Magic Lanthon

               

জিয়াউল হক জিয়া

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

এফএম রেডিও : ‘ভূত’ আর ‘লাভ’  এর সমান্তরাল চলা

জিয়াউল হক জিয়া


একসময় এদেশে রেডিও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম। কিন্তু গত দেড় দশকে এ সমপ্রচার মাধ্যমটি অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তা হারানোর অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, গতানুগতিক ‘বস্তাপঁচা’ আধেয় এবং ৯০’র দশকের পর  ঘরে ঘরে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রবেশ। এর ফলে যেটা হলো, এদেশের বেশিরভাগ মানুষ রেডিও শোনা প্রায় ভুলেই গেল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, রেডিও বলে একসময়ের যুগান্তকারী এই যন্ত্রটি হারিয়ে যেতে বসল। দু’টি ইন্দ্রিয় একসঙ্গে সচল রাখার ক্ষমতা থাকায় টেলিভিশনের হাতে তখন ছিল পুরো রাজত্ব। কিন্তু কীভাবে যেন একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে অনেকেই আবার রেডিও’র শ্রোতা হয়ে উঠলেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে রেডিও হয়ে উঠল নতুন এক সম্প্রচার মাধ্যম। তবে এই রেডিও আগেকার সেই এএম রেডিও নয়; নতুন প্রযুক্তি এফএম২ রেডিও আর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন। ২০০৬ সালে বেসরকারিভাবে রেডিও টুডে মাধ্যমে দেশে এফএম’র যাত্রা শুরু করে। জনপ্রিয়তার কারণে দিন দিন তার দল ভারি হয়েছে। রেডিও ফুর্তি, রেডিও আমার, এবিসি রেডিও, পিপলস্‌ রেডিও তো আছেই, আরও নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সাতটি রেডিও।

এখন প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক, একের পর এক এফএম রেডিও আসছে, ঘটনা কী? কেউ ইচ্ছে করলে রেডিও টুডে কর্ণধার রফিকুল হকের মন্তব্যের মধ্যে উত্তর খুঁজতে পারেন। তার ভাষায়, ‘আমরা যখন রেডিও নিয়ে এ ধরনের চিন্তা করি তখন রেডিওর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আমি যখন রেডিও নিয়ে কথা বলতাম, মানুষ আমাকে পাগল বলত।...আমি মনে করি কনটেন্ট যদি ভাল করা যায়, রেডিওটা আবার ফিরে আসবে।...প্রথমে যেটা করার চেষ্টা করেছি যে, কনটেন্টটা ভাল করার চেষ্টা করেছি।’ রফিকুল হকের কথা একাংশ সত্যি হয়েছে এই অর্থে যে, রেডিও আবার ফিরে এসেছে। আর এটি করতে তিনি চেষ্টা করেছেন কনটেন্ট বা আধেয় ভাল করতে। তিনি বা তারা (এফএম রেডিও কর্তৃপক্ষ) আধেয় কতটুকু ভাল করতে পেরেছেন তা বলা মুশকিল। তবে আধেয়গুলোকে বিশ্লেষণ করা আমার মতো নবীণ লেখকের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ। তাই, এই লেখায় সেটিই করার চেষ্টা করব। আর এক্ষেত্রে আমি বেছে নিয়েছি এই রেডিওগুলোর সেই সব অনুষ্ঠান, যেসব অনুষ্ঠানের উপর ভিত্তি করেই তারা জনপ্রিয়।

কে ওখানে? ভূত এফএম

‘কলেজের হোস্টেলের এক কক্ষে দু’টি মেয়ে থাকত। এক রাতে তাদের একজনের ওয়াশ-রুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। ওয়াশ-রুম ঘরের কাছে হওয়ায় মেয়েটি একাই সেখানে যায়। রাতও তখন খুব বেশি ছিল না। ওয়াশ-রুম থেকে বের হয়ে সে একটি শব্দ শুনতে পেয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারে শব্দটি জানালার দিক থেকে আসছে। শব্দটি কিসের জানার জন্য মেয়েটি জানালার একদম কাছে গিয়ে দেখতে পায় উপর থেকে জানালায় কিছু একটা ঝুলছে। সে আরও কাছে গিয়ে ঝুলন্ত দু’টি রক্তমাখা পা দেখতে পায়। পা দুটো ঠিক উল্টোভাবে ঝুলানো। হাঁটুর নীচ থেকে ছিন্ন করা পা দুটোর কাটা অংশ নিচে আর পায়ের পাতা উপরে। মেয়েটি ভয়ংকর এ দৃশ্য দেখে দৌড়ে কোনমতে তার কক্ষে পৌঁছায়। কক্ষে গিয়ে দেখে তার রুমমেট বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। মেয়েটি রুমমেটের কাছে সব ঘটনা খুলে বললে তা শোনার পর রুমমেট অদ্ভুত হাসি দিয়ে তার পায়ের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে বলে দেখত এই দু’টি পা নাকি?

মেয়েটি তখন দেখে জানালায় সে যে দু’টি পা দেখেছিল তার রুমমেটের পা দু’টি ঠিক সেই রকম। এটা দেখে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলে মেয়েটি দেখে চারপাশে তার সেই রুমমেটসহ অনেকে বসে আছে। তারপর মেয়েটি সবাইকে এই সব ঘটনা খুলে বলে। তখন রুমমেটটি বিস্ময়ের সাথে বলে, তার রুমমেট যখন ওয়াশ-রুমে যায় সঙ্গে সঙ্গে সেও বই আনার জন্য কক্ষের বাইরে যায়। পরে বই নিয়ে এসে দেখে তার রুমমেট অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তারপর সে সবাইকে ডেকে আনে।’

এই ছিল রেডিও ফুর্তিতে ১৫ অক্টোবর ২০১১ এ প্রচারিত ভূত এফএম অনুষ্ঠানে ই-মেইলে পাঠানো তাজ নামের একজন শ্রোতার বর্ণিত একটি ঘটনা। শুধু ই-মেইলেই নয়, অনেকেই অতিথি হয়ে এসে এ ধরনের নানা ঘটনা সরাসরি ভূত এফএম এ অন্য শ্রোতাদের কাছে বর্ণনা করেন। ভূত এফএমের আয়োজন এখানেই শেষ নয়। তাদের ভূত-বিষয়ক স্পেশাল টিমও রয়েছে। যারা ভূত-বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রচার করে। আর অনুষ্ঠান চলাকালীন ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভৌতিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করে থাকেন। খুব আত্নবিশ্বাসী হয়ে ও গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এ ছাড়া উপস্থাপক মাঝে মাঝে ভৌতিক ঘটনাটিকে শ্রোতাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য অতিথিকে নানাভাবে প্রশ্ন করে থাকেন। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অতিথিরা অনেক সময় বিব্রতবোধ করেন। ফাঁকে ফাঁকে চলে পাঠকের খুদে-বার্তা (এসএমএস) পড়া। এই হলো ভূত এফএমের আধেয় ও মূল উপজীব্য।

এখন এই উপজীব্য নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। এই উপজীব্য’র প্রধান দাবি হলো- ভূত-পেতী্ন আছে। দাবি বলছি এ কারণে যে, অন্য একদিনের অনুষ্ঠানে এক শ্রোতা যখন ভূত বিশ্বাস করেন না, বলে একটি খুদে-বার্তা পাঠান; তখন সেই শ্রোতার উদ্দেশে উপস্থাপক বলেন, ‘তো আপনি শুনছেন কেন? গো টু স্লিপ।’ অর্থাৎ অনুষ্ঠান শুনবেন কি না তা আপনার ব্যাপার; কিন্তু ভূত বলে একটা বিষয় আছে তা আপনাকে মানতে হবে। আর শ্রোতাকে যদি ভূতে বিশ্বাস করানো যায় তাহলে যা যা ঘটছে-

প্রথমত, ঝাড়ফুঁক, তাবিজসহ এই ধরনের চিকিৎসাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এসব বিষয় সাধারণত চিকিৎসাবিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় তাদের অব্যর্থ শক্তি দিয়ে। অথচ একবিংশ শতাব্দিতে এসে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রেডিও’র এই স্বীকিৃতি বা বৈধতা দেওয়ার অর্থ কী তা আমাদের জানা নেই।

দ্বিতীয়ততরুণ প্রজন্মকে কুসংস্কারে বিশ্বাসী করানো হচ্ছে। পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন, এই অনুষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রোতাই তরুণ। এদের অনেকেই হয়ত এই অনুষ্ঠান শুরুর আগে এ ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই অনুষ্ঠান শোনার ফলে তার মধ্যে একধরনের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে।

তৃতীয়ত, এ ধরনের অনুষ্ঠান তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। কারণ এই অনুষ্ঠানে অনেক শ্রোতা খুদে-বার্তার মাধ্যমে জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান শুনে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তাদের গা ছমছম করে। এছাড়াও অনেকে বলেছেন যে, তারা অনুষ্ঠান শোনার পর একা একা বাইরে যেতে ভয় পায়।

উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, এতে এফএম রেডিও কিংবা গণমাধ্যমের কী লাভ। লাভ আছে। আমরা জানি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর ভিত্তি করে একটি সংগঠিত সমাজের সৃষ্টি হয়। সংগঠিত সেই সমাজের অনেক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ কিন্তু নির্দিষ্ট করে দেয় এসব প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম একটি। আর গণমাধ্যম সম্পর্কে একথা অনেকেই বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগী হয়ে আধিপত্যশীল ধারার গণমাধ্যম আপামর জনসাধারণের ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালন’ করে ক্ষমতাবান শ্রেণীর পক্ষে নিয়ে যাবে।’ এই ধরনের কথা সত্যি হওয়া মানে গণমাধ্যম অবশ্যম্ভাবীরূপে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতাকে প্রসার করতে ভূত-পেত্নীর ওপর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় বা অদৃষ্টবাদকে ব্যবহার করবে। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পারব গণমাধ্যম এই ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেও।

ভাগ্যগণনা, রাশিফল, কুইজ ও নানান অলৌকিক বিশ্বাসকে উপস্থাপন কোনো নতুন বিষয় নয়। বলা যায়, এসবের ধারাবাহিকতায় এখন যুক্ত হয়েছে ভূত-পেত্নীর ওপর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। আর এসব প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম ‘জনগণের বৃহত্তর অংশকে নৈতিকভাবে নিঃস্ব-দুর্বল করে ফেলছে। সাধারণ মানুষকে মিডিয়া বি-রাজনৈতিক করে ফেলছে যাতে করে কোনোরকম ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন যে সম্ভব এমন আশাটুকুও তারা পরিত্যাগ করে এবং জনজীবন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে, সামাজিক পিরামিডের শীর্ষস্থানীয়দের ও অদৃষ্টের হাতে সমাজের সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। এতে করে যেটি হয়- জনগণ মনে করে পরিশ্রম বা আন্দোলন করে আসলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়; ভাগ্যে যা আছে তাই হয়। পাশাপাশি তারা মেনে নিতে শিখে, মানুষের ইচ্ছা পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; নিয়ন্ত্রিত হয় অতিপ্রাকৃতিক বা ‘ভূত-পেত্নী’ দ্বারা। কিন্তু পাঠক আামরা জানি, শিক্ষিত করা ও সচেতনতা সৃষ্টি করা গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেদিক থেকে বলা যায়, গণমাধ্যম বা এফএম রেডিও তাদের দায়িত্বের কথা মাঝে মাঝেই ভুলে যায়।

লাভ-গুরু : সবজান্তা নাকি পীরবাবা

বেসরকারি এফএম রেডিও রেডিও আমার এর একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান লাভ-গুরু। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে স্টুডিওতে একজন এসে সরাসরি তার ভালোবাসার গল্প শোনান। এখানে সাধারণত এমন ব্যক্তিদের আনা হয়, যারা প্রেম করে সফল বা ব্যর্থ হয়েছেন অথবা সদ্য প্রেমে পড়েছেন। তবে আগ্রহী যে কেউ ফোন করে অনুষ্ঠান চলাকালীন এতে অংশ নিতে পারেন। সবকিছুর বাইরে এখানে আরও একজন থাকেন। তিনি লাভ-গুরু। যিনি অনুষ্ঠানের মূল নায়ক। এ ছাড়া সহযোগী হিসেবে আরজে টুটুল এবং মেঘলার মতো দু-একজন। এদের কাজ হলো শ্রোতাদের খুদে-বার্তা পড়ে সেগুলো সম্পর্কে মন্তুব্য করা। আর লাভ-গুরুর কাজ অনেক। তিনি মনোবিজ্ঞানী না হয়েও শ্রোতাদের বিভিন্ন সমস্যা শোনার পাশাপাশি সেগুলোর সমাধান দেন। অনেকেই আবার ফোন করে তার (লাভ-গুরুর) নেক-নজর কামনা করেন। লাভ-গুরুর আশীর্বাদ থেকে বাদ পড়ে না বাসর-ঘরের কিংবা হানিমুনের নবদম্পতিরাও।

পাঠক, লাভ-গুরুর মতো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমাদের সমাজে আরও আছে। যারা আপনাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রেমের নিশ্চয়তা দেয়। যারা বলে দেয়- কেন আপনার প্রেম ভেঙে গেল, কে আপনার প্রেম ভেঙে দিল, কিংবা কে ভেঙে দিতে পারে ইত্যাদি। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে আমরা মুশকিল আহ্‌সান কেন্দ্র হিসেবে জানি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দিতে এসে আমরা এও জানি, এই ধরনের ব্যবসা পুরোটাই ধান্দাবাজি, এর কোনো ভিত্তি নেই। এখন প্রশ্ন লাভ-গুরুর সাথে মুশকিলে আহসান কেন্দ্রের ভিত্তিগত কোনো পার্থক্য আছে কি না? যদি না থাকে তাহলে এগুলোকে পাঠক কী বলবেন?

এই অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসেন একজন; তিনি মূলত রেডিও কর্তৃপক্ষ দ্বারাই মনোনীত বা নির্বাচিত হয়ে থাকেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে ফোন কিংবা ক্ষুদে-বার্তায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে প্রত্যেক শ্রোতার। একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, এই অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক-অর্থনীতির একটা বড় অংশ কিন্তু এই জায়গায়। যত বেশি শ্রোতা এখানে জড়াবেন, তত বেশি ফোন, ক্ষুদে-বার্তা আসবে তত বেশি অর্থ। আর শ্রোতা বা শ্রোতার অংশগ্রহণ বাড়ানোর চিন্তা থেকেই লাভ-গুরু, ভালোবাসার গল্প আর উপদেশ। এখানে যে বিষয়গুলো লক্ষণীয় সেগুলো হলো- লাভ বা ভালোবাসা নিয়ে তরুণ সমাজের একটা সহজাত আগ্রহ রয়েছে। টিনএজারদের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে যে উপচে পড়া আবেগ সেটাই এ অনুষ্ঠানের মূল পুঁজি। দ্বিতীয়ত, প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে  এসব গদে আব্বাস উপদেশ দেওয়াও অপেক্ষাকৃত সহজ।

বাংলিশ ভাষা  উচ্চারণ চর্চা

দেখা যায় না বলে রেডিওর ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তিই ভরসা। এ কারণে শ্রোতার মনোযোগ পুরোটাই থাকে শব্দের দিকে; বলা যায় ভাষার দিকে। তাই, এখানে ভাষার ব্যবহার, উচ্চারণ, বলার ভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটি শক্তিশালী ভূমিকা থাকে। তাছাড়া, এগুলোর যথাযথ ব্যবহার না হলে শ্রোতার কাছে অনেক সময় প্রকৃত অর্থ পৌঁছতে নাও পারে। আর এসব কারণে এফএম কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। কিন্তু তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা থাকেন না, থাকলে হয়ত আজকে এই আলোচনা করতে হতো না।

খেয়াল করে দেখেছি যে, বাংলাদেশের এফএম রেডিওগুলো বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে নতুন ঢঙে একটু ইংরেজির সুর মিশিয়ে এক ‘অদ্ভুত’ ধরনের বাংলাভাষা চালু করেছেন। অনেকেই রসিকতা করে যাকে বলেন ‘বাংলিশ’। পাঠক, খুঁজে দেখলে আপনিও এফএম রেডিওগুলোর বিভিন্ন আলাপচারিতা, ম্যাগাজিন, টক-শো ইত্যাদিতে এই ‘বাংলিশ’ এর সন্ধান পাবেন। আমি যেগুলো পেয়েছি সেগুলো নিচে একটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি-

একটা অনুষ্ঠানে একজন রেডিও জকি বললেন, ‘হেই, ওয়েলকাম বন্ধুরা স্টুডিওর ঘড়িতে এখন এক্সাক্টলি ১১টা বেজে ২৯ মিনিট। আর তোমার সঙ্গে আছি আমি তোমার ফ্রেন্ড .... ইউর ডিয়ার ফ্রেন্ড...।’ এক শ্রোতা অভিমান করে খুদে-বার্তা পাঠিয়েছে, ‘ভাইয়া বিলিভ মি।’ আরজের উত্তর, ‘ওক্‌-খে, নো প্রবলেম ডার্লিং, থ্যাংক ইউ।’ আরেকটি অনুষ্ঠানে আরজে বললেন- মিরপুর থেকে নাতাশা লিখেছে ভাইয়া, ‘আই ওয়াজ বিজি সো দ্যাট আই ক্যান নট হেয়ার ইউ, বাট নাও আই জয়েন ইউ। গ্রেট। ওক্‌-খে, বন্ধুরা চলো এবার প্লে করছি আইয়ুব বাচ্চুর গান। এই গানটি হিমেল ডেডিকেট করেছে তার বন্ধু নাইয়ান, তামিম, ঝর্ণাকে।’

এই হলো তাদের ভাষার ব্যবহার। পাঠক, এটাকে কোন ভাষা বলবেন। ইংরেজি না বাংলা? যা খুশি বলতে পারেন। কিন্তু এই কথাগুলো কি বাংলায় বলা সম্ভব ছিল না? ‘এক্সাক্টলি’র কথাই ধরুন। এর বাংলা কোনো শব্দ কি আমাদের অভিধানে নেই? আছে, ঠিকই আছে। আর সেটি ব্যবহার করে ‘ঠিক ১১টা বেজে ২৯ মিনিট’ বললে কি কেউ বুঝত না? সবাই বুঝত। বরং ‘এক্সাক্টলি’ই যে অনেকে বোঝেন না তা নিশ্চিত। আমার মনে হয়, এটা তারাও (কর্তৃপক্ষ) জানেন। আর জানলে একথা কি বলা যায় না যে, তারা তাদের অনুষ্ঠানগুলো করেন নির্দিষ্ট কিছু শ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে; যে শ্রোতারা ‘এক্সাক্টলি’র পাশাপাশি ডার্লিং, প্লে, প্রবলেম ইত্যাদির অর্থ বোঝেন। আর যারা এসব অনুষ্ঠানে খুদে-বার্তা পাঠান তাদের নামের মধ্যেও একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তাদের কাঙ্খিত শ্রোতা। যেমন- টাইগার হিমেল, বন্য আরিফ, সন্ন্যাসী ইমন।

এবার আসি উচ্চারণে। ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণ হরহামেশাই কানে লাগে। যেমন : ‘রক্ষা’ শব্দটি তারা উচ্চারণ করে রক্‌খা। অনুরূপভাবে, ‘সন্ন্যাসী’কে সন্‌ন্যাসী, বিহ্বল কে বিহ্‌ভল উচ্চারণ করেন। উচ্চারণ নিয়ে কথা বলার কারণ- এই উচ্চারণকে আমাদের তরুণ সমাজ অনুকরণ করে। তরুণরা মনে করে, রেডিওতে ভুল উচ্চারণ করার কথা নয়; তাহলে রেডিও’র উচ্চারণ অনুসরণ বা অনুকরণ করা যায়। এই যে গণমাধ্যমের ওপর আমাদের বিশ্বাস সেটি কি ঠিক থাকল?

ইংরেজি ভাষায় ছোট-বড় সবাইকে ইউ সম্বোধন করা হয়। ইউ এর বাংলা হলো তুমি। যাই হোক, এটি ইংরেজদের সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা ছোট কিংবা সমবয়সীদের সাধারণত ‘তুই’ অথবা ‘তুমি’ সম্বোধন করি, অপরিচিত ব্যক্তি এবং বড়দের করি ‘আপনি’ সম্বোধন। এটি আমাদের সংস্কৃতি। এখন দেখার চেষ্টা করি, এই ক্ষেত্রে আমাদের এফএম রেডিওগুলো কোন সংস্কৃতি অনুসরণ করে।

খেয়াল করলে দেখবেন, প্রতিটি রেডিও দর্শকদের বেশিরভাগ সময় ‘তুমি’ সম্বোধন করে। রেডিও টুডে কথাই বলি। অক্টোবর মাসের একটি অনুষ্ঠানে একজন আরজে শ্রোতার সাথে ফোনে সরাসরি কথা বলছিলেন। প্রথমে তিনি সেই শ্রোতাকে ‘তুমি’ করে সম্বোধনকরার পর তার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরে যখন বুঝতে পারলেন শ্রোতা গৃহিনী তখন আপনি বলতে বাধ্য হলেন।

এখানে দু’টি বিষয় লক্ষ্যণীয়। প্রথমত, তারা ‘তুমি’ সম্বোধনটিকে একটি আদর্শ মান হিসেবে ধরে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তারা ধরেই নেন যে, তাদের সব শ্রোতাই তরুণ। প্রথমটি সত্য হলে বলা যায়- তারা অন্য কোনো সংস্কৃতিকে লালন করেন। দ্বিতীয়টি সত্য হলে, তারা তরুণের বাইরে কোনো শ্রোতা তাদের অনুষ্ঠানে আশা করেন না। আবার দুটোই সত্য হওয়া মোটেও আশ্চর্যের বিষয় নয়।

আরও দুই-তিনটি অনুষ্ঠান নিয়ে চার-পাঁচটি কথা

রেডিও টুডে লোগোতে লেখা রয়েছে ‘রেডিও টুডে দি স্টেশন অব দ্য নেশন’। অর্থাৎ এটি পুরো জাতির একটি মাধ্যম। যদিও এখন পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, এবং বগুড়ার বাইরে এই চ্যানেলের সম্প্রচার নেই। এ কথাগুলো এজন্য বলছিলাম যে, সারা দেশে সম্প্রচার নেই বলে তারা সারা দেশের মানুষকে গুড মর্নিং পর্যন্ত বলে না। কেবল গুড মর্নিং ঢাকা, গুড মর্নিং চট্টগ্রাম, গুড মর্নিং খুলনা এবং গুড মর্নিং বগুড়া দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করে। অথচ স্লোগান দেয় ‘রেডিও টুডে দি স্টেশন অব দ্য নেশন’।

আসলে জাতির কথা কেবল তাদের লোগোতেই আছে। অনুষ্ঠানে নেই। তাদের সবকিছুই তৈরি করা হয় একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর শ্রোতার জন্য। অনুষ্ঠানের নামগুলোও সেই সাক্ষ্য দেয়। কারণ- টুডেজ ওয়ার্ল্ড মিউজিক, ধুম ট্র্যাক, টুডেজ আড্ডা, টুডেজ হ্যাপি মোমেন্ট, মাস্তি আনলিমিটেড ইত্যাদি অনুষ্ঠানগুলো সব শ্রেণীর শ্রোতার জন্য হওয়ার কথা নয়।

এবার আসা যাক রেডিও টুডে সংবাদে। সারা দিনে এই রেডিও ছয়বার সংবাদ প্রচার করে। যার বড় অংশ জুড়ে থাকে ঢাকার সংবাদ। ঢাকার কোথায় যানজট, কোথায় কোন অনুষ্ঠান, কোথায় কী ঘটল- পুরো সংবাদ জুড়ে তারই বিবরণ। তাহলে কি শুধু ঢাকাকে নিয়েই সংবাদ? এখানে স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু এত কম কেন? কৃষি, পল্লী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য , শিক্ষা এবং তৃণমূল কি এতই কম সংবাদমূল্য বহন করে?

তৃতীয়ত, আরও একটি বিষয়ে বলা যায়। যেসব বিষয় রেডিওতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- জনসচেতনতা, মানুষকে উন্নয়নের দিকে ধাবিত করা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিশু ও নারী নির্যাতন রোধ, প্রতিবন্ধী কল্যাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, কৃষি ও চাষাবাদ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বনায়ন, মৎস্য পালনসহ গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশ অর্থাৎ সর্বোপরি কল্যাণকর ইস্যুসমূহ বেসরকারি এফএম রেডিও চ্যানেলগুলোতে স্থান পাচ্ছে না। কিন্তু একটি জনপ্রিয় জাতীয় গণমাধ্যমের অবশ্যই এগুলো দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যদি তারা এসব  না  করে তবে কীভাবে এটাকে আমরা জাতীয় গণমাধ্যম হিসেবে মেনে নেব।

বাই, গাইস...

বলা যায়, রেডিও’র যে জনপ্রিয়তা ছিল তার পুনর্জন্ম হয়েছে। কারণ, পাঁচ বছর আগেও এই জনপ্রিয়তা প্রায় মরতে বসেছিল। যদিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠার দুই পরিপ্রেক্ষিত দুই রকমের। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারের পতনসহ জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে জনগণের আশার প্রতিফলন ঘটিয়ে রেডিও অর্জন করেছিল জনপ্রতিনিধিত্ব। যে জনপ্রতিনিধিত্ব ছিল রেডিও’র আগের জনপ্রিয়তার মূল উপজীব্য। এখনকার উপজীব্যও সেই প্রতিনিধিত্ব। পার্থক্য এইটুকু, সেটি ‘জন’ থেকে সংক্ষেপিত হয়ে ‘নির্দিষ্ট শ্রেণী’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু এফএম রেডিও’র কর্ণধাররা পথচলার শুরুতে যে স্বপ্নের কথা বলেছিলেন সেখানে এই নির্দিষ্ট শ্রেণীর উল্লেখ করেন নি। হয়ত তারা সব শ্রেণীর কথাই বলেছিলেন। আর আমরাও তাই বিশ্বাস করতে চাই। আমরা চাই এফএম রেডিও ‘এক্সাক্ট’কে ঠিক করুক; একই সাথে ‘লিসেনার’ থেকে ফিরে আসুক শ্রোতায়।

লেখক  : জিয়াউল হক জিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী

ziamcj@gmail.com

তথ্যসূত্র

১.এমপ্লিটুয়েড মডুলেশন বা সংক্ষেপে এএম; ফ্রিকোয়েন্সি এফএম এর চেয়ে বেশি, যদিও ফ্রিকোয়েন্সির নানান ধরন রয়েছে।

২. ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশন বা সংক্ষেপে এফএম; ১৯৩০ সালে এডউইন এইচ আর্মস্ট্রং এর আবিষ্কারক; সম্প্রচার-দূরত্ব সাধারণত ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে, কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহারের মাধ্যমে এই দূরত্ব বাড়ানো সম্ভব।

৩. ‘আরও আটটি নতুন এফএম রেডিও আসছে’; প্রথম আলো; ২৭ অক্টোবর, ২০১০।

৪. বিবিসি বাংলা সংবাদ; রাত ১০টা ৩০ মিনিট; ১৩ অক্টোবর ২০১১।

৫. মামুন, আ. আল; ‘মিডিয়া ও ক্ষমতার মিথোজীবিতা: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সহায়ক নাকি হুমকি’; যোগাযোগ, সম্পাদক: ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৫, জানুয়ারি ২০০৩, পৃ-৬৬, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

৬. হায়দার,কাজী মামুন; ‘গণমাধ্যমে অদৃষ্টবাদের উপস্থাপন : একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের আধেয়-বিশ্লেষণ যোগাযোগ, সম্পাদক : ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃ-১০০, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়, ঢাকা।

৭.  ‘এফএম রেডিওর ভাষা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’; মিডিয়া ওয়াচ, বর্ষ-২, সংখ্যা-৮, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১।

৮. বিশ্বাস, নরেণ (২০০৩); বাংলা একাডেমী বাঙলা উচ্চারণ; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন