Magic Lanthon

               

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সাহিত্য, সিনেমা ও চিত্রনাট্যের ভাষা

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত


সিনেমা করার আগে পরিচালককে যেটা সবচেয়ে আগে ঠিক করে নিতে হয় তা হলো কী বিষয় নিয়ে তিনি সিনেমাটি বানাবেন তা বেছে ফেলা। বিষয় কাহিনীনির্ভর হতে পারে এবং কাহিনীর একশ ভাগই উঠে আসতে পারে পুরাণ বা ইতিহাস থেকে, চিরায়ত বা সামপ্রতিক সাহিত্য থেকে, এমন কী হবু লেখকের অপ্রকাশিত কোনও লেখা থেকে। আবার বিষয় উঠে আসতে পারে কবিতা থেকে, দৈনিক খবরের কাগজে ছাপা কোনও ঘটনা থেকে বা শুধুই পরিচালকের মাথায় অনেকদিন বা হঠাৎ ঘুর-ঘুর করতে থাকা কোনও ভাবনা থেকে। পরিচালকের সৃষ্টিশীল মন ও মনন যেকোনও বিষয় নিয়েই যেমন অসামান্য সিনেমার জন্ম দিতে পারে, আবার উল্টোটাও হতে পারে। অর্থাৎ বুদ্ধিহীন সিনেমা-পরিচালক অসামান্য বিষয় পেয়েও শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর তৈরি করে বাঁদরকেই শিব ভাবতে শুরু করেন। মহৎ সাহিত্যই যে শুধুমাত্র মহৎ সিনেমার জন্ম দিতে পারে না এটা বুঝতে আমাদের বহুকাল লেগে গেছে। মহৎ সিনেমার জন্মের পেছনে থাকে চিত্রনাট্যকারের অর্ধেক কৃতিত্ব। অথচ একটি সিনেমার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সেই চিত্রনাট্যের কাজ ফুরোয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত পাঠের স্বাদ কখনোই সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য পড়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আবার অন্ধকার পর্দায় আস্তে আস্তে ফুটে বের হওয়া পথের পাঁচালী বা অপুর সংসার দেখার যে অভিজ্ঞতা তা একা একা ঘরে বসে চিত্রনাট্য গুলে খেলেও কোনোদিন অর্জন করার নয়।

চিত্রনাট্য লেখার জন্য জানতে হয় সিনেমার ভাষা, সাহিত্যের ভাষা থেকে যা বহু যোজন দূরে। চিত্রনাট্যকারকে তার  হাতের আঙুলের মতো ঘনিষ্টভাবে চিনতে হয় মুভি ক্যামেরার সর্বাসর্ব বুঝতে হয় ফিল্ম এডিটিং-এর মর্মার্থ, ছুঁতে জানতে হয় শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের স্বরকে|

ধরা যাক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় জীবিত এবং সত্যজিৎ রায় নিজে না লিখে সেই সময় লেখককে দিয়ে চিত্রনাট্য লিখিয়ে নিয়ে তৈরি করেছেন ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’  তাহলে সর্বনাশ ছাড়া আর কী হত?  বিভূতিভূষণ মস্ত বড় সাহিত্যিক, একশো দুশো বছর পরেও যাঁর লেখা বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষকে পড়তে হবে। কিন্তু  তিনি সিনেমার রহস্য সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এমন নয়।

একজন নাট্যকার নিজস্ব সৃজন ক্ষমতায় তার ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতেই পারেন। শেক্সপিয়ার থেকে আরম্ভ করে রবীন্দ্রনাথ বা সামুয়েল বেকেটের নাটকগুলি তীব্রভাবে আটকে রাখতে পারে পাঠকের চোখ বইয়ের পাতায় এবং সেখানে মঞ্চের চেয়ে নাটকের ছাপা পাতার আকর্ষণ কোনো অংশে কম নয়। কেন না সেগুলি চিরায়ত সাহিত্যেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু চিত্রনাট্য কখনোই সাহিত্যের মর্যাদা পেতে পারে না বা পাওয়ার দায় নিয়ে তা লেখাও হয় না। সিনেমা সম্পর্কে অত্যন্ত উৎসাহী দর্শক বা গবেষক ছাড়া শুধুই চিত্রনাট্যের পাঠক পাওয়া মুশকিল। কিন্তু তাই বলে একজন সাহিত্যিক অত্যন্ত উঁচুমানের সাহিত্য রচনার ক্ষমতা অর্জন করলেই দক্ষ চিত্রনাট্য রচয়িতা হতে পারবেন, বা কালে-দিনে চিত্রপরিচালক হয়ে উঠতে পারবেন শুধু তার সাহিত্যরচনার গুণে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। এবং একজন সফল নাট্যকার তার নাট্যপ্রতিভার জোরে চিত্রনাট্য লেখার কৌশলও তুরুপের তাসের মতো আয়ত্ত করে ফেলবেন এমন মনে করে ফেললে সিনেমার প্রতি যারপর নাই অবিচার করা হবে।

কিন্তু তবু বাংলা ভাষার তিন প্রথিতযশা সাহিত্যিক ‘ব্যবসায়ীভাবে মোটামুটি সফল’ চিত্রপরিচালকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারা প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। শেষ দু’জন অন্যদের ছবির জন্যও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। বাংলা সাহিত্য এই তিনজনের কাছে চিরকাল ঋণী থেকে যাবে তাদের সাহিত্যকর্মের জন্য। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রেমেন্দ্র মিত্রের তুল্য ছোটগল্প লেখক বাংলা ভাষায় এ যাবৎকাল সামান্য কয়েকজন মাত্রই এসেছেন। অথচ খুব দ্রুত হারিয়ে গেছে তাদের করা সিনেমাগুলি। কেন না সেগুলি আর যাই হোক, সিনেমা হয়েছিল একথা সিনেমাকে ভালোবাসেন এমন কেউ স্বীকার করবেন না। তারা কতগুলো সাদামাটা দৃশ্য তুলে, জড়ো করে, সংলাপ দিয়ে দর্শকদের দুর্বল কিছু গল্প বলেছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের শেষ ছবি চুপি চুপি আসে দেখতে গিয়ে বসে থাকতে না পেরে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। আমার মাতুল, কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্রের খুবই স্ন্নেহভাজন ছিলেন। তার সুবাদে কয়েকবার দেখা হয়েছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে। তখনও আমি যুবক হই নি।

প্রেমেন্দ্র মিত্র তার শেষ বয়সে পৌঁছে গেছেন। আমি কৃতার্থ হয়েছিলাম অসামান্য সেই মানুষটি আমার সঙ্গে দু-এক বার কথা বলেছিলেন বলে। তখন সবে সিনেমার সঙ্গে আমার রহস্যময় এক সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করেছে। বুক ঠুকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সিনেমা করেছিলেন কেন? প্রেমেন্দ্র মিত্র বিড় বিড় করে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘শুধু লিখে সংসার চালানো যায়!’ সেসব অনেকদিন আগেকার কথা। তখন শুধু লিখে বাড়ি-গাড়ি হতো না। তবু সাহিত্যকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তারা, সিনেমাকে সে ভালোবাসার যৎসামান্যও দিতে পেরেছিলেন কি না সন্দেহ হয়। অথচ প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্প সাগর সঙ্গমে নিয়ে দেবকী বসুর একই নামের সিনেমা, কাপুরুষ ছোটগল্পটি নিয়ে সত্যজিৎ রায় কৃত কাপুরুষ এবং তেলেনাপোতা আবিষ্কার নিয়ে পুর্ণেন্দু পত্রীর স্বপ্ন নিয়ে ও পরে তৈরি মৃণাল সেনের খান্ডাহর চলচ্চিত্রের শর্তকে মেনে, মনে রাখার মতো সিনেমা হয়ে আছে অবশ্যই।

ভারতীয় সিনেমার জন্ম থেকেই সিনেমাকে সাহিত্যের অনুসারী ও তার প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়েছে। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে লেখক গল্পাশ্রিত ঘটনা এবং বিভিন্ন রস উদ্রেককারী সংলাপের দ্বারস্থ হয়েছেন। ফলে সিনেমার পাত্রপাত্রীদের বিরামহীন কথা ক্রোধ, করুণা, ভক্তি, প্রণয় ইত্যাদিকে প্রকাশ করেছে মাত্র, সিনেমার ভাষার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি। নির্বাক সিনেমার যুগে চিত্রনাট্যকারের বালাই যে সবসময় ছিল এমন নয়। অনেক সময়ই পরিচালকমশাই একটি ছাপা বই নিয়ে হাজির হতেন। তাতে পাত্র-পাত্রীদের সংলাপের জায়গাগুলো লাল কালিতে দাগ দেওয়া থাকত। সেসব লাইন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হত। তারপর তাদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া হতো ক্যামেরার সামনে। মুখস্থ করা সেসব লাইন যদি আটকেও যেত কখনো কখনো, কুছ পরোয়া ছিল না, ক্যামেরার পাশে দাঁড়িয়ে প্রম্পটার প্রম্পট্‌ করে যেতেন। শুটিং চলার সময় যদি লাইন এক্কেবারে ভুলে গিয়ে পরিচালকমশাইয়ের দিকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়েও থাকতেন কেউ, ‘কাট্‌’ বলে মাথার চুল ছিঁড়তেন না পরিচালক। তিনি অভয় দিয়ে অভিনয় চালিয়ে যেতে বলতেন। ওইখানে কেটে জুড়ে দেওয়া হতো জম্পেশ্‌ সংলাপ, যা ভেসে উঠত পর্দায়। নির্বাক সিনেমার যুগের জনপ্রিয় নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য এরকম অনেক মজার গল্প লিখে রেখে গেছেন।

সত্যজিৎ রায়ের আগে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। অভিনেতা ও      চিত্রপরিচালক হিসেবে জনপ্রিয়তার যে শিখর তিনি ছুঁয়ে ছিলেন দীর্ঘকাল ধরে, তা আজও তুলনাহীন। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমাগুলির একটি মুক্তি। ছবিটির প্রথম দৃশ্য শুরু হচ্ছে এই ভাবে :

‘কয়েকটা দরজা পেরিয়ে প্রশান্ত একটা বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে হাতের তুলির উল্টো দিক দিয়ে টোকা মারে। তিনবার। কোনো উত্তর নেই। প্রশান্ত আবার টোকা দেয়। তিনবার টোকা দেওয়ার শুরুতেই ভেতর থেকে চিত্রার গলা শোনা যায়।

চিত্রা : কে? আরে কে?

প্রশান্ত : চুপ!

চিত্রা : ও! দরজা খুলো না।

প্রশান্ত : কেন?

চিত্রা : দাঁড়াও, কাপড় ছাড়ছি।

প্রশান্ত : ও।

চিত্রা : খুলো না।

প্রশান্ত : এই খুললাম কিন্তু।

চিত্রা : খুলো না বলছি।

প্রশান্ত : এইবার খুললাম।

চিত্রা : ছিঃ! ছিঃ! তুমি কি!

প্রশান্ত : আমি পরিচয়ে স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী প্রশান্ত রায়। এম.এ., এস.এ., etc, etc আর সম্পর্কে তোমার পরম গুরু পতি দেবতা।

চিত্রা : খুব হয়েছে,  চলো। আচ্ছা, লজ্জা একেবারে নেই না?

প্রশান্ত: কোনোকালেই তো ছিল না।

চিত্রা : হ্যাঁ। সেইজন্যই তো আর্টিস্টদের সবাই ঘেন্না করে।

প্রশান্ত: কে? কে ঘেন্না করে? থাক নিজেদের প্রশংসা তো নিজেদের করতে নেই।

চিত্রা : এসব কী?

প্রশান্ত: এগুলো? এগুলো তো বাংলায় জামাকাপড় বলে।

চিত্রা : হ্যাঁ, তাতো আমিও জানি। কিন্তু এসব পরে কি ভদ্রলোকের বাড়িতে নেমন্তন্ন যাওয়া যায়!

প্রশান্ত: ও! তা আমি তো তোমার বাবার ওখানে যাচ্ছি।

চিত্রা : হ্যাঁ। আঁ! এসো, এসো।

প্রশান্ত : না। সরো, সরো, খুব হয়েছে, সরো, সরো।

চিত্রা গান ধরে : আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে...চ

‘মুক্তি’র গল্প ও সংলাপ লিখেছিলেন শনিবারের চিঠি সম্পাদক সজনীকান্ত দাস; প্রমথেশ বড়ুয়া এবং ফণী মজুমদার। তৈরি হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। ঠিক এর দু’বছর পরেই আমেরিকার ডাবলিন শহর থেকে হলিউডে রওনা দিলেন ২৪ বছরের ওরসন ওয়েলস্‌ (Orson Welles) তার জীবনের প্রথম ছবি করতে। ১৯৪১ সালে শেষ হওয়া সেই ছবির নাম The Citizen Kane, যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত নির্মিত শ্রেষ্ঠ চার-পাঁচটি সিনেমার একটি। সিনেমাটি আমার মতো আরও অনেক পরিচালকের জীবনই পাল্টে দিয়েছিল। বুঝিয়ে দিয়েছিল আজীবন কোনো সিনেমার পাশে দাঁড়াতে হবে। ১৯৪০ সালে Herman J. Dczmankiewicz ও Orson Welles-Gi লেখা চিত্রনাট্যটির প্রথম দৃশ্য শুরু হচ্ছে প্রথম ভোরে, কালো পর্দার মাঝখানে ডাকটিকিটের মতো একটি আলোকিত জানালা দিয়ে, যার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে ক্যামেরা। এর কয়েকটি দৃশ্যের পর চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে এভাবে :

ÒThe Window (Miniature)

Camera moves until the frame of window fills the frame of the screen.Suddenly the light within goes out. This stops the action of the camera and cuts the music. In the glass panes of the window we see reflected the rips, dreary landscape of Mr. Kane’s estate behind and the dawn sky.

Dissolve

Interior, Kane’s Bedroom-Faint Dawn-1940

A very long shot of Kane’s enormous bed, silhouetted against the enormous window. Dissolve

Interior, Kane’s Bedroom-faint Dawn-1940

A snow scene. An incredible one. Big impossible flakes of snow. A too picturesque farmhouse and a snowman. The jingling of sleigh bells in the musical score now makes an ironic reference to Indian temple bells-music freezes-.

Kene’s old voice

Rosebud!

The camera pulls back, showing the whole scene to be contained in one of those glass balls which are sold in novelty stores all over the world. A Hand-Kane’s hand, which has been holding the ball relaxes. The ball falls out of his hand and bounds down two carpeted steps leading to the bed, the camera following. The ball falls off the last step onto the marble floor where it breaks, the fragments flittering in the first ray of the morning sun. This ray cuts an angular pattern across the floor, suddenly crossed with a thousand bars of light as the blinds are pulled across the window.

The Foot of Kane’s Bed

The camera very close. Outlined against the shuttered window, we can see a form-the form of a nurse, as she pulls the sheet up over his head. The camera follows this action up the length of the bed and arrives at the face after the sheet has covered it.

Fade Out

Fade In

Interior of a Motion Picture Projection Room

On the screen as the camera moves in are the words:

MAIN TITLE

Stirring brassy music is heard on the sound track of a typical news digest short projected on the screen in the projection room. This screen fills our screen as the second title appears.

Credits’’

১৯৩৭ বা তার সামান্য পরের সময়ে মুক্তি দেখেছিলেন যেসব যুবক-যুবতীরা, তাদের যারা আজও আছেন আমাদের মধ্যে, তারা হয়ত সেই পুরনো সময়ে ফিরে যাবার জন্য আরও একবার ছবিটি দেখতে রাজি থাকতে পারেন, কিন্তু আজকের পনেরো থেকে পঞ্চান্ন বয়সী কোনও দর্শক মুক্তি দেখতে রাজি হবেন কি না, বা রাজি হলেও কতক্ষণ দেখতে পারবেন এ নিয়ে অবশ্যই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর, নবীন চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের জন্য ছবিটির ‘সেই সময়ে সিনেমা কেমন  হতো’ এবং ‘কেমন সিনেমা আজ আর একেবারেই হওয়া উচিত নয়’ এসব বোঝানো ছাড়া নতুন কিছু বলার নেই। মুক্তির একেবারে শুরুর দৃশ্য পরিকল্পনার মধ্যে সিনেমা-ভাবনার যে বীজ সামান্য প্রোথিত করেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া, ছবিটি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই তা সমূলে উৎপাটিত করে চটচটে একটি গল্প কারিগরি দক্ষতাহীন নাটুকে-সিনেমার মাধ্যমে বলেছিলেন। ভারতবর্ষের বড় বড় শহরের সিনেমাগুলোতে তখন হলিউডের ছবিই বেশি করে দেখানো হতো। আঠালো গল্প সেখানেও ছিল। কিন্তু তা সিনেমা-ভাবনাকে একেবারে বিদায় জানিয়ে নয়। হলিউডের সেই সব ছবির কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন এদেশের চিত্রপরিচালকদের অনেকেই, এমনকি সত্যজিৎ রায়ও, তাদের কারিগরি উৎকর্ষের জন্য।

অনেকেই মনে করেন Orson Welles-Gi The Citizen Kane- বাদ দিয়ে আধুনিক সিনেমার ভাষাকে জানা ও বোঝার চেষ্টা করাই বৃথা। আমারও তাই মনে হয়। এবং এর জন্য ছবিটির চিত্রনাট্যের অশেষ গুরুত্ব আছে। তারও প্রায় বারো-তেরো বছর পরে তৈরি পথের পাঁচালী এদেশের প্রথম সম্পূর্ণ সিনেমার ভাষায় একটি চলচ্চিত্র। সিনেমাটির চিত্রনাট্য ‘কীভাবে আদর্শ চিত্রনাট্য লেখা যেতে পারে’ সেই ক্লাসের অসম্ভব মূল্যবান একটি পাঠ। কিন্তু এর আগেও আছে। ১৯৪৮ সালে তৈরি উদয়শঙ্করের পরিচালনায় নির্মিত কল্পনা ছবির চিত্রনাট্য আগাপাস্তালা সিনেমা-ভাবনাকে মাথায় রেখে লেখা এদেশের বিচারে আজও এক অসামান্য দলিল। শুনেছি বিদেশ যাতায়াতের ফলে ফরাসি সিনেমার সঙ্গে উদয়শঙ্করের ওতপ্রোত যোগাযোগ ছিল। সিনেমা নিয়ে রীতিমতো পড়াশুনো করতেন তিনি। নিজে মুভি ক্যামেরা চালাতে পারতেন। কল্পনা দেখতে দেখতে মনে হয় চেষ্টা করলে উদয়শঙ্কর অবশ্যই ভারতীয় সিনেমাকে আরও একটু ধনী করতে পারতেন। ছবিটি দেখে জাঁ রেনোয়া (Jean Renoir) উদয়শঙ্করের চলচ্চিত্র-প্রতিভার কথা স্বীকার করেছিলেন। এছাড়া নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ও ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক-এর চিত্রনাট্যও ভারতীয় সিনেমায় একেবারে নতুন বিষয় ও ভাবনাকে মাথায় রেখে মুনশিয়ানার সঙ্গে লেখা। ছবি দুটির পেছনে চলচ্চিত্রায়নের কৃতিত্বের চেয়েও মনোযোগ দাবি করে চিত্রনাট্যের ভূমিকা। এসবই অবশ্য প্রাক-সত্যজিৎ রায় সময়ের কথা।

আমাদের দেশে সম্ভবত সবচেয়ে সফল চিত্রনাট্যকার সত্যজিৎ রায়। সবসময়ই তার চিত্রনাট্যগুলি  সিনারিও ও শুটিং স্ক্রিপ্ট-এর মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভি আই পুদভকিনের মতো সত্যজিৎ রায়ও বিশ্বাস করতেন চিত্রগ্রহণের সমস্ত খুঁটিনাটি শুটিং পর্বের আগে থেকেই শুটিং স্ক্রিপ্ট-এ বিস্তৃতভাবে লেখা থাকবে। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে ডিটেলের প্রতি অমর নিষ্ঠা সত্যজিৎ রায় ছাড়া আর কারও চিত্রনাট্যে সচরাচর দেখা যায় না। তার চিত্রনাট্যগুলি পড়তে পড়তে কোনো নবীন যশোপ্রার্থী চিত্রপরিচালকের ভ্রম হতেই পারে যে এমন চিত্রনাট্য পেলে, এবং পাশে সুব্রত মিত্রের মতো সিনেমাটোগ্রাফার পেলে, বংশী চন্দ্রগুপ্তের মতো আর্ট-ডিরেক্টর পেলে, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় আর কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেত্রী ও অভিনেতা পেলে এবং সবশেষে, রবিশঙ্করের মতো মিউজিক ডিরেক্টর পেলে পথের পাঁচালী বা চারুলতা করে ফেলা  তেমন কঠিন কোনও কাজ নয়।

এছাড়া যাদের লেখা চিত্রনাট্য সবসময় মনোনিবেশের দাবি করে তারা হলেন ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, অসিত সেন, তরুণ মজুমদার এবং আরও কয়েকজন। ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিক, মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন, তপন সিংহের ক্ষুধিত পাষাণ, বা রাজেন তরফদারের গঙ্গা অসামান্য চিত্রনাট্যের নিদর্শন হয়ে থাকবে অনেককাল। এদের প্রায় সমসময়ে লেখা অজয় করের সাত পাকে বাধাঁ, অসিত সেনের চলাচল এবং তরুণ মজুমদারের শ্রীমান পৃথ্বিরাজ, সরোজ দে’র কোনি এবং আরও বেশ কিছু ছবির চিত্রনাট্য সিনেমার ভাবনাকে গভীরভাবে মাথায় রেখে লেখা। এরপরে অপর্ণা সেন, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, বিপ্লব রায়চৌধুরী, রাজা মিত্র তাদের তৈরি সিনেমার জন্য অবশ্যই ঋণী থাকবেন তাদের চিত্রনাট্যগুলির কাছে। পরের প্রজন্মের অশোক বিশ্বনাথন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, রাজা সেন, শতরুপা সান্যাল ও মলয় ভট্টাচার্য এ পযর্ন্ত যেসব ছবি করেছেন সেগুলি দর্শকের অভিনিবেশ দাবি করেছে অবশ্যই চিত্রনাট্যের গুণে, তার ভেতর লুকিয়ে থাকা সিনেমার জন্য।

সত্যজিৎ রায় এবং তার সমসাময়িক প্রত্যেকের চলচ্চিত্রের বিষয়ই মূলত কাহিনী। সারা পৃথিবী জুড়েই অনেকটা তাই হলেও ভুরি ভুরি ব্যতিক্রম আছে। আবার কাহিনীকে পাশ কাটিয়ে অন্য আঙ্গিকে চিত্রনাট্য লিখেছেন জাঁ কক্‌তো (Jean Cocteau), জাঁ-লুক গদার (Jean-Luc Godard)  বা আঁদ্রেই তারাকোভস্কি (Andrei Tarkovsky) এবং আরও অনেকেই। বিখ্যাত জাপানি চিত্রপরিচালক ওসিমা তার The Boy ছবির চিত্রনাট্যের বিষয় খুঁজে পেয়েছিলেন একদিন সকালবেলার খবরের কাগজের পাতায়। আকিরা কুরোসোওয়া তার Dreams ছবির বিষয় খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের সারাজীবন ধরে বারবার দেখা কয়েকটি স্বপ্নের মধ্যে। ইঙ্গমার বার্গমান (Ingmar Bergman) তার The Silence ছবির ‘বিষয় কীভাবে পেলেন’ এই প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, একদিন ট্রেনে আসতে আসতে জানালা দিয়ে দেখা দ্রুত চলে অপস্রিয়মাণ ছোট একটি স্টেশনে বেঞ্চে হাত ধরাধরি করে বসে থাকতে দেখেছিলেন বিষণ্ন দুই বুড়িকে।  তাৎক্ষণিকের ওই দৃশ্যই তাকে The Silence ছবির চিত্রনাট্য লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এগুলো ছিন্ন-বিছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এরকম হয়। কেউ জীবনানন্দ দাশের আট বছর আগের একদিন বা রাত্রি কবিতায় চিত্রনাট্যের বিষয় খুঁজে পেতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের এক বা একাধিক ছবি থেকে কোনো চিত্রপরিচালক পেতেই পারেন তার ছবির বিষয়। যেমন, ভ্যান গঘ (Van Gogn)-Gi ছবিগুলি থেকে আকিরা কুরোসোওয়া খুঁজে পেয়েছিলেন ছবির বিষয়। বড়ে গোলাম আলি বা বাখ (Johann Sebastian  Bach) শুনতে শুনতে সিনেমার বিষয়ের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন কেউ। অনেক আগে একজন গাড়ির ড্রাইভারকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। হঠাৎ একদিন সেই কবিতা থেকে উঠে এলো লাল দরজা ছবির চিত্রনাট্যের বীজ।

শুধু শব্দ দিয়ে চিত্রনাট্য লেখা যায় না। চিত্রনাট্য মূলত লিখতে হয় ইমেজ বা দৃশ্য দিয়ে। এই ইমেজ বা দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আমাদের চারপাশে, অর্থাৎ আমাদের চেনা পৃথিবীর মধ্যে। সত্যজিৎ রায়েরা অসামান্য সমস্ত চিত্রনাট্য লিখেছেন সেই পৃথিবী থেকে। তৈরি করেছেন বারবার দেখার মতো সিনেমা। কিন্তু এখানেই সবকিছুর শেষ নয়। আমাদেরই কারো কারো মধ্যে বাইরে কাউকে জানান না-দিয়ে গোপন জ্বরের মতো বেঁচে থাকে অন্য এক পৃথিবী। পাশের লোকটিকেও জানতে না-দিয়ে কেউ কেউ বেঁচে থাকেন সেখানে। আর কবিতা থেকে, সুর থেকে, দেওয়ালে ঝুলতে থাকা ছবি থেকে একের পর এক ইমেজ বা দৃশ্য উঠে এসে ভেসে যেতে থাকে সেই দ্বিতীয় পৃথিবীতে। সিনেমা উঠে আসতে পারে সেখান থেকেও। একজন চিত্রনাট্যকার সেখান থেকে আত্মস্থ করা দৃশ্য বা ইমেজগুলিকে একের পর এক বসিয়ে জন্ম দিতে পারেন তার চিত্রনাট্য।

বাংলা সিনেমায় নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় সফল পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে নাম করেছিলেন। হাল আমলে কবি ও নাট্যকার মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাম মনে পড়ছে। মৃণাল সেনের একাধিক ছবির সংযুক্ত চিত্রনাট্যকার তিনি। কিন্তু সেই পেশাটি যেকোনো কারণেই হোক, এখানে তেমনভাবে আদৃত হয় নি। অথচ হলিউড থেকে আরম্ভ করে ইউরোপের সিনেমাশিল্পে শুধুই চিত্রনাট্যকার, আর কিছু নয়, এমন পেশাদারিত্বের রমরমা। লুই বুনুয়েল (Luis Bunuel) থেকে আরম্ভ করে ফেদেরিকো ফেলিনি (Federico Fellini) অনেকেই চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে সংযুক্ত-চিত্রনাট্যকারদের নিয়ে একসঙ্গে চিত্রনাট্য লিখেছেন। নিজেও মাঝে মাঝে স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে যখন এক একটা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ে নিষ্ক্রমণের রাস্তা খুঁজতে থাকি, তখন মনে হয় কারো সঙ্গে কথা বলতে পারলে অনেকগুলো জট অনেক কম সময়ে ছাড়ানো যেত। মনে হয় জাঁ-ক্লদ কেরিয়ে (Jean-claude Carrier)-Gi মতো অসামান্য একজন পেশাদার চিত্রনাট্যকার যদি বাংলা সিনেমায় থাকতেন। বুনুয়েল এবং কেরিয়ে মিলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি চিত্রনাট্য লিখেছেন, সিনেমা হিসেবে সেসব অবশ্যই বুনুয়েল-এর শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির অন্তর্গত।

একটি ছবির চিত্রনাট্য তৈরির কাজ চিত্রনাট্য লিখে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় না। যতদিন না ছবিটি সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে পর্দায় দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে, চিত্রনাট্যের কাজ চলতে থাকতেই পারে। শুটিং করতে গিয়ে, সম্পাদনা করতে গিয়ে, এমনকি, শব্দগ্রহণ করতে গিয়ে চিত্রনাট্য বদলায়। শুটিং করতে করতে নতুন চরিত্র আসে, আগের সংলাপ বদলে নতুন সংলাপ জড়ো হয়, দৃশ্য-সংস্থাপনের পরম্পরা বদলায়, গ্রহণ করা দৃশ্য বাদ যায়। এরকম হতে হতে একদিন পুরো চিত্রনাট্যের অনেক কিছুই বদলে যায়। বদলে যেতে যেতে আলো-ছায়ার মধ্যে সিনেমাটির নিহিতার্থ পুরনো ইঙ্গিতের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে অন্য ইঙ্গিত পায়। অনেক সময়ই সিনেমাটি না লেখা থাকলে শুধুমাত্র চিত্রনাট্য পড়ে বোঝা সম্ভব নয় সিনেমায় দৃশ্যগুলির চেহারা কেমন হবে। একজন চিত্রনাট্য পাঠকের পক্ষে কিছুতেই কল্পনা করা সম্ভব নয় যে, সাদামাটা তিন-চারটি মাত্র লাইন, যা হয়ত অসহায়ভাবে শুয়ে আছে চিত্রনাট্যের পাতায়, একজন সৃষ্টিশীল পরিচালকের শৈল্পিক ছোঁয়ায় কী অন্যন্যসাধারণ ইমেজের জন্ম দিতে পারে। নীচে, আপাত সহজ ও সরল, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে লেখা তিন জাতের তিনটি চিত্রনাট্যের অংশ পড়ে সিনেমা তিনটির দৃশ্য কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল তা মনে করা ও কল্পনা করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

‘রান্নাঘরের দাওয়া।

সর্বজয়া নারকেল কোরাচ্ছে।

ইন্দিরা পা টিপে টিপে এসে সর্বজয়ার দিকে উঁকি মারে। তারপর রান্নাঘরে ঢোকে।

সর্বজয়া কাজ থামিয়ে ঘাড় ঘোরায়।

সর্বজয়া : কী হচ্ছে কি? কী করছ ওখানে? কি নিচ্ছ শুনি?

ইন্দিরা অপরাধীর মতো রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

সর্বজয়া : রান্নাঘরে কী?

ইন্দিরা : কিছু না।

সর্বজয়া : কিছু না মানে? পষ্ট দেখলাম তুমি তাক থেকে কী একটা নিলে-

ইন্দিরা : লঙ্কা ছিল-লঙ্কা নিলাম কটা।

সর্বজয়া : কই দেখি-

সামনে এসে ইন্দিরা হাত খুলে দেয়।

ইন্দিরা : এই যে।

সর্বজয়া : আমাকে বলে নিতে পারো না?

Dissolve

বাইরে ঝোপঝাড়ের পাশে দুর্গা এক্কা-দোক্কা খেলছে। সর্বজয়ার কথা নেপথ্যে  শোনা যায়।

সর্বজয়া: তোমাকে বলিনি আমি রান্নাঘরে ঘুর ঘুর করা পছন্দ করি না?

Dissolve

ইন্দিরের দাওয়া।

ইন্দির এক বাটি থেকে আর এক বাটিতে কিছু ঢালল।

দুর্গা পেছন থেকে এসে পিসির নাকের সামনে একটা পেয়ারা এগিয়ে দেয়।

ইন্দির চমকে ওঠে, তারপর হেসে পেয়ারাটা নেয়।

দুর্গা আর একটা পেয়ারা এগিয়ে দেয়।’

সত্যজিৎ রায় কৃত পথের পাঁচালী চিত্রনাট্যের অংশ

সেট; স্কুলের রাস্তা। বহির্দৃশ্য।

সময় : দিন।

রাস্তা দিয়ে ক্লোজ সটে একটি টাঙ্গা এগিয়ে চলেছে। টাঙ্গায় বসে থাকা অমরনাথ কিছু একটা লক্ষ্য করে কোচম্যানকে বলে,

অমরনাথ : এই, রোকো রোকো। গাড়ি ঘুমালো!

কোচম্যান : কাহা?

অমরনাথ : উধার, জলদি।

সময় প্রায় বিকেল চারটে। স্কুলের কিছু মেয়েদের বাড়ি ফিরে আসতে দেখা যায়। এদের মধ্যে সরস্বতী এবং বীণাও আছে।

লং শটে দেখা যায় কোচম্যান গাড়ি ঘুরিয়ে মাঝামাঝি গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।

কাট্‌-টু

অমরনাথ। সে চেষ্টা করছে বিশেষ একটি মেয়েকে লক্ষ্য করতে।

কাট্‌-টু

একটি গতিময় সাবজেক্টিভ শট। ক্যামেরা অন্যান্য মেয়েদের ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়।

কাট্‌-টু

অমরনাথ। সহসা, তার চোখ যে মেয়েটিকে খুঁজছিল, তাকে দেখতে পায়।

কাট্‌-টু

ক্যামেরা জুম ফরোয়ার্ড করে মেয়েটিকে ধরে। সে অমরনাথকে লক্ষ্যই করে নি।

কাট্‌-টু

অমরনাথের ক্লোজ শট। সে হাসছে।

কাট্‌-টু

সরস্বতী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কঠিন হয়ে আসে তার মুখ।

বীণা : লোকটা কে দিদি?

সরস্বতী : জানি না! চলে আয়।

সরস্বতী তাড়াতাড়ি করে একটি গলিতে ঢুকে পড়ে। বীণা তাকে অনুসরণ করে। তারা একটু এগিয়ে গেলে ফোরগ্রাউন্ডে টাঙ্গাটি এসে দাঁড়ায়।

তরুণ মজুমদার কৃত দাদার কীর্তি ছবির চিত্রনাট্যের অংশ

দৃশ্য-৭২। লোকেশন:ফিটন স্ট্যান্ড। সময় :

সকাল।

ফিটনটা স্ট্যান্ড-এ পড়ে আছে।

সিরাজুল দু’তিনজন লোকের সাহায্যে  ফিটনটাকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেয়।

কাট্‌-টু

দৃশ্য-৭৩। সময় : দিন।

একটা প্লেন আকাশের উপর দিয়ে উড়ে যায়।

কাট্‌-টু

দৃশ্য-৭৪। লোকেশন : টিউব স্টেশন। সময়:দিন।

একটা টিউব স্টেশন ছেড়ে চলে যায়।

কাট্‌-টু

দৃশ্য-৭৫। লোকেশন: ফিটন স্টেশন। সময় : রাত্রি।

ফিটন স্ট্যান্ড।

ক্যামেরা ফিটনটির ওপর স্থির হয়ে আছে।

কয়েকটি লোক ফ্রেম-ইন্‌ করে এবং ফিটনটি টেনে নিয়ে চলে যায় ফ্রেম-এর বাইরে।

কাট্‌-টু

দৃশ্য-৭৬। লোকেশন : মনসুরের ঘর। সময় : রাত্রি।

মনসুর বিছানায় শুয়ে আছে। মনসুরের বুকের ঘড়র ঘড়র শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মনসুরের ঘরে মেহরুন, আয়েশা ও খোদাবক্স ছাড়া আরও অনেকে উপস্থিত। সবার মুখ থমথমে। কেউ কোনো কথা বলছে না।

কাট্‌-টু

বৃদ্ধ হেকিম সাহেবকে নিয়ে সিরাজুল ঘরে ঢোকে। হেকিম সাহেব সোজা মনসুরের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

ক্যামেরা প্যান করে।

সবাই হেকিম সাহেবকে জায়গা করে দেয়।

হেকিম সাহেব মনসুরের পালস্‌ দেখে।

কাট্‌-টু

ক্যামেরা মেহেরুনের মুখ থেকে চলতে শুরু করে এবং উপস্থিত সবার মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে অবশেষে সিরাজুলের মুখের উপর স্থির হয়।

কাট্‌-টু

হেকিম সাহেব মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে। দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে বিড় বিড় করে আল্লার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাতে থাকে।

কাট্‌-টু

দৃশ্য-৭৭। লোকেশন : মনসুরের ঘর। সময় : রাত্রি।

ক্যামেরা নোনাধরা দেওয়ালের উপর দিয়ে সরে যেতে থাকে।

ব্যাকগ্রাউন্ডে মনসুরের শ্বাসকষ্টের ঘড়র ঘড়র শব্দ বাড়ির নিঃস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে খান খান করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মেহরুনের গুমরে গুমরে কান্না ভেসে বেড়ায়।

কাট্‌-টু

শূন্য আস্তাবলের উপর ক্যামেরা প্যান করতে থাকে আস্তাবলের ফাঁক-ফোকরের মধ্য দিয়ে চাঁদের আলো প্রবেশ করে আস্তাবলটিকে এক রহস্যময় জগতে পরিণত করেছে।

কাট্‌-টু

আলসেতে পায়রাগুলো ভয়ে জড়ো হয়ে বসে আছে।’

নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায় কৃত মনসুর মিয়ার ঘোড়া ছবির চিত্রনাট্যের অংশ

কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি চিত্রনাট্য লিখতে পারেন। প্রযোজকের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলেই গল্প কিনে বসে পড়েন চিত্রনাট্য লিখতে। লিখতে লিখতে কলাকুশলী ঠিকঠাক, পাত্র-পাত্রী নির্বাচন পাক্কা। গান-রেকর্ডিং কমপ্লিট। তারপর এক দু’মাসের মধ্যে শুটিং শুরু করার দৌঁড়। চার পাঁচ মাসের মধ্যে ছবির বিজ্ঞাপন ঝুলে পড়ে সিনেমা হলের মাথা থেকে। কেউ দু’তিন বছর ধরে স্ক্রিপ্ট লেখেন। কেউ স্ক্রিপ্টকে বাইবেলের মতো অনুসরণ করেন, স্ক্রিপ্ট থেকে এক ইঞ্চি নড়ন-চড়ন হলে সর্বনাশ। কেউ শুটিং করতে করতে বদলান। কেউ আবার আদপেই বেশি লেখালেখি পছন্দ করেন না। কেউ কিছু না লিখে পুরো চিত্রনাট্যের ভাবনাটা মাথায় রেখে দিয়ে শুটিং করতে পারেন। পারাটা খুব মুশকিল, কিন্তু হতেও পারে। নিশ্চয়ই কথাটা সত্যি নয় তবু কলকাতার সিনেমা-পাড়ায় মজার একটা গল্প বহুদিন ধরে চালু আছে। ঋত্বিক ঘটক সুবর্ণরেখার স্ক্রিপ্ট শোনাবেন প্রযোজককে। একজন অভিনেতা যোগাযোগ করে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি। ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে গেছেন প্রযোজকের অফিসে। টেবিলের একদিকে প্রযোজক, অন্যদিকে লম্বা খাতা নিয়ে ঋত্বিক ঘটক, পাশে অভিনেতা। গলায় যথেষ্ট আবেগ দিয়ে ঋত্বিক ঘটক সুবর্ণরেখার চিত্রনাট্য পড়তে শুরু করলেন। চোখ বুঁজে মন দিয়ে শুনে যেতে লাগলেন প্রযোজক। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে পড়া। এসময় অভিনেতাটির কী মনে হওয়ায় চিত্রনাট্যের পাতায় উঁকি দিয়ে দেখেন, পাতা প্রায় সাদা। আর সেই সাদা পাতার দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অম্লান বদনে প্রযোজককে স্ক্রিপ্ট শুনিয়ে চলেছেন ঋত্বিক ঘটক।

একটা সিনেমা তৈরি শেষ হয়ে যাবার পর আমার নিজের ছ’মাস টানা ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তারপর ঘুমের তলা থেকে নতুন ভাবনাগুলো অস্পষ্টভাবে মাথা তুলতে শুরু করে। আরও অনেক পরে ভাবনাগুলো স্পষ্ট হয়। ততদিনে প্রায় বছর গড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরনো পড়া ও ভাল লেগে গেঁথে যাওয়া কোনো গল্পের কথা ভাবি, যার সঙ্গে অবলীলায় জুড়ে দেওয়া যায় আমার নিজস্ব ভাবনাগুলো, স্বপ্নগুলো, দ্বিতীয় পৃথিবী থেকে ভেসে আসা ইমেজগুলো। লেখার আগে গল্পটি আরও কয়েকবার পড়ে কিছু লিখে-টিখে নিই দু’তিন পাতার মধ্যে। ব্যস। গল্পটির আর কোনো প্রয়োজন থাকে না। প্রথমবার লেখা হয়ে গেলে আমি অনেক দিন ফিরে আসি না সেই চিত্রনাট্যের কাছে। তারপর কিছুকাল অন্তর অন্তর লিখতে বসি আবার। বদলায়। নতুন ভাবনা, নতুন ইমেজ, নতুন কথা মাথা থেকে বেরিয়ে ঢুকে পড়ে চিত্রনাট্যের পাতায়। শুটিং এর জায়গা পাকা হয়ে গেলে আবার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে নিতে হয়। পরিবর্তনের কাজ চলতেই থাকে শুটিং-এর শেষ দিন পর্যন্ত। কখনো কখনো তারপরও চলতে থাকে।

পাঠক হিসেবে ভাল লাগলেও বিখ্যাত কোনো সাহিত্য নিয়ে চিত্রনাট্য লিখতে পছন্দ করি না। সেসব লেখা বিভিন্ন সময়ে বারবার পড়তে পাঠক তার ভাল লাগার ছবিগুলি এঁকে রাখেন মনের মধ্যে। সাহিত্যের চরিত্রগুলিকে পাঠক দেখতে পান, তার নিজেরই দেওয়া সেসব অবয়ব গেঁথে যায় তার হৃদয়ে। তাদের মুদ্রাদোষ, কথা বলা, তাদের হাসি, হেঁটে যাওয়া, তাদের বাড়ি-ঘরদোর, রাস্তা-মাঠ সব, সব কিছুরই একটা ছবি পাঠক এঁকে নেন মনে মনে। এসবই চলতে থাকে অনেক সময় ধরে একাধিক পাঠের মধ্যে দিয়ে। সেসব সাহিত্য সিনেমায় রূপান্তরিত হয়। সেই সিনেমা দেখতে গিয়ে অনেক সময়ই পাঠক চায় তার মনের ভেতরে ডুব দিয়ে থাকা সেই ছবিগুলির সঙ্গে পর্দার ছবিগুলিকে মিলিয়ে নিতে। মেলে না কখনো। হতাশায় সিনেমাটিকে তারা শেষ পর্যন্ত পরিত্যাগ করেন কখনো কখনো। অপুর সংসারকে মেনে নিতে না পেরে দেশ পত্রিকার পাতায় একসময় প্রচুর চিঠি বেরিয়েছিল ছবিটির মুক্তির পর, লীলাকে বাদ দেওয়া নিয়ে ও আরও অনেক কিছু নিয়ে দুঃখ ছিল পত্রকারদের। নষ্টনীড়কে চারুলতা হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে কিছু বিদ্বজ্জনের। ঘরে বাইরের বিমলাকে সমালোচিত হতে হয়েছে অনেক দর্শকের কাছে কেন না সেই মুখ তাদের কল্পনার বিমলার নয় বলে। আরও কত আছে। সাহিত্যের ছবির সঙ্গে সিনেমায় দেখা ছবিগুলি মিলছে না বলে পাঠক-দর্শক মন খারাপ করেছেন। কিন্তু দু’টি মাধ্যম যে আলাদা এটা এরা বুঝতে চান নি অনেক সময়।

আমার সিনেমার গল্পগুলি তাই সিনেমা তৈরির আগে ছিল প্রায় অজানা। তাতে অন্তত একটা ভয়  থেকে রেহাই পাওয়া যায়। পাঠকের হৃদয়ে গাঁথা কোনো স্মৃতির দ্বারা তাড়িত হতে হয় না সিনেমাকে।

দায় স্বীকার : বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের এই লেখাটি ১৫ এপ্রিল ২০০০ সালে দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। চিত্রনাট্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহী নতুন প্রজন্মের জন্য পুনর্মুদ্রণ করা হলো  

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন