Magic Lanthon

               

হেমন্ত সাদিক

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সুখ জাগানিয়া কিছু স্মৃতি ও অতঃপর

হেমন্ত সাদিক


প্রিয় তারেক স্যার,

আমি জানি, আমার এই চিঠি আপনি পড়বেন না। কিন্তু তারপরও এই চিঠি আমি লিখছি। আগামী কোনোদিনও হয়ত লিখব। আমার জীবনের সব স্বপ্ন-সাধ-বাসনা নিয়ে যখন খুব টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে শুরু করেছি, আপনার সঙ্গ পেলাম ঠিক তখন। পুরনো চিন্তা চেতনা জীর্ণ ইচ্ছে বাসনাকে ছুঁড়ে ফেলতে খুবই সাহায্য করেছিল আপনার সেই সঙ্গ। দশম শ্রেণীর মাদ্রাসা-পড়ুয়া আমি তখন প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ঢাকায়। চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমার পরিষ্কার কোনো ধারণাই ছিল না; আর এর বড় বড় নির্মাতাদের নামই তো শুনি নি কখনো।

উৎসবের একপর্যায়ে আমার নায়ক হয়ে আবির্ভূত হলেন আপনি। আয়োজকরা বললেন, আপনি দেশের বিখ্যাত পরিচালক, আমাদের ভাল ও মন্দ চলচ্চিত্রের পার্থক্য কী তা বোঝাবেন। ভাল চলচ্চিত্র কীভাবে আমাদের ওপর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে তা আপনি বোঝালেন। আপনি শুরু করলেন, যখন আপনার ক্লাস শেষ হলো আমি আবিষ্কার করলাম আপনি নিজে কিন্তু খুব কমই আমাদের জানালেন, আমরা সবই প্রায় জানতাম। আপনি কেবল নানাভাবে প্রশ্ন করে আমাদের ভিতর থেকেই উত্তরগুলো আদায় করলেন। মাদ্রাসা থেকে আসা মফস্বলের এই আমার আত্মবিশ্বাস খানিক বেড়ে গেল। মনে হলো আমিও তো কিছু কিছু জানি। আপনাকে আমার ভাল লাগল খুব।

পরে আপনার স্ত্রীর (ক্যাথরিন মাসুদ) ক্লাসে যখন মাটির ময়না দেখলাম, আমি কী উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম! আমি কখনো চিন্তাই করতে পারি নি যে, এ ধরনের (অর্থাৎ মাদ্রাসার পড়াশুনা নিয়ে) জীবনযাপন যারা করে তাদের নিয়েও ভাবা হয়, ছবি হয়। আমার শৈশবও যে অনেকটা আনুর মতোই। এবার আপনি হয়ে উঠলেন আমার নায়ক। মাটির ময়না নির্মাণের বিভিন্ন দৃশ্য ক্যাথরিন মাসুদ যখন দেখাচ্ছিলেন, বিশ্বাস করুন, আপনাকে নায়কের মতোই দেখছিলাম আমি। আপনার কণ্ঠ, উচ্চতা, স্বাস্থ্যবান শরীর আর সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা দেখে আমি সত্যিই খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। বাংলাদেশের আর দুই মহান চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম ও তানভীর মোকাম্মেলের সমবয়সী বন্ধু আপনি; শুনেতো বিশ্বাসই করতে পারি নি। আপনাকে অনেক ইয়াং ও এনার্জিটিক দেখায়।

উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে দিয়ে জানলাম বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের দৈন্যদশা এবং মেধার চরম সংকটের কথা। সুতরাং খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। পরে এই হতাশা অনেকখানি কেটে গেল যখন শুনলাম আপনার চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে বিশ্বের ৪৪টি দেশে প্রদর্শিত হয়েছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানজনক ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগের উদ্বোধন হয়েছে আপনার চলচ্চিত্র দিয়ে। আর সেই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারও লাভ করেছে, তখন সত্যি আশাবাদী হয়ে উঠি। স্বপ্ন দেখতে শুরু করি আপনাকে নিয়ে। গৌরব হতে থাকে এই ভেবে যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ৪৪টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। আমার গৌরব সীমা ছাড়িয়ে গেল যখন দেখলাম আপনার মুক্তির গান ও মুক্তির কথা

শিশু চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যখন চিত্রনাট্যের কাজ শেষ করেছি; লক্ষ্য করলাম আপনার কিছু ব্যক্তিগত অভিমতের প্রভাব আমার চিত্রনাট্যের ওপর পড়েছে। ভাল ছবির যে বৈশিষ্ট্য বলেছিলেন, আমি সেগুলো অনুসরণ করতে চেষ্টা করেছি। অনুসরণ করেছি বলে নিজেকে মোটেও আমার কিন্তু ছোট মনে হয় নি; বরং ভালোই লেগেছে। কারণ আগেই বলেছি, আপনাকে হিরো মনে করতাম, আপনার মতো হতে চাইতাম।

ফিল্ম আর্কাইভ এর এক অনুষ্ঠানে দেখলাম নরসুন্দর। এই চলচ্চিত্রটি দেখার পর আমি পরিষ্কারভাবে বুঝলাম আপনি প্রতিটি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই একটা কিছু বলতে চান। নেহাত বিনোদনের চলচ্চিত্র আপনি করেন না। সস্তা খ্যাতির পিছনে আপনি ছোটেন না। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়- খ্যাতির পিছনে আপনার ছুটতেও হয় নি কখনো। সম্মান, পুরস্কার, খ্যাতি, জনপ্রিয়তা আপনার পায়েই লুটোপুটি খেয়েছে।

বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলনের দিকপাল আপনার সহযোদ্ধা মোরশেদুল ইসলামের সাথে আলাপচারিতায় একদিন জানলাম যে, আপনি, তিনি এবং তানভীর মোকাম্মেল প্রমূখ ছিলেন বাংলাদেশের ফিল্ম আর্কাইভের ফিল্ম এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের শিক্ষার্থী। এই কোর্সের পরপরই আপনি আদম সুরত নির্মাণের দিকে ঝোঁকেন। আমার অবাক লাগে এই ভেবে যে, কী পরিমাণ সাহস আর মেধা থাকলে একজন মাদ্রাসার ছাত্র একটি কোর্স করেই চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো দুঃসাহসিক কাজে জড়িয়ে যেতে পারে।

সেই কোর্সটি অবশ্য আর চলে নি। যেই কোর্স আপনাকে এক অর্থে তৈরি করেছিল চলচ্চিত্রের জন্য, উপহার দিয়েছিল মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেলকে- তা বন্ধ করে দেয় মোটা মাথার রাষ্ট্রচালক। এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আপনি সেসময় আন্দোলন করেছেন, সস্ত্রীক প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ করেছেন ক্ষোভ। জানাতে চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বের কথা। মূর্খ শাসক সে কথায় কর্ণপাত করে নি। পরে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত আপনার চলচ্চিত্রকে করেছে নিষিদ্ধ।

ভিন্ন দেশের মানুষ আপনার চলচ্চিত্র দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছে, সম্মাননা, পুরস্কার দিয়েছে, অথচ নিজ দেশে আপনার কণ্ঠ করা হয়েছে রুদ্ধ। কিন্তু আপনি থেমে থাকেন নি। শুরু করলেন ফেরি করে চলচ্চিত্র দেখানো। শাসককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শহরে-বন্দরে মফস্বলে গেলেন চলচ্চিত্রটি নিয়ে। মানুষ আপনার চলচ্চিত্র গ্রহণ করল- সফল হলেন আপনি। পরিচিত হলেন সিনেমার ফেরিওয়ালা নামে। এই ধৈর্য্য, অসীম মনোবল, এই দৃঢ়তা আপনি কোথায় পেতেন?

আপনার সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে নিয়ে যখন ফেরি করতে এলেন রাজশাহীতে, আমি আর একবার সুযোগ পেলাম আমার নায়ককে কাছ থেকে দেখার। আগে যতবারই আপনাকে দেখেছি, অতিথি হিসেবে দেখেছি। কিন্তু এবার আপনার ছবির প্রদর্শনীতে দেখলাম কর্মী আপনাকে, ভেন্যুতে উপস্থিত হয়েই শুরু করলেন ছুটোছুটি। ‘পোস্টারটি লাগানো সোজা হয় নি, ঠিক করে লাগাও;’ ‘ব্যানারটি ডান দিকে বেশি ঝুলে গেছে, তুলে লাগাও, স্ক্রিন লাগানোটা ঠিক হয় নি মাঝে ভাজ পড়ে আছে, টান টান করে বাঁধো’- এই নির্দেশনাগুলি আপনি করলেন না, আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা আমাদের কাউকে। তার পরিবর্তে যখন যা প্রয়োজন মনে করলেন, কারো অপেক্ষায় না থেকে নিজেই করে নিলেন। পোস্টার লাগানো থেকে টিকেট কাউন্টারের লাইন, প্রজেকশন সবই সামলালেন নিজে।

ক্ষমতাবানকে কেবল নির্দেশ করতে দেখেই অভ্যস্ত যারা, আপনাকে সেদিন এইভাবে দেখে তাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। আমার সীমা রইল না মুগ্ধতার। পণ করলাম জীবনভর অনুসরণ করব আপনাকে। আপনার স্বকীয়তা দেখে শিখতে চেষ্টা করব। কিন্তু সেই শেখার স্কুল আমার এত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে ভাবতে পারি নি। সেদিন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার সময় বারবার শুধু বলতে ইচ্ছে করছিল- স্যার, আমাদের স্কুল আমরা রাখতে পারলাম না, পারলাম না সেই স্কুলে ভালোভাবে পড়তে। আপনি কখনোই আমাদের ক্ষমা করবেন না, কখনোই না।

ইতি

আপনি যাদের হিরো, তাদের একজন

লেখক : হেমন্ত সাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির কর্মী  শিশু চলচ্চিত্রনির্মাতা

sadeeqhemanta@gmail.com

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন