Magic Lanthon

               

তাহ্‌সিন আহমেদ ও তৈয়ব তরুণ

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ছেড়ে দে মা হাতের বাঁধন : টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে  শিশুদের উপস্থাপনা নিয়ে দুটো কথা

তাহ্‌সিন আহমেদ ও তৈয়ব তরুণ


১৯৯৩ সালের ৯ অক্টোবর আমেরিকার ওহিও প্রদেশের মোরাইনে থেকে সংবাদ সংস্থা একটি খবর পাঠায়। খবরটি এমন­­- পাঁচ বছরের একটি শিশু আগুন নিয়ে খেলতে গিয়ে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, সেই আগুনে পুড়ে মারা গেছে তার ছোট বোন। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নামে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশকে তার মা-বাবা জানান, এমটিভির ‘বিভিজ অ্যান্ডস-বাট-হেড’ নামে একটি কার্টুনের ভক্ত ছিল তাদের সন্তানেরা। কার্টুনটিতে প্রায়ই দেখানো হতো দু’টি শিশু সময় কাটানোর জন্য হাতের কাছে যাই পেত তাতেই আগুন ধরিয়ে দিত। তারা মনে করছেন, সেখান থেকেই তাদের সন্তানদের এই বিদ্যা শেখা।১

টেলিভিশন দ্বারা সম-আবেগ সৃষ্টি, তথা মনোজগত নিয়ন্ত্রণের যে সম্ভাবনা ম্যাকলুহান প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা আজ ভয়ঙ্কর বাস্তবে পরিণত হয়েছে; উপরের ঘটনাটি পড়ার পর তা আর বুঝতে বাকি থাকে না।ম্যাকলুহান বলেছিলেন, ‘মানুষের মনোজগত একসময় নিয়ন্ত্রণ করবে টেলিভিশন।’২ ম্যাকলুহানের ওই বক্তব্যের প্রমাণ ও প্রতিফলনে বর্তমান বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনীতিতে টেলিভিশন পালন করছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমান সময়ে পণ্য বিপণনের উপযোগী মানসিকতা গড়তে টেলিভিশনের চেয়ে অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসূ মাধ্যম আর নেই বললেই চলে। তাই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য বিপণনের জন্য এই মাধ্যমের প্রভাবকে কাজে লাগাতে মোটেও কার্পণ্য করছে না। আর এক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিজ্ঞাপনকে।

জীবনের জন্য পণ্য উপকরণ নয়, বরং পণ্যভোগের জন্যই জীবন-বিজ্ঞাপন সাধারণত এই দর্শনই প্রচার করে। পুঁজিবাদি বাণিজ্যিকীকরণের আধিপত্য থেকে কোনো মানুষেরই মুক্তি নেই। এমনকি শিশুরাও এর থেকে ছাড় পাচ্ছে না। ভাল করে দেখলে বোঝা যায়, শিশুরা বিজ্ঞাপনের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর গণমাধ্যমে ১৯৭০ সাল থেকে শিশুদের বিজ্ঞাপনে উপস্থাপন অনেক বেড়ে যায়।৩ এসব দেশে একই সঙ্গে বাড়তে থাকে বিজ্ঞাপনে শিশুর ব্যবহারও। গণমাধ্যমের অভাবনীয় প্রসারে শুধু পাশ্চাত্য নয়, আমাদের দেশের গণমাধ্যমও এখন আর পিছিয়ে নেই।

মুঠোফোন থেকে শুরু করে সয়াবিন তেল, মসলাসহ প্রায় সব বিজ্ঞাপনে শিশুদের উপস্থিতি অহরহ। আর শিশুরা এসব বিজ্ঞাপনের ভাল দর্শকও।‘আর যখন শিশুর মাধ্যমে কোনো বাণিজ্যিক বার্তা দেওয়া হয় তা দর্শকদের বিশেষ মনোযোগ।’৪ এবং শিশুদের ওপর বড়দের মানবিক আবেদন থাকায় ওই সব পণ্য ক্রয়ে তাদের আগ্রহী হতেও দেখা যায়। এখানে শিশুদের অনেকটা  ‘ছদ্ম বিক্রেতা’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে শিশুরা যখন বিজ্ঞাপনে তাদের সমবয়সী কাউকে কোনো পণ্য কিনতে বা ব্যবহার করতে দেখে, তখন সেই পণ্যের ব্যাপারে তাদের আগ্রহও প্রবল হয়। পাশাপাশি শিশুরা অনুকরণপ্রিয় হওয়ায় তাদের পছন্দ-অপছন্দ, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, রুচিবোধ বাজারি স্বার্থের আদলে গড়ে উঠতে থাকে।

গত ছয় মাসে টেলিভিশন দেখতে গিয়ে আমরা বিজ্ঞাপনে শিশুদের উপস্থাপনের বিভিন্ন দিকগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। সাথে সাথে নিয়মিত পাঠচক্রে৫ ও বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনাও হয়েছে। সমসাময়িক বিজ্ঞাপনে শিশুদের উপস্থাপনের নানান ঢং আমাদের বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। বর্তমান যুগে যেহেতু বিজ্ঞাপন থেকে বিছিন্ন থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, তাই এ সংক্রান্ত যথাযথ জ্ঞানই পারে বিজ্ঞাপনকে আমাদের মাথায় চেপে বসা থেকে রুখতে। তাই ম্যাজিক লণ্ঠন পরিবার নিয়মিত আয়োজন হিসেবে রাখতে চেয়েছে বিজ্ঞাপন ব্যবচ্ছেদ নির্ণয়। গত সংখ্যায় বিজ্ঞাপনে  নারীর উপস্থাপনার বিষয়টিতে আলোকপাত করা হয়েছিল। এই সংখ্যায় আমরা শিশু সংক্রান্ত কয়েকটি বিজ্ঞাপনের ব্যবচ্ছেদের চেষ্টা করব।

.

আমরা প্রথমে একটি বেসরকারি কর্পোরেট ব্যাংকের বিজ্ঞাপন নিয়ে কথা বলব। প্রাইম ব্যাংকের এ বিজ্ঞাপনটিতে ঋণ নিয়ে বাড়ি-গাড়ি করার ব্যাপারে ভোক্তাকে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনটিতে মূল চরিত্র চারটি। বাবা ও তার শিশুপুত্র। শিশুটির সহপাঠী রিয়া ও সমবয়সী প্রতিবেশী মন্টু। চাকুরিজীবী বাবা ও গৃহিণী মাকে নিয়ে তিন জনের ছোট পরিবার। এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে বাবা ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। বাবার অসাবধানতায় টেবিল থেকে শিশুটির স্কুলব্যাগ পড়ে যায়। ব্যাগের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা বই-খাতাগুলো তুলতে গেলে বাবার চোখ আটকে যায় একটি ড্রয়িং খাতায়। যেখানে শিশুটি তার বাবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা ও ছবি এঁকেছে। তখন বাবা কল্পনায় দেখতে থাকেন সেগুলো--

তার সন্তান বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটছে। এমন সময় প্রতিবেশী বন্ধুদের খেলার বলটি প্রাচীরের উপর দিয়ে তার হাতে এসে পড়ে। সে মহানন্দে বলটি কুড়িয়ে তাদের সাথে খেলার উদ্দেশ্যে গেট দিয়ে ঢুকতে যায়। কিন্তু প্রতিবেশী মন্টু বলটি কেড়ে নিয়ে বাড়ির গেট লাগিয়ে দেয়। সাথে সাথে বিজ্ঞাপনে শিশুটির কণ্ঠে আকুতির স্ক্রিনে ভেসে আসে-‘বাবা আমাদের জন্য যে বাড়িটা কিনে দেবে তাতে একটা মাঠও থাকবে। আর আমরা সারা দিন খেলব। মন্টুদেরও নেব খেলতে। আমি আর বাবা হব আমাদের দলের ক্যাপ্টেন।’

এরপর বাবা হাতে তুলে নেন আরেকটি ছবি। যেখানে তার চোখে ভেসে ওঠে - বৃষ্টির দিন। স্কুল শেষে ঝুম-বৃষ্টির মধ্যে তার সন্তান সহপাঠী রিয়ার গাড়িতে উঠতে চায়। কিন্তু রিয়া তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। এমন সময় আবার সেই আকুতি-‘বাবা যখন আমাদের লাল গাড়িটা কিনে আনবে, তখন আমি রিয়াকে আমাদের গাড়িতে উঠতে দেব। ও আজ আমাকে গাড়িতে উঠতে দেয় নি। বাবা স্যালারি পেলেই আমরা গাড়ি কিনব।’

এরপর বাবা বিছানায় ঘুমন্ত সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এই ঘটনা শেষ না হতেই বিজ্ঞাপনটির ব্যাকগ্রাউন্ডে বলা হয়-‘ছোট ছোট চাওয়াগুলো অনেক সময় বড় প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। আর তাই জীবনের ছোট-বড় নানা চাহিদা মেটাতে প্রাইম ব্যাংক দিচ্ছে সহজ রিটেইল লোন সুবিধা। এখন জীবনকে গড়ে তুলুন আপনার মতো করে সাথে টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠে-হোম লোন, কার লোন, হাউজহোল্ড ডিউরেবলস লোন, ডক্টরস লোন, অ্যানি পারপাজ লোন, এডুকেশন লোন, ট্রাভেল লোন, ম্যারেজ লোন, সিএনজি কনভারশন লোন, হসপিটালাইজেশন লোন।

আমরা বিজ্ঞাপনের শেষ অংশ দিয়ে আলোচনা শুরু করছি। বিজ্ঞাপনটির ব্যাকগ্রাউন্ডে বলা হয়- ‘ছোট ছোট চাওয়াগুলো অনেক সময় বড় প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।’পরিপ্রেক্ষিত দেখে মনে হয় বিজ্ঞাপনটিতে উঠে আসা জীবনচিত্র রাজধানী ঢাকা শহরের। ঢাকা শহরের মতো একটি মেট্রোপলিটন নগরীতে যদি একটি বাড়ি ও একটি গাড়ি ছোট চাওয়া হয়, তাহলে বড় চাওয়াগুলো কী? আর এই ছোট চাওয়া পূরণের জন্য যদি একজন মধ্যবিত্তকে ব্যাংক ঋণ নিতে হয় তাহলে বড় চাওয়া পূরণের জন্য তাকে কী করতে হবে? এই প্রশ্ন রেখে আমরা বিজ্ঞাপনটির অন্যান্য বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিতে চাই।

অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের সমাজে মোটাদাগে তিন শ্রেণীর মানুষ দেখতে পাই। তবে এখানে মোটেও আমরা মার্কসীয় শ্রেণীর কথা বলছি না। এ শ্রেণীগুলো হচ্ছে-উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। উচ্চবিত্ত শ্রেণীর  যে অর্থনৈতিক অবস্থা তাতে তাদের ঋণ নিয়ে বাড়ি-গাড়ি কেনার প্রয়োজন নেই। কারণ, বাড়ি-গাড়ির মতো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তাদের থাকে। আর নিম্নবিত্তের কাছে বাড়ি-গাড়ি কেনার স্বপ্ন তো দুঃস্বপ্নের মতো। মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই যাদের অনেক সময় অসম্ভব হয়ে ওঠে, তারা বাড়ি-গাড়ি করবে কীভাবে? সর্বশেষ যে শ্রেণী, তা হলো মধ্যবিত্ত। আর সংকট ও সম্ভাবনার শুরু ঠিক এখানেই। আমরা যে বিজ্ঞাপনটির কথা বলছি সেই বিজ্ঞাপনদাতাদের অন্যতম টার্গেট মূলত এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। মধ্যবিত্তরা সমাজে এমন জায়গায় বসবাস করে, যেখান থেকে তারা নিচেও নামতে পারে না, উপরেও উঠতে পারে না। ফলে তারা উভয়-সংকটে ভোগে। তবে তাদের প্রবল ইচ্ছা থাকে উপরে ওঠার। বাড়ি-গাড়ি যেহেতু উচ্চবিত্তের প্রতীক তাই কেনার সামর্থ্য না থাকলেও এসবের প্রতি প্রবল ইচ্ছা থাকে মধ্যবিত্তদের। মধ্যবিত্তের এ ইচ্ছাকে কাজে লাগায় ব্যাংকগুলো, তাদেরকে নানা ঋণ দিয়ে।

এই বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, নিজেদের বাড়ি-গাড়ি না থাকায় শিশুটি অপর দুই শিশু দ্বারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বাড়ি না থাকায় মন্টু তাকে খেলায় নিচ্ছে না। একইভাবে গাড়ী না থাকায় শিশুটিকে নেমে যেতে হচ্ছে  রিয়াদের গাড়ী থেকে। এখানে মন্টু আর রিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এরকম মনে হতেই পারে- তোমার বাবার যেহেতু বাড়ি-গাড়ি নেই, তাই তুমি আমাদের সাথে খেলতে বা গাড়িতে চড়তে পারবে না। আমাদের বাবার বাড়ি-গাড়ি আছে, তাই খেলব, গাড়ীতে চড়ব। কিন্তু এত বঞ্চনা সত্ত্বেও শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, যখন তার বাবা বাড়ি-গাড়ি কিনবে তখন তাদেরকে তার সঙ্গে নেবে।

হঠাৎ পাঠকের কাছে শিশুর এই মানসিকতা বা মনোভাব অন্যান্য শিশুর চেয়ে উদার এবং ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুন, শিশুটির এই উদারতা এবং ইতিবাচক মানসিকতার অন্তরালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তা হলো শিশুটি কিন্তু একবারও বলছে না যে, মন্টু বা রিয়া’সহ অন্যান্য সব প্রতিবেশী বা সহপাঠী শিশুকে খেলায় নেবে বা গাড়িতে চড়তে দেবে। সে যদি বলত যে, অন্যান্য সব প্রতিবেশী বা সহপাঠী শিশুকে তাদের বাড়িতে খেলতে দেবে বা গাড়িতে চড়তে দেবে তাহলে কিন্তু পাঠক কোনো সমস্যা ছিল না। তার এমন কথায় শিশুর যে স্বাভাবিক মনোগঠন সেটিই প্রকাশিত হতো। কিন্তু সে তা বলছে না। কেন? কারণ, শিশুটি অবচেতন মনে মন্টু ও রিয়া হতে চায় কিংবা পরিস্থিতি তাকে মন্টু, রিয়া হতে আগ্রহী করে। তাদের বাড়ি-গাড়ি হলে সে যেমন মন্টু ও রিয়ার মতো হবে, তেমনি তার বাবাও মন্টু ও রিয়ার বাবার শ্রেণীতে অন্তর্ভূক্ত হবে। এই বিজ্ঞাপনটির দর্শক যে শিশু সে নিজের অজান্তেই এই আচরণকে শ্রেয় মনে করা শুরু করবে। তার কোমল মন একটি শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়বে।

শিশুদেরকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার বিষয়টি কনকা টিভির একটি বিজ্ঞাপনেও উঠে এসেছে। বিজ্ঞাপনটির সূচনাতেই ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার শব্দ। একটু পরেই বোঝা যায় এই অ্যালার্ম বাজার কারণ। দুই ভাই পাশের বাড়িতে কার্টুন দেখতে যাওয়ার জন্য করেছে অভিনব এ ব্যবস্থা। দুই ভাই পাশের বাড়ির জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে টিভিতে সেই কার্টুন দেখছিল। একপর্যায়ে এক ভাই অন্য ভাইকে ভয় দেখালে ওই বাড়ির শিশুটির কাছে তাদের অবস্থান প্রকাশ পায়। তখন ওই বাড়ির শিশুটি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে জানালা বন্ধ করে দেয়।

আগের বিজ্ঞাপনের মতো এখানেও একই রকম বৈষম্য সৃষ্টির প্রয়াস দেখা যায়। অর্থাৎ, যাদের টেলিভিশন তারাই কেবল দেখবে, অন্যরা নয়। বিজ্ঞাপনে এই বৈষম্যমূলক উপস্থাপন, যাদের নিজেদের বাড়ি, গাড়ি কিংবা টিভি নেই তাদের মধ্যে একধরনের হীনমন্যতা ও বিচ্ছিনতাবোধ জন্মায়। এই হীনমন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ একদিকে মা-বাবাকে চাপ দেয় ওইসব পণ্য ক্রয়ের জন্য। অন্যদিকে অন্যান্য শিশুদের সাথে তাদের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ায় বাধা দেয়। শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞাপনের প্রভাব সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায়ও এ ধরণের ফলাফল উঠে এসেছে। এসব ফলাফলে শিশুদের মানসিক বিকাশকে প্রতিবন্ধকতার দিকে ঠেলে দেয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়।

বছর কয়েক আগে আর জি সার্চ ইন্ডিয়া নামে একটি সংস্থা ভারতের বড় ৯টি শহরে একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি কেনাকাটার সিদ্ধান্তে শিশুদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা। মোট ৪,৭২৫টি শিশু ও তাদের অভিভাবকদের মতামত যাচাই করে যে ফলাফল পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, প্রায় ৩৪ শতাংশ বাড়িতে ওই সব পণ্য কেনার কথা প্রথম তুলেছে শিশুরা। তার মধ্যে ৫৪ শতাংশ শিশুদের মতামত অনুসারে ওই পণ্যগুলো কেনা হয়েছে।৬

জর্জ কামস্টক এর গবেষণাতেও শিশুদের বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞাপিত পণ্য পাওয়ার জন্য মা-বাবাকে চাপ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।৭ এই চাপের কারণেই বাড়ি-গাড়ি কেনার মাধ্যমে নিজেদের উচ্চবিত্ত করে তোলার জন্য মা-বাবা ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হয়। নিজেদের নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মা-বাবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি-গাড়ি কেনার মাধ্যমে বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য তারা বেশি পরিশ্রম করে। অনেক সময় বেশি পরিশ্রমের সুযোগ না থাকায় অসৎ উপায়ও অবলম্বন করে। অনেক সময় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে গিয়েই ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হয়।

ভারতীয় বস্তুবাদী মতবাদ চার্বাক দর্শন বলে পরিচিত। চার্বাকবাদীদের মতে জগৎ কেবল দুঃখভারাক্রান্ত নয়। জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সুখলাভ। সুখই হচ্ছে যথার্থ উত্তম। তারা বলত ঋণ করে হলেও ঘি খাও। চার্বাকগণ জীবনের দুঃখকে বড় না করে, দুঃখের মধ্যে জীবনকে আনন্দময় ভাবার চেষ্টা করতে বলেছেন।৮ আধুনিক-সমাজও পণ্যভোগে জীবনের সুখ খোঁজার কথা বলছে। কিন্তু চার্বাক দর্শন গড়ে ওঠার সময় মানুষের ভোগবিলাসিতা একটা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে গণমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের পর ভোগবিলাসের চরিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানুষ নিজে যতটা না ভোগবাদী হয়ে উঠছে, তার চেয়ে সেদিকে তাকে বেশি ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আর বর্তমানে এই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করে চলছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে আপনাকে আজকে বলা হচ্ছে- এই মডেলের মোবাইল ফোন সবচেয়ে ভাল। আবার আগামীকাল বলা হচ্ছে, আগের দিনেরটা পুরনো মডেল হয়ে গেছে, আজকেরটা নতুন ও স্মার্ট। এটিই কিনুন।

আরেকটি কথা, আমাদের চিরাচরিত সমাজের যে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা, তা এই বিজ্ঞাপনে অনুপস্থিত। যদিও সমাজ কাঠামোর ভিন্নতায় বর্তমানে বেশিরভাগ যৌথ পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। একক পরিবারের এখন জয় জয়কার। আর বিজ্ঞাপনে এই একক পরিবারের ধারণাকেই সমর্থন করা হয়েছে। এ সমর্থন জানাতে সুখী পরিবারের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে মা-বাবা, বাড়ি-গাড়ি ও কয়েকটি পণ্যকে। এই হলো আধুনিক পরিবার। সেখানে মা-বাবার বাইরে শিশুর জীবনে অন্য আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি নেই। নেই দাদা-দাদী, চাচা-চাচীর উপস্থিতিও।

ফলে শিশুর শৈশবের একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যম থেকেই তারা জগৎটাকে জানতে পারছে, বুঝতে শিখছে। ফলে তাদের অভ্যাস, পছন্দ-অপছন্দ, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ গড়ে উঠছে বাজারি মতাদর্শিক আদলে। যৌথ পরিবার না থাকায় তাদের মানসিক বিকাশের যে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সেটার পরিসর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফার্নহ্যাম তার একটি গবেষণায়, বিজ্ঞাপনগুলো যে শিশুদের জেদী, অবিবেচক এবং অনিয়ন্ত্রিত করে তুলতে পারে তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন।৯

বিজ্ঞাপনের একটি টেকনিক্যাল সমস্যা দিয়ে এই আলোচনা শেষ করতে চাই। বিজ্ঞাপনটি বারবার দেখার সময় একটি বিষয় খটকা লাগে। এখানে ড্রয়িং খাতার প্রথম ছবির নিচে যে লেখা আর শিশুটির কণ্ঠে ভেসে আসা কথার মধ্যে কোনো মিল নেই। ছবির নিচে লেখা ছিল, ‘বাবা বলেছে আমাদের নিজেদের বাড়ি হবে, তখন রাতে চাঁদের বুড়ি আসবে আর সারা রাত ধরে আমাদের গল্প শোনাবে।’ কিন্তু এই বিষয়টিকে বিজ্ঞাপনে ঘুরিয়ে বলা হয় এভাবে, ‘বাবা আমাদের জন্য যে বাড়িটা কিনে দেবে তাতে একটা মাঠও থাকবে। আর আমরা সারা দিন খেলব। মন্টুদেরও নেব খেলতে। আমি আর বাবা হব আমাদের দলের ক্যাপ্টেন।’

.

আমাদের আলোচিত তৃতীয় বিজ্ঞাপন প্রাণ ম্যাংগো জুসের। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্য প্রাণের রয়েছে আলাদা আলাদা জুস প্যাক। তাই, বড়দের ও শিশুদের জন্য বিজ্ঞাপনগুলোর আধেয়তে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। যদিও জুসগুলোর স্বাদে তেমন কোনো পার্থক্য নেই! এখন প্রাণ ম্যাংগো জুসের যে বিজ্ঞাপনটি নিয়ে কথা বলব তাতে একটি পথশিশু রাস্তায় গাড়িতে গাড়িতে পত্রিকা বিক্রি করে। একদিন শিশুটি রাস্তায় একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পায়। তাতে অনেক টাকা থাকলেও সে লোভ সংবরণ করে। পরের দৃশ্যে শিশুটি রাস্তার পাশে তার সমবয়সী একটি শিশুকে জুস খেতে দেখে। এটা থেকে তার মনেও জুস খাওয়ার প্রবল বাসনা তৈরি হয়। সে তখন কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগটির ভিতরে রাখা টাকা বের করে দেখতে থাকে। কিন্তু আবারও সে লোভ সংবরণ করে।

পরের দৃশ্যে দেখা যায় শিশুটি একটি দোকান থেকে মানিব্যাগটির মালিককে ফোন করছে। শেষপর্যন্ত  সে মালিককে মানিব্যাগটি ফেরত দিতে সক্ষম হয়। মালিক শিশুটির সততা দেখে তাকে ৫০০ টাকা দিতে চায়। কিন্তু শিশুটি ৫০০ টাকার পরিবর্তে একটি প্রাণ ম্যাংগো জুস খেতে চায়। মানিব্যাগের মালিক তার কথায় সুর মিলিয়ে বলেন,‘চলো আমিও খাব।’ একসাথে জুস খাওয়ার পর পথের হকার শিশুকে পথেই ফেলে মালিককে গাড়িতে চড়ে চলে যেতে দেখা যায়। আর শিশুটিকে দেখা যায় পত্রিকা হাতে, জীবিকার তাগিদে ছুটতে।

বিজ্ঞাপনটিতে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, যে শিশুটিকে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখা যায় তার পরনে সুন্দর শার্ট ও হাফ-প্যান্ট। সাধারণত আমাদের চিরচেনা যে পথশিশু তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ এতটা পরিপাটি হয় না। কারণ সেই সামর্থ্যই তাদের নেই। আপাত এটি একটি তুচ্ছ ব্যাপার মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা এর পিছনের উদ্দেশ্য খোঁজার চেষ্টা করেছি। বিষয়টা এরকম যে-এই জুস তো সমাজের উচ্চ-শ্রেণীর মানুষও খায়। এখন ওই শ্রেণীর মানুষ যদি একটি নোংরা পোষাক পরা পথশিশুকে একই জুস খেতে দেখে তাহলে তারা জুস খাওয়া বাদ দিতে পারে। আর আমাদের এরকমটা মনে হওয়ার কারণ- যেমন আমরা অনেকেই বন্ধুকে অনেক সময় তার পছন্দের বিষয়ে বলি-এটা একটা শার্ট কিনছিস, এটা তো ‘রিকশাওয়ালারা পরে’। এখানে মোটেও আমরা রিকশাওয়ালাকে ছোট করছি না। কিন্তু এই কথাটি সমাজে অহরহ প্রচলিত। আমরা যারা নিজেদের রুচিশীল ও সুশিক্ষিত মনে করি, তারা অহরহ নিম্নবিত্তের রুচি নিয়ে এ প্রশ্ন তুলি। রিকশাওয়ালা বলে তার রুচিকে ছোট করি। অর্থাৎ গণমাধ্যম অন্যান্য কিছুর মতো এক্ষেত্রেও কৌশলে উচ্চবিত্ত শ্রেণীকেই বিবেচনায় রাখে।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপনে সততার পুরস্কার হিসেবে মানিব্যাগের মালিক শিশুটিকে ৫০০ টাকা দিতে চায়। কিন্তু সে নিতে রাজি হয় না। তার বিনিময়ে চায় একটি দশ টাকা মূল্যের জুস। এতে কী এই বোঝা গেল না যে, সততা বা পাঁচ’শ টাকার চেয়ে একটি প্রাণ ম্যাংগো জুস বেশি মূল্যবান?

তৃতীয়ত, যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, একটি পথশিশুকে দিয়ে প্রাণ ম্যাংগো জুসের এই বিজ্ঞাপন কেন? প্রাণ ম্যাংগো জুসওয়ালাদের নজর এখন পথশিশুর দৈনিক ৫০ টাকা আয়ের দিকে। তারা পথশিশুর ওই ৫০ টাকা থেকে ১০ টাকা ‘ছিনিয়ে’ নেওয়ার লোভ যেন সামলাতে পারছে না। প্রযুক্তির বিকাশের বদৌলতে পথশিশুরা এখন টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞাপনের ওই পথশিশুকে জুস খেতে দেখে অন্য পথশিশুর জুস খেতে ইচ্ছে হতেই পারে। আর এই ইচ্ছেটাকেই ব্যবহারের চেষ্টা করছে তারা।

শেষ দৃশ্য দিয়ে এই বিজ্ঞাপনের আলোচনার ইতি টানছি। দৃশ্যটি এমন, মানিব্যাগওয়ালা এবং শিশুটি জুস খেয়ে দোকান থেকে বের হয়। বের হয়ে মানিব্যাগওয়ালা গাড়িতে চড়ে দ্রুত চলে যায়। শিশুটিও পত্রিকা বিক্রির উদ্দেশ্যে ছুটে চলে যায় দ্রুত। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সমাজে যার যেখানে অবস্থান তা স্থিতি হয়। মাঝখানে যেটা হয়, মানিব্যাগওয়ালা শিশুটিকে জুস খাওয়ার স্বাদ দিয়ে যায়। যেকারণে শিশুটি মৌলিক চাহিদার বাইরে জুস খাওয়ার বাড়তি রোজগারের জন্য আবার জীবন সংগ্রামে নামে পত্রিকা হাতে। বাড়তি রোজগারের জন্য সে হয়ত আরও পরিশ্রম করবে। আবারও সততা বিক্রি করবে ১০ টাকায়; সচরাচর পথশিশুদের ক্ষেত্রে যেরকম হয়।

.

পরীক্ষায় ভালো করায় ছেলেকে আদর করছে মা।

আরেক মা’র জিজ্ঞাসা,  ‘ভাবি, ও কি এক্সট্রা কোথাও টিউশন নিচ্ছে।’

ভাবির উত্তর, ‘নাহ্‌ বাড়িতেই পড়ছে।’

একই শিশু জয়ী হয় গানের প্রতিযোগিতায়।

তখনো ওই মায়ের জিজ্ঞাসা, ‘ভাবি, ও কি এক্সট্রা কোথাও প্র্যাকটিস করছে?’

ভাবির উত্তর, ‘আমিই শেখাচ্ছি।’

পরীক্ষায় ভাল করা শিশুটি আবার ক্যারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়।

আবারও সেই মায়ের জিজ্ঞাসা, ‘ভাবি..., ও এক্সট্রা কী খাচ্ছে?’

ভাবি এবার বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘বললামতো রেগুলার খাবার।’

একদিন দ্বিতীয় মা অলরাউন্ডার শিশুটির বাসায় গিয়ে দেখেন প্রথম মা তার অলরাউন্ডার ছেলেকে হরলিক্স খাওয়াচ্ছে। তখন দ্বিতীয় মা বলেন,‘হরলিক্স...!’ উত্তরে প্রথম মা বলেন ‘হরলিক্সতো রেগুলার খাবারই। কেন আপনি দেন না?’

তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যায়, ‘গম, বার্লির স্বাদে আরও ২৩টি নিউট্রিয়েন্টস এবং নিউট্রি সায়েন্স নিয়ে এল হরলিক্স। প্রমাণিত যে, হরলিক্স বাচ্চাদের করে তোলে আরও লম্বা, আরও শক্তিশালী, আরও বুদ্ধিমান।’এরপর টিভির পর্দায় কয়েকটি শিশুর কণ্ঠে শোনা যায় ‘বেড়ে ওঠার ডোজ রোজ, রোজ।’

ঘটনা হলো, যখন কোনো শিশু ভাল কিছু করছে তখন চারপাশের সবাই ধারণা করছে, তাকে হয়ত অতিরিক্ত কিছু দেয়া হচ্ছে। যখন শিশু পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করছে, তখন ধারণা করা হচ্ছে তাকে এক্সট্রা টিওশন দেওয়া হচ্ছে। তার মানে হলো কোনো শিশুই যেন স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কিছু করতে পারে না। শিশু মানেই তার নিজস্ব কিছু নেই। সে যেন তার চারপাশ, প্রকৃতি, পরিবার থেকে কিছুই পায় নি। কিন্তু বাস্তব অবস্থা মোটেও এমন নয়। দেখুন, গ্রামের নির্মল আলো-বাতাসে স্বভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা অনেক শিশুই কিন্তু এখন যথেষ্ট মেধার সাক্ষ্য রাখছে; যাদের খাওয়া কিংবা পড়াশুনার ব্যাপারে আলাদা কোনো ব্যবস্থাই নেই। তারা প্রকৃতিগতভাবে দুরন্তপনা থেকে দৌঁড়াতে শিখেছে, প্রকৃতি থেকে শিখেছে গান।

কাজী নজরুল ইসলামের কথাই ধরুন না! যার শৈশব কেটেছে রুটির দোকানে, যিনি করেছিলেন লেটো গান। তিনি কিন্তু পরে হয়েছেন আমাদের দেশের জাতীয় কবি। অনেকে বলতে পারেন সেইদিন আর নেই। এখন ‘অনেক কিছু’ লাগে। তাদের বলছি, এখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষায় যে শিক্ষার্থীরা ভয়ংকর রকমের একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে ভর্তির সুযোগ পান; তাদের একটা বড় অংশ আসে পল্লীর সোঁদা মাটির গন্ধ নিয়ে। এখনো প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (২০১০) সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে প্রত্যন্ত গ্রামের ভাতের ফেন খাওয়া কোনো শিশু। তাদের এই মেধার পরিচয় দিতে কিন্তু হরলিক্স কিংবা ‘অনেক কিছু’র প্রয়োজন পড়ে নি!

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বর্তমানে এক শ্রেণীর অভিভাবক বিশেষ করে যারা শহরে বাস করে তারা মনে করেন, শিশুর ভাল কিছু করার জন্য হরলিক্স কিংবা কমপ্লান এর মতো খাবারের বিকল্প নেই। হরলিক্স এখন অন্যান্য খাবারের মতো শিশুদের স্বাভাবিক খাবারে পরিণত হয়েছে। এগুলো আজ আর শিশুর আলাদা কোনো খাবার নয়। তার মানে হরলিক্স এখন ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, ডিম, দুধ, সবজির মতো স্বভাবিক খাবারে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপনটিতে এমনভাবে বলা হচ্ছে ‘হরলিক্সতো রেগুলার খাবারই। কেন আপনি দেন না।’ কিন্তু হরলিক্সের যে দাম, সেটা কিন্তু দেশের বেশিরভাগ লোকের ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে নেই। বাজারে একটি ৫০০ গ্রাম হরলিক্সের দাম ২৯০ টাকা। মাসে যদি একটি শিশুকে ৫০০ গ্রাম ওজনের তিনটি হরলিক্স খাওয়ানো হয়, তাহলে মাসে খরচ হবে ৮৭০ টাকা। খেটে খাওয়া মানুষের কথা বাদই দিলাম, সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষেও মাসে সন্তানের জন্য শুধু একটি খাবারের পিছনে ৮৮৫ টাকা খরচ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

অন্যদিকে হরলিক্সের চেয়ে পুষ্টিগুণসম্পন্ন তরল দুধ, এর খরচের কথা যদি আমরা বলি, তাহলে দেখা যাবে, একটা শিশুকে যদি প্রতিদিন আড়াইশ গ্রাম দুধ খাওয়ানো হয় তাহলে ৪০ টাকা কেজি দরের বাজারমূল্যের দুধে খরচ হবে ৩০০ টাকা। ফল-মূল ও শাকসবজির কথাই ধরি; হরলিক্সের পুষ্টি উপাদানের চেয়ে এগুলোতে পুষ্টি উপাদানের পরিমান অনেকগুণ বেশি, খরচও কম। যদিও হরলিক্সের পুষ্টি উপাদানগুলোর যথার্থতা নানা সময়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্য হরলিক্সের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়। কারণ, হরলিক্সের দাবি করা গুণগুলো গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে।১০ আবার আমরা হরলিক্স ও কমপ্লানের মতো কোম্পানিকে একে অন্যের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি গবেষণা করতেও দেখি। কয়েক বছর আগে ভারতে হরলিক্স কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলাটি করেছিল একই ধরণের খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি কমপ্লান। হরলিক্স কোম্পানি তখন একটি গবেষণার দ্বারা প্রমাণ করে যে, কমপ্লান উপাদানগুলো বাচ্চাদের শক্তিশালী, বুদ্ধিমান করে তুলতে পারে না। কিন্তু মজার বিষয় হলো কমপ্লান তাদের একটি গবেষণায় প্রমাণ করে হরলিক্সের চেয়ে তাদের খাদ্য অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন।১১ শেষ পর্যন্ত মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। পাঠক, এই যখন অবস্থা তখন আপনিই ঠিক করুন তাদের বুলি আওড়ানো পুষ্টিগুণ কতটা সঠিক?

লক্ষ্যণীয় আরেকটি বিষয়, এ ধরনের বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে ছেলে-শিশুদের ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, প্রচ্ছন্নভাবে ছেলেশিশু যেন মেয়েদের চেয়ে শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান। হরলিক্স কিংবা কমপ্লানের মতো অন্যান্য শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনগুলো এই গৎবাঁধা ধারণাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে থাকে। আর এসব বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের সমাজে ছেলে শিশুদেরকে মেয়ে শিশুদের চেয়ে অধিক যত্নে লালন-পালন করে মা-বাবা।

.

বিজ্ঞাপনের মর্মার্থ না বুঝে শিশুরাও ভোগের সংস্কৃতিতে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। এই সংযুক্তির ফলে শিশুদের মনোবিকাশ আজ একধরনের হুমকির মুখে। দেশে দেশে এ নিয়ে অভিভাবকরা সচেতন হয়ে উঠছেন। খোদ আমেরিকাতে শিশুদের নিয়ে এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন বন্ধের দাবি উঠেছে। আমেরিকার অ্যাডভার্টাইজিং এজ পত্রিকা জানিয়েছে, ৬২ শতাংশ মার্কিনি চান টিভিতে শিশুদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হোক।১২ আবার কানাডাতে টিভিতে বাচ্চাদের অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দেখানো নিষিদ্ধ করেছে সেদেশের সরকার। এ বিষয়ে আমাদের দেশের অভিভাবকদের চিন্তা-ভাবনা কী তা হয়ত এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জানা যায় নি। তবে সাধারণ পর্যবেক্ষণে এ নিয়ে তাদের বিরক্তি চোখে পড়ে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে এর জন্য শুধু বিরক্তি নয়, বিরুদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক: তাহ্‌সিন আহমেদ  তৈয়ব তরুণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের  দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী

tahsin_mcj@yahoo.com

toyebur.rahman@gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন