Magic Lanthon

               

মোরশেদুল ইসলাম

প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আমি এখন আমাদেরকে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা বলতে পারি না

মোরশেদুল ইসলাম

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অনেকগুলো ইতিহাস তার হাত দিয়ে রচিত। যৌবনে চরম উৎসাহে শুরু করেছিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন। পরবর্তীতে বিকল্প ধারা নামে পরিচিত এই আন্দোলন বাংলা সিনেমার সমগ্রতায় কতখানি সুফল বয়ে এনেছে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও একথা ঠিক এই আন্দোলনের ফলে অন্তত কিছু তরুণ সিনেমা নিয়ে নাচানাচি করেছে। তার জন্ম ১৯৫৮ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায়। স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে।

১৯৮৪ সালে ছাত্রাবস্থায় নির্মাণ করেন আগামী। সেটা একটি ইতিহাস। এরপর একে একে নির্মাণ করেন নৌকা জীবন (১৯৮৬), সূচনা (১৯৮৮), চাকা (১৯৯৩), দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬), দুখাই (১৯৯৭), বৃষ্টি (২০০০), শর ৭১ (২০০০), দূরত্ব (২০০৪), খেলাঘর (২০০৬)। তার প্রিয়তমেষু (২০০৯) সিনেমাটি ডিজিটাল ফরমেটে নির্মিত প্রথম কোনো সিনেমা হিসেবে সেন্সর ছাড়পত্র পায়। ২০০৫ সালে তার আগ্রহেই প্রতিষ্ঠা হয় চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি। ২০১১ সালে মুক্তি পায় তার সর্বশেষ সিনেমা আমার বন্ধু রাশেদ। বাংলাদেশের সেই প্রখ্যাত নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠনর হয়ে কথা বলেছেন হেমন্ত সাদীক।


কমার্শিয়াল ফিল্ম যেটাকে আমরা বলি বিনোদন ছবি সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে থাকবে না

ম্যাজিক লণ্ঠন: স্যার বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্পে এক ধরনের সংকট চলছে, এই সংকটটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোরশেদুল ইসলাম: সংকটটা নিশ্চয়ই চলছে। কারণ মানুষ ছবি দেখতে সিনেমা হলে যাচ্ছে না। ফলে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা একটা খুবই বড় রকমের সংকট। আর একটা জিনিস আমি সবসময় বলি যে, ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু আসলে বেঁচে থাকে বিনোদন ছবি কত বেশি হচ্ছে বা কত বেশি চলছে সেটার ওপর। আমরা যে ধরনের ছবি বানাই সেটা কিন্তু খুবই সিলেক্টেড দর্শক দেখে। এ রকম ছবি দরকার আছে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি বলতে যেটা বুঝি সেটা যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে কিন্তু কমার্শিয়াল ফিল্ম যেটাকে আমরা বলি বিনোদন ছবি সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে থাকবে না। তো সেই দিক থেকে আমি বলব যে, বিনোদন ছবির ক্ষেত্রে আমাদের একটা খুবই বড় রকমের সংকট এখন চলছে।

সেই সংকটটা কিন্তু একদিনে তৈরি হয় নি। দিনে দিনে তৈরি হয়েছে। একই সাথে যেমন ভাল ছবি হচ্ছে না, দর্শকের দেখার মতো বা সত্যিই বিনোদন পাওয়ার মতো ছবিও হচ্ছে না। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা হল, অবশ্যই নির্মাতারাও এর জন্য দায়ী। যারা ছবিগুলো নির্মাণ করছেন তারা সেইরকম কোন সৃষ্টিশীল ভূমিকা রাখতে পারছেন না। দর্শককে টেনে আনার মতো, দর্শককে ধরে রাখার মতো গল্প বা উপস্থাপন ভঙ্গি তারা দিতে পারছেন না। যেই কারণে তারা অশ্লীলতা বা অন্যান্য যে সস্তা জিনিসগুলা আছে যেটা দিয়ে দর্শককে ধরে রাখা যায় সেইগুলো দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এবং সেইভাবে হয়ত কিছু দর্শক হলে আসছে, কিন্তু সেইটা কিন্তু আসল দর্শক না।

সেজন্য এ ধরনের ছবি কিন্তু ভালো ব্যবসা করছে না। দর্শক হলে না যাওয়ার আর একটা বড় কারণ হলো, মধ্যবিত্ত রুচিশীল দর্শক। তারা একেবারেই হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এটা একটা চরম সংকট। পাশাপাশি আমরা যে ধরনের ছবি করছি, সে ধরনের ছবির ক্ষেত্রে আমি বলব অবস্থাটা আগের চেয়ে অনেক ভাল। এ ধরনের ছবি বেশ হচ্ছে। এদিক থেকে ভাল। কিন্তু এ ধরনের ছবির মূল সমস্যা হচ্ছে সিলেক্টটেড কিছু দর্শক থাকে। এসব ছবি হয়ত বাইরে বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে যায়। ছবিগুলো হয়ত দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনে ঠিক আছে। কিন্তু মূল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ ধরনের ছবি চলতে হবে বেশি। সেটা কিন্তু চলছে না। সেটার ক্ষেত্রে নির্মাতারা যেমন দায়ী আরো কতগুলো ব্যাপার আছে, যেমন চলচ্চিত্র কিন্তু একটা টেকনোলজি নির্ভর শিল্প, প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প। সুতরাং প্রযুক্তির সাথে সাথে কিন্তু চলচ্চিত্র বেড়ে ওঠে। প্রযুক্তির দিক থেকে যদি আমরা পিছিয়ে যাই তাহলে কিন্তু চলচ্চিত্র এগোবে না। এখানে আমরা কিন্তু প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারছি না। কারণ এফডিসির যে অবস্থা, যেখান থেকে মেইনলি ছবিগুলো তৈরি হয়; এফডিসির ক্যামেরার অবস্থা যদি আমি বলি, ল্যাবের অবস্থা, সাউন্ডের যে অবস্থা, সেগুলো এত জঘন্য যে সেইখানে একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডের ছবি বানানোর উপায় নেই।

তো সেইটা যদি হয় দর্শক কিন্তু সিনেমা দেখবে না। কারণ দর্শক কিন্তু এখন সব ধরনের ছবি দেখে অভ্যস্ত। দর্শক আর কুয়োর ব্যাঙ হয়ে নাই, আগে যেমন ছিল। ২০ বছর আগেও যখন ছিল আমাদের ছবি দেখা ছাড়া দর্শকের কোন বিকল্প ছিল না। এখন দর্শক কিন্তু টেলিভিশনে ছবি দেখছে, ডিভিডিতে ছবি দেখছে। সুতরাং ছবি টেকনিক্যালি যে কত এগিয়ে গেছে এটা দর্শক জানে। সুতরাং সেই দর্শক যদি রঙের ঠিক নাই, কালারের ঠিক নাই, সাউন্ড শোনা যায় না- এ ধরনের ছবি দেখে, তবে যত ভাল ছবিই হোক টেকনিক্যাল কারণে তা কিন্তু দেখবে না। এখন আমাদের ছবিগুলো হয়ত বাহির থেকে প্রিন্ট করে নিয়ে আসা হয়, সাউন্ড করা হয়। হ্যাঁ সেগুলোর হয়ত স্ট্যান্ডার্ড একটু ভাল হয়। কিন্তু সব ছবি তো সেটা করা সম্ভব নয়। দেশের মধ্যেই তো ছবিগুলো হতে হবে।

সুতরাং এফডিসির অবস্থা এর জন্য বড় দায়ী। আমি মনে করি এটা ভাল ছবির পেছনে একটা অন্তরায়। সেটা ঠিক করতে হবে। আর একই সাথে সিনেমা হলগুলো; সিনেমা হলগুলোরও পরিবেশ ভাল নাই। সিনেমা হলওয়ালারা হয়ত বলবে যে যেহেতু ছবি নেই ভাল, দর্শক আসছে না, তাই তারা পরিবেশন করতে পারছেন না। একটার সাথে জাস্ট আরেকটা রিলেটেড। সিনেমা হলগুলোর ভাল পরিবেশ নাই, টয়লেট ভাল না, সিট ভাল না, এগুলাতো আছেই, প্লাস প্রজেকশন কোয়ালিটি ভাল না। প্রজেক্টরগুলো সেই কবেকার আমলের, সাউন্ড শোনা যায় না। ছবি ঝাপসা দেখা যায়। সুতরাং এগুলো যদি উন্নত করা না যায়, চলচ্চিত্র যেহেতু প্রযুক্তি নির্ভর একটা শিল্প, তা টিকে থাকবে না। এবং আমাদের দেশে এখন ওই অবস্থাটাই চলছে। যে কারণে আমাদের চলচ্চিত্র একটা বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন। এবং এই থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের খুব সুনির্দিষ্টভাবে, পরিকল্পিতভাবে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।

সেইটা যেমন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যারা আছে তারা নিবেন, একই সাথে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে সরকারকে। সেই চিন্তাটা মাথায় রাখতে হবে কীভাবে এই শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এজন্য সরকারকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হলো এফডিসির সংস্কার, এফডিসির অবস্থা ভাল করতে হবে। একটা কমন কাজ করতেই হবে সেটা হলো, হলগুলোর অবস্থা ভাল করতে হবে। এবং হলগুলোর অবস্থা ভাল করার জন্য সরকার হল মালিকদের কিছু বেনিফিট দিয়ে উৎসাহিত করতে পারে। উৎসাহ বলতে এমন- যদি কেউ হল সংস্কার করে, ভালো সিস্টেম দাঁড় করায়, তাহলে আমি তিন বছরের জন্য হলের ট্যাক্স ফ্রি করে দিলাম। সরকার কোনো ট্যাক্স নেবে না হল থেকে। তখনই হল কর্তৃপক্ষ চিন্তা করবে আমি যদি তিন বছর ট্যাক্স না দিই, তাহলে সেই টাকা ইনভেস্ট করে আমি হলের মান উন্নয়ন করতে পারব। ফলে সরকারকে এই জিনিসগুলো করতে হবে।

তারপর একটা বিষয় হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি। সেটা কিন্তু চলচ্চিত্রে চলে এসেছে। সারা পৃথিবীতেই কিন্তু ডিজিটাল ছবি হচ্ছে। যে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ছবি হচ্ছে সেই প্রযুক্তিও আমাদের আনতে হবে। হলগুলোতে ডিজিটাল প্রজেকশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থা বলতে অনেকে মনে করে যে, আমি কেবল ডিজিটাল ছবি বানালাম সেটিই ডিজিটাল ছবি। তা কিন্তু না। একটা ছবি কিন্তু ৩৫ মিলিমিটারে তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেটি রিলিজ হতে পারে ডিজিটাল ফর্মে। সারা পৃথিবীতে এখন তাই হচ্ছে। হ্যাঁ? তাতে করে হয় কী, এই ৩৫ মিলিমিটারের ছবিটা হাই স্ক্যান করে ডিজিটাল ফরম্যাটে নিয়ে আসা হয় এবং সেটা যখন প্রজেকশন হয়, সেই প্রজেকশন কিন্তু আমাদের নরমাল যে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়ে দেখাই, সেই প্রজেকশন না।

এটা খুব হাই রেজুলেশনের একটা প্রজেকশন। যেটা নিয়ন্ত্রণ হয় সেন্ট্রালি। যেমন, ঢাকায় একটা সেন্টার থাকলো, এখান থেকে ছবিটাকে আপলিংক করা হবে স্যাটলাইটের মাধ্যমে এবং কথা থাকলো যে, সন্ধ্যা ছয়টায় দেশের ১০০ সিনেমা হলে সিনেমাটা চলবে।

ম্যাজিক লণ্ঠন: মানে একযোগে চলবে?

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যাঁ চলবে। ছবিটা চলবে, ছবিটা প্রোগ্রামিং করা থাকবে। এবং ওই একশো সিনেমা হলে সেই সিস্টেমটা থাকতে হবে। ওদের কাছে কিন্তু কোনো প্রিন্ট যাচ্ছে না, ওরা জাস্ট স্যাটেলাইট থেকে একই সময়ে ডাউনলিংক করবে ছবিটা। খুবই হাই রেজুলেশন ছবি হবে। এটা হচ্ছে ডিজিটাল প্রজেকশন। এটা হলে কী হবে? ছবি ৩৫ মিলিমিটারেই হচ্ছে। কিন্তু প্রিন্টের খরচ বেঁচে যাবে। এখন একটি ভালো মানের ছবি যদি ৪০টি হলে রিলিজ হয়, সেক্ষেত্রে প্রিন্ট করতে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা লেগে যায়। একটা প্রিন্ট করতে ৮০-৯০ হাজার টাকার মতো লাগে। তাহলে প্রযোজকের ৪০ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। ওই ছবিটার ক্ষেত্রে কিন্তু প্রিন্ট খরচ লাগছে না এবং টাকাটাও দ্রুত চলে আসছে। তাই না? এই সিস্টেমগুলো যদি আমরা না করতে পারি তাহলে কিন্তু আমরা প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে যাব। এবং শুধুমাত্র প্রযুক্তির সাথে তাল মিলাতে না পারার কারণেই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।

ম্যাজিক লণ্ঠন: স্যার, চলচ্চিত্রের এই যে সংকট এর সাথে কী বিকল্প-ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই? মানে তারা যদি সেই সময় (৮০ দশকে সূর্যদীঘল বাড়ি নিয়ে যে সমস্যাটা হয়েছিল) এফডিসি থেকে বাইরে না যেত তাহলে অবস্থা কী এর থেকে ভালো হতে পারতো না?

মোরশেদুল ইসলাম: না, সেটা হয়ত হতো না। আমি মনে করি না, এফডিসির সাথে এর তেমন কোন সম্পর্ক আছে। বিকল্প ধারা কিন্তু ভিন্ন একটা ধারা না? আমি এখন আমাদেরকে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা বলতে পারি না। কেননা আশির দশকে আমরা একটা ধারা শুরু করেছিলাম। সেটা হচ্ছে খুব সস্তায় আমরা ছবি বানাবো ৩৫ মিলিমিটারের পরিবর্তে, ১৬ মিলিমিটারে। তখন তো সেভাবে ভিডিও মিডিয়া আসে নাই, মিডিয়া আসলে হয়ত আমরা ভিডিও মিডিয়া-নির্ভর করেই তা বানাতাম।

তো প্রশ্ন ১৬ মি.মি. কেন? ১৬ মি.মি. এ খরচ কম। আমরা খুব কম খরচে সিনেমা বানাতে পারি এবং ছবিটা আমাদের মতো করে দেখাতে পারি। কেননা, ৩৫ মি.মি. বানালে সেটা মুক্তি দিতে হবে সিনেমা হলে। অন্যদিকে, সিনেমা হলওয়ালারা কিন্তু সবসময় এ ধরনের ছবি মুক্তি দিতে আগ্রহী হয় না। তখন মানে আশির দশকে সেটা আরও বেশি কড়াকড়ি ছিল।

সেই অবস্থা বোঝাতে সূর্যদীঘল বাড়ি কিংবা মেঘের অনেক রং এর মতো সিনেমার কথা বলতে পারি। দুটো সিনেমাই অনেক ভালো। প্রথমটা এক বছর পরে ঢাকায় মুক্তি পেয়েছে। আবার প্রদর্শক সমিতি চায়নি বলে বন্ধ হয়ে গেছে প্রদর্শন। আর মেঘের অনেক রং কে তো তিন দিনের মাথায় হল থেকে নামিয়ে ফেলা হয়। ওই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের সাবধান করলো যে, আমরা যদি ৩৫ মিলিমিটারে ছবি বানাই তাহলে আমাদের ওই একই অবস্থা হবে। ছবি দেখাতে পারবো না। কিন্তু ছবি তো দেখাতে হবে, নাকি? সে জন্য আমরা চিন্তা করলাম যে, আমরা ১৬ মিলিমিটারেই ছবি বানাবো। তাহলে খরচটা কম হবে। ১৬ মিলিমিটারের প্রজেক্টর যেহেতু পোর্টেবল, আমরা যেকোনো জায়গায় ছবিটা দেখাতে পারবো। এমনকি আমাদের সাধ্য মতো ছোট একটা হল ভাড়া করেও। এই যে বিকল্পভাবে আমরা ছবি বানাচ্ছি এবং বিকল্পভাবে প্রদর্শন করছি, সেটাই হচ্ছে বিকল্প ধারা। বুঝতে পারছো? সেই অবস্থা এখন আর নাই। এখন আমাদের ছবি হলে চলছে। আগে কিন্তু সে অবস্থা ছিল না। বলতে গেলে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এবং এখন কিন্তু আমরা ৩৫ মি.মি. এ আমরা ছবি বানাচ্ছি, তাই না? যারা আমরা বিকল্পধারার ছবি দিয়ে শুরু করেছিলাম- আমি, তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই ৩৫ মি.মি. এ ছবি বানাচ্ছি। আমাদের ছবি হলে চলছে। সুতরাং এটাকে আমি বিকল্প ধারা বলবো না। এখন আমরা যে ছবি বানাচ্ছি বিকল্প ধারাতে থাকার সময়ও এরকম ছবিই বানিয়েছি।

কনটেন্টের দিক থেকে, শিল্প মানের দিক থেকে আমরা আপোসহীন। এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এফডিসির সাথে আমাদের সম্পর্ক আগের থেকে ভালো। কমার্শিয়াল মানে মেইন স্ট্রিম বা বিনোদনধর্মী ছবি যারা বানায়, তাদের সাথে আমাদের এখন খুব একটা দূরত্ব আছে বলে আমরা মনে করি না। চলচ্চিত্র সংক্রান্ত যেকোন বিষয়ে আমরা একসাথে কাজ করছি। তখন দূরত্বটা ছিল মূলত এই কারণে- আমরা যখন ১৬ মি.মি. এ ছবি বানাতাম তখন এর কোনো সিস্টেম এফডিসিতে ছিল না। এফডিসির ল্যাবে ১৬ মি.মি. এ ছবি প্রসেস করা বা প্রিন্ট করা যেতো না। ১৬ মি.মি. এর ক্যামেরাও ছিল না; এখনো নাই। সুতরাং আমাদের বাধ্য হয়ে কিন্তু এফডিসির বাইরে থেকে এই ফ্যাসিলিটিজগুলো নিতে হয়েছে।

আমরা যে এফডিসিতে যাই নি তা কিন্তু নয়। আসলে যে কোন ক্ষেত্রে প্রথম দিকে হয় কী একটা নতুন ধারা যখন তৈরি হয়, তখন যে ধারাটি প্রতিষ্ঠিত সেই ধারার লোকজন নতুন ধারাকে একটু সন্দেহের চোখে দেখে। তারা ভাবে বিপদ হলো নাকি ভাই! বা এরা এসব কী বলে? হ্যাঁ। সুতরাং, সেই একটা দূরত্ব ছিল। ওরা আমাদেরকে সেভাবে গ্রহণ করে নাই। আমরাও একটু ওদেরকে নেগলেক্ট করেছি। এই ব্যাপারটি ছিল প্রথম দিকে। সেটা কিন্তু আমি বলবো এখন আর সেভাবে নেই। দুই ধারার মানুষের ভেতর এখন গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

আমরা দীর্ঘ সময়ে জার্নি দিয়ে কিন্তু প্রমাণ করেছি, আমরা একটা ধারা এবং এটাকে নেগলেক্ট বা অবহেলা করার উপায় নেই, কোন সুযোগ নেই। এই অবস্থাটা আমরা তৈরি করেছি। এবং আগের যে কোন সময়ের থেকে মূল ধারার সাথে আমাদের সম্পর্কটা ভালো।

ম্যাজিক লণ্ঠন: এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। কিছুদিন আগে মেহেরজান সিনেমাটি নিয়ে মিডিয়ায় বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। যদি ভালো-মন্দের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তাহলে একে কী বলবেন? প্রযোজক এর প্রদর্শন বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে সিনেমাটিকে নিষিদ্ধ করে দেবার পক্ষে অবস্থানও নিয়েছিলেন। ওই সময়ে আপনার ভূমিকাটি কী ছিল?

মোরশেদুল ইসলাম: মেহেরজান কে আমি কোন অর্থেই ভাল ছবি বলব না। ভাল ছবির সংজ্ঞা কিন্তু আলাদা। আর তুমি কিন্তু কমার্শিয়াল এলিমেন্ট দিলা কী দিলা না, সেইটা কিন্তু ভাল ছবির সংজ্ঞা হতে পারে না। হ্যাঁ তোমার ছবিতে গান থাকল না থাকল না, সেটাও বিষয় না। ভাল ছবি হচ্ছে সেই ছবি যা সততার সাথে সত্যকে প্রকাশ করে। এটা বিভিন্ন ফর্মে হতে পারে। প্রিমিয়ার শোতেই আমি মেহেরজান দেখি। এবং দেখার পরপরই আমার মনে হয়েছে এটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছবি। ওই ছবিতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধকেই হেয় করার চেষ্টা। নারীর সম্ভ্রমহানি কে ছোট করা হয়েছে পুরো ছবিতে। কিন্তু একটা কথা আমি বারবার বলছি আমি ছবিটাকে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতি না। ছবিটাকে নামিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতিও না। আমার যেটি বিশ্বাস ছিল যে, দর্শকরাই এ ছবির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ছবিটি জাস্ট এক সপ্তাহের মত চলেছে, তারপর নামিয়ে দেয়া হল। যদি না নামানো হতো তাহলে আরও এক সপ্তাহ পরে দর্শকই ছবিটিকে নামিয়ে দিত।

ম্যাজিক লণ্ঠন: এবার এফডিসির দিকে আসি। অনেকেই বলছে চলচ্চিত্রে শিল্পী সংকট আছে। আপনি কী এটাকে সমর্থন করেন?

মোরশেদুল ইসলাম: না, করি না। তবে কমার্শিয়াল ছবি বা বিনোদন নির্ভর ছবির ক্ষেত্রে শিল্পী সংকট আছে। আমরা জানি, একজন নায়কের উপর ডিপেন্ড করে চলছে পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এটা কোন ইন্ডাস্ট্রির জন্য মোটেও ভাল লক্ষণ না। যদি এরকম একজনের ওপর ডিপেন্ড করে চলে তবে ইন্ডাস্ট্রি ধসে পড়তে বাধ্য। সেখানে (এফডিসিতে) আগে নায়ক-নায়িকা সৃষ্টি হওয়া উচিত, যাদের নাকি দর্শকের কাছে এক্সসেপ্টিবিলিটি থাকবে। তবে আমরা যে ধরনের ছবি বানাই সেখানে কোন শিল্পী সংকট নেই। এখানে কারো উপর আমরা নির্ভরশীল নই। চরিত্রমতো কাউকে ভালো লাগলে, যদি মনে হয় তাকে দিয়ে হবে তাহলে তাকে নিয়ে কাজ করি। এরকম অনেকেই এখন তারকা। উদাহরণ হিসেবে রোকেয়া প্রাচীর কথা বলতে পারি।

ম্যাজিক লণ্ঠন: স্যার, ভারতীয় ছবিতে আইটেম সঙের যে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেছে তা নিশ্চয় আপনার দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি। এটাকে এই আইটেম সঙের আবশ্যিকতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কিংবা বাংলাদেশে এর সম্ভাব্যতা বিষয়ে...

মোরশেদুল ইসলাম: কমার্শিয়াল ছবি সারা দুনিয়াতে এখন একই রকম। এখন কেউ খুব ভালভাবে উপস্থাপন করে কেউ খারাপভাবে করে। ইন্ডিয়ান ছবির যে বাজেট, হ্যাঁ সেই বাজেটের কারণে ওরা অনেক ভালভাবে সেটা উপস্থাপন করতে পারে। তবে এটাকে আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। আসলে, কমার্শিয়াল ছবিগুলো কিন্তু সব সময় চলে দর্শকের চাহিদার উপর। দর্শক কী চায় এর ভিত্তিতেই আইটেম সঙের যাত্রা। ওখানে যখন শুরু হয়েছে তখন বাংলাদেশে তা বাদ থাকবে কেন?

আবার ওই ছবিগুলো কিন্তু যুক্তি দিয়ে বা যুক্তি-তর্ক দিয়ে বিচার করে হয় না। সেখানে একটা গান যাবে তা আইটেম গান বলো আর যে গানই বলো তা আগে থেকেই নির্ধারিত হয়। এখন এই গানগুলো ছবির কাহিনীর জন্য আদৌও প্রয়োজন আছে, নাকি নাই, তাও বিবেচ্য বিষয় নয়। এই ধরনের ছবি সবসময় দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সাজানো হয়। তো এইটা, মানে এই আইটেম সঙ দর্শকের চাহিদা। কাজেই তা আসবে।

ম্যাজিক লণ্ঠন: চলচ্চিত্র শিক্ষা নিয়ে যে ব্যাপারটা, মানে নতুন ক্রিয়েটিভ কেউ আসার জন্য এখানে কোনো প্রতিষ্ঠান, ফিল্ম ইনস্টিটিউট নেই- এ ব্যাপারে আপনাদের কোন উদ্যোগ আছে কী না?

মোরশেদুল ইসলাম: আমরাতো সরকারের কাছে এই দাবিটা সব সময় করে আসছি যে, আমাদের এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইনস্টিটিউট করা উচিত। এবং পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট সরকার ছাড়া কেউ গড়ে তুলতে পারবে না। এটা খুব বড় একটা বিনিয়োগের ব্যাপার। স্টুডিও লাগবে, ল্যাব লাগবে- এগুলো সরকারকেই করতে হবে। সেটা আমরা সব সময়ই দাবি করছি। আর এখন যেটা করতে হবে সেটা হলো যে, যেহেতু টেলিভিশনগুলো এখন অনেক হয়েছে। তাই শুধু ফিল্ম নয়, ফিল্ম এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউট যদি এক সাথে করা যায়, তাহলে কিন্তু অনেক বেশি কাজে দেবে। কিন্তু সেটা সরকার করবে। আমরা সব সময় সেটা দাবি করে আসছি।

এর বাইরে আমরা যেটা করতে পারি; ছোট ছোট ওয়ার্কশপ করাতে পারি, বিভিন্ন কোর্স করাতে পারি। সেটাতো হচ্ছে মোটামুটি। তানভীর মোকাম্মেল যেমন করছেন। তাদের ফিল্ম সেন্টার নামে একটা সেন্টারও আছে। সেখানে তারা রেগুলার এ্যাপ্রিসিয়েশন করাচ্ছেন। আমাদের পক্ষে এইটুকুই করা সম্ভব। সেটা আমরা করছি।

ম্যাজিক লণ্ঠন: বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এখন কিছু সিনেমা নির্মাণ করছে। তো সেই বিষয়টা সার্পোট করেন কি না, বা এই ব্যাপারটাকে এখন আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যাঁ। টেলিভিশন চ্যানেল সিনেমা বানাচ্ছে। আমি বলব, এটাতো ভালো দিক। তাতে করে কিছু ভালো ছবি হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে যে, আমাদের এখানে ভালো ছবি রিলিজ দেওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। তো সেইখানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কারণে কিছু ভালো ছবি হচ্ছে। তবে আমি এটা A¯^xKvi করবো না যে, প্রথম দিকে ওই ছবিগুলো শুধু টেলিভিশনেই প্রিমিয়ার করানো হতো। সেটা নিয়ে আমরা কিন্তু আপত্তি করেছিলাম।

ফিল্ম আসলে বড় পর্দার জিনিস। ফিল্ম আমি টেলিভিশনে দেখাব ঠিক আছে, কিন্তু সেটা পরে। আগে বড় পর্দায় দেখানো হবে তার পরে হতে পারে টেলিভিশনে। কিন্তু শুধু যদি আমরা ওই টার্গেট করি যে, টেলিভিশনের জন্য সিনেমা বানাব তাহলে সেটি ফিল্মের জন্য ভালো নয়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যে সিনেমা বানাচ্ছে সেগুলো কিন্তু প্রথমে সিনেমা হলেই রিলিজ হচ্ছে। এটাকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখব

ম্যাজিক লণ্ঠন: বলা হয় যে, এটা আসলে টেলিভিশন চ্যানেলের উন্নতিতে আসছে। কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নতিতে সেভাবে নয়।

মোরশেদুল ইসলাম: না, আমি এটার সাথে একমত নই। কারণ অনেকগুলো সিনেমা হয়েছে যে সিনেমাগুলো ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে আমি যদি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর কথা বলি, সেখানে কিছু সিনেমা হয়ত তারা খারাপ করছে। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে বেশ কিছু সিনেমা তারা করেছে যেগুলোকে আমরা ভালো বলতে পারি। সুতরাং আমি এটাকে খারাপভাবে দেখবো না। এখন টেলিভিশন চ্যানেল যখন সিনেমা বানায়, তখন ওই কথাটা তারা মাথায় রাখে যে ওই পুঁজিটা তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে টেলিভিশনের দিক থেকে। সেটাতো বটেই। সে জন্যই সে ছবিগুলো করতে পারছে। তাছাড়া তা পারতো না। এ ধরনের সিনেমা কিন্তু সিনেমা হল থেকে পুঁজি ফিরিয়ে আনতে পারে না। যতোই ছবি ভালো হোক। সেটা বাস্তব কথা। সুতরাং এটা তারা করবেই। আমি মনে করি না যে, এটা খারাপ উদ্যোগ।

ম্যাজিক লণ্ঠন: আচ্ছা, সরকারিভাবে যে অনুদানটা দেওয়া হয় এটা আমরা এখন দেখি যে সাধারণত যারা খুব বড় মাপের চলচ্চিত্র নির্মাতা বা পরিচিত মুখ তারা বেশি পান। কিন্তু তরুণ যারা বা নতুন যারা বানাচ্ছেন এবং ভালো বানান; তারা এই জায়গাটা থেকে উঠে আসতে পারে না। এই জায়গাটাতে এরকম কিছু ব্যাপার আছে কী না যে তরুণরাও কোন অংশ পাবে বা বড়দেরকে দেওয়া হতো ৫০ লাখ টাকা সেখানে পাঁচ তরুনকে ১০ লাখ করে দেওয়া হলো। এরকম কিছু করা যায় কি না ?

মোরশেদুল ইসলাম: না না সেরকম কিছু না। তরুণদেরকে দিলেও ওই ৫০ লাখ টাকাই দিতে হবে। বৈষম্য করার পক্ষপাতি আমি নই। কথা হচ্ছে যে, অনুদান জিনিসটা মানে আমাদের এখানে যতকিছুই আছে তার কোন কিছুই কোন নীতিমালা মেনে করা হয় না। সবকিছুরই একটি নীতিমালা থাকা উচিত। তাই না? আমরাতো এমন কী জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা করার জন্যও দাবি করছি। মাঝখানে কিছু কমিটি এটার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু কোন সরকারের আমলেই এটা হয়নি। জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা যদি আমাদের একটা থাকতো। তাহলে কিন্তু সব কিছুই একটা নীতিমালার ভিত্তিতেই হতো। নীতিমালার ভিত্তিতে হলে কিন্তু এই প্রশ্নগুলো থাকে না।

এখন অনুদান যদি নীতিমালার ভিত্তিতে হতো তাহলে হয়ত বলাই থাকতো (এখন ছয়টা ছবিতে অনুদান দেওয়া হচ্ছে) যে ছয়টার মধ্যে দুইটা হয়ত পাবে অভিজ্ঞ নির্মাতারা, আর বাকি চারটা পাবে নতুনরা, যারা কখনও ছবি বানায়নি। এবং অনুদানটাতো আসলে নতুনদের বেশি করে দেওয়া উচিত। এটা আমি সব সময়ই মনে করি। কারণ নতুনদের দিলে যে কাজে লাগে সেটাও আমরা দেখেছি যেমন সূর্যদীঘল বাড়ী অনুদানের ছবি। ওই দুই পরিচালক যারা আগে কোন ছবিই করেনি। বাদল রহমান তার এমিলির গোয়েন্দা বাহিনী। সুতরাং নতুনদের দিলে কাজে লাগে। কিন্তু ওই যে সুষ্ঠু নীতিমালার ভিত্তিতে যদি হয় তাহলে সেটা হতো। তবে এখন আমরা দেখছি যে, গত দুই বছরে কয়েকজন নতুন পরিচালক অনুদান  পেয়েছে। অনেক নতুন ছেলেও কয়েকটা পেয়েছে। ছবি হচ্ছেও। সমপ্রতি শেষ হয়ে গেল কাজলের দিন রাত্রি। সেই ছেলেটাও কিন্তু নতুন। কিন্তু ওই যে নীতিমালা না থাকায় এগুলো হয়ত কিভাবে পাচ্ছে তা আমরা জানি না।

আসলে কতোটা মেধা যাচাই করে কিংবা স্ক্রিপ্ট যাচাই করে সেটা হচ্ছে, আমরা জানি না। তো সেটার একটা নীতিমালা থাকা উচিত। আর একটা জিনিস যে, সরকার ঘোষণা করেছিল শর্ট ফিল্মকে অনুদান দেওয়া হবে। হয়তো ১০ লাখ টাকা করে পাঁচটা ছেলেকে দেওয়া হবে। কিন্তু সেটা এখনও কার্যকর হয়নি। আমরা শুনছি যে মিনিস্ট্রিতে এটা হচ্ছে। কিন্তু এখনও হয়নি। সেটা যদি হয় তাহলে শর্ট ফিল্মের ক্ষেত্রে নতুনরাই পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

ম্যাজিক লণ্ঠন: স্যার, শিশুতোষ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আপনার একটা ভালো অবদান আছে। তো আপনার অবর্তমানেও শিশুতোষ চলচ্চিত্রের যে আন্দোলন সেটাকে গতিশীল রাখতে বা শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে অন্যদেরকে উৎসাহিত করতে আপনাদের কোন পদক্ষেপ আছে কি না?

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যাঁ, সেটা আছে এবং আমি এ ক্ষেত্রে আমাদের চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির কথা বলি। আমরা চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি গঠন করেছিলাম, আমাদের দেশে যেন শিশু চলচ্চিত্র আন্দোলনটা বেগবান হয়; সব ক্ষেত্রে, এমনকি নির্মাণের ক্ষেত্রেও। তো আমি বলব যে, সেটা অনেকাংশে সফল হতে যাচ্ছে। কেননা আমরা প্রতি বছর ফেস্টিভ্যাল করছি। ফলে আমাদের চিলড্রেন ফিল্ম যা আগে টোটালি উপেক্ষিত ছিল, সেটা কিছুটা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেছে এবং সরকারও ঘোষণা দিয়েছে যে, প্রতি বছর দুইটা শিশুতোষ চলচ্চিত্রকে অনুদান দিবে। এবং সেটা কিন্তু হচ্ছে। সরকার ঘোষণা দেওয়ায় পর-পর দুই বছর আমরা দেখলাম যে এটা রানিং করা হয়েছে। গত বছরও দুইটা শিশুতোষ চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। কাজলের দিন রাত্রি আর একটা সামিয়া জামানের সে। রিসেন্টলি এই বছরও দুইটা চলচ্চিত্রকে দেওয়া হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক, আর চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালটা করার ফলে তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতারা আসছে, মানে শিশুদের মধ্য থেকে নির্মাতা আসছে। আমার মনে হয় যে, এটা একটা বড় ঘটনা। এই যে গত ফেস্টিভ্যালে আমরা প্রায় ১০০টার মতো ছবি পেয়েছিলাম যেখান থেকে বাছাই করে আমরা ৪৮টি ছবি দেখালাম। পাঁচটা ছবিকে পুরস্কার দেওয়া হলো। এই পুরস্কারের মধ্যে আবার আর্থিক ব্যাপারটা থাকে বলে এটা কিন্তু বাচ্চাদেরকে অনেক উৎসাহিত করে।

ছবি বানানোর প্রসেসটাও এখন সহজলভ্য হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসায় প্রচুর ছেলেমেয়ে এখন ছবি বানাচ্ছে। এখন এই বাচ্চারা যে ছবি বানাচ্ছে এদের মধ্যে অধিকাংশই যে ছবি বানানোতেই থেকে যাবে তা হয়ত না। বিভিন্ন্‌ পেশায় এরা ছড়িয়ে পড়বে সেটাই আমরা আশা করি। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় গেলেও ওদের মধ্যে যে চলচ্চিত্র ব্যাপারটা থেকে যাচ্ছে, এটা কিন্তু সমাজে একটা ইফেক্ট তৈরি করবে। আর এর মধ্যে কিছু হাতে গোনা ছেলেমেয়ে আমার মনে হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেই ভবিষ্যতে এ কাজ করবে। তো এতো ছোট বয়স থেকেই যে তাদের মধ্যে এই সিনেমা ব্যাপারটা ঢুকে গেল, এটা কিন্তু একটা বড় দিক। আমি মনে করি, আমাদের চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বাংলাদেশে শিশু চলচ্চিত্র আন্দোলনটাকে বেগবান করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটার ফলাফলটা আমরা হয়ত কয়েক বছর পর থেকে পেতে থাকব।

ম্যাজিক লণ্ঠন: এটা কি সারা দেশেই ছড়িয়ে যাচ্ছে?

মোরশেদুল ইসলাম: সারা দেশেই তো ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে সেটা চিন্তা করতে হবে। টাকা-পয়সার সীমাবদ্ধতা আছে তারপরও কিন্তু প্রথমবার থেকেই আমরা চেষ্টা করছি ফেস্টিভ্যালটাকে ঢাকার পর দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে, ছোট ছোট শহরে তিন দিন ধরে করতে। এবং সেটা কিন্তু হয়েছে রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি এ সমস্ত জায়গায়ও। এবং গত বছর তিনটা বিভাগীয় শহরে (ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম) একই সাথে ফেস্টিভ্যালটা আমরা করেছি। এই বছর থেকে সবগুলো বিভাগীয় শহরে এক সাথে ফেস্টিভ্যালটা হবে এবং সারা দেশের ছোট ছোট জায়গায় এটি করার কথা ভাবছি। সুতরাং আমরা কিন্তু আমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করছি ফেস্টিভ্যালটাকে শুধু ঢাকার মধ্যে সীমিত না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দেবার। এবং এই যে ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে সারা দেশ থেকে ১২৫ জনকে বাছাই করি। তারা যে এক সপ্তাহের জন্য ঢাকায় আসে এটার মাধ্যমেও দেশের সব শিশু-কিশোরদের প্রতিনিধিত্বটা কনফ্রাম করছি ।

ম্যাজিক লণ্ঠন: আচ্ছা, আমাদের এই যে ফিল্ম আর্কাইভ আছে, এই ফিল্ম আর্কাইভটার কাছে আমরা যে প্রত্যাশা করি সে অনুযায়ী কাজ পাচ্ছি না। এ ব্যাপারে আপনার মতামতটা ...

মোরশেদুল ইসলাম: ফিল্ম আর্কাইভের অবস্থাটাতো ভালো না। আমি এই আর্কাইভের সাথে যুক্ত। এর যে এক্সপার্ট কমিটি আছে গত কয়েক বছর ধরে সে কমিটির আমি †g¤^vi| ফিল্ম আর্কাইভের যে মূল সমস্যাটা ছিল এটার নিজস্ব কোন ভবন না থাকা, যে কারণে অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গেছে সেগুলো ঠিক মতো চেক করা হয় নি। ছবি সংরক্ষণ করতে হয় একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়। সেটা না করার দরুণ আমাদের অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। ছবিগুলো ঠিকমতো চেক করা হয় না বা ছবি যে সংরক্ষণ করা হবে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই ধর, ১৪ কিংবা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে; ফিল্ম আর্কাইভে ফিল্ম সংরক্ষণের জন্য ওই রকম মেশিন প্রয়োজন। যার দ্বারা হিউমিডিটি রক্ষা করতে হবে। তা এইগুলো যখন একটা ভাড়া বাড়িতে হয় তখন নরমাল কিছু এয়ারকন্ডিশন কিনে এইগুলো করা হয়। সেটা কিন্তু প্রপারলি হয় না। যেটার জন্য অনেক ছবি নষ্ট হয়ে যায়। তো আমরা প্রথম থেকে দাবি করে আসছিলাম যে, ফিল্ম আর্কাইভের জন্য একটা পরিকল্পিত ভবন দরকার। ফিল্ম আর্কাইভ এমন একটা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যার কাজগুলা একটু বিশেষ ধরনের। সেখানে নিজস্ব একটা ভবন না থাকলে হবে না। সৌভাগ্যের কথা যেটা, একটা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে আগারগাঁওয়ে, সেই জায়গাটা আবার খেয়ে ফেলছে একটা রাস্তা হওয়ার ফলে। যাই হোক, তারপরও আমরা মেনে নিচ্ছি। যতোটুকু জায়গা আছে অর্থাৎ এক একরের একটু বেশি। সেটার ওপর ফিল্ম আর্কাইভের নকশা করা হয়েছে, নকশা পাশও হয়েছে এবং ৭০ কোটি টাকার অনুদান পাওয়া গেছে। এর কাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলে আমরা আশা করছি। এটা ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তো এটা একটা আশার কথা।

ম্যাজিক লণ্ঠন: তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এই মাধ্যমটাতে আসতে আগ্রহী হচ্ছে। তো তাদের মধ্যে যারা চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত বা যুক্ত না, তাদের জন্য আপনার কিছু বলবার থাকে যদি...

মোরশেদুল ইসলাম: কিন্তু আমি মনে করি, এই মাধ্যমটাতে আসার আগে একটু মাধ্যমটা সম্পর্কে জেনে-বুঝে আসা উচিত। তাহলে তাদের কাজগুলোও ভালো হবে এবং তারা কী জন্য কী করছে তা জানতে পারবে। এবং সেই ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র আন্দোলন বা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন সেটা যদি তারা চর্চা করে আসে বা সেটার মধ্য দিয়ে আসে, তাহলে তারা ফিল্মকে বুঝে-শুনে কাজগুলো করতে পারবে। তখনই তাদের কাজগুলো কিন্তু বিক্ষিপ্ত চেষ্টা না হয়ে একটা পরিকল্পিত চেষ্টা হবে, আর কী।

লেখক: হেমন্ত সাদীক ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। তিনি চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি, রাজশাহী শাখা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন