Magic Lanthon

               

দেবাশীষ কে. রায় ও রোকন রাকিব

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম : নতুন সম্ভাবনা, নতুন সংকট

দেবাশীষ কে. রায় ও রোকন রাকিব


প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের এই যুগে এসে মানুষ ক্রমাগত সম্মিলিত হচ্ছে আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটের ছায়াতলে। পরিশ্রমী মানুষ তার মেধা-মননের একটা বড় অংশের প্রয়োগে তৈরি করেছে আন্তর্জাল নামক এক চমকপ্রদ পরিসর। যে পরিসরে নব্য যুক্ত হওয়া একটি ধারার নাম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর এই মাধ্যম হিসেবে ফেইসবুক, টুইটার এর মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো সৃষ্টি করেছে নতুন একধরনের সামাজিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, আমাদের নিত্যকার সামাজিক সম্পর্কগুলোও আর সেই মানবীয় সম্পর্কে নেই। অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়ে পড়েছে যান্ত্রিক। আবার অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সম্পর্কগুলোতে পরিলক্ষিত হচ্ছে মানবিকতা ও যান্ত্রিকতার দ্বৈত-সংষ্করণ। যে সংস্করণের একদিকে ভার্চুয়াল রূপ আর অন্যদিকে সামাজিক রূপ।

মানুষের দৈনন্দিন যে প্রয়োজন যেমন- মানবীয় সম্পর্ক, সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রায় সব বিষয়েরই সমন্বয় ঘটছে এই মাধ্যমগুলোতে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই নব্য ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা রয়েছে। এক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে, এই মাধ্যমগুলো নামে সোশ্যাল হলেও কাজে কতটুকু সোশ্যাল কিংবা মানুষকে কতটুকু সোশ্যাল করতে পেরেছে। নাকি কেবল সোশ্যাল করবার ধুয়া তুলছে? তাই, আজকের এই আলোচনায় প্রাযুক্তিক সফলতা-বিফলতাকে গৌণ করে এর সামাজিক ও মনস্তাত্বিক প্রভাবকে মূখ্য করে দেখার চেষ্টা করব। সেই সাথে চেষ্টা করব মাধ্যমটির শ্রেণীগত অবস্থান, রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও সমাজে প্রতিনিধিত্বশীলতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে।

কী আছে ওই আকাশের সীমানায়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি অনলাইন সেবা, প্ল্যাটফর্ম তথা ওয়েবসাইট, যা মানুষে মানুষে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্কের নেটওয়ার্ক; যেখানে তারা তাদের আগ্রহ ও কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারকারী অবধারিতভাবে তার ব্যক্তিগত তথ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ উপস্থাপন করে থাকেন। অনলাইন কমিউনিটি সার্ভিসগুলোও (অনলাইন বুলেটিন বোর্ড সিস্টেম, চ্যাটরুম, ফোরাম, ওয়েব-লগ প্রভৃতি) মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। কিন্তু বৃহৎ অর্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সার্ভিস। অন্যদিকে অনলাইন সার্ভিস হলো গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। সোজা কথায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক প্রকার বিশেষায়িত ওয়েবসাইট; যেখানে ব্যক্তি তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, আবেগ-অনুভূতিসহ মানবীয় বিষয়গুলো তার নিজস্ব নেটওয়ার্কে তুলে ধরার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।

হালের এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর আবির্ভাব খুব বেশি দিন আগের নয়। ইন্টারনেট প্রযুক্তির একটা পরিণত পর্যায়ে এসে গত শতাব্দীর শেষ দিকে এই মাধ্যমের উদ্ভব। যদিও ই-মেইল বা অন্যান্য প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ায় তথ্য আদান-প্রদানের শুরু ৭০ এর দশকে। Geocities সাইটটির মাধ্যমে সর্বপ্রথম যখন সামাজিক নেটওয়ার্কিং আরম্ভ তখন ১৯৯৪ সাল। পরের বছর একই ধরনের আরও দুটি সাইট প্রতিষ্ঠিত হয় theglobe.com ও tripod.com নামে। ১৯৯৭ সালে এসে সামাজিক নেটওয়ার্কিং ধারণার বিস্তৃতি ঘটে sixdegrees.com সাইটটির হাত ধরে। এরপর ধারাবাহিকভাবে যোগ হয় Myspace, Orkut, Bebo এর মতো সাইটগুলো। এখানে বলা দরকার, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এই সময় থেকেই ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে।

২০০৪ সালে এসে সামাজিক নেটওয়ার্কিং এর ধারণায় নতুন মাত্রা আনেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মার্ক জুকারবার্ক। তার প্রতিষ্ঠিত Facebook স্বল্প সময়েই হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে এর সদস্য প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করা হলে দুনিয়াজুড়ে আলোচনায় আসে সাইটটি। প্রায় ৮০ কোটি ব্যবহারকারী নিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সাইটটি সামাজিক নেটওয়ার্কিং জগতের শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত Twitter প্রায় ৩৮ কোটি সদস্য নিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। এই সাইটটি গ্ল্যামারজগতের পাশাপাশি ও পশ্চিমা বিশ্বে তুলনামূলক বেশি জনপ্রিয়। সর্বশেষ ২০১১ সালে সার্চ ইঞ্জিন Google চালু করে googleplus.com।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন চে গুয়েভারা

পৃথিবী যে বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে একথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসেই এখন গোটা দুনিয়ার খবর জানা যায়, শোনা যায়। আর ভাব বিনিময়ের বিষয়টিতো থেকেই যায়। ভাবের এই বিনিময় মানুষ কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থেই করে না। ইদানিং মানুষ জনমত, নিজেদের অধিকার, দাবি আদায়ের জন্যও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ভাব বিনিময় করছে। আর এই ভাব বিনিময় সক্রিয়ভাবে প্রভাবিতও করছে জনগণ ও জনমতকে।

এই প্রভাব কতটা তীব্র হতে পারে তার একটি জলন্ত উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেল মধ্যপ্রাচ্যে। তিউনিশিয়ায় সরকার-বিরোধী আন্দোলনে সেখানকার শাসকগোষ্ঠী দেশটিতে সব ধরনের রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপরও শাসকগোষ্ঠী আন্দোলনকারীদের থামাতে পারে নি। মিছিল-মিটিং এর পরিবর্তে আন্দোলনকারীরা ই-মেইল, ইউটিউব, ফেইসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নিজেদের সংগঠিত করেছিল, বিপ্লব করেছিল। আর এই বিপ্লবকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ইন্টারনেট প্রভাবিত বিপ্লব।

এই আলোচনায় মিশরকেও টানা যেতে পারে। কোনো ধরনের নেতৃত্ব ছাড়াই কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা মিশরিয় জনগণ একটি জনমতে পৌঁছতে পেরেছিলেন। যার ফলে তারা পদত্যাগে বাধ্য করতে পেরেছিলেন ৪০ বছরের পরাক্রমশালী শাসক হুসনে মোবারককে। লক্ষণীয় যে, এই আন্দোলন চলাকালীন ইরানে এর সমর্থনে বিক্ষোভ হলে শাসকগোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাল ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। তার মানে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব কতখানি তা ইরানি শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছে। যেমনটি পেরেছে সিরিয়া ও আলজেরিয়া সরকার। কারণ এই দুটি দেশ আন্তর্জাল কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

জনমত গঠন কিংবা আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ক্রমেই হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যে শক্তির সীমা কেবল দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্ব জনমতকেও বেঁধে চলেছে এক সুতোয়। বিষয়টা অনেকটা এমন- আন্তর্জাল তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো জগৎ-জোড়া এক জাল, যার এক সুতোয় আগুন লাগলে দ্রুত সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে অন্য সুতোয়। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার বিকল্প কাভারেজ সেই ইঙ্গিতই প্রদর্শন করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন, পারসোনার গোপন ভিডিও চিত্রের খবর, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর বিভিন্ন দিক মূলধারার মিডিয়াতে না এলেও ঠিকই অনুরণিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে। সম্প্রতি সৌদি আরবে বাংলাদেশীদের শিরঃচ্ছেদ, লিবিয়া ইস্যু, ওয়ালস্ট্রিট বিরোধী আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো মূলধারার পাশাপাশি এসব বিকল্প মিডিয়াতেও সমানভাবে আলোচিত-সমালোচিত। বিজ্ঞাপন, মালিকানা, মতাদর্শ যখন মূলধারার কণ্ঠরোধ করছে তখন কাশ্মিরের মতো নিরীহ জনগোষ্ঠীও এই বিকল্প মাধ্যমকে মত প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

পাল্টে যাচ্ছে কথনরীতি, আসছে ফেসবুকিয় ভাষা

প্র্রশাসনিক ভবনে চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল দেখছিলাম, হঠাৎ এক নারী কণ্ঠ কানে এল- ‘OMG, আমি A পাইছি।’ শুনে কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলাম। এর কিছুদিন পর একদিন চা খাচ্ছিলাম আমাদের (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) ক্যাম্পাসের টুকিটাকি চত্বরে। ভাল চায়ের প্রশংসায় আমার বন্ধু বলে উঠল, মামা চা জোস্‌ হইছে। ১০০টা লাইক দিলাম। OMG এবং চায়ের ১০০ লাইকের অর্থ বুঝেছিলাম ফেইসবুক ব্যবহার করতে গিয়ে। ফেইসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলোতে কেউ কোনো স্ট্যাটাস দিলে তার বন্ধুরা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে লাইক-আনলাইক দিতে পারেন। অনলাইনের এই ভাষাকে দ্বৈত সংস্করণের মানুষ চা পানের মতো নিত্যকার বাস্তবিক কাজেও ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, ব্যস্ত মানুষ যখন সময় পাচ্ছেন না তখন OMG দিয়েই Oh My God বোঝানোর চেষ্টা করছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোর এমন অনেক পরিভাষা এখন হরহামেশা ব্যবহৃত হচ্ছে বাস্তব জীবনে।

শুধু যে ভাষাই সংক্ষেপিত হচ্ছে তা নয়। মানবীয় সম্পর্কগুলোও সংক্ষেপ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিষয়টা এরকম- বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জন্মদিনে wish করতে HBD, উচ্চস্বরে হাসতে LOL, অভিবাদন জানাতে Congratz এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করছে। পাঠক একটু ভাবুন, আগের দিনে আমরা কারও জন্মদিন মনে রাখতে তারিখটি ডায়রিতে লিখে রাখতাম, সাথে দিনটিকে ঘিরে থাকত নানা পরিকল্পনা, প্রস্তুতি; এর সবই হতো প্রিয় মানুষটির অগোচরে। পছন্দের মানুষটিকে Wish করা, তার জন্য উপহার কেনা, এগুলো ছিল বিশেষ এক আবেগ-উত্তেজনার বিষয়। কিন্তু ভার্চুয়াল সংস্কৃতির যুগে এসে জন্মদিনকে ঘিরে থাকা সেই আবেগ-উৎকন্ঠাগুলো কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। আমরা কেউই এখন আর ঘটা করে কাউকে জন্মদিনে Wish করি না। কাউকে Wish করতে তার ওয়ালে শুধু HBD লিখে দিই। ব্যস, শেষ। এর বেশি কিছু না! বস্তুত, আজকাল মানবীয় সম্পর্কগুলোও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দ সংক্ষেপের মতো ছোট হয়ে গেছে। ছোট হয়ে এসেছে ভালোবাসার আকার, কাউকে অনুভব করার সীমানা।

সামাজিক যোগাযোগ কমিউনিটিতে ব্যবহৃত এই পরিভাষাগুলো একেবারে নতুন। এটা কোনো প্রমিত ভাষাও নয়, আবার সেলফোন-সংস্কৃতি, বিজ্ঞাপন, এফএম রেডিও’র মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া ডিজুস ভাষাও নয়। তার মানে এই ভাষার জন্মই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কেউ যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বসেন তখন তাকেও কিছু বিশেষ ভাষা ব্যবহার করতে হয়। ফেইসবুক বা অনলাইনে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ বা ভাষা আমাদের বাস্তবতার ভাষাগুলোকেও বদলে দিতে চায়। আজকের এই দিনে এসে আমরা হরহামেশাই প্রয়োগ করছি অনলাইনের সেই ভাষাগুলো। যা কিনা আমাদের বাস্তবতার ভাষাগুলোর সাথে প্রায় সমার্থক স্বরে উচ্চারিত হচ্ছে। ব্যবহারের আধ্যিকের কারণে আজকাল অনেকেই বাস্তব জীবনে অনলাইনে ব্যবহৃত এই ভাষাগুলোর ভুল প্রয়োগও করছেন। ফলে বাস্তবের ভাষার মধ্যে আসছে পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে মানুষের ভাষা। আবির্ভাব ঘটছে এক মিশ্র প্রকৃতির ভাষা। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে বহুল ব্যবহৃত কিছু পরিভাষা এরকম-

HBD- Happy Birth Day

LOL- Laughing Out Loudly

Congratz- Congratulation

Asm- Awesome

Bro- Brother

F9- Fine

Gr8- Great

Gn- Good Night

পরিবর্তন সামাজিক সম্পর্কে

পাঠক, আপনি যদি নিয়মিত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী হন, তাহলে নিজের পরিবর্তনের জায়গাটা একটু ভাবুন। সচেতন, অসচেতন বা অবচেতনভাবে কিছু একটা পরিবর্তন কিন্তু হচ্ছে। সেটা হোক ইতিবাচক বা নেতিবাচক। নিয়মিত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে- এমনটাই জানাচ্ছেন গবেষকরা।১০ আর এই আত্মকেন্দ্রিকতার উদয় হয় যখন ব্যবহারকারীর মাঝে আসক্তি কাজ করে। এই আসক্তি হলো তার (ব্যবহারকারীর) বন্ধুদের সাথে মিথস্ক্রিয়া, বিভিন্ন কাহিনী, গল্প শেয়ার করার আসক্তি।১১ ফলে ব্যক্তি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করেন অনলাইনে, হয়ে পড়েন আত্মকেন্দ্রিক। পাশাপাশি মানসিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। কারণ ভাল লাগা, না-লাগা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, উচ্ছ্বাস, অনুভূতি সবকিছুরই শেয়ার চলছে এই সামাজিক মাধ্যমে।

অনেক সময় প্রেম, বন্ধুত্ব, বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোও কিন্তু এই মাধ্যমেই হচ্ছে। তাই সামাজিক মাধ্যমকে শুধু ইতিবাচক বা নেতিবাচক দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা সমীচীন হবে না। দৈনন্দিন বাস্তবতায় প্রযুক্তির উৎকর্ষে এসে মানুষের সংস্কৃতিতে জন্ম নেয়া আরেক সংস্কৃতির নাম সাইবার সংস্কৃতি। প্রযুক্তি-নির্ভর এই সংস্কৃতির যে গতি তা আমাদের চিন্তা-চেতনা, অভ্যাসেও প্রচণ্ড অনুরণন তৈরি করছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের সব ক্ষেত্রেই এই গতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। ফলে আমরা কেমন যেন একটা যান্ত্রিক সময়ে এসে পড়েছি। উঠতে-বসতে, খেতে-ঘুমাতে সব ক্ষেত্রেই যন্ত্র আর যন্ত্র।

কাছের বন্ধুদের মধ্যেও কাউকে দেখছি চা খাওয়ার ফাঁকে তার ফেইসবুকের মেসেজ ইনবক্সটি চেক করতে, কাউকে বা তার স্ট্যাটাস আপডেট করতে। প্রযুক্তি মূখ্য হয়ে ওঠায় চা খেতে খেতে বন্ধুটির সাথে দেয়া অনাবিল আড্ডাটি গৌণ হয়ে পড়েছে। অনুমতি না নিয়ে ফটো ট্যাগ করে দেয়ায় সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিও শত্রু বনে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন মোবাইল ফোনের সাথে সমগুরুত্বে ব্যবহার করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো।

প্রযুক্তির সাথে অভিযোজিত হতে হতে মানুষ এতটাই প্রযুক্তি-ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে যে, প্রযুক্তি ছাড়া যেন জীবন অচল। সম্প্রতি আমেরিকাতে পরিচালিত একটি গবেষণা ঠিক তেমন তথ্যই দিচ্ছে। ওয়েকফিল্ড নামক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৭৩ শতাংশ কলেজ ছাত্র কোনো রকমের প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া অধ্যয়ন করতে পারে না, আর ৩৮ শতাংশ ছাত্র একটানা ১০ মিনিটের বেশি সময় তাদের ল্যাপটপ, ফোন বা অন্যান্য মাধ্যম চেক না করে থাকতে পারে না।১২ এই প্রযুক্তি-নির্ভরতা এমন পর্যায়ে গেছে যে তা- খাদ্য, বস্ত্রসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ইন্টারনেট এখনো সর্বসাধারণের হাতের নাগালে না এলেও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো ব্যবহারের মাত্রা।

ব্যস্ততার মাঝেও বন্ধু-বান্ধবদের খোঁজ-খবর মেলে হাতের নাগালেই। অনেক সময় দীর্ঘদিন আগে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ফেইসবুকের পাতাতে। মানুষে-মানুষে বন্ধুত্বের মেলবন্ধন আজ অনেক সহজ। আর তাই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অপূর্ব বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। ফেইসবুক নামক অদ্ভুত এই বই এর পাতাতে মা-বাবা, ছাত্র-শিক্ষক, শিল্পী-শ্রোতা, উৎপাদক-ভোক্তা সবাই বন্ধু। শুধু তাই নয়, অনেক সময় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি অনেকে বিভিন্ন গ্রুপ১৩ খুলে বসেন। অনেকেই আবার এইসব গ্রুপের মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করছেন, চুটিয়ে মনোনিবেশ করছেন ভার্চুয়াল আড্ডায়।

 

মানসিকতার সাথে প্রভাবিত শরীরও

প্রযুক্তি মাত্রই তার ভাল-মন্দ দুটো দিক থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বেলায়ও একথা প্রযোজ্য। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ল্যারি ডি রোজেন আমেরিকাতে পরিচালিত এক জরিপে জানান, যেসব টিনএজার ফেইসবুক ব্যবহার করে, তারা আত্মপ্রেমিক বা আত্মবিলাসী হলেও যারা ফেইসবুক ব্যবহার করেন না, তাদের চেয়ে অনেক বেশি সহমর্মী। এই সহমর্মিতা তারা বাস্তব জীবনেও প্রয়োগ করছে।১৪ আবার ইতিবাচকতার বিপরীত চিত্রও অনেক গবেষণায় পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালে এক হাজার ৩০ জন মা-বাবার উপর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশু ও টিনএজারদের মধ্যে যারা গণমাধ্যমে (অনলাইন ও অফলাইন) বেশি সময় ব্যয় করে, তাদের উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা, পেটব্যাথা ও অসুস্থতার জন্য স্কুলে অনুপস্থিতির মাত্রা বেশি।১৫ এই জরিপ কিন্তু এই ইঙ্গিত দেয় যে, শারীরিক ক্ষেত্রে টিনএজার ও তরুণ প্রজন্ম নিয়ে ঝুঁকিটা একটু বেশিই। কারণ এরকম আরও একটি গবেষণায় টিনএজার ও তরুণদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, এদের মধ্যে যারা বেশি সময় ফেইসবুকে কাটায়, তাদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও বাইপোলার ডিজ-অর্ডার বেশি।১৬ উপরের তিনটি গবেষণা পশ্চিমা সমাজের উপর করা হলেও আমাদের সমাজও সেদিকে অনেকটা ধাবিত হয়েছে কিংবা হচ্ছে। তাই আমাদের সমাজে এ ধরনের গবেষণা হলে হয়ত একই বা কাছাকাছি ফলাফল আসবে।

আজকাল অনেককেই বিশেষ করে টিনএজারদের ফেইসবুক খুলে রাতভর বসে থাকতে দেখা যায়। যার ফলে এদের অনেকেই হয়ত সকালের ক্লাসটিতে অনুপস্থিত থাকছে, কিংবা ভুলে যাচ্ছে পূর্বনির্ধারিত কোনো কাজ। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কবলে পড়ে আমরা যেন শারীরিক অথবা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হই, সে দিকটাও ভাবা দরকার। কারণ, আমরা চাইলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারব না।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশুদের বিষয়টি আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কম্পিউটারে গেমস খেলার বাইরেও শিশুরা এখন আন্তর্জালের প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী হয়ে উঠছে। এদের মধ্যে স্কুলগামী শিশু-কিশোরের সংখ্যাই বেশি। কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃপক্ষই ১৩ বছরের নিচের শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি প্রদান করে না। তাতে কী? অসত্য তথ্য দিয়ে তা অহরহই হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলে, প্রায় ৭৫ লাখ শিশু-কিশোর বর্তমানে ফেইসবুকে ব্যবহারকারী হিসেবে নাম লিখেছে। এদের মধ্যে ৫০ লাখ শিশুর বয়সই ১০ বছরের কম। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এসব শিশুর অভিভাবকরা জানেনই না তাদের শিশুসন্তান কীভাবে ফেইসবুকে সময় অপচয় করছে। অভিভাবকদের উদাসীনতায় পর্নোগ্রাফির মতো ভয়াবহ সব চিত্র শিশুর নখদর্পণে চলে আসছে অনায়াসেই।১৭ হয়রানির স্বীকারও হচ্ছে অনেকে। এই ২০১০ সালেই ১০ লাখ শিশু ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা রকম হয়রানির শিকার হয়েছে’১৮ এছাড়া সামাজিক মেসেজিং, টেক্সটিং, ফটো-ট্যাগ, ইন্সট্যান্ট মেসেজ ইত্যাদি শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেশ প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জালিক সাহিত্যচর্চা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে পাল্টাতে শুরু করেছে আমাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রা। সামগ্রিকতার অংশ হিসেবে সাহিত্যচর্চার ধরনেও ভিন্নতা এসেছে কিছু অংশে। যেমন, এখন আর কেউ চিঠি লেখার প্রয়োজন অনুভব করে না। চিঠি পরিণত হয়েছে ই-মেইলে। কাগজে লেখা চিঠির অনুভূতিগুলো এখন প্রকাশ হচ্ছে তড়িৎ বার্তায়। তাছাড়া কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, মন্তব্য এখন আর কাগজের খাতায় আটকে নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ প্রভৃতির হাত ধরে সেগুলো মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কাছে। এখানে নেই কোনো সেন্সরশিপ, নেই স্থান সংকুলানের বাড়তি ঝামেলা। আর তাই অনেকেই ফেইসবুকের মতো মাইক্রোব্লগিং সাইটগুলোতে করছেন মাইক্রো সাহিত্যচর্চা।

এই মাইক্রো সাহিত্যচর্চায় কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প, অনুভূতি, জীবনদর্শন সবই থাকছে। কিন্তু পরিমাণগত একটা পার্থক্য রয়েছে। এখানে সাহিত্যের আকারটি ছোট। যদিও প্রযুক্তির বিকাশে তা হয়ত একদিন সমতায় আসবে। তখন আর এই চর্চা হয়ত কেবল স্ট্যাটাসকেন্দ্রিক থাকবে না। তারপরও, নানান ঢংয়ে পোস্ট করা সাহিত্যসদৃশ স্ট্যাটাসগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মন ছুঁয়ে যায়। কিছুদিন পর হয়ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে যে, কোনো ব্যবহারকারী তার এক বছরের স্ট্যাটাস দিয়ে একটি সংকলনই বের করে ফেলবেন। যে সংকলনে স্ট্যাটাসগুলো হতে পারে এরকম-

সম্ভাবনার সকল শর্ত পূরণ করে জীবনে যে ঘটনাগুলো এক-এক করে সম্ভব বা বাস্তব হয়ে ওঠে, কেবল নিজের অনুকূলে না থাকায় মানুষ মাঝে মাঝেই সে ঘটনাগুলোকে অসম্ভব বা অবাস্তব আখ্যা দিতে চায়। অথচ, এই মানুষই আবার নিজের ভাবনায় হাজার হাজার অবাস্তবকে প্রতিনিয়ত বাস্তব বলে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। আমার মনে হয়, বাস্তবতা বাইরে যতটা না আপেক্ষিক, তার চেয়ে বেশি আপেক্ষিক মানুষের নিজস্ব ভাবনায়। আর নিজস্ব ভাবনার এই আপেক্ষিকতার নাম-ই স্বপ্ন।১৯

সময়ে এসেছিলে অহরহ

তুমি অসময়ে আসো একবার

আবারো ইচ্ছে জাগে

তোমার অভিনয় দেখবার২০

পুরনো জানালায় নতুন বাতাস

দোষী কে, বাতাস নাকি জানালা?২১

জীবন, জীবনের জন্যই তো এত কিছু করছি।

মৃত্যু, তোমার জন্য যে কোনো পরিশ্রমই

বাকি রাখলাম না।২২

নজরদারি  প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চালাতে সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইটের দারস্থ হয়েছিলেন। তহবিল গঠন ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি এসব মাধ্যম ব্যবহার করেন। এসব সাইটের মধ্যে বিশেষ করে ফেইসবুকের নাম উল্লেখযোগ্য। অথচ সেই ওবামাই এবার তার মেয়েদের ফেইসবুক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কারণ, তিনি চান না, বাইরের লোকজন তার ঘরের খবর জানুক।২৩

তার মানে, কেবল ওবামা নয়। এই মাধ্যম ব্যবহারকারী সবাই একধরনের নজরদারির মধ্যে থাকছে; এমনকি নজরদারি করছেও। কারণ, প্রতিটি ব্যবহারকারী সচেতন বা অসচেতনভাবে প্রতিনিয়ত স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তার অবস্থা, অবস্থান, অনুভূতি চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি সবার সামনে তুলে ধরছেন। আর এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সহজেই ওই ব্যবহারকারীর সম্পর্কে অনেক ধারণা পাওয়া সম্ভব।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। দেখুন, বাস্তব জগতের পাশাপাশি মানুষ মিলছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের বন্ধনে। অনেক ক্ষেত্রে একই মানুষের ভার্চুয়াল রূপ ও বাস্তবের রূপের মধ্যে থাকছে বিস্তর ফারাক। কেউ কেউ নিজের সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলছে। টিনএজারদের মধ্যে বিশেষ করে অনেক ছেলেই কোনো মেয়ের নাম দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করছে বলে হরহামেশাই শোনা যায়। কেউ আবার নিজের নামের ছদ্মনামও ব্যবহার করছেন। অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংও এই মাধ্যম ব্যবহারকারীদের জন্য এক বড় বিড়ম্বনা| পাঠক, নিম্নোক্ত এই ব্যবহারকারীর কথাই ধরুন-

আমার সঙ্গী (স্ত্রী) (নামটি লিখছি না) এর ফেইসবুক আইডি গতকাল সন্ধ্যায় হ্যাক করা হয়েছে। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে সমুদ্র জল নাম নিয়ে অনলাইনে অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। কেউ উদ্দেশ্যমূলক বা অসুস্থ মানসিকতার কারণেই এটা করেছে বলে আমার ধারণা। আমাদের বন্ধু-শুভাকাক্ষীদের কেউ সেই আইডি থেকে নোংরা বা বিভ্রান্তিকর কোনো বার্তা পেয়ে থাকলে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

শুধু হ্যাকিং নয়, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য চুরির অভিযোগও উঠছে খোদ সামাজিক যোগাযোগ সাইটের বিরুদ্ধেই। আমেরিকায় ২০১১ সালে এরকম অভিযোগ ওঠে ফেইসবুকের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে পাচার করছে।২৪ তাহলে কি খোদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কর্তৃপক্ষই ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ নয়? আর যদি তাই হয় তাহলে এই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে মানুষ বিশ্বাস রাখবে কীভাবে?

 

মিনি হাউজ অব নিউজ

আরেকটি ১৫ আগস্ট আসন্ন। সেনাবাহিনীতে জামায়াতের হাজার হাজার সদস্য আছে আর জামায়াত শিবিরের মুজাহিদরা মিলে আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটাবে। জামায়াতের কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে জামায়াতের এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, একবার বেঁচে গেছেন, কিন্তু এবার আল্লাহ্‌র নাম নেয়ারও সময় পাবেন না। জামায়াত নেতার এই বক্তব্য চলাকালীন বিপুল সংখ্যক পুলিশও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।বিএনপির রোডমার্চ উপলক্ষে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা ডাইংপাড়া মোড়ে আয়োজিত পথসমাবেশে জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ্‌র বক্তব্য এটি।২৫

পাঠক, উপরের তথ্যগুলো ওবায়দুল্লাহ্‌ বলার অল্প সময়ের মধ্যেই জানতে পেরেছিল ফেইসবুকের অনেকেই। কেননা, তথ্যটি স্ট্যাটাস আকারে তাৎক্ষনিক জানিয়েছিলেন একটি জাতীয় দৈনিকের ব্যুরো প্রধান। তিনি ঘটনাস্থল থেকেই সংবাদটি ছবিসহ ফেইসবুকে তার ওয়ালে পোস্ট করেন। মজার ব্যাপার হলো, এত অল্প সময়ের মধ্যে ফেইসবুকে থাকা বন্ধুরা ছাড়া দেশের আর কেউই প্রায় এ তথ্যটি জানতে পারে নি। স্ট্যাটাসটি পোস্ট করার অল্প সময়ের মধ্যে এটি নিয়ে ফেইসবুক বন্ধুরা পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য পোস্ট করতে থাকেন। পরের দিন অবশ্য সংবাদটি পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল।

সংবাদটি নিয়ে এত কথা বলার কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তা তুলে ধরার জন্য। বেশিরভাগ মুঠোফোনে সহজেই আন্তর্জালে প্রবেশের সুবিধা থাকায় ব্যবহারকারীরা যখন খুশি তখনই ফেইসবুকে ঢুঁ মারার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই তাৎক্ষনিক কোনো খবর/তথ্য ছড়িয়ে দিতে আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে এই যোগাযোগ মাধ্যম। অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমের আগেই সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে আমরা সেই চিত্র দেখেছি। এই নির্বাচনের ফলাফল যে যার মতো পেরেছে স্ট্যাটাসে দিয়েছে।

এছাড়া মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর শীর্ষসংবাদগুলোও লিংক আকারে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পাওয়া যায়। আবার এমন সংবাদও পাওয়া যায়, যা নানান স্বার্থের কারণে মূলধারার গণমাধ্যমে পাওয়া যায় না। বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরাই যেন মাঝে মাঝে সাংবাদিক হয়ে যান। ফলে, রকমারি সংবাদে ভরে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর পাতা।

লগ আউট

ইতি এবং নেতি; এই দু’টি বাচকতাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য। খেয়াল করলে দেখা যাবে- ইতিবাচকতার প্রায় পুরো অংশই হলো সহজীকরণ। যে সামাজিক সম্পর্কগুলো ধরে রাখা, নির্মাণ অথবা পুনঃনির্মাণ করা মানুষের জন্য দুরূহ ছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেগুলোকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। সেটি সব দিক দিয়েই; সময় বা শ্রম যাই বলা যাক না কেন! আর নেতিবাচকতার জায়গায় একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কৃত্রিমতা। অর্থাৎ, সামাজিক-মানবিক অনেক কিছুই আজ   শংকর কিংবা কৃত্রিম হয়ে উঠেছে প্রযুক্তির সংস্পর্শে। নেতিবাচকতার বাকিটুকু আপেক্ষিক। এটুকু ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়। যেমন, সব ব্যবহারকারীই কিন্তু নিজেকে ভুলভাবে এই মাধ্যমে উপস্থাপন করেন না। এটি আসলে ব্যক্তিত্বের প্রশ্ন। যে ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আদর্শ ও অর্থনীতির মতো অনেক কিছুই এই পারিপার্শ্বিকতার জন্ম দেয়, পরিবর্তন ঘটায়।

লেখক : দেবাশীষ কে. রায়  রোকন রাকিব যথাক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর  দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী

shish07ru@gmail.com

rakib.2071@gmail.com


তথ্যসূত্র

১. ইংরেজি ‘ইন্টারনেট’ শব্দটির বাংলা হিসেবে ইদানিং ‘আন্তর্জাল’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরাও এই লেখায় ইন্টারনেটের পরিবর্তে এই শব্দটি ব্যবহার করেছি।

২. en.wikipedia.org/wiki/social_network

৩. en.wikipedia.org/wiki/social_network

৪. www.facebook.com/press/info.php

৫. en.wikipedia.org/wiki/Twitter

৬. যদিও গুগল প্লাস বলছে, তারা ফেইসবুকের আদলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়। তারা মূলত তাদের পণ্যের প্রসার ঘটাতেই এ ধরনের একটি সাইট খুলেছেন। তাই তারা একে পুরোপুরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে নারাজ। বিস্তারিত দেখতে পারেন: ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয় গুগল প্লাস’; প্রথম আলো, ১৩ নভেম্বর ২০১১।

৭. ‘আন্দোলনের নতুন হাতিয়ার সামাজিক মাধ্যম’; মিডিয়া ওয়াচ, বর্ষ-২, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১।

৮. স্ট্যাটাস হলো ফেইসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ব্যবহৃত একধরনের ফিচার যার মাধ্যমে ব্যবহারকারী তার চিন্তা, কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার ওয়ালে ট্যাগ করে থাকেন। অনেক সময় ব্যবহারকারী তার ওয়াল ছাড়া সাধারণ নিউজ ফিডেও ‘স্ট্যাটাস’ লিখে থাকেন।

৯. হক, ফাহমিদুল; ‘বাংলা ব্লগ কমিউনিটি: মতপ্রকাশ, ভার্চুয়াল প্রতিরোধ অথবা বিচ্ছিন্ন মানুষের কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা’; যোগাযোগ, সম্পাদক: ফাহমিদুল হক ও আ. আল মামুন, সংখ্যা-১০, জানুয়ারি ২০১১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১০. ‘ফেইসবুক ও টিনএজার স্বাস্থ্য; প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১১।

১১. ফেইসবুকের সফলতার রহস্য’; কালের কণ্ঠ; ১ জুলাই ২০১১।

১২. প্রাগুক্ত, প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১১।

১৩. একাধিক ব্যবহারকারী যখন সমস্বার্থের ভিত্তিতে কিছু নীতিমালার উপর নির্ভর করে তাদের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের গোষ্ঠীবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকেই ‘গ্রুপ’ বলা হয়।

১৪. প্রাগুক্ত, প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১১।

১৫. প্রাগুক্ত, প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১১।

১৬. প্রাগুক্ত,প্রথম আলো; ২৪ আগস্ট ২০১১।

১৭. ফেসবুকের নেশায় বুঁদ হচ্ছে শিশুরাও’; দৈনিক ইত্তেফাক; ১২ মে ২০১১।

১৮. প্রাগুক্ত, দৈনিক ইত্তেফাক; ১২ মে ২০১১।

১৯. Facebook ID : Asadur Rahman Lablu

২০. Facebook ID : Mostafiz Gony

২১. Facebook ID : Atiqur Rahman Tamal

২২. Facebook ID : Meherul Hasan Sujon

২৩. ওবামার মেয়েদের ফেইসবুক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা’; কালের কণ্ঠ; ১৯ ডিসেম্বর ২০১১।

২৪. http://forum.projanmo.com/topic20411.html

২৫. Facebook ID : Anu Mustafa


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন