Magic Lanthon

               

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির ও রবিউল ইসলাম বাবু

প্রকাশিত ১৭ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘রোদের আলোকে চাঁদ বলে মনে হয়’

পুরুষতন্ত্রের দখলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের গান

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির ও রবিউল ইসলাম বাবু


রাজলক্ষ্মীর অভিশাপের জীবন। তার গানের সুরে, নাচের মুদ্রায় অভিমান আর অনুতাপের আভাস। সেই অবুঝ প্রেমের বয়সে যার গলায় বঁইচির মালা পড়িয়েছিলো, এই বাইজি জীবনের সব একান্ত সময়ে মনে-প্রাণে ছিলো তার দেবতুল্য ছবি। জীবনের যতো সুরসাধনা, নৃত্যকলা, রূপের খ্যাতি, তার চেয়েও বড়ো সাধনার নাম শ্রীকান্ত। সেই পুরুষের পায়ে মুখ রেখে, চোখ তুলে তার মুখের দিকে চেয়ে সেই সাধনাকে পূজার নামান্তর করে সে প্রকাশ করে-

 শত জনমের স্বপ্ন তুমি

আমার জীবনে এলে,

 শত সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে।

এই গানের কথা আর সুরে তাল মিলিয়ে শ্রীকান্তের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পড়ে। আরতি নাচের ঢঙে পবিত্র প্রেমের নিবেদন করে রাজলক্ষ্মী। গানের সুর অসাধারণ মায়াময়। একজন নারীর প্রেমের নিবেদন, মায়া, নির্ভরশীলতা, সাধনা,স্বপ্ন, আরতি, পূজার মতো নৈবেদ্য আমাদের কানে মধুর শোনায়। যতো নরম, যতো মিহি, যতো নিবেদন থাকে মেয়ে কণ্ঠের গানে, আমরা ততো বেশি সৌন্দর্যের স্বীকৃতি দেই। যতো মিষ্টি করে গাওয়া সম্ভব শিল্পী গেয়েছেন। সুরের মাধুর্য অস্বীকার করা অসম্ভব। গীতিকার এমন একটা গান লিখেছেন কাহিনীর প্রয়োজনে! রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত চলচ্চিত্রের কাহিনীতে রাজলক্ষ্মীর অবস্থান এমনই, কারণ শরৎচন্দ্র তার শ্রীকান্ত উপন্যাসে রাজলক্ষ্মীকে এভাবেই দেখিয়েছেন। তিনি তো উপন্যাসিক। একজন সফল কাহিনী রচয়িতা হিসেবে তৎকালীন সমাজের মোটামুটি সত্যিকারের অবস্থা তিনি তুলে ধরবেন এমনই স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রভাব বলে একটা ব্যাপার থাকে। সমাজের, মানুষের জীবনের প্রভাবে যেমন চলচ্চিত্র বা চলচ্চিত্রের গানের সৃষ্টি, তেমনি এই গানগুলোও তো কোনো না কোনোভাবে সমাজকে, মানুষের মন, বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায় মুখ মুখোশ। ৫০ পরবর্তী চার দশক ছিলো বাংলা চলচ্চিত্রের গানের দাপুটে যুগ। ৬০, ৭০, ৮০ আর ৯০ দশকে অনেক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। অতি উৎসাহীরা রেডিও শুনে লিখে ফেলতো গানের কথা। আর তখনকার শ্রোতাদের একটা বড়ো অংশ ছিলো নারী। এটুকু অনুমান করা মনে হয় অন্যায় নয় যে-সাবিনা ইয়াসমীনের জননন্দিত কণ্ঠে যখন ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই, আমি মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো জোছনা ঝরিয়ে যাই’ এর মতো আত্মত্যাগী গান সুন্দর সুরে বাজতো, অসংখ্য সাধারণ মেয়ে তাদের নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া বা ঘটতে যাওয়া ক্ষতিকর ত্যাগকে বরণ করার জন্য একধরনের অনুপ্রেরণা পেতো। পিয়ানোয় হাতরাখা শাবানার স্নিগ্ধ রূপ আর সহ্য করার ক্ষমতা দেখে অনেক মেয়েই তাদের অধিকার হয়তো ভুলে যেতো, হয়তো অনেকেরই মনের কথা হয়ে যেতো, ‘আমি নীরবে ভালো যে বেসে নিজেকে পোড়াতে চাই।’

উল্লিখিত দুটি গানেরই গায়কী, সুর, সঙ্গীতায়োজন মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো, জনপ্রিয় এবং জাতীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।মানুষ তাই গানগুলো মনভরে শুনলো, ভালো গান ভালোবাসলো; করে নিলো আপন। সমাজের, জীবনের, সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে থাকলো গানগুলো। কিন্তু এর বাইরেও কি কিছু থাকা উচিত ছিলো না? ‘একথা অস্বীকার করতে বাধা নেই যে, এটাই বাস্তব, সমাজের জন্য চরম সত্য। কিন্তু চলচ্চিত্রের কাজ কেবল বাস্তবতা তুলে ধরাই নয়; বিকল্প বাস্তবতা কিংবা বাস্তবতার যথার্থতা মূল্যায়ন।’

২.

বাঙালির একটা বিশাল আয়তনের আর মহাগর্বের ঐতিহ্য আছে। এই ঐতিহ্যের জগতে এখনও পুরনো মুনি-ঋষির বিদেহী আত্মা বাস করে। মধ্যযুগের কবিগণ, বঙ্কিমবাবু, শরৎচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এখনও কথা বলেন। মহাভারত, রামায়ণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কোরান, মুসলিম শরীফ, বিষাদসিন্ধু-এই গ্রন্থগুলো আমাদের বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যের অনেক বড়ো একটা অংশ নির্ধারণ করে দেয়।

ঐতিহ্য ধারণ করা, স্মরণে রাখা সাধারণ অর্থে ক্ষতিকর বা নিন্দনীয় হতে পারে না। কিন্তু যখন নিজস্ব সংস্কৃতিতে বিশ্বাস মানেই দাঁড়ায় যে অতীতের সামাজিক নিয়মগুলো কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়, তখন সেই ঐতিহ্য ধারণের অন্য নাম গোঁড়ামি। ধর্মীয় গোঁড়ামির সহযোগী, অনেকসময় তার চেয়েও মারাত্মক হলো আমাদের বাঙালি-প্রতিক্রিয়াশীলতা। এককথায় বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যে আমরা অধিকাংশ মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করি। চোখে দেখি, কান পেতে শুনি-দুনিয়ার অনেক জায়গায় বিশাল সব পরিবর্তন ঘটে। আমরা কিছু পরিবর্তনে বাহ্‌বা দেই, উচ্ছ্বাস দেখাই। আবার অনেক পরিবর্তনে ‘ছিঃ ছিঃ’ করি। বাঙালির নাক উঁচু স্বাভাব সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় লৈঙ্গিক ব্যবস্থার কোনো বড়ো রকমের বিবর্তনে। নারীর জীবনধারণের রীতিনীতির প্রশ্নে অধিকাংশ বাঙালি (এমনকি উচ্চশিক্ষিত ও প্রচলিত অর্থে আধুনিক) পুরুষের চিন্তাভাবনায় এখনও কাজ করে বহু যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্য আর সংস্কার।

সেই প্রাচীন যুগে বিভিন্ন কাব্যে বা ধর্মীয় গ্রন্থে নারীদের মনে করা হতো-পুরুষের চেয়ে সবক্ষেত্রে অধম, পুরুষের নিয়ন্ত্রাণাধীন, মুখাপেক্ষী। হিন্দু ঋষিরা আর বাইবেলের সন্তরা এ-বিষয়ে (নারীর অধ-অবস্থান) একমত ; নারীকে তারা বিন্যস্ত করেছেন শিশু আর উন্মাদের শ্রেণীতে। মনুর [৯:৩] বিধানে নারী চিরস্বাধিকারহীন অসহায় শিশু; ‘নারীকে কুমারীকালে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা করবে, নারী কখনওই স্বাধীন থাকার যোগ্য নয়।’ বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের বাংলা চলচ্চিত্রেও আমরা এর খুব বেশি পরিবর্তন বা ব্যতিক্রম দেখি না। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া মধুমিলন ছবির ফেরদৌসি রহমানের কণ্ঠের শ্রোতাপ্রিয় একটি গানে নারীর অসহায় দশা আর পুরুষমুখাপেক্ষিতা ফুটে উঠেছে এভাবে,

কথা বলো না-বলো ওগো বন্ধু

ছায়া হয়ে তবু পাশে রইবো।

আমি অভাগিনী

শুধু যে তোমারই

যতোই ব্যাথা দেবে সইবো।

ইসলামের তখন পূর্ণ বিকাশকাল। ১০৭৭ বা ’৭৮ সালে তদানীন্তন পারস্যের জিলান প্রদেশের এক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন বড়ো পীর খ্যাত ইসলাম-প্রচারক আব্দুল কাদের জিলানী। তার মায়ের জীবনধারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কিংবদন্তির প্রচলন আছে আমাদের বাঙালি মুসলিম সমাজে। ধারণা করা হয় অবরোধবাসিনী এই পতিব্রতা নারী কোনোদিন ঘরের বাহির হননি। আমাদের মুসলমান নারীদেরকে এক সময় সেই শিক্ষাই দেওয়া হতো (বা এখনও দেওয়া হয়)। একটা সময় ঘরের বাহির তারা হতে পারতো না। এই অবস্থার অনেকখানি পরিবর্তন হলেও নারীর স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রবল বিপত্তি হয়ে অনেক ধর্মীয় সংস্কার এখনও আমাদের মাঝে প্রকট। ধর্মে উল্লেখ নাই, অথচ ধর্মের রীতি বলে মানা হয়, এমন ভুল বিশ্বাসও অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমাদের ঢাকার সিনেমার গানে এসেছে। কবরী অভিনীত আরাধনা ছবিতে ব্যবহৃত হয় শাম্মী আখতারের গাওয়া, ‘আমি তোমার বধূ, তুমি আমার স্বামী / খোদার পরেই তোমায় আমি বড়ো বলে জানি’ গানটি। সৃষ্টিকর্তার পরেই স্বামীর সম্মান এই ধরনের কোনো ক্রমাবস্থান কোরানে নেই, শুদ্ধ হাদিস সংরক্ষণকারীরা কখনও এমন কথা উল্লেখ করেননি। অথচ আরাধনা ছবিতে স্ত্রীর প্রেমের গাঢ়ত্ব, অবুঝ নিবেদনের গভীরতা বোঝানোর জন্য গানের এমন কথার তেমন প্রয়োজন ছিলো না। গানটি জনপ্রিয় হয়েছে হয়তো সুরের জন্যে, কিন্তু কথাগুলো নিশ্চয়ই অনেকের মনে গেঁথে গেছে, অনেকের কাছেই সত্য এবং মান্য বলে মনে হয়েছে।

বাঙালি প্রগতির সবচেয়ে বড়ো আদর্শ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; তিনি তার কবিতা, গান, গল্প, নাটক, উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে, বাঙালির জীবনকে জাতে তুলেছেন, সম্মানিত করেছেন, অনেককিছু চিনিয়েছেন, জানিয়েছেন। কোনো মতামত প্রমাণের জন্য রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃত করলে তাই আমাদের অধিকাংশেরই আর তেমন কোনো সন্দেহ জাগে না। দেশপ্রেম, প্রার্থনা, আত্মত্যাগ, আত্মবিশ্বাস, রোমান্টিক প্রেম ইত্যাদি বিষয়ে অসামান্য দার্শনিক সেই কবিগুরুও তার শক্তিশালী কলমে লিখলেন, প্রচার করলেন ভারতীয় নারীর সুখের রূপকথা-‘আমরা তো দেখতে পাই আমাদের দেশের মেয়েরা তাঁদের সুগোল কোমল দুটি বাহুতে দু-গাছি বালা প’রে সিঁথের মাঝখানটিতে সিঁদুরের রেখা কেটে সদাপ্রসন্ন মুখে...কখনো কখনো অভিমানের অশ্রুজলে তাঁদের নয়নপল্লব আর্দ্র হয়ে আসে, কখনো-বা ভালবাসার গুরুতর অত্যাচারে তাঁদের সরল সুন্দর সুখশ্রী ধৈর্যগম্ভীর সকরুণ বিষাদে ম্লানকান্তি ধারণ করে;...যা হোক, আমাদের গৃহলক্ষ্মীদের নিয়ে আমরা তো বেশ সুখে আছি এবং তাঁরা যে বড়ো অসুখে আছেন এমনতরো আমাদের কাছে তো কখনো প্রকাশ করেন নি, মাঝের থেকে সহস্র ক্রোশ দূরে লোকের অনর্থক হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায় কেন।’

আমরা রবীন্দ্রনাথে অনেক বেশি বিশ্বাস রাখি। ঢাকার চলচ্চিত্রের গানের গীতিকারেরা তার রোমান্টিসিজম, কল্পনাশক্তির কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তাই গৃহলক্ষ্মী, পুত্রবধূ, সহধর্মিনী, রজনীগন্ধা, বধূ-বিদায় প্রভৃতি চলচ্চিত্রের গানে রবীন্দ্রনাথের কথার প্রতিধ্বনি ওঠে। আমাদের নারীরা চোখের জলে ভিজে ভিজে ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেয়। তারা স্বামী আর সংসারের সুখের জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দেয়। কাহিনী জনপ্রিয় হয়। কাহিনীর সঙ্গে মেলানো রোমান্টিক আর মন ভুলানো গানে বাহ্‌বা পড়ে। গানের কথায় যে নারী মনের দুঃখ আছে, যন্ত্রণার দাগ আছে আমরা ভুলে যাই। সাবিনা ইয়াসমীন তাই কান্নাভেজা কণ্ঠে ‘দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক/ নিন্দা আমার প্রেম উপহার, সাতনরী হার কলঙ্ক’ গাইলেও বাস্তবের মা-বোন-স্ত্রী-পুত্রবধূ-ভাবি-মাসি-পিসিদের দুর্দশা আমাদের চোখে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথের মতো আমরা সেসব অবহেলা করি। মনে করি, হয়তো, এমন কষ্ট একটা মেয়ের জন্যে বড়োই স্বাভাবিক। বাহ! কী সুন্দর মিষ্টি দুঃখের গান, তারা তবুও গাইতে জানে।

৩.

‘... in our tradition bound society–women need to uphold the cultural traditions…like wear the Indian type of dress, visit temples, conduct poojas, maintain relationships with family (both own and in-laws), but men can generally do whatever they want... Bollywood tries to uphold some sort of unrealistic and artificial 'ideal' which unfortunately can be used as a stick to beat women with in real life.’

নিতা কুলকার্নি নির্দিষ্টভাবে হিন্দি প্রথাগত চলচ্চিত্রের সমালোচনার উদ্দেশ্যে কথাগুলো লিখেছেন তার ব্যক্তিগত ব্লগে। কিন্তু আমরা ঢাকার চলচ্চিত্রেও এর স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। আসলে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া উপমহাদেশের বেশিরভাগ এলাকায় নারী সম্পর্কে সমান মাপের সংস্কার প্রচলিত। তাই করাচি, কলকাতা,মুম্বাই, ঢাকা, খুলনা সবখানেই প্রায় একই চিত্র। এই সব শহরে আদর্শ নারী বলতে বোঝায় লম্বা কালো কেশবতী, লাজুক চোখ, মাথায় বিনয়ের ঘোমটা দেওয়া, কথায়-চলনে যতো বেশি সম্ভব নম্র এবং অপ্রতিবাদী কাউকে। তাই লাহোরের চলচ্চিত্রে জেবা, শবনম, রানিকে আমরা যেভাবে উপস্থাপিত হতে দেখতাম, মুম্বাইয়ের রূপালি পর্দার রেখা, শর্মিলা ঠাকুর বা জয়া ভাদুরি তাদের থেকে খুব আলাদা কেউ ছিলেন না। তেমনি কলকাতার সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবীর চলন-বলন বা পর্দা-উপস্থিতির সঙ্গে গৃহলক্ষ্মী বা রজনীগন্ধা’র শাবানা, আরাধনাআবির্ভাব’র শর্মিলী আর কবরী বা সহধর্মিনী ছবির দিতি কতোখানি আলাদা?

মুম্বাইয়ের ছবির ‘unrealistic and artificial ideal’ (অবাস্তব আর কৃত্রিম নীতিবোধ) যেমন সেখানকার বাস্তব নারীদের পরাজিত জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, ঢাকার চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রের অবমূল্যায়নও তেমনি সারাদেশে একধরনের অসচেতনতা বজায় রাখতে সাহায্য করে অনেকখানি। এখন না-হয় প্লেব্যাক গানের সেই দাপুটে যুগ আর নাই। কিন্তু এমনও সময় ছিলো যখন সাংসারিক, সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্র বাংলা চলচ্চিত্রের কাহিনী, তারকা বা গানের প্রসঙ্গ হামেশা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিশেষ করে ৭০, ৮০’র পুরো দশক আর ৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের গ্রামে বা মফস্বলে চলচ্চিত্রের গানের জনপ্রিয়তা ছিলো অন্য যেকোনো গানের ধারার চেয়ে অনেক বেশি।

ধরুন, ৮০ বা ৯০-এর দশকে বগুড়া বা কুমিল্লার একটা পল্লী-মেয়ে হয়তো রেডিও খুলে আত্মসমর্পণের ভাব, ভক্তি আর আবেগ দিয়ে ঝুমুর ছবিতে রুনা লায়লার গাওয়া ‘তুমি যে আমার প্রেমের অহংকার, নারী জীবনে স্বামী বড়ো অলংকার...প্রেমেরই ছোট্ট একটি ঘর আমায় দাও’ গানটি শুনছে। গানটা তার অসম্ভব ভালো লেগে গেলো। আরও অনেকের মতো কথাগুলো তার মাথায়, মনে সংস্কারের মতো গেঁথে যাওয়া অস্বাভাবিক না। আবার খুরশীদ আলমের বিখ্যাত গান ‘চুমকি চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে?’ শুনে, আমার বেশ ধারণা হয়, অনেক যুবক বা ছাত্র ইভ-টিজিংয়ে উৎসাহিত হয়েছে, গানটির রিমেক শুনে এখনও যেমন হয়।

৪.

গান তো কবিতা থেকে একেবারে আলাদা কিছু না। গীতিকাররা অবশ্যই কবি। তাদের কবিতায় তাল, ছন্দ, মাত্রার প্রাধান্য বেশি। শব্দগুলো হওয়া চাই নরম, সহজে উচ্চারণ করার মতন। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল মনে হয় এ-যাবৎ সবচেয়ে বেশি বাংলা গান রচনা করে গেছেন। কবিতা আর গানের মিল যে কতোখানি তা তাদের লেখার ধরনে বোঝা যায়। ‘সর্বহারা’ কবিতায় নজরুল লিখলেন,

ব্যথার সাঁতার-পানি-ঘেরা

চোরাবালির চর,

ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস

সেই চরে তোর ঘর?

 

আবার প্রায় একই দৃষ্টিকোণ আর ধরন মেনে ‘একূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ গানে কবি লিখলেন,

‘সেই নদীর ধারে কোন্‌ ভরসায়,

(ওরে বেভুল) বাঁধলি বাসা সুখের আশায়

যখন ধরলো ভাঙন পেলিনে তুই

পারে যাবার ভেলা।

রবীন্দ্রনাথের ‘তোমার সোনার থালায় সাজাবো আজ’ গান, কবিতা দুই-ই। নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গান হিসেবেও যথেষ্ট জনপ্রিয়। রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী সময়ে আধুনিক গান এবং আধুনিক কবিতা নামে দুটি পৃথক ধারার সৃষ্টি হয়। আধুনিক কবিতা প্রথাগত সব নিয়ম ভেঙে ষাট, সত্তর আর আশির দশকে বিপ্লব বলে গণ্য হতে থাকে। ‘আধুনিক বাংলা গান নামে যা চালু হল, তা আধুনিক সাহিত্য বা আধুনিক কবিতার সম্পূর্ণ বিপরীত’। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের গানে কুসংস্কার আর প্রথাগত, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়তে থাকলো ভয়ানকভাবে। শামসুর রাহমান, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, তসলিমা নাসরিন অনেকেই যখন কবিতায় আধুনিক, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র তখন অনেক শক্তিশালী একটা মাধ্যম হয়েও এমন কোনো স্বপ্নের ধারে-কাছে যায়নি। জুলি নামের এক চলচ্চিত্রে দেখানো হয় শবনম প্রথম জীবনে অত্যাচারিত হতে হতে, একটা সময় এসে প্রতিবাদী হয়। একে একে প্রতিশোধ নিতে থাকে। কিন্তু তার পুরো শক্তি আর অনুপ্রেরণা যোগায় একজন পুরুষ। বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নের মতো কোনো স্বাবলম্বী আর স্বাধীন গল্প জুলি বা এই ধরনের অন্য কাহিনীচিত্রগুলোতে পাওয়া যায় না। আবার, বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে পরিচিত আর ব্যবহৃত দৃশ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, একটা মেয়ে প্রায় ধর্ষিত অবস্থায় চিৎকার করছে। হঠাৎ একজন শক্তিমান, ত্রাতা পুরুষের আবির্ভাব এবং মেয়েটার মুক্তি। এর পুনরাবৃত্তি প্রায় অসহ্য রকমের, প্রায় প্রতিটি মূলধারার ছবিতে এসেছে। গানের কথাগুলোও যেনো এই ধরনের সংস্কারের অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কবিদের মতো চলচ্চিত্রের গান রচয়িতারা স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন না। কাহিনীকার, প্রযোজক, পরিচালকের অনেক নির্দেশনা মানতে হয়। প্রতিহিংসা ছবির কাহিনীর প্রয়োজনে প্রযোজক, পরিচালক এমন একটা ডুয়েট গান লিখতে বললেন যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা বিয়ের বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়ার খুশিতে পরস্পর সেটি গাইবে। মিলনের আনন্দ আর অধীর অপেক্ষার কথা জানাবে। সেই মতো গীতিকার লিখলেন। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বৈষম্য-দোষ যাকে বলে, ছেলেটির জন্যে লিখলেন,

আজ থেকে সারাজীবন

তুমি যে আমার,

পুরোপুরি দখলদারি

পেয়েছি পেয়েছি তোমার।

 

অর্থাৎ, বিয়ে মানে মেয়েটি ছেলের সম্পদ অথবা সম্পত্তি হয়ে যাবে আমরণ। স্ত্রীর দেহ-ইচ্ছা-মন-ধর্ম-কর্ম সবকিছুতেই ‘পুরোপুরি দখলদারি’ করার সামাজিক, ধর্মীয়, পারিবারিক আইনগত অধিকার পায় ছেলেটি। যতো বড়ো, যতো গাঢ় প্রেমিক মন নিয়েই একজন পুরুষ-গীতিকার এমন কথা লিখুন না কেনো, তিনি তার এবং পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজের আজন্মের প্রতিষ্ঠিত গোঁড়ামিকেই সুরের মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের কণ্ঠের মধ্য দিয়ে আরও পোক্ত করতে চেয়েছেন। অথবা তিনি অসচেতনভাবে, গা এলিয়ে লিখেছেন গানখানি। মেয়েকণ্ঠের জন্য তার বরাদ্দ আরও ভয়াবহ। মেয়েটা যেনো এমন অন্যায় দখলদারিত্ব মেনে নিয়েছে। ‘হুকুমজারি হয়েছে শুধু পাওনি অধিকার।’

হতে পারে ঘটতে যাওয়া বিয়ের আনন্দে আমাদের দেশের সাধারণ পুরুষ আর সাধারণ নারীরা এমন করেই প্রকাশ করে। সে-ক্ষেত্রে গানটি বাস্তবমুখী, জীবনমুখী বলে ধরে নেওয়া উচিত। নিলাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিহিংসার মতো অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় মেলোড্রামার গানের ক্ষেত্রে এই বাস্তবমুখিতা কতোখানি জরুরি ছিলো?মূলধারার চলচ্চিত্রে আমরা কতোখানি বাস্তবনির্ভর? চলচ্চিত্রের গানের ক্ষেত্রে তো বাস্তবতার মান প্রায় শূন্য। কারণ, পর্দায় কোনো বাদ্যযন্ত্রের নজির নাই, কিন্তু তবলা, গিটার, বাঁশি, কিবোর্ড, হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজতে থাকে গানের সঙ্গে, বেশ সুরেলা ভাব নিয়ে। দর্শকদের প্রায় সবাই জানে যে, অভিনেতাদের ঠোঁটে তারা যে গান শোনে তা অন্যের গাওয়া। মৌসুমি, দিতি বা ববিতার বেশ মানানসই অভিব্যক্তির পরেও মানুষ রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ ঠিকই ধরে ফেলে। তাহলে গীতিকারেরা যদি বার্তা বা সচেতনতামূলক, বৈষম্যহীন কথা লেখার-স্বার্থে খানিকটা কল্পনাপ্রবণ হন বা বাস্তবের খানিকটা ঘষেমেজে দেখান, তাতে ক্ষতি কী? প্রতিহিংসার গানটা যদি এভাবে শুরু হতো ‘আজ থেকে সারাজীবন দুজন দুজনার/পাশাপাশি পথ চলার পেলাম অধিকার।’ তাহলে মনে হয়, কাহিনীর বিশেষ কোনো ক্ষতি হতো না, সুরও বসানো যেতো আগের মতোই।

চলচ্চিত্রের গীতিকবিরা আধুনিকতা থেকে অনেক দূরের জগতের বাসিন্দা? নাকি তারা কখনও সচেতনভাবে কিছু লেখেননি? তাদের কখনও মনে হয়নি যে, অনেক তো হলো এবার একটা মেয়ের জন্যে লিখি; একটা মেয়ের মুক্তির গান দিয়ে অসংখ্য লিঙ্গ-বৈষম্য দূরে পাঠাই, বনবাসে? হয়তো এমন তাদের কোনোদিন মনে হয়নি। গীতিকারদের সিংহভাগ পুরুষ। তারা চারপাশের ধর্ম, পরিবার, সমাজ, পুরুষের সব সংস্কার, গোঁড়ামিকে আজও হয়তো সর্বোত্তম সত্য বলে মানেন। তারা উদার কবিতার মতো করে ভাবেন না, তারা আধুনিক সাহিত্যের ধারও ধারেন না। চলচ্চিত্র মানেই বাণিজ্য। চলচ্চিত্রের গানও তার অংশ। বাণিজ্যে সফলতার মূল শর্ত জনতার মন ভোলানো। যা চিরায়ত, সবার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, তাকে আবারও উচ্চারণ করা সহজ, নিরাপদ আর ঝুঁকিহীন। জনপ্রিয় বিশ্বাসকে আঘাত করার সাহস দেখানোর মতো লোক আমাদের মূলধারার চলচ্চিত্রে কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবাই ব্যবসা খুঁজেছে, জননন্দিত হওয়ার চেষ্টায় জীবন পার করেছে, মেধার ব্যয় করেছে। কিন্তু ব্যবসার বাইরেও, সহজ বিনোদনের বাইরেও চলচ্চিত্রের একটা বড়ো দায় আছে। সেই দায়িত্ব কেউ পালন করেনি; কোনো পুরুষ-গীতিকার তো নয়ই। শিল্প হিসেবে আমাদের মূলধারার চলচ্চিত্র যতোখানি ব্যর্থ হয়েছে বারবার, চলচ্চিত্রের গানের দোষ ততোখানি, বা তার চেয়েও বেশি। কদাচিৎ শোনা যায় দু-একটা নারীমুক্তির চরণ। কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তা কখনই দাঁড়ায়নি।

নারী গীতিকারেরা যে-কয়টা হাতেগোনা গান লিখেছেন তার মধ্যেও একই রকম পুরুষের আধিপত্য। কবি খোশনূরের লেখা ‘তুই যে আমার মিলন মালারে বন্ধু পিরিতের নকশি সুতায় বেঁধে রাখি, হায় দমে দমে তোরে ডাকি’র মতো গানেও কোনো ধরনের বিদ্রোহের আভাস নাই। বরং নারী-গীতিকারদের লেখা গানগুলোতেও আত্মসমর্পণ ভাব বেশ স্পষ্ট।

৫.

প্রচলিত চলচ্চিত্রে গান ব্যবহারের নির্দিষ্ট কিছু ধরন আছে। পুরুষকণ্ঠের গানের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ধরন হলো নারীর রূপে ব্যাপক মুগ্ধতা প্রকাশ। খুবই জনপ্রিয় আর জীবনঘনিষ্ঠ এই ধারায় রচিত হয়েছে অজস্র গান। পছন্দের নারীর রূপ বর্ণনায় চিরাচরিত রীতির বাইরে তেমন কোনো গান লেখা হয়নি।

রূপ দেখে বলবো কী?

ভাষা খুঁজে পাই না,

ঘরে যদি চাঁদ থাকে

আকাশের চাঁদ চাই না।

যেনো নারীর রূপ সবসময়ই চাঁদের মতো স্নিগ্ধ। তাতে সূর্যের তেজ নাই। চাঁদ-সূর্যের আলো ধার করে জ্বলে থাকে সে। নারীর চোখ, চুল, চিবুক, শরীর কেবল দেখার শোভা, চাঁদের আলোতে যেমন কোনোদিন ধান শুকানো যায় না, বই পড়া দুরূহ। ফকির মজনু শাহ ছবির একটি গানে জাফর ইকবালের কণ্ঠ এমন-

মেঘ কালো, ভ্রমরা কালো,

আরও কালো মাথার চুল,

সেই না কালো লাগে গো ভালো,

নারীর অঙ্গে ফুটলে ফুল।

নারীদেহ পুরুষের চোখে ফুল। শোভা নিয়ে ফুটে থাকে। বাতাসের দোলা ছাড়া একেবারে নিশ্চল, চলে যাওয়ার ক্ষমতা এর নেই, কেবল ঝরে যেতে পারে। আর পুরুষ ভ্রমরের মতো চাইলে যখন-তখন মধু নিয়ে চলে যেতে পারে আরেক ফুলে।

এমন উপমার ফাঁদে বারবার ঘুরপাক খায় আমাদের গানের মূলধারা। কেউ কখনও বলেনি একজন নারীর চোখের মণি কালো ভ্রমরের মতন, নারীর কণ্ঠ ভ্রমরের মতো গুনগুন করে উড়ে এসে পুরুষের ঘুম ভাঙায়। প্রকৃতিকেন্দ্রিক রোমান্টিসিজম আর প্রকৃতির নিয়মের দোহাই দিয়ে যুগের পর যুগ নারী-অপমানের গান নির্দ্বিধায়, আলগোছে লেখা হচ্ছে। আব্দুল আলীম, মাহমুদুন্নবী, আব্দুল জব্বার, খুরশীদ আলম, বশির আহমেদ, এন্ড্রু কিশোর প্রমুখের সুন্দর সুন্দর গলার স্বর ব্যবহার করে নারীর শরীরকে একঘেয়ে সৌন্দর্য বর্ণনায় ক্লিশে করে ফেলা হচ্ছে। ফুল, চাঁদের মতো পরাধীন সবকিছুর সঙ্গে তুলনা করে নারীর মানবজীবনকে অবহেলায় এড়িয়ে যাওয়া, মন ভুলিয়ে দমন করা বেশ সহজ!

৬.

‘পুরুষতন্ত্রের কারণে নারীর ভাবনা মূলত হয়ে পড়ে পুরুষেরই ভাবনা। পুরুষের ভাবনার ছকেই তখন নারীর জীবন আবর্তিত হয়। বিশেষ করে আধুনিক চিন্তা-চেতনার দ্বারা দীক্ষিত নয় যে-নারী, তার পক্ষে কখনই বিকল্প কিছু ভাবা সম্ভব নয়। আমাদের গ্রামীণ নারী এভাবেই পুরুষকে ধ্যানজ্ঞান মনে করেছে। তার ভিতরে গড়ে উঠেছে ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্যের বোধ।’

পুরুষ যখন ‘নারীর অঙ্গে ফুল’ ফুটলে তার বর্ণনায় ঢলে ঢলে পড়ে, নারীর প্রতিক্রিয়া কেমন তখন? ‘মেঘ কালো, ভ্রমরা কালো, আরও কালো মাথার চুল/ সেই না কালো লাগে গো ভালো, নারীর অঙ্গে ফুটলে ফুল।’ এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিক্রিয়া আসে, ‘সেই ফুলের মধু অঙ্গে শুকায় সজনি গো/ বয়েসের ভার মানে না।’ অর্থাৎ পুরুষ গীতিকারেরা নারীকণ্ঠগুলোকে যতোটা সম্ভব নিজেদের কাজে লাগিয়েছেন। অনেকসময় বলা হয়-এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের গানে মেয়েদের আধিপত্য। আসলে ব্যাপারটা সত্যি নয়। পাকিস্তানে নূরজাহান, মালা বেগম; ভারতে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে; আমাদের এখানে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন দশকের পর দশক প্লেব্যাক জগতকে শাসন করেছেন বলে ধরা হয়। কিন্তু রুনা লায়লা বা সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ ছাড়া যখন একটা বাংলা চলচ্চিত্রও মুক্তি পেতো না, তখনও কতোখানি স্বাধীন ছিলেন তারা? এমন কোনো গীতিকার ছিলো না যে তাদের কণ্ঠের সত্যিকারের মর্যাদা দিয়ে একটি-দুটি নারীমুক্তির গান লিখে দিয়েছেন! তারা সারাজীবন এ-দেশের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে গেলেন গানে গানে, দুঃখ-আকুতি তুলে ধরলেন, কিন্তু কতোবার আমরা তাদের দেখলাম পুরুষতান্ত্রিক গানের কথার কাছে হার মানতে? অনেকবার, অজস্রভাবে। একটা গানের খানিক বিস্তারিত কথা শিল্পীর নাম সহযোগে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা মনে হয় অনেকটা বোধগম্য হবে। লাভ ইন সিঙ্গাপুর ছবির গান।

রুনা লায়লা:    ঘরজামাই বানাবো তোমাকে,

পারবে না ফেরাতে আমাকে।

এই সিঙ্গাপুরে সংসার গড়ে দুজনে

থাকব সুখে।

সুবীর নন্দী:     স্বামী মানে হাজব্যান্ড।

                   হাজব্যান্ড মানে ঘরজামাই নয়

                   সোয়ামি হবো। ওগো এবার আমার

                   হাত ধরে চলোনা দেশে।

                   ঘরনি বানাবো তোমাকে।

রুনা লায়লা:    সোয়ামি বানাব তোমাকে।

মানে কী দাঁড়ায়? একটা মেয়ের জন্য ঘরনি হয়ে স্বামীর ঘরে যাওয়া স্বাভাবিক,পবিত্র কাজ। আর যদি একজন পুরুষ ঘরজামাই হয় তার জাত-কুল সবই যায়। এর চেয়ে ডাকাতি বৈষম্য আর কী হতে পারে? অথচ এমন স্পষ্ট বৈষম্যকে বাংলা চলচ্চিত্রের গানের মাধ্যমে বারবার সমর্থন জানানো হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় কণ্ঠগুলো। কোনোদিন কোথাও কোনো প্রতিবাদের ইঙ্গিত উল্লেখযোগ্য রকমে পাওয়া যায়নি। সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে সহস্রবার আত্মসমর্পণের গান তুলে দেওয়া হয়েছে। আপনপর ছবিতে নারীকণ্ঠের প্রতি বৈষম্য, হোক না তা কাহিনীর প্রয়োজনে, একেবারে মারাত্মক। এই ছবিতে বশির আহমেদ আর সাবিনা ইয়াসমীনকে দিয়ে একই সুরের দুটি গান রেকর্ড করা হয়। বশির আহমেদের কণ্ঠে,

পিঞ্জর খুলে দিয়েছি,

যা কিছু কথা ছিলো ভুলে গিয়েছি,

যারে যাবি যদি যা।

অসম্ভব জনপ্রিয় এই গানের সমান্তরাল সুরের আর বিপরীত কথার গানটি সাবিনা ইয়াসমীনের-

পিঞ্জর ছেড়ে যাব না।

দে আঘাত কত দিবি কিছু ক’ব না।

নে রে হার মেনেছি।

শুধু এই গান নয়; সাবিনা ইয়াসমীনের মিষ্টি কণ্ঠকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের অসহায় ভাবের গান অনেক গাওয়ানো হয়েছে। বিরাজ বউ ছবিতে ‘আমার সকল চাওয়া তোমারই কাছে’, নতুন বউ ছবিতে ‘আমি কপালে পরেছি স্বামীর সোহাগী চন্দন’, বন্দিনী ছবিতে ‘ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকোনা... লাজে মরি মরি গো’, জোয়ারভাটায় ‘মন যদি ভেঙে যায়, যাক যাক কিছু বলবো না’, নয়নমনি ছবিতে ‘চুল ধইরো না খোঁপা খুলে যাবে হে নাগর’ এইসব বহুল প্রচলিত আর কিংবদন্তিতুল্য গানগুলো বারবার নারীর অসহায়ত্বের ধারক ও বাহক হিসেবে উঠে এসেছে। যদি বাঙালি সমাজের সত্যিকারের চিত্র হিসেবে ধরি, তাহলে এই গানগুলো নারী মনের দুঃখ-যাতনায় সমবেদনার মতন। কিন্তু এই সমবেদনায় ফল হয় উল্টো। কারণ চলচ্চিত্রের গানের মাধ্যমে ঢালাওভাবে, মিষ্টি কথায়, সুরেলাভাবে এই সমবেদনা প্রকাশ করলে শ্রোতা-পুরুষের চোখ আরও অন্ধ হয়ে যায়, শ্রোতা-নারী আরও সহ্য করার শক্তি নিয়ে আত্মঘাতী মন প্রস্তুত করে।

চলচ্চিত্রের গানের আরেকটি জনপ্রিয় ধারা আছে। কাহিনীর প্রথম দিকে বাজানো হয় গানগুলো। নারীকণ্ঠের গান। গানের মূলভাব, মেয়েটির পক্ষে আর একলা থাকা সম্ভব নয়। একজন পুরুষের অপেক্ষায় তার আর দিন কাটে না, রাত কাটে না। অথবা পছন্দের পুরুষটির কাছে নিজেকে সমর্পণের নানা ছল করে। অসংখ্য চলচ্চিত্রে রুনা লায়লার জন্য লেখা হয়েছে এসব কথার গান। রুনার কণ্ঠের আবেদনময়ী ভাবটাকে ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে পুরুষের তুলনায় নারী অধিক কামুক। নারী তার দেহের ভার বহন করার যোগ্য নয়। মহাভারতের ‘অনুশাসন’ পর্বে ঋষি বলেছেন, ‘স্ত্রীলোক স্বভাবতই রতিপ্রিয়...নিজের অভিলাষ পূরণ করতেই তারা ব্যতিব্যস্ত থাকে।’১০ এতোকাল পরেও সেই মতবাদের প্রতিধ্বনি ওঠে ঢাকার সিনেমার গানগুলোতে। চন্দনদ্বীপের রাজকন্যায় ব্যাকুল নারীকণ্ঠ গায় ‘বসন্তেরই এমন দিনে মনের বাগান খালি, কোথায় গেলে পাবো বলো আমার সুজন মালী রে, একা একা ভালো লাগে না।’ গাড়িয়াল ভাই ছবিতে ‘তুমি কেমন গাড়িয়াল, শুধু টানো পরের মাল, হাতের কাছে থাকতে মানিক রইলা যে কাঙাল’, পাহাড়ি ফুল ছবিতে ‘পাহাড়ি ফুল আমি মৌরাণী, হায় কেউ জানে না, রূপে আছে নেশা, চোখে ছলনা।’

পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষার চেয়ে নারীর যৌন চাহিদাকে অনেক বেশি অশালীন আর বিকৃত দেখানোর জন্য, শিল্প-মানহীন গান তৈরি হতে থাকে। সেই যুগের বাহাদুর ছবিতে ‘রূপে আমার আগুন জ্বলে, যৌবনভরা অঙ্গে, প্রেমের সুধা পান করে যাও, হায়রে আমার দিওয়ানা’ দিয়ে যার শুরু। ৯০ দশকে চলচ্চিত্রের স্থুল-অশ্লীল কাহিনীহীন চিত্রায়ণ যখন ফুলে ফেঁপে ওঠে, বাড়তে থাকে এ-ধরনের গানের সংখ্যা। নারীর স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদাকে, অবহেলায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে, উপস্থাপন করা হতে লাগলো পতিতাবৃত্তির ভাষায়। উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ‘বিচ্ছু আমার গায়ে কামড় দিল রে’, ‘ওরে ও দুষ্টু পানি এখন আমার ভরা জাওয়ানি’, ‘আমার ঘরেতে এলোরে রসেরই নাগর’, ‘কে নেবেরে কে নেবে আমি সোনার চাক্কা’, ‘হে যুবক এদিকে তাকাও’।

একদিকে সাবিনা ইয়াসমীনের নরম কণ্ঠের দোহাই দিয়ে নারীর সব বিদ্রোহ, অধিকারকে জমিয়ে বরফ-শীতল করে দেওয়া, অন্যদিকে রুনা লায়লার কণ্ঠের উচ্ছ্বাস আর আবেদনময়ী ভাব ব্যবহার করে নারীকে কামুক, ছলনাময়ী করে উপস্থাপন করা। কোনোভাবেই পুরুষ গীতিকারের চোখে নারী স্বাভাবিক নয়; তারা আলাদা, অন্যরকম; আকর্ষণীয় কিন্তু ছলনাময়ী। ধৈর্যশীল আবার দেহবিলাসী। আশ্চর্য রকমের এক সৃষ্টি যাকে বোঝা দায়। তাই যেমন ইচ্ছা লেখো। তার মনের ভাব জানার দরকার নাই। তার বিলাপে কান দেওয়া অনুচিত। লিখে যাও মন যা চায়। পুরুষ সব পারে। নারীর চিন্তাকে পুরুষের ভাষায় অনুবাদ করতে পারে; নারীর গানকে পাখির গানের মতো শব্দ-বাক্যহীন করে ফেলতে পারে।

 

৭.

‘It is fatal to be a man or woman pure and simple : one must be a woman manly, or a man womanly.’১১

ঢাকাই চলচ্চিত্রের গান হোক বৈচিত্র্যময়। এর সুরে, কথায় সব মানুষই সমানভাবে উঠে আসুক। পুরুষের মতো নারীর ঘুম-স্বপ্নও যেনো গুরুত্ব পায়। নারীর মতো পুরুষের রূপের বর্ণনায়ও যেনো উঠে আসে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, ফুলের ঘ্রাণ। পুরুষের মতো নারীও যেনো কোনো কোনো গানে ভ্রমরের সঙ্গে তুলনা পায়। কোনো গান শুনে যেনো না মনে হয় নারীর দেহ, মন পুরুষের থেকে ভিন্ন, দুর্বোধ্য বা বিকৃত।

বাংলা চলচ্চিত্রের গানে মুক্তির কথা, সাম্যের কথা, সত্যিকারের কবিতার মতো উপযুক্ত কথা যেনো শুনতে পাই। কাহিনীর প্রয়োজনে গান হতে পারে কখনও কখনও খানিকটা পুরুষতন্ত্রের তানে, কিন্তু অন্য কিছু গানও যেনো এর বিরুদ্ধে কথা বলে। যদি প্রতিবাদ না থাকে, একঘেয়ে, একতরফাভাবে গানগুলো গোঁড়া ঐতিহ্য আর অন্ধ পুরুষের আজন্মের সংস্কারকে বারবার, বহুবার ঘোষণা করে যায়, নারী সারাজীবন গানের খাঁচায় পাখি হয়ে ডানা ঝাপটাবে, অভিমানে মরে যাবে তার অধিকারের যতো ফুল। পুরুষ গীতিকারের মনে খানিকটা নারীর মন বাসা বাঁধুক। অনেক নারী গীতিকবির জন্ম হোক খানিকটা পুরুষের আত্মবিশ্বাস নিয়ে। গানে যেনো পাঞ্জাবি আর শাড়ির কথা আসে সমান তালে, মুখজোড়া দাড়ি যেনো চোখে পড়ে ঘন চুলের মতোই। পুরুষের চোখ আর নারীর চোখের শক্তির যেমন কোনো পার্থক্য নেই, তেমনি গান যেনো দুজনেই সমান কানে শোনে।

 

লেখক : আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফ্রিল্যান্স লেখালেখি করেন। রবিউল ইসলাম বাবু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

muktadir137@gmail.com

amribabu@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। http://www.moi.gov.bd

২. মিঠু, মাজিদ; মোহাম্মাদ আলী মানিক; ‘চলচ্চিত্রে মা : সর্বসহা সর্বহারা জননী, তুমি মানুষ হওনি’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদক-কাজী মামুন হায়দার; ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা, জানুয়ারি-২০১২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।

৩. আজাদ, হুমায়ূন (১৯৯২ : ৭২ ); নারী; আগামী, ঢাকা।

৪. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ূন (১৯৯২ : ১২৯)।

৫. Kulkarni, Nita J; 'Portrayal of women in Bollywood then, now and in the past.'

http://nitawriter.wordpress.com/2007/04/25/portrayal-of-women-in-bollywood-then-now-and-in-the-past/

৬. ইসলাম, কাজী নজরুল (১৯৭২ : ৫৫); সঞ্চিতা; মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

৭. ইসলাম, কাজী নজরুল (১৯৯৯ : ৩৩২); নজরুল গীতি : অখণ্ড; হরফ, কলকাতা।

৮. গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল (২০১১ : ২০); রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার; দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা।

৯. মাসুদুজ্জামান; ‘উত্তর-উপনিবেশবাদ, নারীবাদ ও সেলিনা হোসেনের গল্প’, কালি কলম; সম্পাদক-আবুল হাসনাত; চৈত্র ১৪১৮, ঢাকা।

১০. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ূন (১৯৯২ : ৫১)।

১১. Woolf, Virginia (1998 : 108); A Room of One’s Own; Cambridge: Cambridge University Press.

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন