে আরো এগিয়ে নেয়া যায়।

কিন্তু স্বাধীন দেশে চলচ্চিত্রের একটা সুন্দর ইতিহাস গড়ে দেওয়ার আগেই চলে যেতে হলো জহির রায়হানকে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় যে চলচ্চিত্রটি নিয়ে সেটি তারেক মাসুদের মাটির ময়না(২০০২) স্বাধীনতধারার চলচ্চিত্র হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে অনেকদিন এটি নানাভাবে সফল হয়। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সমালোচক পুরস্কার, অস্কার প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশী চলচ্চিত্র হিসেবে আমন্ত্রণ, ইউরোপ, আমেরিকায় বানিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় এবং আমেরিকা থেকে চলচ্চিত্রটির ডিভিডিও বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অথচ ধর্মবিরোধী বক্তব্য থাকার ঠুনকো অজুহাতে সরকার মাটির ময়নাকে সেন্সরে আটকে দেয়। এমনকি সেসময় তারেককে মৌলবাদী ধর্মগোষ্ঠীর কাছ থেকে হত্যাসহ নানা ধরনের হুমকির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

এছাড়াও তানভীর মোকাম্মেল’র স্মৃতি ৭১ চলচ্চিত্রটি কোনো কারণ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বিনষ্টের দায়ে সরকার নিষিদ্ধ করে।

সর্বশেষ ২০১১ সালে হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ নামের একটি চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড আটকে দেয়। কারণ চলচ্চিত্রটিতে খলনায়ক চরিত্রে রূপদানকারী ব্যক্তিটি যে পোষাক ব্যবহার করেছেন তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতাদের ব্যবহৃত পোষাকের সাথে মিলে যায়।১১ ভাবুন যুক্তিটা কত ঠুনকো? শেষ পর্যন্ত পরিচালককে এই পোষাকের জন্য ওই জায়গাগুলো নতুন করে শুটিং করে লাগাতে হয়েছে। এটাও কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এক ধরনের দমন-পীড়ন। যা অনেকটা ‘হীরক রাজার’ মতো।

.

ইলমাজ গু‘নের মৃত্যুতে রাষ্ট্রযন্ত্র কিছু সময় স্বস্তিতে ছিল ঠিকই, কিন্তু পরে বুঝেছিল গু‘নে নেই কিন্তু তার সৃষ্টি চলচ্চিত্রগুলো আছে। এবং সেগুলো প্রতিনিয়ত, প্রতিক্ষণে তাদের মুখোশ খুলে দিয়ে ভোগাবে আরও অনেক দিন। রাজনৈতিক ছায়াতলে না থেকে, রাজনীতিবিদ না হয়েও সামরিক শোষকের রাষ্ট্রযন্ত্র দেশত্যাগী হতে বাধ্য করেছিল গু‘নেকে। বিশ্বের সব শাসকরা এভাবেই গু‘নেদের পরবাসী করে স্বস্তিতে থাকতে চায়। তাদের ধারণা ছিল ইলমাজকে সরিয়ে দিলেই হয়ত তারা তাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে পারবে আজীবন। ভেবেছিল এক ইলমাজ গু‘নের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই হয়ত সব ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে যুগে যুগে দেশে দেশে জন্ম নিয়েছে শত ইলমাজ গু‘নে।

লেখক : রুবেল পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী

rubelmcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. হেওয়ার্ড (২০০৬:৭২) উদ্ধৃত, নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।

২. আনোয়ার, রফিকুল; ইলমাজ গু’নে: জীবন ও চলচ্চিত্র; কালি  কলম; বর্ষ-৮, সংখ্যা-৩, ১৪১৮।

৩. মানবতাবাদী এক চলচ্চিত্রকার; সমকাল; ৭ জুলাই ২০১১।

৪. http://www.bbc.co.uk/news/world-middle-east-14976753

৫. ইরানে চলচ্চিত্র অভিনেত্রীকে বেত্রাঘাতের নির্দেশ; প্রথম আলো, ১১ অক্টোবর ২০১১।

৬. হাসান, মানজারে; সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের জাতীয় চলচ্চিত্র; যোগাযোগ, সম্পাদক- ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫, পৃ-৪৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

৭. গুপ্ত, ধ্রুব; আফ্রিকানচলচ্চিত্র; চলচ্চিত্রের অভিধান; সম্পাদনা- ধীমান দাশগুপ্ত; পৃ:৪৫, বানীশিল্প, কলকাতা।

৮. পুরো নাম জুয়ান ডমিনগো পেরন (১৮৯৫-১৯৭৪)। তিনি আর্জেন্টিনার সামরিক অফিসার ও তিনি দ্য সিক্রেট অরগ্যানাইজেশন (THE GOU) এর সদস্য ছিলেন। এই দলটি ১৯৪৩ সালের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল। পেরন পরবর্তীকালে সেদেশে তিন মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শ্রমিক সংঘেরও প্রধান ছিলেন। তিনি তার দেশের শ্রমিকদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলেন। বিস্তারিত জানতে http://en.wikipedia-org/wiki/juan_per%c3%b3n

৯. গুপ্ত, অজয়; রুশ চলচ্চিত্রের তিন পর্ব; শতবর্ষে চলচ্চিত্র; সম্পাদনা- নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; খণ্ড-২; পৃ: ১৬৮,আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

১০. জীবন থেকে নেয়া প্রতিবাদের চলচ্ছবি’; কালের কণ্ঠ; ২৮ অক্টোবর ২০১০।

১১. আপিল বোর্ডেও হৃদয় ভাঙা ঢেউকে ‘না’’; প্রথম আলো; ১৮ জুলাই ২০১১।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন