Magic Lanthon

               

আসাদুর রহমান ও তাহ্‌সিন আহমেদ

প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

খেলার সংবাদের খেলা

আসাদুর রহমান ও তাহ্‌সিন আহমেদ

ক্রীড়া সংবাদের বর্তমান ধরনের একটি ঢং হলো- গল্পে গল্পে বলে যাওয়া। যারা গল্প বলেন তারা সবসময় চান গল্পের শ্রোতা যেন বেশি হয়। এই বেশি শ্রোতা মাথায় রেখে গল্প লেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক তার সংবাদে মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক কিছু জুড়ে দেন। এই জুড়ে দেওয়া বা জোড়া দেওয়ার বিষয়টা অনেক সময় এমন পর্যায়ে যায় যে, সংবাদ আর সংবাদ থাকে না। যেটা থাকে, সেটা হয়ে যায় মন্তব্য।। আবার অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ বাছাইয়ের ব্যাপারেও আমলে আনা হয় না সংবাদমূল্যকে।

অনেক সংবাদ আছে যেগুলোর উপস্থাপনের ঢং-ই কথা বলার সুযোগ করে দেয়। সাধারণত এটাই হয়ে থাকে যে, সংবাদের শিরোনাম পড়েই পাঠক সিদ্ধান্ত নেন কোন সংবাদটি পড়বেন আর কোনটি পড়বেন না। কেননা, শিরোনামই পাঠককে বোঝানোর চেষ্টা করে যে এই সংবাদটিতে আসলে এই আছে। কিন্তু বাস্তবিক, পত্রিকার পাতায় এমন অনেক শিরোনাম পাওয়া যায় যেগুলো সংবাদ-বিবরণীর সংক্ষিপ্ত রূপ ধরে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে পাঠকের সামনে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ যে আসলে এক ধরনের ধোঁকাবাজি তা পাঠক বুঝতে পারে পুরো সংবাদটি পড়ে। আবার, হতাশ হতে হয় বিভিন্ন তারকাদের কলাম পড়ে। পত্রিকাগুলোতে প্রতিনিয়তই ইয়া বড় বড় তারকারা কলাম লিখে থাকেন। কিন্তু এই কলামগুলো পড়ে তেমন কোনো মাল-মশলাই খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তখনই প্রশ্ন ওঠে, এসব নামমাত্র কলামের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না?

যাই হোক। যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে তৈরি না হয়েও সংবাদপত্রগুলো কিন্তু পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছে, এটা তো ভালো, সমস্যা কী? উত্তরে বলতে হয়, হাট-বাজারের হকাররাও দর্শক-শ্রোতার মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেন। যেখানে তারা পণ্য বিক্রির স্বার্থে যোগ করেন অলৌকিক সব গুণাবলী আর মনভুলানো কথার হাজারটা ডালপালা। অলৌকিক আর মনভুলানো বলার কারণ বিজ্ঞাপিত পণ্যের যে গুণকীর্তন তারা করেন, তা পরীক্ষালব্ধ নয় এবং বলা যায় অবিশ্বাস্য। এই সূত্র ধরেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি সংবাদপত্রগুলোও তাই করছে? কেবল ক্রেতা তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগেছে গোবেচারা পাঠকের পেছনে? উত্তর খুঁজতে সংবাদপত্রগুলো একটু খতিয়ে দেখা দরকার।  

আর এই খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশের মূলধারার করপোরেট মিডিয়া হিসেবে প্রথম আলো ও সমকাল এ প্রকাশিত ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ সংক্রান্ত বেশকিছু সংবাদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।   

অনেকটা পাতানো খেলা প্রথম আলো ১৪ ফেব্রুয়ারি ১১ বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছে-

...সাকিব আল হাসানকেও যোগ করা যায় তাদের সঙ্গে। প্রত্যাশার

ফানুস যেভাবে উড়ছে, কোয়ার্টার ফাইনাল তো বটেই, ২ এপ্রিল

ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে সাকিবের ছবিটিও অনেকে কল্পনা করে ফেলেছেন।  

এর দুই দিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় শিশিরের একটি কার্টুন বেশ বড় করে ছাপানো হয়। কার্টুনটিতে সাকিব ঘুমাচ্ছেন, উপরে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে সাকিবেরই হাস্যোজ্জল মুখ। তার মানে, সাকিব স্বপ্ন দেখছেন তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। একইভাবে সমকাল ১৯ ফেব্রুয়ারি তাদের একটি শিরোনাম করেছে এমন- সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশরও।

অন্যদিকে এই দুটো সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার আগেই ৮ ফেব্রুয়ারি ১১ সাকিব নিজেই সংবাদ সম্মেলনে বলেন টার্গেট কোয়ার্টার ফাইনাল। কেবল সাকিব নয়, আমরা যারা ক্রিকেট অল্প-বিস্তর হলেও বুঝি তারাও কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নই দেখেছিলাম। কেন দেখেছিলাম তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার- বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ছিল বি গ্রুপে। এই গ্রুপের অন্য দলগুলো হলো- ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড। এই সাতটি দলের মধ্যে চারটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার কথা। শক্তির বিচারে এই গ্রুপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চতুর্থ ও বাংলাদেশ পঞ্চম শক্তিশালী দল। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টার্গেট করেছিলাম। কারণ এই নয় যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আমাদের চেয়ে দুর্বল। কারণ এই যে, গ্রুপের অন্য তিন দল অর্থাৎ ভারত, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী। একই সঙ্গে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে হারাবোই।  

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া না যাওয়ার স্বপ্ন যেখানে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী একটি দলকে হারানোর ওপর দোল খায়। এবং নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সাথে হারার তিক্ত অভিজ্ঞতাও যেখানে আমাদের আছে; সেখানে সাকিবের হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি ধরিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?   পাঠক, প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, তাহলে গণমাধ্যম আমাদের কেন এমন স্বপ্ন দেখাচ্ছে? উত্তর খুঁজতে খুব বেশি বিশ্লেষণে যাওয়ার দরকার নেই।সাধারণ দর্শক হিসেবে আপনার মনে যদি খুব বেশি আগ্রহ না থাকে তাহলে কিন্তু আপনি ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে তেমন মাতামাতি করবেন না- এটাই স্বাভাবিক| কিন্তু তাদের (সংবাদপত্রের) কাছে দর্শকের আগ্রহ থাকা, না থাকা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, দর্শক হিসেবে আপনাকে আগ্রহী করে তুলতে হবে।  

ধরুন, আপনার এক বন্ধু আপনাকে এসে বললো, শোন্‌ এবার কিন্তু বাংলাদেশও বিশ্বকাপ জিততে পারে। আপনি বললেন, ধুর! কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারে কি না তাই দ্যাখ ।আপনার বন্ধু বললো, তুই বেটা জানিস-ই না। পেপার-পত্রিকা কিছু পড়িস? এই দেখ, প্রথম আলো, সমকাল কী লিখছে? যখন আপনি সংবাদপত্রগুলোতে সত্যি সত্যি এরকম সম্ভাবনা দেখবেন তখন আস্তে আস্তে ব্যাপারগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করবেন।অর্থাৎ আপনাকে একপর্যায়ে এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হবে। কারণ, একটি বিষয় যখন বারবার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকভাবে কারো সামনে উপস্থাপন করা হয়- এক পর্যায়ে তা নিয়ে ভালো লাগা বা খারাপ লাগার সৃষ্টি হয়। যেমনটি ঘটে স্যাটেলাইট চ্যানেলে একই হিন্দি গান বারবার দেখে।  

অন্যদিকে যে সামাজিক পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি তাতে বই, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট বা লিখিত কোনোকিছুকে কিন্তু খুব সহজে বিশ্বাস করি। আমরা ভাবি বারবার পত্রিকায় লিখছে, তার মানে ঘটনাতো ঠিক কিংবা ঠিক হতে পারে। আর বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের দেশের এমন ইতিবাচক সংবাদের ক্ষেত্রে এমনটা আরও বেশি ঘটে।   যাই হোক, আপনাকে বিশ্বাস করানো গেলো যে, বাংলাদেশেরও বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা আছে। আর এই বিশ্বাস থেকেই আপনার মধ্যে তৈরি হবে স্বপ্ন | তাই স্বপ্নর শেষ আপনি দেখতে চাইবেন। ফলে যা হবে, বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রতিদিন সংবাদপত্র না পড়লে আর আপনার চলবে না। পারলে আপনি টেলিভিশনও দেখবেন।এখন কথা হলো, এভাবে আপনার কাছে সংবাদপত্র বিক্রি করে গণমাধ্যম মালিকরা কিন্তু প্রাথমিকভাবে সফল। তারা আপনাকে সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। এখন এমনিতেই বাকি উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। সেটা কেমন? আপনি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়লে পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়বে, আর সার্কুলেশন বাড়লে পত্রিকার দাম বাড়বে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। এটা গেল একটা দিক। অন্যটা হলো, যারা এতো টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেবেন তারাও তো কিছু চাইবেন, নাকি? এখন তাদের পাওয়ার পালা। নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেখে আপনার কিন্তু পর্দায় জীবন্ত শচীনকে দেখতে ইচ্ছে করবে। আর তা দেখতে হলে বাড়ির পুরানো ২১ ইঞ্চি টিভির পরিবর্তে কিনতে হবে ৪২ ইঞ্চি এলসিডি কিংবা প্লাজমা টেলিভিশন। এসব টেলিভিশন কেনার জন্য একই সঙ্গে আছে আবার নানা মন ভোলানা অফার। তাহলে কী দাঁড়ালো? আপনি ছিলেন একজন সাধারণ পাঠক বা দর্শক, শেষমেষ হয়ে গেলেন একজন ক্রেতা। 

কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি   ২ মার্চ সমকাল এর একটি শিরোনাম এমন -বাংলাদেশকে রোচের হুঙ্কার। পুরো প্রতিবেদন পড়ে দেখা গেছে, সংবাদে বেশ কয়েকবার হুঙ্কার শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো রোচের কথায় হুঙ্কারের মতো কোনো কিছু সত্যি সত্যি কি ছিল? প্রতিবেদনটিতে রোচ[i] কেবল বলেছেন, তারা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো বাংলাদেশের চেয়ে ভালো দল-ই। এটা সর্বজনবিদিত। আর এ কথা রোচ বললে, সেটা হুঙ্কার হয় কীভাবে?