Magic Lanthon

               

কাজী মামুন হায়দার

প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আইজেনস্টাইন, চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ!

কাজী মামুন হায়দার


জন্ম: ১৮৯৮ সালের ২৩ জানুয়ারি

প্রথম ছবি: স্ট্রাইক (১৯২৪)

মৃত্যু: ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সাল

সবচেয়ে আলোচিত ছবি: ব্যাটলশিপ পটেমকিন (১৯২৫)

অবদান: ইনটেলেকচ্যুয়াল মন্তাজ

 

বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু ছেলে হতে চাইলো অন্য কিছু। তাইতো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পাঠ নেওয়ার পরও তার স্বপ্নরাভিড় জমাতে থাকে শিল্পের নবতম শাখা,চলচ্চিত্রে। স্বপ্ন ধরতে পুদভকিনের হাত ধরে ছেলেটি চলচ্চিত্র শিক্ষক লেভ কুলেশভের কাছে গেল। কিন্তু ছাত্র হতে না হতেই শিক্ষক কুলেশভের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারকে তিনি খারিজ করে দেন। শিক্ষক বললেন ‘মন্তাজ’হলো খন্ডাংশের ‘সংযোগ’ছেলেটি বললো ‘না,সংঘর্ষ’। আর সেটাই চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম সৃষ্টি ‘ইনটেলেকচ্যুয়াল মন্তাজ। নবীন ছাত্রের মেধা দেখে কুলেশভ বিস্মিত না হয়ে বললেন,আইজেনস্টাইন,সমস্ত চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে হয়ত তুমিই হবে শ্রেষ্ঠ!

 

কুলেশভের কথার যেটুকু অনিশ্চয়তা ছিল এর বেশ কিছুদিন পর তাও থাকলো না। আইজেনস্টাইন,সের্গেই মিখাইলোভিচ আইজেনস্টাইন ১৯২৫ সালেই তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যাটলশিপ পটেমকিন নির্মাণ করে হয়ে উঠলেন ‘চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি’। চলচ্চিত্রের এই মহান মানুষটির জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। রাশিয়ার রিগাতে তিনি জন্মগ্রহণ করলেও তার বাবা মিখাইল অসিপোভিচ আইজেনস্টাইন ছিলেন জার্মান ইহুদি পরিবারের সন্তান। ইঞ্জিনিয়ার বাবা ছিলেন রুশ আমলা শ্রেণীর প্রতিনিধি ও প্রবক্তা। অন্যদিকে তার মা সেন্ট পিটার্সবার্গের সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ীর মেয়ে জুলিয়া ইভানোভনা ছিলেন সংস্কৃতিমনা। শিল্প সংস্কৃতিতে আইজেনস্টাইনের সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকাংশেই তার ভূমিকা ছিল।

 

মা চেয়েছিলেন ছেলেকে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। মায়ের এই সহযোগিতামূলক আচরণেই হয়ত তিনি প্যারিসে মাত্র আট বছর বয়সে বেড়াতে গিয়ে জর্জ মেলিয়ের এর সিনেমা দেখেন। শৈশবের সেই স্মৃতি আইজেনস্টাইনকে তাড়িত করেছে বারবার। কিন্তু মায়ের সংস্পর্শে বেশিদিন থাকা হলো না তার। বাবা-মার বিবাহ বিচ্ছেদে মাত্র এগারো বছর বয়সেই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে হয় আইজেনস্টাইনকে। তারপর বাবার কাছেই বেড়ে উঠতে থাকেন তিনি। যেখানে তাকে সার্বক্ষনিক সঙ্গ দিতো একজন সেবিকা। যিনি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গৃহকর্ত্রী হিসেবেই স্বীকৃতছিলেন। এতসব কিছুর মাঝেও তিনি ভুলতে পারেননি মাকে। আর তাই নিজের বিভিন্ন সিনেমায় এমন মুখাবয়ব নিয়ে এসেছেন যা হয়ত তার মায়ের স্মৃতিকেই উপস্থাপন করে।

 

এটা ঠিক যে,পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আইজেনস্টাইনকে নিঃসঙ্গ করে ফেলেছিল,তবে বাড়িয়ে দিয়েছিল তার জ্ঞানের আকাঙ্খা। যে আকাঙ্খার কারণেই তিনি ফরাসী ইতিহাস থেকে শুরু করে রাশিয়ান ইতিহাস,সাহিত্যসহ অনেক ইতিহাসের বই পড়ে ফেলেন। যা তার বয়সী ছেলে-মেয়েদের তুলনায় ছিল অনেক বেশি। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তার এ জানার বিষয়টি অনেক বেশি সাহায্য করেছিল। এর পাশাপাশি সার্কাস দেখা,বন্ধুদের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তাকে বেশ সহায়তা করেছে। তবে যে মানুষগুলো তাকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন,ভ্‌সভোলোদে মেয়েইহেলিদ

অন্যদিকে পেশা জীবনে নানা বিষয়ের অভিজ্ঞতাও তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণে নানাভাবে সাহায্য করেছে। অভিজ্ঞতার বড় অংশটি আসে ১৯১৮ সালে যখন তিনি লাল ফৌজে যোগ দেন। লাল ফৌজে যোগ দেয়ার পেছনে অবশ্য বেশ কিছু কারণ ছিল। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো,তিনি যখন পেত্রোগাদ ইন্সটিটিউট অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তেন তখন তিনি বেশ কাছ থেকে গুলি চালানো দেখেছিলেন। যা তাকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার প্রণোদনা জুগিয়েছিল। এটা ১৯১৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারি বিপ্লবের ঘটনা। তার দেখা এ বিক্ষোভকে তিনি যেমন স্কেচ এঁকে প্রকাশ করলেন ‘স্যার গে’নামক পত্রিকায় তেমনি পরে তুলে ধরলেন অক্টোবর ছবিতে। পেশা জীবনে লাল ফৌজে যোগ দেয়ার আগেই অবশ্য ‘পিতার্সবর্গস্কাইয়া গাজেতা’পত্রিকায় ব্যঙ্গচিত্র এঁকে তিনি আয় করেন। যা ছিল তার জীবনের প্রথম উপার্জন।

 

১৯১৯ সালের শেষের দিকে লাল ফৌজে থাকাকালীনই তিনি সেখানে একটি নাট্যদল গঠন করেন। তারপর ১৯২১ সালে ভর্তি হন ‘স্টে স্কুল অফ স্টেজ ডিরেকশন’এ। এখানেই আইজেনস্টাইনের সাথে পরিচয় হয় মেয়েইহেলিদের। তারপর অভিনয়ের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু গলার কারণে সুবিধা করতে পারেন নি। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে তখন নাট্য পরিচালনাতেই মনোযোগ দিলেন তিনি।

 

জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ১৯২৪ সালে আইজেনস্টাইন নির্মাণ করলেন তার প্রথম ছবি স্ট্রাইক। পরের বছর ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন। এখন পর্যন্ত এটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত| পরে ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করেন অক্টোবর (১৯২৮),ওল্ড এন্ড নিউ (১৯২৯),কিউ ভিভা মেক্সিকো,আলেকজান্ডার নেভস্কি (১৯৩৮),আইভান দ্য টেরিবল (১৯৪৪) এর মতো সিনেমা। তার সিনেমাগুলোতে সমাজের নিচুশ্রেণী ও শ্রমজীবী মানুষকেই তুলে ধরা হয়েছে বেশি। সেই সাথে তুলে ধরতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণাকে। ফলে সে ধারণা বরাবরের মতো শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে গেছে। তাইতো তার আইভান দ্য টেরিবল সিনেমাটির দ্বিতীয় পর্ব বন্ধ করে দেয় রাশিয়া-সরকার। যদিও সেই সিনেমার প্রথম পর্বের কারণেই সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেছিল। দ্বিতীয় পর্বেও সিনেমাটি বন্ধ করার কারণ একটাই,সিনেমাটি সরকারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে সমালোচিত হয় সিনেমাটি। যা আইজেনস্টাইনকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলে।  শয্যা নিতে বাধ্য হন তিনি।


শারীরিক অক্ষমতার কারণে সিনেমা নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেলেও চলচ্চিত্র বিষয়ক ভাবনা প্রকাশ পেতে থাকে তার লেখায়,অঙ্কনে। চলচ্চিত্র বিষয়ে ফিল্ম সেন্স ফিল্ম ফর্ম নামে তার গ্রন্থ দুটি এখনো বেশ মূল্যবান। রাশিয়া তথা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চলচ্চিত্রের এই পথ প্রদর্শক,ইনটেলেকচ্যুয়াল মন্তাজের জনক ১৯৪৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তিনি চলে যান তবে রেখে যান চলচ্চিত্রের এক সমৃদ্ধ জগৎ। যা তার উত্তর-প্রজন্মের কাছে গুপ্তধনের মত।

 

সিনেমারনাম : ব্যাটলশিপ পটেমকিন

সিনেমাটোগ্রাফি : এডওয়ার্ডটিস

সঙ্গীতপরিচালনা : ডিমিট্রিস সতকোভিস

নির্মাণকাল : ১৯২৫ সাল

ব্যাপ্তি : এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট

 

১৯০৫ সালে পটেমকিন জাহাজের নাবিকদের অসফল কিন্তু বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহ এ ছবির কাহিনী। চলচ্চিত্র সম্পর্কে আইজেনস্টাইনের তত্ত্বের সবচেয়ে ব্যাপক, গভীর ও বলিষ্ঠ প্রয়োগ এই ছবিতে। পটেমকিন সংক্রান্ত আলোচনায় এ ছবির দুটি বৈশিষ্ট্যের কথাই সাধারণত উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, সামগ্রিকভাবে ছবিটির সাংগঠনিক সুসংবদ্ধতা; দ্বিতীয়ত, ছবিতে সন্নিবিষ্ট নাট্যরস।


ধ্রুপদী বিয়োগান্ত (ট্রাজেডি) নাটকের মতো ছবিটি ভাগ করা হয়েছে পাঁচ অঙ্কে। তবে ছবিতে তথ্যগুলি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দর্শক এক অখন্ড, ধারাবাহিক সত্তার স্বাদ পায়।


ছবির তৃতীয় অঙ্কটি প্রথমটির চেয়ে আলাদা, পঞ্চমটি তৃতীয়টির তুলনায় ভিন্ন। ট্রাজেডির চিরাচরিত গঠন কৌশলকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে প্রত্যেক অঙ্কের আগে একটি শিরোনাম যোগ করে। ছবিটির পাঁচ অঙ্ক এরকম-

  1. মানুষ ও মাংসকীট (The Man and Maggots)
  2. কোয়ার্টার ডেকের নাটক (Drama in the Harbour)
  3. মৃতের আহ্বান (A Dead man calls for Justice)
  4. ওদেসার সিঁড়ি (Tha Odessa Staircase)
  5. নৌবাহিনীর মুখোমুখি বা স্কোয়াড্রনের সঙ্গে দেখা (The Meeting with Squadron)

এ ছবির পাঁচটি অঙ্ক সাধারণ এক বৈষয়িক সূত্রে গ্রথিত হলেও তাদের পরস্পরের মধ্যে লক্ষণীয় সাদৃশ্য কিন্তু সামান্যই। চেহারার আদলে অবশ্য এরা অভিন্ন। চলচ্চিত্র অধ্যয়নরত ছাত্রদের এ ছবিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ এতে ব্যবহৃত ‘ইন্টেলেকচ্যুয়াল মন্তাজ’ (intellectual montage)|


মার্কসীয় দ্বান্দিক তত্ত্ব থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথিসিসের ওপর ভিত্তি করে আইজেনস্টাইন-এর এই মন্তাজ তত্ত্ব। কমবাশন (combustion) ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ যেমন ইঞ্জিনকে এগিয়ে নেয় তেমনি দুটি পাশাপাশি শটের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বিষয়টাকে তৃতীয় আরেকটি অবস্থানে নিয়ে যায়। এইভাবে শটে শটে সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই বক্তব্য এগিয়ে চলে। অর্থাৎ ১+১ = ২ হয় না, হয় ৩। আইজেনস্টাইনের মতে এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক সিনেমা।


আমরা এখন ব্যাটলশিপ পটেমকিন ছবিতে মন্তাজের ব্যবহার দেখব। ছবির দ্বিতীয় অঙ্কে ‘পটেমকিন’ এর বিদ্রোহী নাবিকদের সংবর্ধনা দেয়ার জন্য ওদেসা বন্দরে ওদেসাবাসী সমবেত হয়, এটা থিসিস; ওদেসা সিঁড়ির ওপরে কসাকবাহিনীর আবির্ভাব ও হত্যাকান্ড পরিচালনা, এটা অ্যান্টিথিসিস; এবং পটেমকিন জাহাজ থেকে কসাক হেডকোয়ার্টারে গোলাবর্ষণ ও তা ধ্বংস, সিনথিসিস। এটা গোটা একটা সিকোয়েন্সের দ্বান্দ্বিক চলচ্চিত্রায়ন।


আর পাশাপাশি দুটো শটের ক্ষেত্রে মন্তাজের ব্যাপারে অনেক সময় গতিটা হলো গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। যেমন- ওদেসার সিঁড়ি দিয়ে জনতা দ্রুত ছুটে নিচে নামছে; পরের শটেই মৃত সন্তান কোলে উদভ্রান্ত এক মা একাকী উপরে উঠছেন। দুটো শটের গতিতে রয়েছে দ্বন্দ্ব। সৃষ্টি হচ্ছে দ্বান্দ্বিক সিনেমা।


একইভাবে জাহাজে নাবিকরা একবার বাঁয়ে ছুটছে, একবার ডানে ছুটছে- প্রতীকে গণচেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতির এও এক চমৎকার দ্বান্দ্বিক ব্যবহার। এছাড়া দ্বন্দ্ব থাকতে পারে পর পর দুটি শটের কম্পোজিশনগত রূপে, পটেমকিন জাহাজে মাস্তুল ও কামানের অবস্থান, জনতার মিছিলের আকৃতি, ব্রিজের গড়ন এরকম আরো উদাহরণ টানা যায়। এমনকি শব্দ ও ছবির দ্বন্দ্ব থাকতে পারে (আইজেনস্টাইনের প্রথম ছবি ‘স্ট্রাইক’ এ শ্রমিক ও পিয়ানো বাজানোর দৃশ্য আমরা এ রকম দ্বন্দ্ব দেখতে পাই)।


ইনটেলেকচ্যুয়াল মন্তাজকে শুধুই পাশাপাশি অবস্থিত দুটো শটের সংঘর্ষের একটা ফল, একে যান্ত্রিকভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। কারণ, মনে রাখতে হবে শুধু অংশের যোগফলই সমগ্রতা নয়। সমগ্রের নিজেরও একটি বিশেষ স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একথা যেমন পদার্থবিজ্ঞানে সত্য তেমনি আইজেনস্টাইনের সিনেমার ক্ষেত্রেও সত্য।


ব্যাটলশিপ পটেমকিন ছবির একটি বিশ্বখ্যাত সিকোয়েন্স হলো ‘ওদেসা সিঁড়ি সিকোয়েন্স’। এই সিকোয়েন্সটি এখন বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হলো। বিশেষ এই দৃশ্যে বিভিন্ন চরিত্র তথা জনতার বিহ্বল অবস্থার কথা বাদ দিয়ে আমরা শুধু দেখাব, কীভাবে এখানে ‘গতি’ কে আবেগের ক্রম-আরোহণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।


সিকোয়েন্সের শুরুতে ক্লোজ-আপ শটে কিছু মানুষের বিশৃঙ্খল দৌঁড়াদৌঁড়ি। এরপর লং শটে সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু পরের কয়েকটি দৃশ্যে পূর্বের বিশৃঙ্খল গতির জায়গায় এলো সৈন্যদের পায়ের কিছু শট, বন্দরের সিঁড়ি দিয়ে ছন্দোবদ্ধ পদক্ষেপে তারা নামছে। এখানে লয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছন্দও বাড়তে থাকে।


এই অবরোহী গতি তার অন্তিম বিন্দুতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আচমকা দিক পরিবর্তন হল, সিঁড়ি বেয়ে পলায়নরত ছত্রভঙ্গ জনতার যে ভীড় আমরা আগে দেখেছি তার জায়গা নিল মৃত সন্তানের নিথর দেহ কোলে হতভাগ্য নিঃসঙ্গ জননীর মূর্তি। ধীর বিষণ্ন পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে তিনি উঠছেন। ছত্রভঙ্গ জনতার ব্যস্ততার গতি অবরোহী। এরপর হঠাৎ নিঃসঙ্গ প্রতিমা, ধীর, অবসন্ন, নিস্তেজ।


এবারে গতি আরোহী। কিন্তু মুহূর্তমাত্র তার স্থায়িত্ব। আবার আকস্মিক দিক পরিবর্তন- বিপরীত গতি অবরোহণ। দ্রুততর ছন্দ নিয়ে আসে বর্ধিত লয়। আবার হঠাৎই ধাবমান জনতার এই দৃশ্যকে অনুসরণ করে আসে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্যারাম্বুলেটর এর দৃশ্য। এবার কেবল লয় পরিবর্তন নয়, উপস্থাপন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন দেখা দেয়- বিমূর্ত থেকে বস্তুগত। অবরোহী গতির এ হলো আরেক দিক। ফলে ক্লোজ থেকে আমরা চলে যাই লঙ শটে।


ছত্রভঙ্গ জনতার ব্যস্ততাকে অনুসরণ করে সৈন্যদের ছন্দোবদ্ধ কুচকাওয়াজ। গতির বিশেষ এক রূপ (জনতার পলায়ন, পতন ইত্যাদি) পরিবর্তিত হয় অন্য এক রূপে (পতনশীল প্যারাম্বুলেটর), অবরোহণ থেকে আরোহণ। এবার আমরা সৈনিকদের গর্জে-উঠা রাইফেল থেকে চলে যাই রণতরীর একটি মাত্র কামানের একটি মাত্র গোলাদাগার দৃশ্যে। এভাবে পূর্বাপর মাত্রা পরিবর্তন ঘটে, ঘটে যায় গুণগত পরিবর্তন, যতক্ষণ না তা শুধু ঘটনার বিশেষ অংশকেই নয়, কাহিনীর সমগ্র ব্যাপ্তিকেই আচ্ছন্ন করে। উদ্যত সিংহমূর্তির পর্যায়ে এসে এমনকি কাহিনীর বর্ণনাত্মক ভঙ্গিও রূপান্তরিত হয় প্রতীকী উপস্থাপনায়।


তথ্যসূত্র

১. পুরো নাম ভি আই পুদভকিন (১৮৯৩-১৯৫৩)। বিজ্ঞানের ছাত্র পুদভকিন মস্কো বিশ্বদ্যিালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে উচ্চতর অধ্যয়ন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজ করেন সেনাবিভাগের একটা ল্যাবরেটরিতে। এ নিয়ে তার আগ্রহ বেশি দূর গড়ায়নি। ১৯২০ সালের মে মাসে মস্কোর স্টেট ফিল্ম স্কুলে নিউজরিল ক্যামেরাম্যান এবং অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখানে কাজ করার কিছু দিন পর পুদভকিন চলচ্চিত্র শিক্ষক কুলেশভের ওয়ার্কশপ, স্টেট স্কুল অব সিনেমাটোগ্রাফিতে যোগ দেন। সেখানে কুলেশভের হাতেই তার চলচ্চিত্রের হাতেখড়ি। ১৯২৭ সালে সোভিয়েত বিপ¬বের দশম পূর্তিতে পুদভকিন ও আইজেনস্টাইনের উপর সরকারি দায়িত্ব পড়ে অক্টোবরের বিপ্লব নিয়ে ছবি নির্মাণের। এ অব সেন্ট পিটার্সবার্গ নামের এই ছবিটি সেসময় আর্থিক ও শৈল্পিক দুই দিক থেকেই প্রচণ্ড সাফল্য অর্জন করে।


২. মস্কো ফিল্ম ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও ফিল্ম তাত্ত্বিক ল্যেভ কুলেশভ। ৩০ বছরের অধ্যাপনা জীবনে রাশিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কয়েকটি প্রজন্মকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন। তার ছাত্র ছিলেন পুদভকিন প্রমুখ। দর্শকদের উপর চলচ্চিত্র-ভাষার প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি কাজ করেন। যা ‘কুলেশভ ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। তার আলোচনাটা এমন- যখন একটি শটের পিছু পিছু আরেকটি শট অনুসরণ করে তখন এমন একটি অর্থ সৃষ্টি হয় যেটি দুটি শটের মধ্যে কোনোটিতেই নেই। যদি প্রথম শটটি হয় ‘ক’ এবং দ্বিতীয় ‘খ’ তাহলে ‘ক+খ=গ’। দুটিতে মিলে তৃতীয় একটি ফিল্ম ইমেজ বা প্রতিরূপের সৃষ্টি হবে। মন্তাজ তাত্ত্বিকরা এই চিন্তার দ্বারা যথেষ্ট এবং যথার্থ প্রভাবিত হয়েছিলেন।


৩. এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা এই লেখার পরের অংশে করা আছে।


৪. নাট্যকার মেয়েইহেলিদ ছিলেন বিপ¬ব উত্তর রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক শিল্প-সংস্কৃতি জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন