Magic Lanthon

               

রুবেল পারভেজ

প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ক্ষুধার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে সেলুলয়েডিয় রাজনীতি  

রুবেল পারভেজ

 

কী বলবো সেই ফাঁদের ধোঁয়া

ব্যাধ বেটা দিচ্ছে খেওয়া

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে পর উইলিয়াম হান্টার তার ‘এ্যানালস অব দ্য রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে অত্যন্ত বিস্ময় সহকারে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘কলকাতা ও মুর্শিদাবাদের মত সব বড়ো বড়ো শহরের বড়ো বড়ো দোকানগুলো থরে থরে নানা রকম উপাদেয় এবং রসাল খাবারে সজ্জিত রয়েছে। কাঁচের আলমারি থেকে বাইরে সেগুলো দেখা যাচ্ছে, অথচ দোকানের বাইরে শ’ শ’ মানুষ না খেয়ে মরে পড়ে আছে। হান্টার সাহেব প্রশ্ন করছেন, এ লোকগুলো তো মারাই গেল কিন্তু মারা যাওয়ার আগে দোকানের খাবার লুট করে খেয়ে নিল না কেন? তিনি বললেন, ইয়োরোপ ভূখণ্ডে এ দৃশ্য কল্পনা করা যায় না।’

এখন প্রশ্ন, কেনো এ বাংলা অঞ্চলের মানুষের এমন সংকীর্ণতা ও ভীতু মন? তারা কেনো অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার নয়? হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসতো এমন ছিলো না। এ-দেশের মানুষ সহজ-সরল সাধারণ জীবনযাপন করতো ঠিকই, কিন্তু নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা সবসময় সোচ্চার ছিলো। প্রতিবাদী বা প্রতিরোধী চেতনা বাঙালি মানসিকতায় নেই, তা সত্য নয়। কারণ দুর্ভিক্ষের আঘাতে জর্জরিত এই মানুষগুলোই কিন্তু তেভাগা আন্দোলন করেছিলো। ১৯৪০ এর দশকে সংগঠিত হয়েছিলো তেভাগা আন্দোলন। ভূমিহীন, গরীব ও মাঝারি কৃষক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধনী কৃষকও অংশগ্রহণ করেছিলো সে আন্দোলনে। এমনকি সে-সময়ে অস্ত্র হাতে নেমে পড়েছিলো নারীরাও। চাষীরা সংগঠিত হয়েছিলো নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। তারা নিজেদের সব ফসল এক জায়গায় জমা করেছিলো সমবণ্টনের জন্য। ফসলের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জোতদারের ধানের গোলা আক্রমণ ও লুট করেছিলো। উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ আদায়ই ছিলো এর কারণ।

অন্যদিকে জোতদার যদি তা দিতে বিরোধিতা করতো তাহলে তার ভাগটিও নিয়ে নেওয়া হতো। ইতিহাস জানান দেয়, তেভাগা আন্দোলন ছিলো অনেক বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী। সেই তেভাগা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলো, পরবর্তী সময়ে তারাই ছিলো দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ। কারণ, মন্বন্তরকালে এই মানুষগুলোর চোখে তাদের শত্রু দৃশ্যমান ছিলো না। আর দৃশ্যমান ছিলো না এ-জন্য যে, দুর্ভিক্ষের জন্য মজুতদার, সরকার কিংবা কালোবাজারিদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা তাদের সাধারণ দৃষ্টিতে ছিলো অসম্ভব। তৎকালীন যুদ্ধপরিস্থিতিও বিভ্রান্তিকর ছিলো। তারপরও শত্রু চিহ্নিত করা সম্ভব হলে হয়তো পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ ছিলো। কিন্তু যেকোনো পরিস্থিতিকে এমনভাবে ঘটানো হতো যে তা আঁচ করতে পারা সাধারণের পক্ষে সম্ভবই ছিলো না। কারণ এই দীর্ঘসময়ে শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসনকে বৈধতা দিতে এবং দায় এড়াতে যেকোনো সমস্যাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতো; সাদা চোখে দেখে মনে হতো তা প্রকৃতিগত অথবা উপরের কোনো শক্তির প্রভাবে হচ্ছে! তাই রাস্তায় পড়ে মরা ছাড়া এই মানুষগুলোর গতান্তর ছিলো না।  


কোন্‌ কুলেতে যাবি মনরায়, গুরুকুলে

যেতে হলে লোককুল ছাড়তে হয় 

একসময় এই পরিস্থিতি বা উপনিবেশিকতার হাত থেকে মানুষগুলো মুক্তি পেলেও মানসিকভাবে ওই অবস্থান থেকে তারা বের হতে পারেনি; আসলে তাদের বের হতে দেওয়া হয়নি। পশ্চিমারা সবসময় তাদের শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম সবকিছুতে আমাদের চৈতন্যকে খাটো করে দেখিয়েছে। উপনিবেশিকতার কারণেই আমরা বর্বর, বন্য থেকে মানুষ ও পশ্চাৎমুখী সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে পদার্পণ করতে সক্ষম হয়েছি বলে তারা হাঁক-ঢাক ছেড়েছে। আর এভাবে তারা তাদের দমন-পীড়নের শাসনব্যবস্থাকে জায়েজ করেছে।

আর তাদের সমর্থন দিয়েছে উপনিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠা এ-দেশীয় বিশেষ একটি শ্রেণী। যারা তাদের ক্ষমতা, মান-মর্যাদা ও শিক্ষিতভাবটা বজায় রাখতে সাধারণ থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে নিজেদের সাহেব-বাবু-মেমদের স্তুতি করতে করতে কাটিয়ে দিয়েছিলো। রেলগাড়ি, কলের-মেশিনের আগমনকে তারা সভ্যতার অগ্রগতি ভাবতে শুরু করে। আবার শিল্প-সাহিত্যের উন্নয়নে বা এর ধারাকে বিকশিত করতে পশ্চিমা ঢঙে এগিয়ে নিতেও ছিলো তারা বদ্ধপরিকর। পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরে অত্যন্ত গর্ববোধ করতো এ-দেশের বঙ্কিম-রামমোহনেরা। আর এরাই নিজ শ্রেণীকে উন্নততর করতে নিয়েছিলো ব্যাপক প্রস্তুতি। যাকে সমাজ-সংস্কার প্রগতিশীল ও জনকল্যাণমূলক কাজ বলে গুরুচণ্ডালি বক্তব্যে তুলে ধরা হতো। বংশীয় বা উত্তরাধিকারসূত্রে ওই একই ধারাকে জ্যামিতিক হারে বজায় রাখছে এ-কালের বঙ্কিম-রামমোহনেরা। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি শাসকের পক্ষে কথা বলতো। আবার কেউ কেউ ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটির জায়গা করে নিতে বা তার নায়োকোচিত ভাবখানা বজায় রাখতে শাসককে ‘জি হুজুর’ বলতো, আবার সাধারণ মানুষের কাছে সহমর্মী ও ত্যাগী হিসেবেও থাকতে চাইতো। তাদের নীতিই ছিলো অনেকটা-‘কুলও রাখব, শ্যামও রাখব’ এর মতো। সেকালের বিখ্যাত ব্যক্তি দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটির উদাহরণ আনা যেতে পারে। নাটকটির ভূমিকায় নাট্যকার নিজেই লিখেছেন ‘নীলকরনিকরকরে নীলদর্পণ অর্পণ করিলাম। এ-ক্ষণে তাঁহারা নিজ নিজ মুখ সন্দর্শনপূর্বক তাঁহাদিগের ললাটে বিরাজমান স্বার্থপরতা-কলঙ্ক-তিলক বিমোচন করিয়া তৎপরিবর্তে পরোপকার­- শ্বেতচন্দন ধারণ করুন, তাহা হইলেই আমার পরিশ্রমের সাফল্য, নিরাশয় প্রজাব্রজের মঙ্গল এবং বিলাতের মুখ।’ খুব স্পষ্ট করেই নাট্যকার বলতে চেয়েছেন নীলচাষই তার নাটকের বিষয়, বিশেষ করে নীলকরদের অত্যাচার। তিনি নিজ দেশের, নিরাশ্রয় লোকদের নীলকরদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে চান, আবার বিলাতের মুখও রক্ষা করতে চান। নাট্যকার নীলচাষের হাত থেকে চাষীদের বাঁচাবার জন্য মূলত ইংরেজ শাসকদের দয়া চাইছেন, অথচ তিনি চাষীদের লড়াই করার কথা বলছেন না।

বাংলার শত বছরের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিলো নীলবিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহকেই নাটকে জায়গা দেওয়া হলো না। নাটকটি কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা কৃষকদের বিজয়গাঁথার সংগ্রাম নিশ্চিত না করে পরিবারের কয়েকটি নারী চরিত্রকে ঘিরে কাহিনী আবর্তিত হয়ে শেষ হয়েছে। এ-থেকে সহজেই অনুমান করা যায় দীনবন্ধু মিত্র একদিকে ইংরেজ শাসককুলের ভাবাদর্শী ও বাংলার বৃহৎ জনসাধারণের বন্ধুরূপে চিরকাল স্মরণীয় ও মহান হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ও ইংরেজদের অধীনে চাকরিরত বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি দীনবন্ধুর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি নীলদর্পণ প্রকাশিত হওয়ার পর বঙ্গদর্শনে লিখলেন, ‘নাটকে সামাজিক কুপ্রথা সংশোধনের চেষ্টা করলে সেটা আর নাটক থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘কাব্যের উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি, সমাজ সংস্কার নহে। নাটক নাম কলঙ্কিত হইয়াছে।’

শুধু বঙ্কিম-দীনবন্ধুই নন, সে-সময়কার অনেক সমাজ-সংস্কারক, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও বিশ্বমোড়লরা তাদের মত, পথ ও ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে সমাজে বিরাজমান অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছেন। বর্তমানেও তাদের উত্তরসূরিরা সেই একই কাজগুলোই গর্বিত চিত্তে অহরহ করছেন। প্রতিনিয়ত সাধারণ জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন সব প্রতিষ্ঠান তারা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায়। আধুনিককালে এসে ওইসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান, ভাষা ও তার চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে গণমাধ্যম। যে-কারণে গণমাধ্যম হয়ে উঠেছে একটি অন্যতম ও কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। ফলে গণমাধ্যম প্রাধান্যশীলতার এই সময়ে বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে এবং ক্ষমতা বিস্তারে কোনো ধরনের বেগও পেতে হচ্ছে না তাদের।

উন্নত দেশগুলোর বৃহৎ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম-প্রতিষ্ঠানগুলি যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য ক্ষুদ্র গণমাধ্যম-প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক, সেহেতু তাদের চাপিয়ে দেওয়া বা আরোপিত কোনো বিষয় সাধারণত কেউই এড়াতে পারে না। আবার পাশ্চাত্য ভাবধারা, তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইত্যাদি লালন-পালন এবং গ্রহণে এই গণমাধ্যম থাকে বেশ তৎপর। বিশেষ করে ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে স্যাটেলাইট যুক্ত হওয়ার কারণে কোন্‌ পোশাক পড়তে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, নারীকে কীভাবে কী করলে স্বাধীনতা দেওয়া যাবে ইত্যাদি অনেককিছুই নির্ধারণ করে দিচ্ছে ক্ষমতাবানদের দ্বারা চালিত এই গণমাধ্যম।

 

আপন দেহের কল না পড়ে

বিভোর হলে কলমা পড়ে

একজন শিল্পী আট-দশটা মানুষের মতোই সমাজে বেড়ে ওঠেন, প্রত্যক্ষ করেন ঘটে যাওয়া সবকিছু। কিন্তু মানুষটি কেনো শিল্পী? শিল্পীর চোখ ওই সাধারণের চোখ থেকে ভিন্ন বলেই আমরা তাকে শিল্পী বলি। সমাজের প্রয়োজনে সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি পারিপার্শ্বিকতাকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলেন। সময় ও পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে শিল্পী সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তার শিল্পকে কীভাবে ফুটিয়ে তুলবেন। মনে রাখতে হবে শিল্পের সঙ্গে শুধু শিল্পীর ব্যক্তিগত বোঝাপড়াই আবশ্যিক নয়, সেই সঙ্গে তার চারপাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা দেখি উপনিবেশিকতার যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্ত দিক। দুর্ভিক্ষ, খাদ্য ঘাটতি, অনাহারে মৃত্যু, সহিংসতাই যেনো ছিলো সেখানকার সংস্কৃতি। গত শতাব্দীর ৫০ দশকটি ছিলো এ-সবের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ। সেসময়ে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মধ্যে চলচ্চিত্রমাধ্যমটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম বলে বিবেচিত হওয়া শুরু হয়েছিলো এইসব দেশে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে এসেছিলো এবং একাত্মতা প্রকাশ করেছিলো চলচ্চিত্রনির্মাতারাও। গ্লাউবার রচা, নেলসন পেরেরা দয় সান্টোস, র‌্যুই গুয়েরা তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একই আদর্শগত শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন।

এই দেশগুলোর চলচ্চিত্র মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদী ধারার চলচ্চিত্র হয়েও ছিলো অন্যকিছু। রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বরূপ ও তার ভিতর যেসব উপনিবেশী প্রভাব ছিলো, লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রকর্ম সেসব উন্মোচিত করেছিলো। ব্রাজিলের গ্লাউবার রচা ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলনকে তার এক রচনায় ‘ক্ষুধার নন্দনতত্ত্ব’ এবং একই সঙ্গে ‘নাশকতার নন্দনতত্ত্ব’ বলে অভিহিত করেন। রচা লিখেছেন ‘তারাই ভায়োলেন্সের শিকার, ক্ষুধার্ত থাকাটাই যাদের কাছে স্বাভাবিক জীবনধর্ম। এটা সেই সমাজ কাঠামোর ভায়োলেন্স, যা মানুষকে অনাহারে থাকতে বাধ্য করে।’

আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থাও প্রায় ওই-সমস্ত দেশসমূহের মতোই ছিলো। হয়তো সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, ক্ষুধা, মৃত্যুর চেহারা তো একই ছিলো; একই ছিলো তাদের অনুভূতি। ঠিক ওই সময়ে দাঁড়িয়ে উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে, শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সে-দেশের মুক্তিকামী চলচ্চিত্রনির্মাতারা ঠিকই সত্য প্রকাশ করেছিলেন, তুলে ধরেছিলেন সব সত্যকে। কিন্তু আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাবো এ-ভূখণ্ডে যতো দমন-পীড়নই হোক না কেনো তা শাসককুলের সম্মান রক্ষার্থে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত ক্ষুধার্ত মানুষের মুখটিও তুলে ধরতে আশ্রয় নিতে হয়েছে বিভিন্ন চাটুকারিতার। আর দুর্ভিক্ষের প্রকৃত কারণ তুলে ধরা তো কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।  

যদি এ-দেশে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত দুর্ভিক্ষ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে-সেসব চলচ্চিত্র মূলত খালি চোখে যা দেখা যায় তারই প্রতিচ্ছবি। দুর্ভিক্ষ নিয়ে তাদের ডিসকোর্স এরকম-দুর্ভিক্ষ হয়, এটি প্রকৃতি প্রদত্ত, কারণ অর্থনৈতিক সঙ্কট কিংবা যুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। এ-গুলো চলচ্চিত্রেও উঠে আসে একইভাবে। দর্শক সেলুলয়েডে দেখতে পায় কিছু কঙ্কালসার মানুষ, রাস্তায় রাস্তায় তাদের নগ্নদেহে হেঁটে বেড়ানো, সরকারি লোঙ্গরখানা, যুবতী গৃহবধূর দেহ বিক্রি ইত্যাদি। চলচ্চিত্রে দুর্ভিক্ষের যে গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ দাঁড়িয়েছে সেখানে এর বাইরে তেমন কিছুই দেখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে আমরা ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নিম অন্নপূর্ণা এবং আমজাদ হোসেনের ভাত দে  চলচ্চিত্রগুলোর কথা বলতে পারি।

পাঠক, আসুন আমরা এবার খোঁজার চেষ্টা করি ইতিহাসের এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে সত্যজিৎ রায় নির্মিত অশনি সংকেত এর কাহিনীর কতোখানি সাদৃশ্য আছে, না থাকলেও তা কোন্‌ দিক থেকে নেই এবং তার নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলনগুলো কী।


অশনি সংকেত  ও দুর্ভিক্ষের সত্যজিতিয় ডিসকোর্স

সত্যজিৎ রায় পঞ্চাশের মন্বন্তরে সময়কালীন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অশনি সংকেত উপন্যাসকে চিত্ররূপ দিয়েছেন। সত্যজিৎ রায় তার অশনি সংকেত-এ ১৯৪৩ সালে সংঘটিত দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটির কাহিনীর শুরু-স্বচ্ছল একটি ব্রাহ্মণ পরিবার এবং তাদের গ্রামের মানুষের জীবন নিয়ে। এরপর ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, তীব্র খাদ্যসঙ্কটের মধ্য দিয়ে দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত পুরো গ্রাম। একই সঙ্গে সারা দেশের সার্বিক অবস্থা। দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে জাপানের সিঙ্গাপুর দখল। আড়তে মজুদ চাল ও গ্রামের গেরস্থের গোলাভরা ধান; সেই ধানের লুটপাট ইত্যাদি। একই সঙ্গে চুটকি নামের গ্রাম্য এতিম নারীর পতিতা হয়ে ওঠা। মোটাদাগে এই হলো অশনি সংকেত।

চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে লেখা ওঠে ‘১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে মানুষের সৃষ্টি এই দুর্ভিক্ষে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ নরনারীর মৃত্যু হয়।’ পাঠক শুরু করছি একেবারে শেষ থেকে, সত্যজিৎ তার এই কথার মধ্যে দিয়ে স্বীকার করে নেন দুর্ভিক্ষ মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো চলচ্চিত্রে তিনি কোথাও বললেন না কোন্‌ মানুষের সৃষ্টি। গুণী এই নির্মাতা তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শককে জীবন, সমাজ, দর্শন ইত্যাদি সবকিছু সম্পর্কে আলাদাভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ তৈরিতেও তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রই সফল হয়েছে। তিনি তার চলচ্চিত্রে সবসময় যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যুক্তিই ছিলো তার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান দর্শন; তার হাতেই সৃষ্টি হয়েছে ফেলুদার মতো চরিত্র। অথচ সেই সত্যজিৎ নির্মাণ করলেন দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রায় যুক্তিহীন এক চলচ্চিত্র। নিজে বললেন, দুর্ভিক্ষ ‘মানুষের সৃষ্টি’ কিন্তু এর জন্য কে বা কারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করলেন না। এ দুর্বলতা কি অশনি সংকেত-এর নাকি সত্যজিতের?

দ্বিতীয়ত, এভাবে শুধু ‘মানুষের সৃষ্টি’ বলে সাধারণীকরণের প্রচেষ্টা আমাদের ভিতরের সন্দেহকে বাড়িয়ে দেয়। তিনি এই ‘মানুষের সৃষ্টি’ শব্দটি ব্যবহার করে কোনো বিশেষ পক্ষ বা শ্রেণীকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন, নাকি অন্যকোনো পক্ষকে দায়ী করলেন? পাঠক আসুন আমরা এবার তা খোঁজার চেষ্টা করি-  


ক. হিংসের দায় দিয়ে লালন

শৃগালের কাজ করে ফেরে

গ্রামের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে গঙ্গাচরণ বাবু ও বিশ্বাসমশাইয়ের কথা হচ্ছে-

-এই যে চারিদিকে হাঙ্গামার কথা শুনছি এর শেষ কবে হবে বলুনতো বিশ্বাসমশাই? (গ্রামবাসী)

-তা কি কেউ বলতি পারে। এসব হলো রাজাদের ব্যাপার-স্যাপার; আমরা হলো মুখ্য-সুখ্য গেও মানুষ। যুদ্ধের কথা কি আমরা বলতি পারি! কী বলেন পণ্ডিত মশাই। (বিশ্বাসমশাই)

-জার্মানিরা নাকি শুনলাম কী একটা পুর নাকি দখল করে নিছে। (গ্রামবাসী)

-সিঙ্গাপুর। জার্মান নয় জাপান। (গঙ্গাচরণ)

-কোন্‌ জেলায় হবি পণ্ডিত মশাই? (গ্রামবাসী)

-জেলা মেদিনীপুর। (গঙ্গাচরণ)

-পুরির কাছে হলো কি? (গ্রামবাসী)

-ঠিক কাছে নয়, একটু দূরে, পশ্চিম দিকে। (গঙ্গাচরণ)

-সেখানেই যুদ্ধ চলছে? (গ্রামবাসী)

-তার জন্যই এই চালের দাম বাড়ছে? (গ্রামবাসী)

-হু, এইটিই তো স্বাভাবিক| (গঙ্গাচরণ)

সংলাপের সার কথা হলো, বাজারে চালের দাম বাড়ার কারণ জাপান সিঙ্গাপুরকে দখল করেছে। সে-জন্যই চাল আমদানি করা যাচ্ছে না, কোনো ব্যবসা করা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা হলো, দুর্ভিক্ষের ঠিক ওই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। ব্রিটেন-আমেরিকা-ফ্রান্স ছিলো মিত্রশক্তি অন্যদিকে জাপান-জার্মানি-ইতালি ছিলো অক্ষশক্তি। আর সেই সময়টিতে ব্রিটিশ শাসনের অধিভুক্ত হওয়ায় ভারতবর্ষ ছিলো মিত্রশক্তির পক্ষে। যুদ্ধ, তা যে-পক্ষের মধ্যেই হোক না কেনো তা মানবতার জন্য হুমকি। আর দুর্ভিক্ষের পথে ধাবিত হওয়ার জন্য তা একটি কারণও বটে। কিন্তু চলচ্চিত্রে বারবার জাপান সিঙ্গাপুরকে দখল করেছে এ-কথাই শুধু বলা হলো। অথচ যারা আমাদের ভূখণ্ড দখল করে দমন-পীড়ন করছিলো, যাদের আগ্রাসনের পর থেকেই বারবার দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হচ্ছিলো-সেই ব্রিটেনের কথা একবারও বলা হলো না। অথচ যতো যুদ্ধই হোক দুর্ভিক্ষের দায় ব্রিটেন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কিন্তু সত্যজিৎ এড়ালেন!

আমরা যদি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামল খেয়াল করি তাহলে দেখবো, তাদের পুরো শাসনামল জুড়েই ছিলো দুর্ভিক্ষ। ব্রিটিশ শাসনের প্রথমভাগে (১৭৫৭-১৮০০) যে-চারটি দুর্ভিক্ষ হয় তার মধ্যে ১৭৬৯-৭০ কালপর্ব ‘ছিয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে’ বিহার এবং বাংলায় ইংরেজ বণিকদের খাদ্যশস্যের ব্যবসা ও অনাবৃষ্টিতে যথাক্রমে ৩০ লক্ষাধিক ও এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। একইভাবে গুজরাট, হায়দ্রাবাদ কিংবা দাক্ষিণাত্যে ইংরেজ বণিকদের খাদ্য নিয়ে অমানবিক ব্যবসা ও অনাবৃষ্টিতে অজ্ঞাত সংখ্যক নর-নারী মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮০০-১৮৫০) প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে অগণিত লোক মৃত্যুবরণ করেছিলো, তার মধ্যে ১৮১২-১৩ সালে রাজপুতানা ও পাঞ্জাবে ২০ লক্ষাধিক আর ১৯৩৭-৩৮ সালে উত্তর-ভারতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো ১০ লক্ষাধিক। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৫০-১৯০১) ১৪ বার মানুষকে মন্বন্তরের সম্মুখীন হতে হয়। এই ৪৭ বছরে বৃটিশ সরকার ঘোষিত দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যুসংখ্যা দুই কোটি ৮৮ লক্ষ ২৫ হাজার। ১৭৬৫-১৮৫৮ এই ৯৩ বছরে দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে বারবার এবং ১৮৬০ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত বছর বছর ছিল আকাল। অথচ এতোসব মর্মান্তিক ঘটনার জন্য প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বাজার থেকে উধাও করে দিয়ে ব্রিটিশরা এই ঘটনাকে খাদ্যসঙ্কট বলে জানালেও প্রকৃতপক্ষে খাদ্যদ্রব্য উধাও করার পিছনে ছিলো তাদেরই প্রত্যক্ষ মদদ।

দুর্ভিক্ষের জন্য ব্রিটেনের দায়বদ্ধতা নিয়ে এ-রকম হাজারো প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সত্যজিৎ রায় পুরো কাহিনী থেকে তাদের বাইরে রাখলেন এবং প্রচ্ছন্নভাবে তাদের ক্ষমতাকে বৈধতা দিলেন। কিন্তু কেনো? তিনি কি তাহলে ব্রিটিশ শাসনকে অবচেতনভাবে মেনে নিয়েছিলেন!  

 

খ. কাঁধে চড়ায় কাঁধে চড়ি

যে ভাব ধরায় সেই ভাব ধরি

প্রবল আত্মবিশ্বাস, কথায় বেশ গতি, ভয়, সঙ্কোচ ছিলো না চুটকির। চুটকির মা, বাবা, ভাইসহ পরিবারের সবাই ওলা-ওঠা রোগে মারা গিয়েছিলো। শুধু সেই বেঁচে ছিলো, আর এটিই তার গর্ব। পরিবারের এই ভয়াবহ পরিণতির কথা নিঃসঙ্কোচে সবাইকে হাসতে হাসতেই চুটকি বলতো। অথচ আকালে যখন গ্রামে তীব্র খাবার সঙ্কট দেখা দিল তখন সে খাদ্যের সন্ধান করতে ব্যর্থ হলো। বাধ্য হলো চালের জন্য পুরুষের কাছে শরীরটুকু বিক্রি করতে। শেষ পর্যন্ত একেবারেই টিকতে না পেরে শরীরকে পুঁজি করে চলে গেলো শহরে।

চলচ্চিত্রের শুরুতে যে স্বাধীন চুটকি, যে চুটকির মনোবল ছিলো প্রবল; শেষে সেই চুটকির অসহায় আত্মসমর্পণ। আবার সেই অধস্তনতা, সত্যজিতের আকালি নারী দুর্বলই হয়ে রইল। পরিপ্রেক্ষিত থাকলো দুর্ভিক্ষ। নারীকে আবর্তিত করে যে ডিসকোর্সগুলি সমাজে তীব্র আকারে বলবৎ সত্যজিৎ তাতে আরও একটা গিট্টু দিয়ে বাঁধন মজবুত করলেন। পূর্বপুরুষদের ধর্ম রক্ষা করে তাদের মান রেখে নিজেকে যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। সত্যজিৎ মনে হয় ভুলে গিয়েছিলেন, তার দেশের নারীরা কতো সংগ্রামী, চেতনাগত অবস্থানে কতো দৃঢ়। সংসারের দুঃসময়ে, দেশের দুঃসময়ে তারা কখনই পিছপা হয়নি, বরং ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রতিবাদ করেছে।

দুর্ভিক্ষের মতো এতো বড়ো সঙ্কটে তিনি নারীকে পুরুষের ভোগের জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভাবতে পারলেন না! ক্ষুধার্ত চুটকি ব্লাউজ ছাড়া লাল শাড়িতে পুরুষের চোখে কামুক হয়েই রইলো। এবং সবশেষে পুরুষতান্ত্রিকতার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হলো পরনির্ভরশীল অবলা। সেলুলয়েডের চুটকিতো বাস্তবের হাজারো চুটকির ছায়া। এই চুটকিরাই শুধু বিক্রি হয়, এর বিপরীতে পুরুষরা শুধু তাদের কিনে, নিজে বিক্রি হয় না।

 

গ. এনেছে এক নবীন গোরা

নতুন আইন নদীয়াতে  

চলচ্চিত্রটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা কয়েকটি দৃশ্যে দেখতে পাই, গ্রামের খেটে খাওয়া নারী তাদের সারা দিনের পরিশ্রমের ফসলটুকু নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিলো তখন কিছু লোক তা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এরপরের দৃশ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কিনছিলো গ্রামের মানুষ; হঠাৎ একটি লোক তা কেড়ে নেয় এবং তারপর যে যেভাবে পারে সেভাবে চাল লুট করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবশেষে চাল লুণ্ঠনের দায়ে সরকারি রক্ষী তাদের আটক করে নিয়ে যায়। এরপর আরেক দৃশ্যে দেখা যায়, গ্রামের সম্ভ্রান্ত লোক বিশ্বাস বাবুর বাড়ির সামনে গ্রামের কিছু প্রতিবাদী মানুষ চাল চাইতে আসে, শেষমেশ চাল না পেয়ে শক্ত ভাষায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যায়।

পাঠক লক্ষ্য করুন, দেশজুড়ে যখন দুর্ভিক্ষ চলছে, মানুষ মারা যাচ্ছে তখন সত্যজিৎ সাধারণের খাদ্য কেড়ে নেওয়া, চালের দোকান লুটের মতো ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বিষয়কে সংগ্রাম-লড়াই বা প্রতিবাদ হিসেবে দেখাচ্ছেন। দাবি আদায়, অধিকার বা বেঁচে থাকার সংগ্রামে এ-দেশের সাধারণ মানুষের যে-ঐতিহাসিক দৃঢ়তা, মনোবল, আদর্শিক চেতনা সত্যজিৎ তা নিমিষেই খারিজ করে দিলেন বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দেখিয়ে। তিনি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন নিরন্ন ওই মানুষগুলোর সামনে যারা আছে, তাদের সঙ্গে যারা থাকে এদের মধ্য থেকেই কেউ হয়তো দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। অতএব তাদের সঙ্গে লড়াই করো, তাদেরটা ছিনিয়ে নাও; এর বাইরে আর কারও কোনো দোষ নেই। অর্থাৎ সত্যজিৎ-এর ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ এর মানুষ মনে হয় এরাই!


ঘ. রাধা ছাড়া তিলার্ধ নয়

ভারত পূরাণে তাই কয়

চলচ্চিত্রটি মূলত হিন্দুপ্রধান কিছু পরিবার ও হিন্দু অধ্যূষিত এলাকার মানুষদের নিয়ে নির্মিত। কাহিনীর শুরু একটি ব্রাহ্মণ পরিবার দিয়ে। শিক্ষিত ব্রাহ্মণের নাম গঙ্গাচরণ চট্টোপাধ্যায়। তাকে সবাই সমীহ করে সম্মান দেয়। এলাকার ছেলেমেয়েদের পাঠদানও করান তিনি। তার সংসারে তেমন কোনো অভাব ছিলো না। গ্রামের সবাই তাকে সাহায্য করে। ভালোই চলছিলো। কিন্তু গ্রামে যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সাধারণ মানুষগুলোর যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা যাচ্ছিলো তখন কোনো বিত্তবান ওই সাধারণ মানুষগুলোর জন্য এগিয়ে আসেনি। এমনকি না খেয়ে মরলেও কেউ কাউকে সাহায্য করেনি। কিন্তু চলচ্চিত্রের শেষদৃশ্য পর্যন্ত কিছুটা হলেও অন্তত সবার দয়া-দাক্ষিণ্য বা সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ঠিক দিনাতিপাত করছিলো গঙ্গাচরণ। এর কারণ কী?

সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোয় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো ধর্ম। আর এজন্যই এর প্রতিনিধিত্বকারীরা যুগে যুগে পেয়েছে বাড়তি মান-মর্যাদা, সম্মান। ক্ষমতাবানরা ক্ষমতার বৈধতার প্রশ্নে এবং সাধারণের সম্মতি আদায়ে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। ধর্মকে দাঁড় করিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র কোনো রকম সংঘাত ছাড়াই তার কর্তৃত্ব টিকে রেখেছে। গ্রামসির বয়ান অনেকটা এরকম, ‘আধিপত্য’ হলো শক্তি প্রয়োগের বদলে ‘সম্মতি’ দ্বারা একটি শ্রেণী কর্তৃক অপরাপর শ্রেণীর ওপর ‘প্রাধান্য’ প্রতিষ্ঠা, ‘সম্মতি’ সিভিল সমাজের পরিসরে এইসব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অর্জিত হয়।’ আর সে-জন্যই ধর্ম ও এর প্রতিনিধিত্বকারীরা সমাজের একটি বিশেষ জায়গা থেকে বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন। এবং সাধারণের মনেও এমনভাবে তা গেঁথে ফেলা হয় যে, তারাও তা আপোষে মেনে নিতে একরকম বাধ্য হয়। এর ফলে কথা ওঠে সাধারণ মরে মরুক, ব্রাহ্মণ যেনো না মরে। সত্যজিৎ যেনো আবারও সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করলেন, ক্ষমতাবানদের সামাজিক ক্ষমতাকে আরও প্রসারিত করলেন ও নিশ্চয়তা দিলেন তাদের টিকে থাকার।

 

ঙ. পাতালে চোরের বহর

দেখায় আসমানে নহর  

সত্যজিৎ রঙিন ছবিতে পা রেখেছিলেন অশনি সংকেত দিয়েই। তিনি নিজেই বলেছিলেন, রঙিন ছবি করেছেন প্রধানত ব্যবসায়িক কারণে। রঙিন ছবি তোলার খরচ ও ঝামেলা দুটোই কম। দর্শকও রঙ পছন্দ করে। ততোদিনে অবশ্য টেলিভিশনও রঙিন হয়ে গেছে, দর্শকও অভ্যস্ত হয়ে গেছে রঙে। তাই রঙ দিয়ে অর্থ উপার্জনও সহজ হয়ে যায়। চরিত্রের রূপ ফুটিয়ে তুলতে রঙ সাহায্য করে এবং নাট্যরস সৃষ্টিতেও তার ভূমিকা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দারিদ্র্র, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধার যে একটি আলাদা ‘সৌন্দর্য’ আছে তা সত্যজিৎ বেশ পরিষ্কার করেই তুলে ধরেছিলেন রঙিন ফিতায়। স্পষ্ট করে তিনি দেখিয়েছেন ক্ষুধার্ত মানুষের হাড় বের করা শরীর, বিবর্ণমুখ। তিনি রঙ দিয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে তুলেছেন নারী-শরীর। চুটকির ক্ষুধার্ত পেট বিবর্ণ হলেও রঙিন ছবিতে তার পরনের শাড়ি, সজ্জা কিন্তু এতোটুকু ম্লান হয়নি। তার বেঁচে থাকার জন্য যেনো ওই সাজসজ্জা ছিলো জরুরি। অন্যদিকে নিরন্ন নারীমুখগুলো যেনো মেনেই নিয়েছে মৃত্যু তাদের সঙ্গী, শরীরে তাদের জৌলুস নেই, তাই রঙ নেই পরনের কাপড়েও। তার মানে নারী শরীর বিক্রি করতে চাইলেও পারে না, এর জন্য রঙ লাগে। যে-ব্যবসায়ী রঙ চুটকির বিবর্ণ শরীরে লাগিয়েছে সত্যজিৎ।    

আমরা কাহিনীর একটি পর্যায়ে দেখতে পাই চুটকি, অঙ্গনাসহ তিনজন মেটে-আলু খুঁজতে বনের মধ্যে যায় এবং এক পর্যায়ে অঙ্গনা ধর্ষণের শিকার হন। অদ্ভূত ব্যাপার হলো, দুর্ভিক্ষে নারী অসহায় হয়ে পড়ে আর পুরুষের ক্ষুধা বেড়ে যায়। আর সে-সময় কেনো জানি নারী হয়ে পড়ে দুর্বল আর পুরুষ হয় সবল। হঠাৎ দেখে মনে হয়, পেটের ক্ষুধা যেনো কেবলই নারীর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাহিনীর ধারাবাহিকতায় অঙ্গনার ধর্ষণ কি খুবই জরুরি ছিলো? নাকি অপ্রয়োজনীয় এই দৃশ্যটি ছিলো কেবলই ব্যবসার প্রয়োজনে। তার মানে হলো, ওই পুরুষেরা দুর্ভিক্ষে ভাতের লোভ দেখিয়ে নারীকে ভোগ করেছেন; আর ব্যবসার প্রয়োজনে স্বয়ং সত্যজিৎ নারীকে ধর্ষণ করিয়েছেন।

 

ভাত দে, নইলে মানচিত্র খাবো

পাঠক, আমরা এবার আকাল নিয়ে বাংলাদেশে নির্মিত ভাত দে চলচ্চিত্রটির দিকে একটু চোখ রাখবো। আমজাদ হোসেন পরিচালিত এ-চলচ্চিত্রটির কাহিনী এরকম-সিরাজুদ্দি বয়াতি ঘরছাড়া বাউলমনা। সংসারে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে। দু’মুঠো ভাত ছাড়া বাড়তি কিছু চাওয়া নেই তাদের। সিরাজুদ্দি তা অনুভব করে কিন্তু দিতে পারে না। সন্তানের ও নিজের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে সিরাজুদ্দির স্ত্রী প্রতিবেশির ঘরে ভাত চুরি করে; ধরাও পড়ে। শেষ পর্যন্ত নৌকার এক মহাজনের কাছে তার ভাতের সংস্থান হয়; কিন্তু এজন্য তাকে ছাড়তে হয় সিরাজুদ্দির সংসার। এক সময় মহাজনের নারী ক্ষুধা মিটে যায়; ছেড়ে দেয় তাকেও। এক পর্যায়ে স্বামী-সন্তানের শোকে সে পাগল হয়ে যায়।

এ-দিকে মেয়ে জরিনা বসন্ত রোগে অন্ধ সিরাজুদ্দিকে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকে। সময়ের পরিক্রমায় জরিনা হয়ে ওঠে সুন্দরী জরিনা। তার রূপের জৌলুস থাকলেও পেটের জৌলুস থাকে না। বাধ্য হয় চালকলে কাজ নিতে। কলের মহাজন মিঞা সাহেব বড়ো নারীভক্ত। তার কলে কাজ করা মেয়েদের তিনি শরীরের বিনিময়ে ‘সচ্ছলতা’ দেন। তাদের একজন হরবালা। কিন্তু জরিনা তা মানে না। নিজেকে বাঁচাতে সে পালিয়ে আসে। মিঞা সাহেব তার ওপর ক্ষুব্ধ হন, তাই শ্রমের বিনিময়েও তার খাবার জোটে না। বাবা মারা গেলে তারই শিষ্য গওহর বয়াতির সঙ্গে বিয়ে হয় জরিনার। একপর্যায়ে মিঞা সাহেবের চক্রান্তে জেলে যায় গওহর। স্বামীহারা জরিনা অভাবের তাড়নায় পাগলপ্রায় হয়ে যায়।

পাঠক, আসুন চলচ্চিত্রটির নির্মাতা নারী-ভাত-অর্থ-পুরুষ এই কয়েকটি বিষয়কে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি। বলতে পারেন, ঢাকাই বাংলা সিনেমার আবার খোঁজাখুঁজির কী আছে। এখানে তো নারীই ভায়োলেন্সের শিকার হবে এটিই স্বাভাবিক। তারপরও চলুন পুরনো মদ আবার না-হয় একটু নতুন করে গিলি।


ক. তুমি পতি, তুমি আল্লাহ, তুমিই রহমত

সিনেমার শুরুতেই আমরা দেখি ঘরে চাল নেই, মা-মেয়ে দুজনেই ক্ষুধার্ত। অভাবের কথা আসলেই শোনা যায়-‘তোর বাপ আসে না; তাই চাল নাই। ওর বাপে বাড়ি থাকে না, রোজগার করে না তাই এতো কষ্ট।’ দেখুন, তার মানে পুরুষ মানেই নিয়ন্ত্রক, পুরুষ মানেই পুঁজি। পতি আর পুঁজি যেনো সমার্থক। চলচ্চিত্রটির প্রতি পরতে বোঝা যায়, পতি ছাড়া টাকা রোজগারের কোনো ব্যবস্থাই নেই। এটিই প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সত্য। টাকা শুধু পুরুষকে চেনে, তাদের কাছেই যেতে চায়, আর সেই টাকায় নারীকে ‘কিনে’ পুরুষ। আমরা ছোটবেলায় বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে পড়েছি-‘যাহা নারীকেও বুঝায় না পুরুষকেও বুঝায় না তাহাই ক্লিবলিঙ্গ।’ এখন দেখি বা বুঝি টাকা মানেই পুংলিঙ্গ। আর যা পুংলিঙ্গ তাই পুরুষ!

তাইতো ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমার ও আমার বোনের জামা-প্যান্ট বানানো হলে আমারটার পকেট থাকতো, আর বোনেরটাতে থাকতো না। মাকে এমনটি কেনো প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, ‘তুমি আয় করবে তোমার বোনকে টাকা দিবে। আমাদের দেখবে।’ তার মানে আমি রোজগার করলেই কেবল আমার বোনের, মায়ের স্বপ্ন পূরণ হবে; নচেৎ নয়। এটিই যেন ‘নিয়ম’। বিষয়টা আরও পরিষ্কার করে বলি, গওহর একবার জরিনাকে বলে, কাজের জন্য নারায়ণগঞ্জে যেতে হবে; দুই মাস আসতে পারবে না। এ-কথা শুনে জরিনা শঙ্কিত হয়, ভয় পায়। কাতর কণ্ঠে বলে, ‘না তুমি যাইবা না। সংসার না চলুক, না খাইয়া মরুম।’ তার মানে পেটে খাবার না থাকলেও চলবে কিন্তু স্বামী না থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে মিঞার হাত থেকে বাঁচতেও জরিনার স্বামীর দরকার পড়ে। এ-দৃশ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে আমজাদ হোসেন তার স্বগোত্রীয় নায়কের ‘ক্ষমতার আফিম’ এর কৌটা খুলে পুরুষ দর্শককে তা থেকে এক চামচ খাইয়ে তাদের চৈতন্যকে জাগ্রত করেন। একই সঙ্গে আবার ক্ষুধা মেটাতে পরপুরুষের হাত ধরে চলে যাওয়ায় সিরাজুদ্দিকে কষ্ট দেন, অপমানবোধ করান।

ওদিকে অশনি সংকেত-এ একই দশা দেখি। গঙ্গাচরণ বাবু বাইরে কিছু পেলে তা খান না, নিয়ে আসেন পত্নী অঙ্গনার জন্য। এতো ভালোবাসা! বাঙালি পুরুষ বউকে এতোই ভালোবাসে যে বউয়ের হাতে দাগ, ফোসকা পড়ুক তা তিনি চান না। কারণ তাহলে যে তার পূর্ণ কাম অপূর্ণ থেকে যাবে। বউ ঘরের বাইরে গেলেই তার মান-সম্মানে ধাক্কা লাগে, অপমান বোধ হয়। তাইতো বউ পরের বাড়ি ধান ভানতে যাবে শুনে গঙ্গাচরণ বলে, ‘এ গায়ে আমাদের কতো সম্মান দেখিছো তো, এ-সম্মানটা বাঁচিয়ে চলতে হবে তো। চালের ব্যবস্থা নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না; সে ব্যবস্থা আমি করবো।’

বউয়ের প্রতি গঙ্গাচরণের এতোই ভালোবাসা যে তাকে বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। এ-ভালোবাসা কী বউয়ের প্রতি নাকি নিজের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার প্রতি। কারণ ভয়, নারী বের হলে যদি সে তার সমকক্ষ হয়ে যায়! যদি ‘ভালোবাসার বেড়ি’ ছিঁড়ে ফেলে; যদি ক্ষমতার ভাগ চায়! তাই সত্যজিৎ-আমজাদ পরম্পরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, পুরুষকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। তারা চান নারী ঘুড়ির মতো উড়ুক, পাখির মতো নয়। আর নাটাইটা তাদের হাতেই থাকুক।

 

খ. হবো বলে চরণ দাসী

সিরাজুদ্দির বউ নদীতে গোসল করে। ভিজে শরীর, খোলা বুক। আর নৌকায় বসে থেকে তা ভাতের সঙ্গেই গিলতে থাকে মহাজন। সিরাজুদ্দির স্ত্রীও তার দিকে কামুক দৃষ্টিতে তাকায়; মহাজন আনন্দ পায়। অতঃপর তাকে এক গামলা ভাত দেয়। নারীর শরীর যেনো বায়োস্কোপ! বায়োস্কোপ দেখে বাচ্চারা যেমন এক-দুই টাকা তার মালিককে দেয়, তেমনি সিরাজুদ্দির স্ত্রীকেও দেয় মহাজন। পার্থক্য কেবল টাকার বদলে ভাত।

আজকে সিনেমায়, পত্রিকায় প্রিয়াংকা চোপড়া, প্যারিস হিল্টনরা যেভাবে শরীর দেখিয়ে পয়সা কামায়। সিরাজুদ্দির স্ত্রীও তাই করে; আসলে করানো হয়। নারী যেহেতু ‘জীবন্ত পণ্য’ সেহেতু এটিই স্বাভাবিক। অন্যদিকে সিরাজুদ্দির মেয়ে জরিনা সতী, দেহ বিকোতে পারে না, তাই পেটও চলে না। চোখের সামনে না খেতে পেয়ে বাবার মৃত্যুও সে ঠেকাতে পারে না। তার মানে শরীর দাও, বিনিময়ে সব নাও। আর সে কারণেই মিঞা সাহেবের চালকলে জরিনা কাজ করার পর টাকা চাইতে গেলে সে বলে-‘তোমার মতো অপরূপ সুন্দরী এই পৃথিবীতে যা চায় তাই পায়, যদি তুমি ধান চাও পাইবা, চাইল চাও পাইবা, চাইলের কল চাও পাইবা, এই গদি চাও পাইবা, আর যদি আমারে চাও তাও পাইবা। যদি তোমারে আমি পাই।’

আরেকটি দৃশ্যে মিঞা সাহেবের অনুগত হরবালাকে দেখি। মিঞা সাহেব তাকে ‘সব’ দেয়, বিনিময়ে কেবল শরীর দিতে হয়। মিঞা সাহেবের ‘পোষ’ মানা হরবালা তাই ওকালতি করে জরিনাকে বলে- ‘ধান কলে কাম করতে হইলে এতো লজ্জা শরম থাকলে হয়? টাকা নিতে গেলে মিঞা সাহেবের কাছে যাও।’

টাকার অদৃশ্য শক্তি, ভারী শিকলে নারী বাঁধা পড়ে, হয়ে যায় পুরুষের অধীনস্ত। একইভাবে অশনি সংকেত-এ দেখি, চুটকি ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে অনেক কাজের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়। সফল হয় তখন, যখন পোড়া-মুখ লোকটিকে তার শরীরটুকু দেয়। যতোক্ষণ দেয় না ততোক্ষণ সে অভুক্ত থাকে; সে হরবালাই হোক আর চুটকিই হোক!

 

গ. তোরা কেউ যাসনে পাগলের কাছে

হরবালা সুন্দরী, সবসময় নিজেকে সাজিয়ে রাখে, হেসে কথা বলে, অন্যকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলে। কিন্তু হরবালাও নিঃস্ব ছিলো জরিনার মতোই। টাকাওয়ালা বিধাতা-পুরুষ মিঞা সাহেব তাকে ‘সচ্ছলতা’ দিয়েছে। ঘামা শরীরে গা থেকে একটু গন্ধ আসলেও মিঞা সাহেব অবশ্য সুগন্ধী মাখিয়ে দেন। হরবালা তাকে খুশি রাখে। পুরুষ তাকে বিশ্বাস করায়, স্বীকার করিয়ে নেয় ভিতরে কান্না চেপে রেখে কীভাবে ভালো থাকা যায়।

মেরিলিন মনরোর কথা নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে। পৃথিবীর বিখ্যাত যৌনাবেদনময়ী নারী, অভিনেত্রী। ধর্ষিত হয়েছিলেন, তারপরও সবকিছু মেনে নিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সংগ্রাম করেছেন। নিজে হেসেছেন, পুরুষকে আনন্দ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিজেকে শেষ করে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন পুরো পুরুষ জাতির ওপর। জরিনাকে বাঁচিয়ে হরবালা নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিলেন; কিন্তু হারিয়ে দিলেন মিঞা সাহেবকে মানে একজন পুরুষকে।   

এদিকে অশনি সংকেত-এ চুটকি নিজেকে সঁপে দেয় চালওয়ালা পোড়া মুখের লোকটির কাছে। শেষ পর্যন্ত পেট বাঁচাতে সে শহরে চলে যায়। যাওয়ার আগে ব্রাহ্মণ-বধূ অঙ্গনার কাছে এসে তার পায়ে ধরে চুটকি বলে, ‘তুমি সতী লক্ষ্মী বামুন দিদি। আশীর্বাদ করো বাউন দিদি যেনো নরকে গিয়েও দুটো খেতে পাই।’ হরবালা, চুটকি, মনরোরা এভাবেই হারিয়ে যায়। আর জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে যায় তারা ‘অসতী’, তাই বাকিরা ‘সতী, সতী লক্ষী’। সত্যজিৎ-আমজাদও একইভাবে নারীর পার্থক্যই করেন। প্রতিষ্ঠা করেন কে সতী, আর কে অসতী-তার মাহাত্ম্য।

 

নিম অন্নপূর্ণা: বুদ্ধদেবের উজান যাত্রা

সংসারের টানাপোড়েন সেই সঙ্গে রাষ্ট্রে সংগঠিত আকাল দুইয়ে দিয়ে টালমাটাল ব্রজো-প্রীতিলতার সংসার। তাই দুই মেয়েকে নিয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে কলকাতায় আগমন; স্বপ্ন শুধুই বেঁচে থাকা। তারা শোনে কলকাতায় টাকা ওড়ে, জীবন এখানে রঙিন। কিন্তু শোনা কথায় দেখা স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। তারা বোঝে এ-শহর রঙিন, কিন্তু তা দেখতে রঙিন চশমা লাগে। আর সেই চশমায় নিরন্নদের চোখে পড়ে না। শেষ পর্যন্ত পরাজিত-ব্যর্থ ব্রজো-প্রীতিলতা আবার ফিরে যায় বাপ-দাদার ভিটেতে। পার্থক্য, তারা এসেছিলো চারজন, ফিরে যায় দুইজন। কিন্তু তারপরও কলকাতা শহরেও বাড়তে থাকে ব্রজো-প্রীতিলতার সংখ্যা। এভাবেই শেষ হয় নিম অন্নপূর্ণার কাহিনী।


ক. যার ভাবে মুড়িয়েছি মাথা

সে জানে আর আমি জানি

সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখি, ব্রজোর ছোট মেয়ে অভুক্ত লতি এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে; পথে যা পাচ্ছে তাই কুড়িয়ে খাচ্ছে। এক পর্যায়ে সে এক ধনী লোকের বাড়ির ছাদে উঠে পড়ে; দেখে মোটাসোটা গড়নের এক লোক চিৎকার দিয়ে বলছে ‘চিলও, চিলও। বাকি খাবার বেচিও না, কাউকে দিও না।’ কী নির্মম বৈপরীত্য, একদিকে লতির ক্ষুধা আর একদিকে ধনীর উদ্বৃত্ত খাবার ফেলে দেওয়া! আরেকটি দৃশ্য দেখি, পাখির খাবার থেকে একটু খাবার নেওয়ার অপরাধে লতিকে এক প্রতিবেশী মারধর করে; মাকে কটু কথা বলে।

দুটি দৃশ্যে ধনী ও গরীবের এক বিশাল ফারাকের ইঙ্গিত করা হয়। লক্ষ করুন, উদ্বৃত্ত খাবার নিয়ে সংলাপটি ‘বাকি খাবার বেচিও না, কাউকে দিও না’। তার মানে খাবার দিও না, গরীবের ক্ষুধাকে আরও তীব্র করে তোলো। কারণ পেট ভরা কেউ তোমার কাছে আসবে না, তোমার শাসন মানবে না। তাই তুমি কাউকে শোষণ করতে পারবে না। বুদ্ধদেব আর সত্যজিতের মধ্যে পার্থক্যটা হলো প্রথমজন ধনী-পুঁজিপতিদের চেহারাটা, তাদের আসল উদ্দেশ্যটা প্রকাশ করে দিয়েছেন; আকালের পিছনের কারণ বলেছেন। অথচ সত্যজিৎ-আমজাদ দুর্ভিক্ষের জন্য, ক্ষুধার্তের জন্য, গরীবের টানাপোড়েনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীকে, ব্যক্তিকে বা তাদের দলভুক্ত কাউকে দেখতেই পেলেন না।

 

খ. রাষ্ট্র তার রাজপুত্রগণ

ব্রজো একটি কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, এলাকার বাবুদের কাছে যায়, তারা তাকে বারবার আশ্বস্ত করে। এক সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে সেই বাবুদের একজন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো, চলছিলো সুরা পান। ব্রজো সেখানে উপস্থিত হয়, প্রতিশ্রুত কাজ দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু লোকটি এবার অপারগতা প্রকাশ করে। নিরুপায় ব্রজো কিছু টাকা চাইলে, অল্পকিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়। তাকে কাছেও টানে না, দূরেও সরায় না। ফোঁটা ফোঁটা পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে।

সমাজে ক্ষমতা-কাঠামোর কেন্দ্রে থাকা মানুষদের দুধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, একপক্ষ সাধারণকে সরাসরি তিরস্কার করে, নির্যাতন করে দাপট টিকিয়ে রাখে। অন্যপক্ষ এগুলো করে না, হাত বুলিয়ে সামান্য অর্থের বিনিময়ে মানুষকে বশে রাখে। এ-ক্ষেত্রে তাদেরকে সমর্থন দিয়ে কোনোভাবেই তার পাতানো জাল থেকে বেরোতে দেয় না। দুই ধরনের ক্ষমতাবানের এই দুই রূপ যেনো রাষ্ট্র-কাঠামোর মতোই। একদিকে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি আদায়, অন্যদিকে তা না হলে দমন-পীড়নের মাধ্যমে বশে রাখা। বুদ্ধদেব আমাদের সেই দিকেই নজর আটকালেন। কিন্তু সত্যজিৎ কিছুই দেখালেন না। ধনী বা সচ্ছল গেরস্থদের এমনভাবে ফুটিয়ে তুললেন যেনো তাদের সাধারণের দুঃখে এগিয়ে আসার খুব ইচ্ছে, কিন্তু দুর্ভিক্ষের কারণে পারছেন না। সত্যজিৎ মাথায় হাত বোলালেন কিন্তু ফোঁটাও পানিটুকুও দিলেন না। আসলে সত্যজিৎ ওদের অর্থাৎ ক্ষমতাবানদের বাঁচিয়ে দিলেন।


গ. পাথরেতে অগ্নি থাকে

বার করে লয় ঠুনকি ঠুকে

চলচ্চিত্রটির শেষ পর্যন্ত দেখি ব্রজো বেকার। কিন্তু তার স্ত্রী প্রীতিলতা ঠিকই তার সর্বোচ্চ চেষ্টায় পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখে। সে প্রতিদিন কিছু না কিছু খাবার তৈরি করে সংসারের সবাইকে অভুক্তের হাত থেকে রক্ষা করে। প্রীতিলতা যখন আর পেরে ওঠে না তখন ক্ষোভে ব্রজোকে বলে, ‘বাড়ির বউ না হলে আমিই বেড়োতাম।’ তার মানে, সে চাইলেও বেড়োতে পারে না। হয়তো ব্রজোও চায়, তার স্ত্রী বের হোক। কিন্তু সেও বেড়া ভাঙতে পারে না। এখানে প্রীতিলতার ইচ্ছার স্বতঃস্ফূর্ততাই মুক্তির পথ। স্বামীর অকর্মণ্যতায় পরিবারকে চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রীতিলতার যে চেষ্টা তা নারীর সংগ্রামের পথকেই বুঝায়।

পাশের ঘরে বস্তা ভরা চাল, নিজে না খেয়ে জমিয়ে রাখে এক বৃদ্ধ। অথচ ব্রজোর পরিবারের খাবার নেই; সবাই অভুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে প্রীতিলতা চালের বস্তা চুরি করতে গিয়ে বৃদ্ধের কাছে ধরা পড়ে এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বৃদ্ধ মারা যায়। তারপরও প্রীতিলতা বস্তা ছিনিয়ে আনে। ভাত রেঁধে সবাইকে খাওয়ায়, কিন্তু তার পেটে ভাত আর যায় না; উগলে ফেলে দেয়। প্রীতিলতা জানে এটি অপরাধ; কিন্তু তারপরও পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ওই কাজ করে। এই চিত্র উইলিয়াম হান্টারকে চিন্তায় ফেলে, প্রচলিত ডিসকোর্সকে আঘাত করে। এছাড়া প্রীতিলতার দুই মেয়েকে দেখি পথের খাবার টোকাতে, পাশের বাড়ির এক নারীকে দেখি স্বামীকে ঘরে রেখে নিজের রোজগারে সংসার চালাতে। বিপরীতে আকালের প্রচলিত ডিসকোর্সে শরীরকে বিকোতে দেখি না, স্বামীর রোজগারের আশায় চুলো বন্ধ করতে বসে থাকতে দেখি না। আর এটাই বুদ্ধদেবের উজান যাত্রা।


ঘ. লতি পিঁপড়ে হতে চেয়েছিলো

নিম অন্নপূর্ণায় লতি যুথিকে বলে, ‘পিঁপড়েরা কোথায় যায় দিদি? সে বলে ওই বাড়িতে। লতি বলে ইস! আমরা যদি পিঁপড়ে হতাম।’ লতি জানে, ওই বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রতিবন্ধকতা কী। তাই সে ওই মানুষ না হয়ে পিঁপড়ে হতে চায়। সে এই সময়কে প্রত্যাখান করে, যে-সময়ে মানুষের চেয়ে পিঁপড়ে হয়ে বাঁচার সুবিধা বেশি থাকে। এ লতির প্রতিবাদ, এ প্রতিবাদ বুদ্ধদেবেরও।

কিন্তু সত্যজিৎ এ-প্রতিবাদ করতে পারেননি, তিনি মেনে নিয়েছেন। অশনি সংকেত-এর শেষ দৃশ্যে অনেক লোক আসতে দেখে গঙ্গাচরণ তার স্ত্রী অঙ্গনাকে বলে, ‘আর কতো হবে, দশ জন?’ অঙ্গনা বলে, ‘না এগারো জন।’ বোঝা যায়, বাড়তি একজন হলো তাদের অনাগত সন্তান। এখানে ওই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না করেই সত্যজিৎ নতুন প্রজন্ম আনেন; যারা হয়তো এই সময়, এই মত এবং এই পথকে মেনে নেবে।

তিনটি চলচ্চিত্র জুড়ে সত্যজিৎ ও আমজাদের সঙ্গে বুদ্ধদেবের এই মেনে নেওয়া, না নেওয়ার খেলা। এ-খেলায় কার জয় হলো সেটা না হয় আপনারাই নির্ধারণ করুন।

 

লেখক : রুবেল পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

rubelmcj@gmail.com      


তথ্যসূত্র

১. ছফা, আহমদ (২০০১ : ১২); বাঙ্গালি জাতি বাংলাদেশ রাষ্ট্র; প্যাপিরাস, ঢাকা।

২. চৌধুরী, রাহমান; ‘নীল বিদ্রোহ ও নীলদর্পণ নাটক’; নতুন দিগন্ত; সম্পাদক-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; সংখ্যা-৪, বর্ষ-২০১১, পৃ-৯, ঢাকা।

৩. প্রাগুক্ত; চৌধুরী, রাহমান (২০১১ : ১৪)।

৪. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৯); ‘চলচ্চিত্রধারাসমূহের অন্তর্গত পাঠ’; চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।

৫. রশীদ, সৈয়দ রিয়াজুর; ‘দুর্ভিক্ষ সংহিতা’; চালচিত্র; সম্পাদক-রাজা শহীদুল আসলাম; অষ্টাদশ সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃ-১৮৯, ঠাকুরগাঁও।

৬. রহমান, সাদিকুর; (২০০৯ : ৬৫); ‘গ্রামসির চিন্তার কয়েকটি দিক’; আন্তোনিও গ্রামসির সহজ পাঠ; ঘাস ফুল নদী, ঢাকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন