Magic Lanthon

               

সুশান্ত সিনহা

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

মিশুক স্যারের সঙ্গে নয় মাস

সুশান্ত সিনহা


২০১০ সালের মার্চের কোনো এক রাতের ঘরোয়া মিটিংয়ে অতিথি আধপাকা চুলের হালকা পাতলা গড়নের এক মানুষ। সেদিন খুব বেশি কথা বললেন না তিনি, শুধু শুনলেন আর মাঝে মাঝে হ্যাঁ-হু শব্দে দু-একটির উত্তর দিয়ে শেষ করলেন। এটিএন নিউজ এর শুরুর দিকের সেই মিটিংয়ে ওই মানুষটির উপস্থিতিতে তার সম্পর্কে খুব যে বেশি একটা ধারণা পেয়েছিলাম তা নয়। কারণটা নিতান্তই নিজের অজ্ঞতাপ্রসূত। কিন্তু এ মানুষটা যে আর পাঁচটা মানুষের চেয়ে একটু অন্যরকম, তার ইঙ্গিত সেদিন ওই মিটিংয়ে একটু হলেও পেয়েছিলাম। সেই উপলব্ধির পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছি ক’মাস পরেই। বলছি, সাংবাদিক মিশুক মুনীরের কথা। ক্ষণজন্মা এই মানুষটি শিখিয়েছিলেন, কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হয় টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে।

স্বল্পভাষী কর্মঠ মানুষটাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল মাত্র নয় মাস। এই অল্প সময়েই গতানুগতিক সভা-সেমিনারভিত্তিক সংবাদের বাইরে এই প্রজন্মের টেলিভিশন সাংবাদিকদের যাওয়ার পথটা মিশুক মুনীর দেখিয়েছিলেন- এ কথা বললে এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে না। এটিএন নিউজকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার যে জোয়ার এনেছিলেন মিশুক স্যার, তাতে শুধু আমরাই নয়, দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় অনেকখানি পরিবর্তন আসতে পারত। সেই পরিবর্তন চিরতরে থামিয়ে দিল ১৩ আগস্টে মানিকগঞ্জের একটি সড়ক দুর্ঘটনা। বাবা শহীদ মুনীর চৌধুরীর মতোই মিশুক মুনীরের অসময়ে চলে যাওয়ার মাধ্যমে যে উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো, সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একুশে টিভির বাংলাদেশী সাইমন ড্রিং খ্যাত মিশুক স্যারের সম্পর্কে জেনেছিলাম মুন্নী-দির (মুন্নী সাহা) কাছে। স্যার কীভাবে প্রথম প্রজন্মের টেলিভিশন সাংবাদিকদের সব কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতেন সেসব কথাও শুনেছি। নাওয়া খাওয়া ফেলে সংবাদের পিছনে মিশুক স্যারের পাগলাটে ছোটাছুটির ঘটনাগুলোর কথা দিদি যখন বলত তখন মনে মনে মানুষটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করতাম। কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হতো। তবে আমার কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁরাক ঘোচাতে সময় লেগেছিল মাত্র ক’মাস। সেই এলোমেলো চুলের মানুষটি আসার পর থেকেই এটিএন নিউজ এর সংবাদের চেহারা পাল্টানোর মহাযজ্ঞে নেমে পড়লেন।

প্রথমে খুঁটিনাটি সবকিছুই ভালোভাবে দেখে, তারপর স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে একটু একটু করে এগুতে থাকলেন কাঙ্খিত পথে। যার অনেকগুলো পদক্ষেপে তিনি সফলও হয়েছিলেন। বাকিগুলোও সফল করতে যন্ত্রপাতিসহ পরিকল্পনার রূপরেখাও দিয়ে গেছেন মিশুক মুনীর। কিন্তু অধরাই থেকে গেল মিশুক স্যারের সব স্বপ্ন।

মাত্র নয় মাসে মিশুক স্যারকে দেখে, তার কাজের ধরন দেখে মনে হয়েছে, স্যারের স্বপ্নের সব কথা বাস্তব ছিল, আজও আছে। অত্যন্ত অল্প সময়ে মিশুক মুনীর এটিএন নিউজ এর সবাইকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন। যে পথকে অনুসরণ করে একজন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে আগামীর পথ চলতে পারবে। নয় মাসে টেলিভিশন সাংবাদিকতার ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ’ সব কাজেই চাহিবামাত্র পাশে হাজির হতেন অসম্ভব কাজপাগল এই মানুষটি। কোনোদিন তার রুমে ঢুকতে যেমন অনুমতি নিতে হয় নি, তেমনি কোনো প্রশ্নের উত্তর পেতেও ন্যূনতম বেগ পেতে হয় নি। যখনই কোথাও কারো বুঝতে অসুবিধা হয়েছে, সহযোগিতা লেগেছে- সেখানেই এক-ছুটে হাজির হতেন তিনি।

এমনই একদিনের কথা না বললেই নয়। শেয়ার বাজারের দরপতনে উত্তাল শেয়ারবাজার। ডিএসই এলাকায় পুলিশের টিয়ারসেল, লাঠিচার্জ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ছুটছি তখন। হঠাৎ অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়ে ‘হ্যালো, কে?’ বলে জানতে চাইলাম। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল ‘সুশান্ত...আমি মিশুক, তুমি কোথায়?...আমি আসছি, লাইভ হবে।’ কিছুক্ষণের মধ্যে সত্যিই তিনি লাইভের যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হলেন। ওইরকম একটা পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের সিইও এসেছেন রিপোর্টারের সাথে কাজ করতে, এর চেয়ে বড় বিষয় সাংবাদিকের কাছে আর কী হতে পারে! এসেই তিনি প্রথম জিজ্ঞেস করলেন, ‘খাইছো তোমরা?’

অসম্ভব সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী এই মানুষটি এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এগিয়ে যেতে বিকল্প উপায় খুঁজে পথ বাতলাতে পারতেন। কিন্তু করেন নি। তিনি বিশ্বাস করতেন যা আছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করো, আর যা নেই তা আনার প্রস্তুতি নাও। হতাশা যেন মিশুক স্যারের ধারে-কাছে ভিড়তে পারত না।

বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে দেখলাম কারখানার মালিকরা কীভাবে নদীর নিচে দিয়ে পাইপ বসিয়ে কারখানার বর্জ্য পানিতে ফেলছে। বিষয়টা ক্যামেরায় ভালোভাবে তুলে ধরা একটু কঠিনই ছিল। অফিসে ফিরে স্যার এই কথা শুনেই বললেন, ‘ওকে নো প্রোবলেম, ইউ উইল ম্যানেজ আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা।’ কিন্তু বিশেষ ওই ক্যামেরাটি মিশুক মুনীরের আমৃত্যু বন্ধু তারেক মাসুদের কাছে থাকায় তিনি তখন দিতে পারেন নি। কিন্তু স্যার কথা রেখেছিলেন। দুর্ঘটনার মাত্র ক’দিন আগে বিদেশ থেকে আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা কিনে এনেছিলেন মিশুক স্যার। তারপর অনেককে ডেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা কাজ করে। কথা আর কাজের মধ্যে মিশুক মুনীরের এমন মিল শুধু একটা ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়, নয় মাসের প্রতিটি ঘটনায় দেখেছি।

স্যার, আমাদের বন্ধুর চেয়েও বড় ছিলেন। কোনো কিছু জানতে বুঝতে চাইলেই বলতেন আসো। প্রাণ খুলে হাসতে হাসতে তিনি চাহিদা পূরণ করতেন, কখনো ফিরিয়ে দেন নি। শুধু সেদিন মানিকগঞ্জ থেকেই ফিরলেন না তিনি। ধূমপান করতেন মিশুক স্যার, কিন্তু সেটা কখনো ভবনের কোনো ফ্লোরে নয়। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানার দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। দায়িত্ব পেলে ঠিকভাবে পালন করা কেন জরুরি, বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য, সেটা কাজের মাধ্যমে সবসময় তুলে ধরতেন স্যার। সত্যিই শিক্ষক ছিলেন মিশুক মুনীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বদ্ধ ঘরে তার ছাত্র হতে না পারলেও নয় মাসে তার চেয়ে কম পেয়েছি বলে মনে হয় না। মিশুক মুনীরের সাথে কাজ করেছি, এজন্য নিজে গর্ব অনুভব করি। স্যারের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হই প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনে।

স্বল্পসময়ে স্যার যা দিয়েছেন তা মনে রাখলেই দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব। এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে বলছি, স্যারের অনুপস্থিতি ভুলবার নয়। সদা হাস্যজ্জ্বল ও মুক্ত মনের মানুষটিকে আর ক’টা দিন পেলে আমরা অনেকখানি পাল্টে যেতে পারতাম সব দিক দিয়ে। স্যার অসময়ে চলে গেলেন আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে। এখনো অবচেতনে মনে হয় এই বুঝি স্যার হেঁটে আসছেন। স্যার, সত্যিই আরও কিছুদিন আপনার অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল।

লেখক : সুশান্ত সিনহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ছাত্রাবস্থায় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বর্তমানে এটিএন নিউজে রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।

sinhasmp@yahoo.com 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন