Magic Lanthon

               

রাজীব আহসান

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

তারেক মাসুদের রূপবান এবং কিছু ধূসর-টাটকা স্মৃতি

রাজীব আহসান

এক.

শিল্পকলা একাডেমীর স্টুডিও থিয়েটার লাগোয়া ছাদে বসে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে গরম চায়ে চুমুক দিতেই ভাইব্রেশনে রাখা মুঠোফোনটি কেঁপে উঠল। পকেট থেকে বের করে দেখি তারেক ভাই ফোন করেছেন। ফোন ধরতেই হাসিমাখা ভরাট কণ্ঠস্বর, ‘জরুরি কথা আছে, এক্ষুনি চলে আসো।’ তারেক ভাইকে না বলার সাহস ও শক্তি কোনোটাই আমার নেই। সুতরাং নিজের জরুরি কাজ ফেলে তারেক ভাইয়ের জরুরি কথা শোনার জন্য তার মনিপুরি পাড়ার বাসায় হাজির হই। তারেক ভাইয়ের কথা শুনে আমার চোখ ছানাবড়া। তিনি রূপবান রিমেক করবেন। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না মাটির ময়নার নির্মাতা বানাবেন রূপবান। তিনি যখন বুঝতে পারলেন আমি বিশ্বাস করছি না, তখন পৃথিবীর অনেক বড় বড় নির্মাতার উদাহরণ দিলেন এবং বুঝালেন তিনি এ বিষয়ে খুব সিরিয়াস। তিন দিন পর আমাকে আবার আসতে বললেন।

তিন দিন পর যথারীতি হাজির হওয়ার পর দেখি তারেক ভাই সালাউদ্দিনের রূপবান থেকে শুরু করে রূপবান নিয়ে অন্যান্য সব চলচ্চিত্র (বনবাসে রূপবান, আজকের রূপবান ও আরও দু-একটি) হাতে নিয়ে বসে আছেন। তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস হয় না আমি রূপবান বানাব। রূপবান নিয়ে বানানো সব ছবি দেখা শেষ করলাম। নতুন ছেলে-মেয়ে নিয়ে বানাব।’ উল্টো পাশে বসা একটি ছেলে (সম্ভবত নবীন চলচ্চিত্রকর্মী) বলল, ‘ভাই এটা কি কমার্শিয়াল ছবি হবে?’ তারেক ভাই বলল, ‘আমার সব ছবিই কমার্শিয়াল। মাটির ময়না বাণিজ্যিকভাবে খুবই সফল।’ সেদিন চলচ্চিত্র কতটা শিল্প, কতটা বাণিজ্য তা নিয়ে মধ্যরাত অব্দি বিস্তর আলোচনা করে ঘরে ফিরি।

দুই.

তারেক ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম কবে কোথায় দেখা হয়েছিল মনে নেই। তবে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত কোনো সেমিনার বা আলোচনা সভায় নিশ্চয়। দূর থেকে তারেক ভাইয়ের বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম কিন্তু কাছে ঘেষতে ভয় হতো। তারেক ভাইয়ের মুক্তির গান ও মাটির ময়না দেখে আমি তার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সম্ভবত ২০০৩ এর শেষ দিকে বুকে সাহস নিয়ে একদিন ফোন দিই। তিনি তার বাসায় আসতে বলেন। যথাসময়ে হাজির হই বাসায়। তিনি আমার সাথে খুবই আন্তরিকতার সাথে কথা বলেন। আমরা সেদিন কথা বলছিলাম মাটির ময়না নিয়ে। চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমার বিশ্লেষণ তাকে মুগ্ধ করেছিল কিনা জানি না, তবে তিনি আমাকে তার সাথে রাতে খেতে বাধ্য করেছিলেন। সে রাতে লাল চালের ভাত, মুরগির মাংস, সবজি আর মাছ দিয়ে খেয়েছিলাম।

তারেক ভাইয়ের বাসায় এরপর থেকে যতবারই গিয়েছি কিছু না কিছু, না খেয়ে আসতে পারি নি। সেই থেকে সাত-আট বছর ধরে নিয়মিত তারেক ভাইয়ের বাসায় যাতায়াত। তার কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি, অনেক কিছু শিখেছি। তারেক ভাইয়ের সাথে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অব্দি কত আড্ডা দিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। প্রথম দিকের আড্ডায় আমার সাথে থাকত বিকাশ আহমেদ ও কাজী রানা ভাই, পরবর্তীতে মোহাম্মদ আলী পারভেজ আর  শাহাদত স্বপন।

তারেক ভাই বলতেন আমরা শুনতাম। কী না থাকত ওই আড্ডায়, তবে শুরু যে কী দিয়ে হতো, আর শেষ যে কী দিয়ে হবে বোঝা মুশকিল ছিল। আড্ডা হয়ত শুরু হতো মার্কেজ দিয়ে এরপর বিশ্বসাহিত্যের অনেক গলি পেরিয়ে ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, চিত্রকলা, নাট্যকলা, সংগীত, চলচ্চিত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান হয়ে শেষ হলো রন্ধন শিল্প দিয়ে। তারেক ভাই আমাদের কিয়োরোস্তামির ছোট ছোট কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন মূল ফার্সি ভাষায়, তারপর অনুবাদ করে বাংলায় বলতেন। ছোট ছোট কবিতাগুলো ছিল অনেকটা জাপানি হাইকুর মতো। তারেক ভাই বলতেন, ‘ফার্সি মজার ভাষা, খুব কঠিন নয়, একটু দেখলেই পারবা।’

তারপর ইরানি চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। আলোচনায় স্থান হতো আব্বাস কিয়োরোস্তামি, মোহসেন মাখমালবাফ, মাজিদ মাজিদি, জাফর পানাহি, সামিরা মাখমালবাফ প্রমূখের। তারপর আফ্রিকার চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হতো সেখানে উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করতেন তিনি। একবার এক সন্ধ্যা আমরা কাটিয়ে দিয়েছিলাম নিরোদ সি চৌধুরী নিয়ে আলোচনা করে। আমি তপন রায় চৌধুরীর বাঙালনামা ও বিজয়া রায়ের আমাদের কথা (সত্যজিৎ কে নিয়ে বিজয়ার আত্মজীবনী) বই দুটি পড়ে এর পাঠ প্রতিক্রিয়া তারেক ভাইয়ের কাছে ব্যক্ত করি। বাঙালনামায় অক্সফোর্ডে ‘তপন-নিরোদ’ কথোপকথনের কথা উল্লেখ করা মাত্রই তারেক ভাই বিলেতে নিরোদ সি চৌধুরীর সাথে সাক্ষাতের মজাদার কথা শুনালেন, যা ছিল খুবই উপভোগ্য।

তারেক ভাই আমাদের, মানে তরুণদের খুবই ভালোবাসতেন। তিনি চাইতেন আমরা ভাল বই পড়ি, ভাল ছবি দেখি এবং ভাল ছবি বানাই। তিনি আমাকে ফোন করে জার্মান কালচারাল সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাসবাইন্ডারের ছবি দেখানোর জন্য। আমি মুগ্ধ হয়ে কয়েক দিনব্যাপি ফাসবাইন্ডারের ছবিগুলো দেখেছিলাম। এরপর তারেক ভাইয়ের বাসায় ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।

একদিন তারেক ভাই ফোন দিলেন, ‘তুমি কোথায়, ব্যস্ততা না থাকলে তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।’ যথাসময়ে হাজির হয়ে বললাম, ‘কোথায় যাবেন?’ মৃদু হেসে তিনি বললেন,‘আমার এক পাগলা বন্ধু আছে। তার ইংরেজি কবিতার বই বেরোচ্ছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলে আলোচনা, চলো।’ গিয়ে দেখি পাগলা বন্ধুটি হলো ব্যান্ড শিল্পী মাকসুদ। তারেক ভাই সেখানে সাবলীল ইংরেজি বক্তৃতায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছিলেন।

তারেক ভাই আমাকে তার অতীত জীবনের কথা বলতেন। তার দুঃখ দুর্দশাময় সময়ের কথা বলতেন। একবার তিনি ছবি বানানোর টাকার জন্য মূলধারার চলচ্চিত্রে নায়ক হতে যাচ্ছিলেন। সেই মজার স্মৃতি মাঝে মাঝে বলতেন। তিনি একটি কথা আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘রাজীব, ছবি বানাতে গিয়ে কখনো আহত হয়ো না, তাহলে নির্ঘাত নিহত হবে।’ এখানে আহত হওয়া বলতে ছবি বানানো প্রক্রিয়ায় নানা ঝুট-ঝামেলার কথা তিনি বুঝিয়েছেন। তিনি বলতেন, ‘একদিন তুমি বা তোমরা আমার থেকেও ভাল ছবি বানাবে।’ আমরা যখন প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে হতাশ হয়ে তারেক ভাইয়ের কাছে যেতাম, তখন তিনি আমাদের হতাশা লাঘব করতে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তি ও ফিল্মমেকারের স্ট্রাগলের কাহিনী বলতেন। আমরা বাড়ি ফিরতাম নতুন আশাবাদ নিয়ে।

তারেক ভাইয়ের আলোচনায় থাকত আইজেনস্টাইন, আন্তনিওনি, কুরোসাওয়া, ওজু, গঁদার, চ্যাপলিন, ডি সিকা, ক্রঁফো, তারকোভস্কি, ফেলেনি, পাসোলিনি, ফাসবাইন্ডার, পোলানস্কি, ফ্ল্যাহার্টি, গ্রিয়ারসন, বার্গম্যান, ব্রেঁস, রেনোয়া, স্পিলবার্গ, সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃনাল থেকে শুরু করে পৃথিবীর তাবৎ চলচ্চিত্রকার। তিনি আড্ডা খুবই পছন্দ করতেন। আমাকে ফোনে এবং মুঠোফোনে ক্ষুদে-বার্তায় প্রায়ই আড্ডায় ডাকতেন। তার দুটি ক্ষুদে-বার্তা (sms) এমন-

U r invited to day-long weekly

cine Adda. 13/21 Babar rd. Moh.pur

on sat day, 12 March,

pls confirm by sms.

(11.03.11, 05:15PM)

আরেকদিন ক্ষুদে-বার্তায় লিখলেন-

Dear Razib, we are in office

all day today. So please

let me know what time

you can come by.

(04.04.11, 10:31 AM)

এছাড়াও তারেক ভাই তার সব আনন্দ আমাদের সাথে ভাগ করতেন ক্ষুদে-বার্তায়। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রানওয়ে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করলে তিনি ক্ষুদে-বার্তা পাঠান এভাবে-

Students of kushtia islamic versity

made history yesterday by filling

1250 seat hall to watch Runway.

We salute each audience for patronising

an independent film. (24.01.11, 10:58 AM).

ঠিক তেমনি রানওয়ে সিরাজগঞ্জের একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির খবর তিনি জানান এরকম ক্ষুদে-বার্তায়-

RUNWAY is getting cinema Hall

release @ shopnopuri, in textile village

in Shirazgong on 11th feb.

(09.02.11, 04:31 PM).

      

তিন.

অনেকদিন যোগাযোগ নেই তারেক ভাইয়ের সঙ্গে। হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বললেন, ‘তোমরা বড় ভাইয়ের কোনো খোঁজ-খবর নেও না।’ আমি খুবই লজ্জা পেলাম এবং ইনিয়ে বিনিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলাম। তিনি বললেন, ‘একটা খুশির খবর আছে, বুড়ো বয়সে বাবা হতে চলেছি যদিও এখন দাদা হওয়ার বয়স।’ আমি খুবই খুশি হলাম। তারপর তারেক ভাই ও ক্যাথরিন ভাবী আমেরিকা থেকে বাচ্চা নিয়ে আসার পর গেলাম তারেক ভাইয়ের বাসায়। গিয়ে তার কাণ্ড-কারখানা দেখে আমি অবাক। এসব তিনি কী করছেন। একদম শিশু হয়ে গেছেন তারেক ভাই। তিনি শিশুপুত্রের সাথে সোহরাব-রোস্তম খেলছেন এবং আমাকে বলছেন, ‘এটা আমার কান পুরস্কারের থেকেও বড় পুরস্কার।’ এখন যখন সেই কথা ভাবি  তখন চোখ এমনিতেই ভিজে ওঠে।

এরপর তিনি অনেকগুলো কাজ একসাথে শুরু করেছিলেন। এরমধ্যে বাংলাদেশের উৎসব নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজও ছিল। যে প্রামাণ্যচিত্রে নৌকাবাইচের একটি দৃশ্য ধারণ করতে তিনি হেলিকপ্টার থেকে শট নিয়েছিলেন। খুবই অসাধারণ কিছু শট আমাকে দেখিয়ে বললেন,‘ইস! মাটির ময়নার নৌকাবাইচের সময় যদি এমন একটা শট পাইতাম।’

তিনি সারা দেশ ঘুরে রানওয়ে দেখাচ্ছিলেন। এজন্য মিডিয়া তাকে সিনেমার ফেরিওয়ালা বলে আখ্যা দিয়েছিল। এসময় তিনি সারা দেশের দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহের করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু প্রচুর দর্শক যে চায়ের স্টলে বসে চলচ্চিত্র দেখছে এটা তার দৃষ্টি এড়ায় নি। তারেক ভাই প্রেক্ষাগৃহ মালিক, চায়ের স্টলের সিনেমা দর্শক এদের সাথে কথা বলেন এবং এসব দৃশ্য ধারণ করে নিয়ে আসেন। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়েন সিনেমা হল বাঁচাও আন্দোলনে। আমাকে একটা ক্ষুদে-বার্তায় জানান-

Cinema Hall Bachao Shirshok

motobinimoy shova @ shilpokola

Academy Auditorium @ 10-30 AM

today. You are invited as one of

special speakers. (04.02.11, 09:45 AM).

একসময় ঠিক তেমনি আর্কাইভের দৈন্য-দশায় তিনি লিখেছিলেন ‘চলচ্চিত্রের বধ্যভূমি’ শিরোনামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা। চলচ্চিত্র নিয়ে তারেক ভাইয়ের লেখাগুলো ছিল খুবই প্রাঞ্জল।

চার.

৪ আগস্ট ২০১১। নাখাল পাড়ায় বড় বোনের বাসায় দাওয়াত খেতে গেছি। খাওয়া-দাওয়া পর্বের আগেই তারেক ভাইয়ের ফোন, ‘দ্রুত বাসায় আসো; কথা আছে।’ দাওয়াতের কথা বলায় বলল, ‘কাছেইতো, কথা সেরে আবার চলে যেও।’ তারেক ভাইয়ের বাসায় পৌঁছতেই কাগজের ফুল এর একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এখন দাওয়াতে যাও, কাল পড়ে সন্ধ্যা ৭টার সময় আসো। তোমাকে দায়িত্ব নিতে হবে।’

রাতে স্ক্রিপ্টটা পড়ে খুবই ভাল লাগল। এটা মাটির ময়নার প্রিক্যুয়াল। মাটির ময়না আনুর গল্প, আর কাগজের ফুল আনুর বাবার গল্প। দাঙ্গা, ৪৭ এর দেশভাগ, কলকাতা আর্ট কলেজ, জয়নুল আবেদিন এবং আরও অনেক কিছুই আছে স্ক্রিপ্টটিতে। বাংলা-ভাগের মর্মান্তিক ঘটনার শিল্পিত বয়ান আছে কাগজের ফুল এ। স্ক্রিপ্টটি পড়তে পড়তে আমি আর্ট কলেজের ছাত্রী সিগারেট-খোর মাধবীলতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।

৫ আগস্ট ২০১১ চলচ্চিত্র কর্মী মোহাম্মদ আলী পারভেজকে সাথে নিয়ে তারেক ভাইয়ের বাসায় যাই। তারেক ভাই ভিজ্যুয়াল বর্ণনা দিয়ে আমাদের কাগজের ফুল এর দৃশ্যগুলো বলছিলেন। আমাকে প্রধান সহকারী হওয়ার কথা বললে, আমি নিজের চলচ্চিত্র বানানোর কথা বললাম। হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার গল্প নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছি বলে রুচির প্রশংসা করলেন। তারপর পারভেজের ছবির কারণেও ব্যস্ততার কথা বললাম। ওই ছবির আমি অন্যতম প্রযোজকও। তারেক ভাইকে আসলে সরাসরি না বলা যায় না। তিনি আমাদের কয়েকদিন সময় দিলেন শিডিউল আগ-পিছ করে তার সাথে কাজ করার জন্য। আমি এই জন্য ১৫ দিন সময় নিলাম। তারপর তিনি আবার রূপবান এর কথা ওঠালেন। কাগজের ফুল এর পর তিনি রূপবান বানাবেন বললেন।

আমি বোকার মতো হুট করে বলে ফেললাম আমি রূপবান এর প্রডিউসার হব। তারেক ভাই বললেন, ‘কী কারণে তুমি করবে।’ আমি বললাম, ‘লাভের আশায়। আমি নিশ্চিত, এটা হিট করবে।’ পারভেজ বলল, ‘ভাই নরসুন্দরে যে মেকিং আপনি দেখাইছেন এর কিছুটা থাকলেইতো হিট।’ আমার সারা জীবনে এই প্রথম লাভ-লসের হিসাব করলাম। তারেক ভাই আমাদের বিদায় দিতে উঠে দাঁড়ালেন। পারভেজের সাথে হাত মেলালেন। এরপর আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললেন ‘আমি কিন্তু রূপবান বানাবোই, যাও তুমিই প্রডিউসার।’

সেই শেষ দেখা। সেই শক্ত হাতের স্পর্শ এখনো লেগে আছে। তারপর ১১ তারিখ পর্যন্ত ফোনে কথা হয়েছে প্রায় প্রতিদিনই। ১৩ তারিখ রাতে দেখা হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু দুপুরেই কাগজের ফুল এর লোকেশন দেখে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের প্রাণপ্রিয় তারেক ভাই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। একই সঙ্গে চলে গেলেন সিনেমাটোগ্রাফার মিশুক মুনীর। সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল বর্ণাঢ্য এক চলচ্চিত্র অধ্যায়ের।

তরুণ নির্মাতাদের কাছে তারেক ছিলেন সূয-স্বরূপ। আমরা যারা তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছি, এটা মেনে নিতে পারি না যে- তারেক ভাইয়ের সাথে আর কখনো কোনোদিন কথা হবে না, কখনো আর দেখা হবে না। হাসিমাখা কণ্ঠে ফোন করে বলবেন না, ‘রাজীব বাসায় চলে আসো কথা আছে।’

বিশ্বখ্যাত কবি নাজিম হিকমত বলেছিলেন, ‘বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু এক বছর। তারপর উহা গাড়ির কালো ধোঁয়ার  মতো মিলিয়ে যায়।’ সময় অনেক গড়িয়েছে। এসেছে নতুন শতাব্দী। শোকের আয়ু হয়ত আরও কমেছে। কিন্তু তারেক ভাই আপনি থাকবেন তত দিন, যত দিন এ দেশ থাকবে। আপনার আদম সুরত, মাটির ময়না, অন্তর্যাত্রা, মুক্তির গান, নরসুন্দর, রানওয়ে মধ্যে আপনি বেঁচে থাকবেন। তারেক ভাই, আপনাকে আমরা অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি।

লেখক : রাজীব আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। চলচ্চিত্র পাগল এই যুবক কেবল চলচ্চিত্র নিয়েই কাজ করবেন- এজন্য আর কিছুই করেননি

razibaahsan@gmail.com

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন