Magic Lanthon

               

মোস্তাফিজ গনি

প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দুই রাষ্ট্রের মাঝে গড়ে ওঠা তৃতীয় রাষ্ট্রের সন্ধানে

মোস্তাফিজ গনি


আজ   থেকে ৪০ বছর আগে যে-সীমান্ত ছিলো আমাদের আশ্রয়ধাত্রী, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা­-ঠিক ৪০ বছর পর সেই একই সীমান্ত আমাদের জন্য হুমকি, মৃত্যুর কারণ ও স্বপ্নভঙ্গের বিষাক্রান্ত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল ভূখণ্ডের বাইরে সংগ্রামরত মানুষগুলো যখন নিজ রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিতাড়িত, নিজ রাষ্ট্রের নির্যাতন, নির্মমতা যখন তাকে পর্যুদস্ত করে দেয় তখন হয়তো এই মানুষগুলো কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে বেছে নেয় সীমান্তমুখী জীবন। আত্মহত্যা পাপ; সম্ভবত এজন্যই না মরে এখানে তাদের জীবন টেনে আনে। আর এখানেই একজন  মানুষকে অমানুষ হতে হয়। সেই সঙ্গে এরা যে-রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে সে-রাষ্ট্রের আগ্রাসী আচরণ; যারা প্রভু হয়ে ওঠে এই রাজ্যহীন রাজত্বের, নাগরিকহীন মানুষের। দুটি দেশের নাগরিকদের জন্য যে-সংবিধান বা আইন ; তার পরিবর্তে এখানে জারি রাখা হয় তৃতীয় অলিখিত সংবিধান। নাগরিকহীন, দেশহীন সীমান্তগামী এ-মানুষগুলো কি এভাবেই জমিনহীন, সম্বলহীন হয়ে থাকবে?

শোষণের উদ্ভব থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। এরপর রাষ্ট্র তার আইন  জারি রাখতে মানুষকে তালিকাভুক্ত করলো। মানুষ হয়ে উঠলো রাষ্ট্রের নাগরিক। আর  নাগরিক মানেই তাকে মানতে হবে রাষ্ট্রপ্রবর্তিত আইন। রাষ্ট্রের প্রতি সেজদা করাই হবে নাগরিকের একমাত্র ধ্যান। রাষ্ট্র তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে ‘গণতন্ত্র’কে রক্ষার স্বার্থে নাগরিকদের তা মানার জন্য শপথবাক্য পাঠ করায়। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে, তোমাদের দেখাশুনার দায়িত্ব আমাদের; অতএব আমাদেরকে আমাদের মতো করে চলতে দাও। মুখের সামনে রাষ্ট্র এই মুলা ঝুলিয়ে বশীকরণ করে নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে। এবং এতোসব করার জন্য এই ‘নাগরিকত্ব’ অস্ত্রটিই ব্যবহার করে। আপনি যে মানুষই হন না কেনো সেটি তাদের নিকট মুখ্য বিষয় নয়, তাদের নিকট মুখ্য বিষয় আপনাকে নাগরিক করে তোলা।


নদীর ওপার পাখির বাসা

সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে যে-মানুষগুলো বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিশেহারা; যাদের পিঠ সীমানার শেষ প্রান্তে এসে থেমে গেছে, যারা ইতোমধ্যেই হয়েছে রাষ্ট্র প্রত্যাখ্যাত-স্বাভাবিকভাবেই এই  মানুষগুলো পার্শ্ববর্তী অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর  এই  সুযোগ কাজে লাগিয়েই মধ্যবর্তী সুবিধাবাদী শ্রেণী নিঃস্ব এই মানুষগুলোর প্রভু হয়ে ওঠে। ফলে এই  মানুষগুলো আর নিজের মতো করে চলতে পারে না। গণমাধ্যমে এ-চিত্রগুলো সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফুটে উঠেছে নানাভাবে। কখনও পত্রিকার কালো হরফে, কখনও বোকাবাক্সে, কখনও সেলুলয়েডে। ক্ষমতাবানরা এর রূপ নির্মাণ করেছেন নিজ নিজ স্বার্থমুদ্রায়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের স্বরুপ আর উন্মোচিত হয়নি। বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায় নির্মিত কাঁটাতার কি পেরেছে রাষ্ট্রের স্বরুপ উন্মোচন করতে? পাঠক চলুন, কাঁটাতার ধরে আমরা ঘুরে আসি দুই রাষ্ট্রের মাঝে গড়ে ওঠা সীমান্ত নামক সেই তৃতীয় রাষ্ট্র থেকে।

কাঁটাতার-এর কাহিনী এই রকম-অবৈধপথে সীমান্ত পার হওয়া নারী রুখসানা খাতুন আইনগত  স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা তদবির করে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ‘কায়দা’ করে সে সেখানেই থেকে যায়। তাকে আইনি সুবিধা দিয়ে সাহায্য করে এক উকিল। রুখসানার মতো আরও অনেক নারীরই এই দশা। গ্রামের প্রতিবাদী লোক তার নিষ্ক্রিয় বন্দুক হাতে ঘুরে বেড়ায় এবং সরকারের সব মহলে জানিয়ে দেয় পলাশপুরের বর্তমান অবস্থা। এ-দিকে সুধা নামে এক  নারী একটু ভালো থাকার জন্য, নিরাপদে থাকার জন্য খুঁজে ফেরে একজন  মানুষকে। যে তাকে একটু নিরাপত্তা দিবে। কিন্তু সবাই তার নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে শরীর নেয়। সেও শরীর দিতে থাকে বাধ্য হয়ে। আর এভাবে সুধার মতো অনেক নারীই হয়ে ওঠে পতিতা। এদিকে রাষ্ট্র তার পোষ্য সেনাবাহিনীর জন্য হালাল করে দেয় সীমান্তের সবকিছু। তারা তাদের মতো করে রাজত্ব করতে থাকে। সীমান্ত হয়ে ওঠে পতিতা, চোরাকারবারী, আইনজীবী, সৈন্যবাহিনীর যাত্রা-বিরতি স্থান। সব মিলে শক্তিমানদের হাতে নিপীড়িত ভাসমান কিছু মানুষের নির্মম জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে কাঁটাতার।


নাগরিকের অস্ত্র যখন নিষ্ক্রিয়

কাঁটাতার চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই, এক বন্দুকধারী বৃদ্ধ তার বন্দুকটির লাইসেন্স করার জন্য আদালতে যান। পেশকার তাকে লাইসেন্স না করার পরামর্শ দেয়। এ-কথা শুনে বৃদ্ধ আঁতকে ওঠেন। একসময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসকদের কাছে তার গ্রাম পলাশপুরের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও জবাবদিহিতা নিয়ে একের পর এক চিঠি পাঠাতে থাকেন। কিন্তু কোনো লাভ হয় না তাতে। বৃদ্ধের হাতে বন্দুক থাকা সত্ত্বেও সে কিছুই করতে পারে না। পাঠক আমরা দেখি, জনপ্রতিনিধি বা নেতা নির্বাচনে জনগণকে ভোটাধিকার দেওয়ার আইন হয়, স্লোগানে মুখরিত হয় চারপাশ। ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’ বুলি আওড়ানো হয়। এবং জনগণ এই ‘জনবান্ধব গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থায় ভোট দেয়; তার ক্ষমতা প্রকাশ করে। যিনি নেতা নির্বাচিত হন, তিনি রাষ্ট্র ও মানবের প্রতি এমন তেজস্ক্রিয় দায়িত্ব পালন করেন যে জনগণের আর কিছুই করার থাকে না।

যার প্রমাণ আমরা আমাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়েই দেখি। উদাহরণ দিয়ে পৃষ্ঠা ভারি করার কোনো প্রয়োজন মনে করছি না। ফিরে আসি কাজের কথায়-জনগণকে ‘ক্ষমতার বন্দুক’ দেওয়া হয়েছে। সেই বন্দুকে থাকে একটি মাত্র গুলি-যার নাম ভোট। সেই গুলি একবার বন্দুক থেকে বের হলে, তারপর কে কাকে চেনে! যে-যার মতো করে রাষ্ট্র চালাতে থাকে। কোনো সমস্যা হলে জনগণ হাতে বন্দুক নিয়ে ওই বৃদ্ধের মতো যতোই হা-হুতাশ করুক না কেনো, কোনো লাভ নেই। নখদর্পহীন, বিবেকহীন, খোঁড়া যুক্তিহীন শক্তিশালী প্রতিবন্ধী শাসনব্যবস্থা জারি করে, শাসক তার নিজের বাহবা নিজেই দেয়। মূলত বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায় বৃদ্ধ ও তার নিষ্ক্রিয় বন্দুকটি দিয়ে জনগণ ও তার ক্ষমতার যে মৃতরূপ তাই তুলে ধরেছেন। আবার একরাতের একটি দৃশ্যে দেখতে পাই-সেনারা বৃদ্ধের ঘরে প্রবেশ করে। বৃদ্ধ তাদের দিকে বন্দুক তাক করে। এবং সৈন্যরা সেটি নিয়ে ঠাট্টা করে বলে-‘ওটা রেখে দে, উনুন ধরাতে কাজে লাগবে।’ এখানে রাষ্ট্র তার সশস্ত্র সন্তানদের দিয়ে জনগণকে দাবিয়ে রাখে। আর  জনগণের ক্ষমতা হয়ে ওঠে ওই উনুনের মতোই।


বিচ্ছিন্নতা নাকি জুজুর ভয়

বিরাট আয়তনের দেশ ভারত। তার রয়েছে হাজারো জনগোষ্ঠী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মিশেল। ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক সংস্কৃতির, ভিন্ন জীবনাচরণের মতোই এখানকার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থা। পুঁজি বিনিয়োগের স্বর্গভূমি খ্যাত হলেও এই রাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনও মৌলিক অধিকারটুকু পায় না। মানুষ হিসেবে ন্যূনতম বেঁচে থাকার সামর্থ্যটুকুও নেই তাদের। ফলে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা সশস্ত্র হতে বাধ্য হয়। তারা হয়ে ওঠে গেরিলা। ভারতে রয়েছে এ-রকম অসংখ্য বিচ্ছিনতাবাদী দল; যারা স্বাধিকার চায়। আমরা ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের কথা বলতে পারি। ‘ভারতে মাওবাদী আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এতোদিনে। ভারতের ২৮টি রাজ্যের ১৪টিতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজ্য সরকারগুলো নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করেও তাদের দমাতে পারছে না। ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীরা সশস্ত্র লড়াই করছে। তাদের লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য শুধু ভারত সরকারের উৎখাতই নয়; সেই সঙ্গে রাষ্ট্র কাঠামোরও পরিবর্তন। ...পুলিশ, বিএসএফ, কোবরা, স্করপিয়নসহ ভারতের সব সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়োজিত করা হয়েছে অপারেশন গ্রিন হান্টের অধীনে।’১ এখন প্রশ্ন করতে পারেন, এর সঙ্গে আমাদের সীমান্তের সম্পর্ক কী? বা সীমান্তের আলোচনায় এর যৌক্তিকতাই কতোটুকু?

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান খুবই স্পর্শকাতর। মাওবাদী অধ্যূষিত এলাকাগুলির সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত খুবই কাছাকাছি। এছাড়া উলফাসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা-কর্মী গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য এ-দেশে অবস্থান করছে এবং এখান থেকেই দলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়-এমন অভিযোগ ভারত বরাবরই করে। সেই সঙ্গে ‘ভারত এই আন্দোলনের সাথে বাংলাদেশকে জড়ানোর চেষ্টা করছে। কিছুদিন আগে ভারতের স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ভারতের মাওবাদীরা বাংলাদেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র পেয়ে থাকতে পারে।’২ পাঠক, এ-জন্যই হয়তো কাঁটাতার ঘেরা সীমান্ত এতোটা ভয়ানক হয়ে ওঠেছে। ভারত নিশ্চিত যে আমরাই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লালন-পালন করছি। তাই তারা সীমান্তে যাকেই দেখে তাকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবতে শুরু করে। এ-কারণেই যাকে খুশি তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সম্ভবত ফেলানীকে মেরে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সতর্ক করা হয়, ভয় দেখানো হয়। সীমান্তে ফেলানীর লাশ হয়ে ওঠে ভয় দেখানোর সতর্ক নিশানা। একইভাবে ভিন্ন জুজুর ভয় দেখিয়ে হত্যা চলে ভারত-পাকিস্তান, পাকিস্তান-আফগানিস্তান, আমেরিকা-মেক্সিকো, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি, চীন-তিব্বত সীমান্তে। সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের ফ্যারে পরে নিহত হয় হাজারো ফেলানী।

কিছুদিন আগে বিবিসি রেডিও-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএসএফ প্রধান ইউ কে বনশাল বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানো বন্ধ হবে না এবং সীমান্তে পুরোপুরি গুলি চালানো বন্ধ করা সম্ভবও নয়। আর  যতোক্ষণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অপরাধমূলক কাজ হতে থাকবে, ততোক্ষণ সেই অপরাধ আটকাতেই হবে বিএসএফকে। সেটিই এই বাহিনীর দায়িত্ব।’৩ এই ‘অপরাধ’ কিন্তু সাধারণ অপরাধ নয়, বিএসএফ-এর সংজ্ঞায়িত। তাই আমরা কাঁটাতার- দেখি নিশ্ছিদ্র ‘নিরাপত্তা’র কথা বলে সীমান্ত ঘেঁষে সবসময় সেনাবাহিনীর সাজোয়া যানগুলি দাপিয়ে বেড়ায়। যাতে তাদের ঘরের শত্রু ওই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কোনোভাবেই বেপরোয়া হয়ে না উঠতে পারে। তেমনি প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের নিরীহ মানুষগুলোকে হত্যা করে আমাদের শাসায়; তাদের ভাষায়, আমাদের দেশে থাকা তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয় দেখায়। তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করে। মাঝখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নিরীহ এই মানুষগুলো হয়ে ওঠে বলির পাঠা।

কাঁটাতার- একটি দৃশ্যে অনন্ত উকিলের কথোপকথনটি এমন-

উকিল: এই সমস্ত মেয়েরা পয়সার লোভে গাঁয়ের খবর দেশের বাইরে পাচার করে দেয়। জানিস? দেখছিস তো গাঁয়ের হালচাল।

অনন্ত: কিন্তু আমাদের সাথে থেকে ও দেশের কী-এমন খবর জোগাড় করবে। আমরাই তো দেশের আধ্যেক খবর জানি না।

উকিল: এই বোকার মতন কথা বলিস না। কোথায় কোন্‌ লডঘট্টা বাদিয়ে তোর এখানে এসেছে তুই জানিস?

অনন্ত: আমরা এখন তাহলে কী করবো?

উকিল: কী আবার করবি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে এখান থেকে তাড়া, না হলে কিন্তু পুলিশের খপ্পরে পড়ে যাবি। এ আমি বলে যাচ্ছি।

অনন্ত: এরমধ্যে আমাদের দোষ কোথায়?

উকিল: বাহ, তোমরা একজন  সন্ত্রাসবাদীকে আশ্রয় দিয়েছো। এখন আবার বলছো আমাদের দোষ কোথায়।

পুরো কাঁটাতার- দেখা যায়, আইনের লোকজন নারীদের অন্য চোখে দেখছে। সন্দেহ করছে, তারা দেশের জন্য ক্ষতিকর। এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় ভিন্ন জায়গায়। রাষ্ট্র দাবি করছে, নারীরা বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার। অরুন্ধতী রায় এর ব্যাখ্যা করেন অন্যভাবে, তার ভাষায়, ‘...দেখলাম, সশস্ত্র ক্যাডারদের অর্ধেকেই মহিলা। এর একটা বড় কারণ, ৩০ বছর মাওবাদীরা এখানে কাজ করছে নারীদের সঙ্গে। সেখানে মহিলা সংগঠনের সদস্য ৯০ হাজার। বোধহয়, এটাই ভারতে সর্ববৃহৎ নারীবাদী সংগঠন। এখন সে ৯০ হাজারের সবাই নিশ্চিতভাবেই মাওবাদী। অপরদিকে সরকার নিজেই নিজেকে ক্ষমতা দিয়েছে দেখামাত্র গুলির। তা হলে, তারা কি এই ৯০ হাজারকে গুলি করবে?’৪ অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত এই নারীদের রাষ্ট্র যে-চোখে দেখে বা মনে করে ঠিক তারই প্রতিফলন আমরা কাঁটাতার- দেখতে পাই। তাইতো চম্পা, সুধাদের বারবার সন্ত্রাসী ভাবা হয়।ফলে তারা তাদের শরীরও রক্ষা করতে পারে না, গ্রেফতার আতঙ্কে ভোগে। পুলিশ এসে ঠিকই ধরে নিয়ে যায়। সম্ভবত নিশ্চিতভাবেই (মাওবাদী নারীদের ক্ষেত্রে ভারতের সাম্প্রতিক প্রবণতা তাই বলে) বলা যায়, সেখানে প্রথমে সে ধর্ষিত হবে, পরে হবে হত্যা। এই দেশে-দেশে সীমান্তগামী নারীর জীবন।


সীমানা বনাম নিরন্ন-বিপন্ন মানুষের আকুতি

মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী আরাকান রাজ্যে চলছে রোহিঙ্গা নিধন ‘উৎসব’। সেই ভয়ে রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে নিকট সীমান্ত বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথৈ সাগর পাড়ি দিয়ে করুণা ভিক্ষা করে তারা বলছে, ‘ভাসা পথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে হে সভ্যতা। আমরা সাতভাই চম্পা মাতৃকাচিহ্ন কপালে এসে ঠেকেছি এই বিপাকে-পরিণামে। আমাদের কোলে-কাঁখে শিশু, ঘরপোড়া কাঠে কালো কালো যিশু। দরিয়া কিনারে আজ  দুঃখ অথৈ, করজোড়ে বলি, গ্রহণ করো রহম করো ভাই। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের চোখে উটকো ঝামেলা আর  মিয়ানমারের কাছে বহিরাগত ‘বাঙালি’। মিয়ানমারে তারা ঘৃণিত বাংলাদেশে তারা পরিত্যক্ত।’৫ এ-আকুতি সমুদ্রের জলে ভাসতে থাকা নিরন্ন, বিপন্ন মানুষের আকুতি। বাঁচার জন্য তাদের এই প্রাণভিক্ষার আকুলতা। এ যেনো আমাদের দেশের কারও বোন, কারও মা, কারও স্ত্রী যারা সীমান্তের ওপারের ভারতের কাছে পতিতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী। আমরা কাঁটাতারে দেখি, রুখসানা দেশ ছেড়ে ওপারে যায়। এ-দেশে সে মুসলমান ওই দেশে সে হিন্দু, রুখসানার বদলে চম্পা। আর সংসারী পিরানী হয়ে ওঠে দেহ-বিতরণকারী সুধা।

এভাবেই সীমান্ত পরিচয় বদলের রাজনীতিতে মেতে ওঠে। আজ   নাফ নদীর সীমান্তে মানবতা প্রতিরোধের সুশৃঙ্খল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে না পারে। কারণ আমাদের রাষ্ট্রই হয়তো এদেরও বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবতে শুরু করেছে। এরপরও যদি কেউ পালিয়ে আসতে পারে তাদের মধ্য থেকেই কোনো রোহিঙ্গা ‘রুখসানা’ হয়তো এদেশে হবে ‘চম্পা’। কোনো রোহিঙ্গা ‘পিরানী’ হয়তো পতিতা ‘সুধা’ হয়ে ওঠবে। আর এভাবেই বদলে যাওয়ার দেশ হয়ে ওঠে সীমান্ত। ভালোই হতো যদি পিরানীরা পিরানীই আর  রুখসানারা রুখসানাই থাকতো; ভাসতে থাকা রোহিঙ্গারা পেতো একটু আশ্রয়। কারণ মানবতার তো আর  দেশ, কাল, ধর্ম নেই।


-ব্যবসায় সবার ভাগ আছে

কাঁটাতার-  চোরাকারবারী মজিদের সংলাপ, ‘টাকার কোনো দেশ নেই। ওপার-এপার নেই। জামিন হবে না কেনো? এ-ব্যবসায় সবার ভাগ আছে।’ পাঠক, হ্যাঁ এ-ব্যবসায় সবার ভাগ আছে। ভাগ আছে মজিদের, ভাগ আছে রাষ্ট্রের, আছে সীমান্তরক্ষকের, এমনকি জেলখানার দারোয়ানেরও। এ-জন্যই সীমান্ত নামক টাকার রাজ্যের দরজায় সবাই ওৎ পেতে থাকে। তারা টাকার জন্য ভুলে যায় মানবিকতা, ভুলে যায় মানুষের ওপর মানুষের কর্তব্য। সর্বোপরি, টাকাই এখানে ঈশ্বরের ঈশ্বর হয়ে ওঠে।

‘চোরাচালানকে ঘিরে সীমান্ত এলাকায় রয়েছে একাধিক পণ্যভিত্তিক গ্রুপ। সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপটি স্বর্ণ হেরোইন ও অস্ত্র ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। দ্বিতীয়টি ভারতে তৈরী আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা তৈরীর সরঞ্জাম, মদ-ফেনসিডিল ও সাইকেল চোরাচালানে জড়িত। আর  তৃতীয়টি ভারতীয় গরু, প্রসাধনী, শাড়ী, ছিট কাপড়, চিনি প্রভৃতির সাথে জড়িত।’৬ পাঠক, এখানে চোরাচালানের প্রথম ও দ্বিতীয় ধরনটির সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের বড়ো বড়ো মাথা সরাসরি জড়িত। তাই এ-নিয়ে কথা বলছি না। আমাদের আগ্রহের জায়গা তৃতীয় ধরনটি যেখানে সম্পৃক্ততা একেবারে প্রান্তিক মানুষের। আমরা দেখি, সীমান্তে যতো হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনের ঘটনা ঘটে সবগুলোতেই তৃতীয় ওই ছিন্নমূল ছিঁচকে চোরাকারবারীরা শিকার হন। মূলত এরা বেঁচে থাকার জন্য যে-অল্প পয়সার বাণিজ্য করে, তা রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। কিন্তু রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি খেলা করে এদের নিয়েই।

মজিদ নামের চোরাকারবারীকে সীমান্তরক্ষী বারবার ধরে, আর টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। আর  এরাই কখনও কখনও দুই রাষ্ট্রের সংঘাতের কারণ হয়ে ওঠে। এদের নিয়েই গলাবাজি হয়, রাজায় রাজায় সভা হয়। আবার এদেরকেই প্রয়োজনে করে ফেলে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী। মজিদকে দেখতে সুধা থানায় গেলে পুলিশ ও মজিদের সঙ্গে তার কথা হয়। মজিদ বোঝে সে রাষ্ট্রের ফ্যারে পড়ে যাচ্ছে।

তাইতো সুধার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে মজিদ বলে, ‘মনে হয় ওদের কোনো মতলব আছে, বড়ো কিছুতে ফাঁসাতে চাইছে আমাকে।’ কাঁটাতার- আমরা কোনো বড়ো চোরাকারবারিকে দেখতে পাই না, যারা অস্ত্রের সঙ্গে, মাদকদ্রব্য বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। বাপ্পাদিত্য হয়তো নিজেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন আমরা তাদের স্বরুপ উন্মোচন করলেও লাভ নেই। তাদের নাগাল পাওয়া বা কদমবুচি করার মতো ক্ষমতা কারও নেই, এমনকি রাষ্ট্রেরও।


আধুনিক রাষ্ট্রের রক্ষাকবজ সেনাবাহিনী

আধুনিক রাষ্ট্রের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় মনে করা হয় সেনাবাহিনীকে। রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতেই সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে। এখন এই বিশেষ বাহিনীরও বিশেষ কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকে। সুতরাং তাদের তৃষ্ণা নিবারণের দায়িত্বও এসে পড়ে রাষ্ট্রের ওপর। এ-জন্য রাষ্ট্র তাদের প্রয়োজনমতো তুষ্টির ব্যবস্থা করে। রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্ট অংশের ভোগ-দখলের অধিকার দেয়। বিনিময়ে রাষ্ট্র চায় তার বিধিবদ্ধ সার্বভৌমত্বের শক্তিশালীকরণ। যেমনটি আমরা দেখি দিনের পর দিন সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে, সীমানা দখল করে। এ-দ্বারা একদিকে রাষ্ট্র নিশ্চিত হয়, তার সার্বভৌমত্ব নিরাপত্তার প্রশ্নে। অন্যদিকে গরীব প্রতিবেশীকে বগলদাবা করার আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের পথও উন্মুক্ত হয়।

কাঁটাতার- সেনাবাহিনী রাতের আঁধারে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নারীদের ধরে নির্যাতন, অপহরণ করে। আবার স্থায়ী বন্দোবস্তের জন্যও গাড়িতে করে তাদের জন্য পতিতা নিয়ে আসা হয়। এ-বিষয় নিয়ে অনন্তের সঙ্গে  উকিলের কথোপকথন এমন-

উকিল: সৈন্যদের রক্ত গরম। এই মেয়েগুলিকে এই জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। হয়তো পলাশপুরের বাকি মেয়েদেরও লাগতে পারে। তবে যুদ্ধ লাগলে এ-দেশেরগুলি ছেড়ে তখন ওই দেশেরগুলি ধরবে।

অনন্ত: যুদ্ধমানে কী এই...।

পাঠক, মনে করে দেখুন একাত্তরের দিনগুলির কথা। তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের এভাবেই ক্ষুধা নিবারণের আইনি বৈধতা দিয়েছিলো তাদের রাষ্ট্র; আর  এতে সহযোগিতা করেছিলো এ-দেশিয় দোসররা। আর  এ-থেকে বোঝা যায় রাষ্ট্রের সঙ্গে সেনাবাহিনীর, সেনাবাহিনীর সঙ্গে নারী তথা নাগরিকের সম্পর্ক।


সতী থেকে পতিতা  

পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে নারীর অবস্থান আলাদা করে বলার অবকাশ নেই। নারী ভোগের বস্তু, সেবার সামগ্রী, তা যদি স্থির হয় তাহলে তাকে ইচ্ছেমতো ‘চেটেপুটে’ খাওয়া যায়-পুরুষ এটিই চায়। রাষ্ট্র যেহেতু এক  অর্থে পুরুষ কর্তৃত্বাধীন সেহেতু নারী তার চোখে নাগরিকের বাইরেও অন্যকিছু। রাষ্ট্রের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে বঞ্চনা নিয়ে যখন বেঁচে থাকার সংগ্রামে নারী আশ্রয় নেয় সীমান্তে; তখন তার ওপর নেমে আসে সীমান্ত নামক অঘোষিত ‘রাষ্ট্র’-এর অলিখিত আইন -কানুন। সিধু কন্ডাকটার পিরানীকে বলে, ‘তোর শরীরই আমার ঠিকানা।’ আবার উকিলের কাছে সাহায্য চাইতে গেলেও রুখসানা খাতুনকে আগে টাকা দিতে হয়। নিজ রাষ্ট্র থেকে নির্যাতিত, বিতাড়িত এই নারীরা পেটের দায়ে, মাথাগোঁজার জন্য পুরুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আশ্রয় খুঁজে ফেরে। সে-জন্য তাকে পুরুষের মনের মতো করে চলতে হয়; কখনও ধর্ম পরিবর্তন করে, কখনও নাম পরিবর্তন করে নিরেট মুখোশ বদলিয়ে। এ-যেনো নির্মমতার মঞ্চে জীবন বাঁচানোর অভিনয় করে বেড়ানো।

খেয়াল করার বিষয় হলো, পুরুষ যখন সীমান্তে সমস্যায় পড়ে, তখন হয় সে অর্থ দিয়ে ছাড় পেয়ে যায় কিংবা তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিপরীতে সীমান্তের গোলাগুলিতে নিহতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা নগণ্য। তার মানে কি এর সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ততা কম? মোটেও না। কারণ সীমান্তে আক্রান্ত নারীদের ওইভাবে হত্যা করা হয় না। তারা হয়ে ওঠেন সেই নারী যাদের স্থির পণ্য করে ভোগ করা হয় দিনের পর দিন, তারা নিহত হন ভিন্ন এক পৃথিবীর মানুষ হওয়ার মাধ্যমে।

কাঁটাতার-এর সুধা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের একজন  সুধা নয়। তার অবস্থা বিশ্বের যেকোনো সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী সুধার মতন। বিনোদের কাছে সুধার জবানিতেই যার প্রমাণ মেলে, ‘অভাব মানুষের নাম পাল্টে দেয়, জাত পাল্টে দেয়।’ শুধুমাত্র একটি পরিচয়ের জন্য, একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সুধা, পিরানী, রুখসানা, হালিমা আরও  ভিন্ন নামে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। সে যে পুরুষের কাছে যায়, সেই পুরুষের মনের স্রোতের অনুকূলে তাকে দাঁড় টানতে হয়। হয়তো এভাবেই চলতে থাকে।


লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে বেসকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা- বার্তাকক্ষ সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

mostafizgony@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. রায়, অরুন্ধতী (২০১০ : ২৫); ‘পাহাড়ি জঙ্গলে কমরেডদের সাথে’; ভারতে মাওবাদের উত্থান; সম্পাদনা-আনাম, আলফাজ ও মেহেদী হাসান; সংবাদ, ঢাকা।

২. রায়, অরুন্ধতী (২০১০ : ৭); ভারতে মাওবাদের উত্থান; সম্পাদনা-আনাম, আলফাজ ও মেহেদী হাসান; সংবাদ, ঢাকা।

৩. ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২, বিবিসি রেডিও-কে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া।

৪. রায়, অরুন্ধতী (২০১০ : ৭৮); ‘মাওবাদীরা হলো সশস্ত্র গান্ধীবাদী’; ভারতে মাওবাদের উত্থান; সম্পাদনা-আনাম, আলফাজ ও মেহেদী হাসান; সংবাদ, ঢাকা।

৫. ওয়াসিফ, ফারুক; ‘দরিয়া কিনারে আজ   দুঃখ অথৈ’; প্রথম আলো, ১৬ জুন ২০১২।

৬. http://www.banglanews24.com/detailnews.php?nssI=fd9dcf1d14627bb05c490d790b6a52&nttl=201007253498

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন