Magic Lanthon

               

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

প্রকাশিত ১৩ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ঘেটুপুত্র কমলার প্রধান সম্পর্ক সম্পর্কে

সাদা জলের মেঘ কাশবনে এসে মরে গেলো

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির


হাওরের জল গভীর হয়ে ভরে আছে চোখের সবখানি সীমানায়। মাঝখানে দেখা যায়, রঙিলা এক নাও। তাতে জমানো পাট নাই, সোনা রঙের ধান নাই, হালকা আসমানি রঙের সেই নাওয়ের গায়ে লাল আর সাদা রঙের উজ্জ্বল কারুকাজ। বাদ্য বাজনার সরঞ্জাম, বাদকের দল। শুরু হয় গানের তান, নাচের আয়োজন। ছইয়ের নিচে তখন...

কচি দুইখান পা, সেই পায়ে সোনালি-লাল ঝুমুর; আর চুড়ি জড়ানো হাতে লাল কাপড় বাঁধা; আলগা চুলে ফিতার খানিক লাল। এরপর মুখ দেখলে রঙ করা লাল ঠোঁটের মানুষটির পরিচয় নিয়ে একটু ভ্রম হয়। মেয়েদের বলে প্রচলিত পোশাকে এক সুদর্শন কিশোর ধীরে ধীরে উপরে উঠে এসে নাচে যোগ দেয়, মুখে মাসুম হাসি।

কিশোর ছেলেকে মেয়ে সাজায়ে ঘেটুগানের আয়োজন করা হতো হাওর অঞ্চলে। ঘেটুগানের উৎসবমুখর ভাব; কারণ-ধরন, ব্যবহার, প্রচলন; এবং এসবের উপজাত দ্বন্দ্ব, সমস্যা ইত্যাদি যথাসম্ভব অন্তর্ভুক্ত করে হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী আর পরিচালনায় ২০১২ সালে ঘেটুপুত্র কমলা নামের চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। প্রচলিত বাংলা চলচ্চিত্রের চিরাচরিত নায়িকার স্থলে একজন কিশোরকে উপস্থাপন, বিপরীত পোশাকের ব্যবহার, ঘাটুছেলের আকর্ষী রূপ, পুরুষ জমিদারের বিকল্প যৌনাচরণ-এসবের কারণে নির্মাণশৈলী, ক্যামেরার কাজ, সেট ডিজাইন ইত্যাদি আলোচনা ছাড়ায়ে এই ছবির ক্ষেত্রে বেশি করে আলোচনায় উঠে এসেছে ঘাটুছেলে কমলা বা তার সত্য সত্তা জহির আর জমিদার হেকমতের মধ্যকার সম্পর্ক, সমকামিতার প্রসঙ্গ।


আ.

পুরুষ সিংহ...ধরা যাক তার কোনো কেশর নাই...

ময়ূর পুরুষ...কিন্তু ছড়ায়ে দেওয়ার মতোন পেখম নাই...

একটা কিশোরের মাথায় লম্বা চুল, রক্তের মতোন ঠোঁট, কাঁচুলি-জড়ানো উঁচু বুক...

রোমিলা থাপার আর ভিনসেন্ট স্মিথসহ আরও কতোক ঐতিহাসিকের মতে, বেদের যুগে আর সিন্ধু সভ্যতার কালে, নারী আর পুরুষের পোশাকের তেমন বড়ো কোনো বিভাজন ছিলো না। নারী পুরুষ উভয়ই লম্বা চুল রাখতো, উভয়ই গহনা ব্যবহার করতো, বস্ত্রের নীচে নীবি জড়িয়ে বাঁধত। বিপরীত পোশাকের ধারণা নিশ্চয়ই জোরদার হয়েছে আরও পরে। সমাজ ও সংস্কৃতির ইচ্ছা, উৎসাহে বা চাপে, দুই লিঙ্গের মানুষদের জন্যে আলাদা পোশাকের প্রচণ্ড প্রচলন হওয়ার পরেও মনে মনে, গোপন ঘরে বা সাহস করে লোকের সামনেও বিপরীত পোশাক পরার (cross dressing) ইচ্ছা বা ঝোঁক কারও কারও মধ্যে আসা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু হাওর অঞ্চলের ঘাটু গানে, রাঢ় এলাকার লেটোর দলে, মালদহ বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলকাপ পালায় বা মানিকগঞ্জসহ সারা বাংলার যাত্রার দলগুলোতে বিপরীত পোশাকের ব্যবহার, প্রচলন বা ধরন আলাদা। বিচার, বর্ণনা বা বিশ্লেষণ করতে গেলে-ইচ্ছা, ঝোঁক বা বাধ্যবাধকতা কোনো শব্দ দিয়েই খুব সহজে তা সম্ভব নয়। এইসব শিল্পমাধ্যমের আকর্ষণের শীর্ষে থাকতো-মেয়ের রঙিলা পোশাকে, নারকেলের খোল জাতীয় কিছু জড়ায়ে বুক ফোলানো, আলতা লাল ঠোঁটের বালক। তারা নাচতো, গাইতো। ঘাটুর দলের ছেলেকে ঘাটুপুত্র, ঘেটুপুত্র বা ঘাটুছেলে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। ঘাটুগানের বিষয়বস্তু প্রেমনির্ভর। রাধাকৃষ্ণের প্রেম ও পরকীয়াভাবই প্রধান উপজীব্য। ...সুন্দর চেহারার কিশোর বালককে বালিকার পোশাক পরিয়ে এ ধরনের গান পরিবেশন করা হত। প্রেম বা পরকীয়ার ভাব নিয়ে নাচ-গানের সময়, অঙ্গভঙ্গির কারণেই হোক আর অন্য যে-কারণেই হোক, ঘেটুপুত্র যৌনোদ্দীপক বলে বিবেচিত ছিলো।

বিত্তবানেরা এসব কিশোরকে যৌনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য লালায়িত হতে শুরু করেন। ঘেটুপুত্র কমলায় গানের প্রবল ব্যবহার করে পুরনো সংস্কৃতি স্মরণ করা হয়েছে। তবু যৌনতার প্রসঙ্গই বেশি জোরালো লাগে। যে-যৌনজীবনকে ঘিরে এই ছবির গল্প, তা বিপরীত লিঙ্গের প্রচলিত সহজ যৌনতা থেকে আলাদা। শারীরিক আকর্ষণের ধরন এখানে অন্যভাবে খেয়াল করার মতন। ঘেটুপুত্র ছেলে হয়েও একজন গৃহী পুরুষের মনে যে-আবেদন সৃষ্টি করতে পারে তার অনেকখানিই, অন্তত আপাতভাবে, তার পোশাকের কারণে। সাধারণ, স্বাভাবিক সমকামিতার ক্ষেত্রে এই ধরনের বিপরীত পোশাক জরুরি না। সমলিঙ্গেও যৌনতার ধরন ঘেটুপুত্রের ক্ষেত্রে আলাদা। চৌধুরী হেকমতের সঙ্গে বিছানায় যেতে জহির নামের ছেলেটার কমলায় রূপান্তর হওয়া লাগে। উন্নত বুক লাগাতে হয়; নাভি, কোমর, ঠোঁট, গাল সবখানে মেয়ের মতন হতে হয়। বালকই যদি লাগবে, তখন একটা বালকরূপী বালককে নিয়ে বিছানায় যেতে আপত্তি কেনো?

কোনো নির্দিষ্ট পোশাক যখন ইচ্ছাকৃতভাবে যৌনতা জাগাতে ব্যবহার করা হয়, তাকে ইংরেজিতে বলে ‘clothing fetish’ বা ‘garment fetish’কমলাকে মেয়ের ভনিতায় বিছানায় নিয়ে জমিদার এমন নিশ্চয়ই ভাবে না যে, তার সঙ্গে কোনো বালিকা শুয়ে আছে। মেয়ের পোশাক এখানে কেবল যৌন-উত্তেজক। কিন্তু কেবলমাত্র মেয়ের পোশাকেই যদি উত্তেজনা আসবে তবে ছেলের দরকার কেনো? কেনো বালিকা বা নারী নয়-ছেলে, ঘাটুছেলে?

চলে আসে মুসলমান শাসকদের জীবনের বাইজি প্রসঙ্গ। অনেক মুঘল শাসক ছিলেন বাইজিপ্রিয়। বাইজি আনারকলি আর সেলিমের (সম্রাট জাহাঙ্গীর) প্রেমকাহিনী নিয়ে সারা উপমহাদেশে কিংবদন্তির প্রচলন এখনও আছে। লক্ষ্ণৌয়ের নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ বাইজি নাচের ভক্ত ছিলেন। ঢাকায় সপ্তদশ শতকে সুবাদার ইসলাম খাঁ এর দরবারে কাঞ্চনী নামক বাইজিদের নৃত্য গীত পরিবেশনার কথা জানা যায়। আহসান মঞ্জিলের রঙমহলে, শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিলে, দিলকুশার বাগান বাড়িতে বাইজি নাচের আসর বসতো। মাঝে মাঝে বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলকাতা থেকেও বাইজিরা আমন্ত্রিত হতেন।

আমিরজান, পান্না বাই, গওহরজান, হীরামতি, রাজলক্ষ্মী প্রমুখ ছিলেন ঢাকার প্রখ্যাত বাইজি। এদের সঙ্গে অনেক ভক্ত শাসকেরই প্রেম, দৈহিক সম্পর্ক হতো। তবে ইসলাম ধর্ম পরনারীর সঙ্গে এইধরনের সম্পর্ককে বরাবরই নিরুৎসাহিত করে। তাই হয়তো এক সময় ধর্মভীরু মুসলমান জমিদারেরা বাইজিদের আমন্ত্রণ জানানো ছেড়ে দেন। অথবা হাওর অঞ্চলগুলোতে বাইজিদের আনা তখনকার দিনে অনেক ঝক্কিঝামেলার ব্যাপার ছিলো। আরব দেশগুলোতে উটের জকি জাতীয় বালকদের যৌনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণের ঐতিহ্য থেকেও অনুপ্রেরণা আসতে পারে। নয়তো ঘাটুগানের জন্মই হয়েছিলো জমিদারদের আকর্ষণ করার জন্যে। ঘেটুপুত্র কমলা নিয়ে করা মতিন রহমানের রিভ্যু অনুসারে, ঘাটুগানের বৈশিষ্ট্য, এটি কর্মজীবীদের গান। শুধু বিনোদন নয়, গান গেয়ে অর্থ উপার্জন এর মূল লক্ষ্য।

পয়সা রোজগার যখন লক্ষ্য, তখন বড়ো বড়ো পয়সাদার মানুষদের কাছে যেকোনো আকর্ষণীয় বেসাতি সাজায়ে  নিয়ে যাওয়াই হয়তো প্রধান কাজ ছিলো। জমিদারেরা এক সময় ঘেটুপুত্রের স্বাদ পেতে শুরু করলো, অনেকেই হাওর অঞ্চলের এই রোজগারমুখী গানে জড়িয়ে গেলো, পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করলো। হাওর অঞ্চলের শৌখিনদার মানুষ জলবন্দী সময়টায় কিছুদিনের জন্য হলেও ঘেটুপুত্র নিজের কাছে রাখবেন-এ বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে বিবেচিত হতে শুরু করল।

এসব কারণ জোরালো যদি না হয়, তিন মাস ঘেটুপুত্র কাছে রাখার পিছনে বড়ো একটি কারণ হলো-সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি চেতনে বা অবচেতনভাবে সৃষ্ট, হোক তা দমিত বা সুপ্ত শারীরিক আকর্ষণ। অনেকেরই ধারণা, সমকামিতা বিষয়টি বা এর প্রচলন খুবই সাম্প্রতিক। কিন্তু না। সমলিঙ্গের মানুষের সঙ্গে যৌনতার নজির প্রাচীন ইতিহাসে; গ্রিক, হিন্দু ইত্যাদি পৌরাণিক কাহিনীতে পাওয়া যায়। গ্রিক পুরাণে হায়াসিন্থাস নামের এক সুদর্শন বালকের প্রেমে পড়েন দুইজন মহান দেবতা : সূর্য দেব ও বায়ু দেব। ফুকোর মতে, প্রাচীন এথেন্সের সমাজে সমকামিতার গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। তাই ‘Same-sex desire-or homosexuality...existed since the human discovery of sexuality.’ অর্থাৎ যৌনতার সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয়ের কাল থেকেই সমকামিতা প্রচলিত। আবার আমাদের এখানে অনেক রক্ষণশীলরাই মনে করেন, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে নতুনদের মাঝে এই প্রবৃত্তি চলে এসেছে। কিন্তু এই ধারণাও ভুল। মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে কৃষ্ণ আর অর্জুনের শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত আছে। আরও বড়ো একটি প্রমাণ হলো, বাৎস্যায়নের কামসূত্রের অন্তর্ভুক্ত সমকামিতা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা। বা বরুরুচির উভয়াভিসারিক কাব্যে যেমন এসেছে...

ব্যক্ষেপং কুরত স্তনৌ ন সুরতে গাঢ়োপ গূঢ় স্যতে

রাগস্মস্তব মাসি মাসি সুভগে নৈবার্ত বস্যাগম :

রূপশ্রীনব যৌবন্যেদ্বয় রিপু গর্ভোনুপি নৈবাস্তিতে

হ্যেবংত্বাং সুগণাং বিহাস্যতি স চেদরু তৎসবং ত্যক্ষতি।

অর্থাৎ, স্তনযুগল না থাকায় তোমাকে সহজেই আলিঙ্গন করা যায়। ঋতুস্রাবের কোনো দুশ্চিন্তা নেই বলে তোমায় নিয়ে সুখের সাগরে ডুবে থাকা যায়। গর্ভধারণের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে তোমার শরীরে চিরকালই যৌবন খেলা করে।১০

সুফি সাহিত্যে পুরুষ সাধকেরা নিজেদের একজন পুরুষ ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করার বাসনা করতেন। আরবি কাব্যেও সমকামিতার উপস্থিতি মেলে।

‘...from Abu Nuwas:

For young boys, the girls I've left behind

And for old wine set clear water out of mind.’১১

(নতুন বালকের তরে বালিকার সাধ ছেড়ে এলাম,

পুরনো মদের লোভে আমি শুদ্ধ পানি ভুলিলাম।)

সমলিঙ্গেও দৈহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমসময় স্বাভাবিক সমকামি স্বভাব লাগে না। অনেক আবাসিক বালক বিদ্যালয়, মাদ্রাসায়, কারাগারে, আর সামরিক-বেসামরিক বাহিনীতে নারীর অভাবে বিপরীতকামি ছেলেরাও সমলিঙ্গে তৃষ্ণা মেটায়। এরা উভকামি (bisexual) আচরণ করলেও মূলত বিপরীতকামি। চৌধুরী হেকমতকেও এই ধরনের উভকামি ধরা যেতে পারে। তবে সে কমলার মতন ঘেটুছেলে রাখে বাধ্য হয়ে নয় অবশ্যই। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। ঘেটুপুত্র, নাবালক পুরুষ, দরকার অন্য মাত্রার আমোদের জন্যে। ‘Sodomy’ বা পায়ুকামে যৌনস্বাদ আলাদা। স্বাদের ভিন্নতার জন্য হয়তো তার বালকের শরীর প্রয়োজন। আর ঘাটুছেলেই একমাত্র সহজলভ্য পুরুষ যৌনসঙ্গী, নিরাপদ। নিরাপদ কারণ-এই ধরনের মূলত বিষমকামি, বিশেষ ক্ষেত্রে সমকামিদের বেশিরভাগই যুবক, সমর্থ পুরুষের চেয়ে নাবালক বা মেয়েলি ছেলেদের পছন্দ করে। ‘penetrated’ (অন্য কোনো পুরুষকে সক্রিয় ভূমিকায় মিলিত হতে দেওয়া) হওয়ার ভয়ে এরা চায় ‘passive’ (নিষ্ক্রিয় ভূমিকার) কচি, নরম ছেলে।

 

ই.

আমি রাজার মতোন তোমার

কাঁধে অবমনে ঢেলে দেই

বিশালরকম লোভ, সেই লোভের

সমস্ত পাপ তোমার বুক বেয়ে নিচে নামতে থাকে...

 হুমায়ূন আহমেদ সমকামিতার বাঙালি ‘confusion’ (দ্বৈতভাব) অনেকখানি ধরতে পেরেছেন। চৌধুরী হেকমত আর জহির/কমলার সম্পর্ক আসলে কোনো সহজ সমকামিতায় ব্যাখ্যা করার মতন না। আবার বাইজির সঙ্গে শৌখিন মানুষের যে-ধরনের সম্পর্ক থাকে তাও না। আরও জটিল কিছু একটা। এখানে একদিকে সমর্পণ আর অন্যদিকে ভোগ আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, জহির/কমলাকে শিকার আর হেকমতকে শিকারি মনে হয়। অর্থাৎ, এখানে কিশোরটি যৌন নির্যাতনের শিকার।

জহির দরিদ্র, তার বাবার টাকা প্রয়োজন। জমিদার তাদের তিন মাসের জন্য থাকতে দেয়। জলাবদ্ধ সময়টায় রাতের বেলা বসে নাচ আর গানের আসর। আগে থেকে বায়না করা থাকে। পুরো ঘেটুর দলে সেই টাকা ভাগাভাগি হয়। উপরি হিসেবে জমিদার আরও টাকা দেয়। থাকা খাওয়ার যথাসম্ভব রাজকীয় আয়োজন। সবাই উপভোগ করে তিন মাসের এই যথা-বিশাল আয়োজন। দুঃখ, সমস্যা বা যন্ত্রণা হয় মূলত তিনজন মানুষের : জমিদারের স্ত্রী, জহিরের বাবা ও জহিরের। শিকার আর শিকারি বললেও হেকমতের সঙ্গে জহিরের সম্পর্ক পরিষ্কার বোঝা দায়। কারণ, এখানে শিকার আগে থেকেই জানে তার সঙ্গে কী ঘটতে যাচ্ছে, তাকে কী করতে বাধ্য করা হবে। সে আত্মত্যাগের ভঙ্গি নিয়ে সেই জমিদারের ঘরে যায়। দারিদ্র্যের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করা যাকে বলে।

যেমন, একটা দৃশ্য ধরে বললে-হেকমত যে-রাতে প্রথম জহির/কমলাকে নিয়ে শোয়, সেই রাত। হেকমত চিরাচরিত পুরুষালি(?) আর জমিদারি ভাব নিয়ে অপেক্ষায়। কমলায় সজ্জিত জহিরকে দিয়ে গেলো এক চাকর। আবহসঙ্গীত তখন ভীতিসূচক। দরজায় এক কালো বাঘের মূর্তি হিংস্র ভঙ্গিমায়। হয়তো হেকমতের হিংস্রতার প্রতীক। জহির/কমলা এসে বসলেই প্রথম যে-কথা হেকমত বলে, আমারে ভয় পাবা না, ভয় পাবার কিছু নাই।

জহির/কমলার সারা মুখে, হাতে, পায়ে, চোখে, বুকে তবুও ভয় স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। ভয় আরও জোরালো হলেও সে কিন্তু না করে না। মনে হয় জানে যে, জমিদারকে এখন এড়ায়ে যাওয়া অসম্ভব। যতোখানি নীরবে সম্ভব, সে সহ্য করে যায়। জানে টাকার জন্যে তাকে কষ্টটুকু সহ্য করতে হবে। হয়তো ঘেটুর দলের বায়নার টাকা তার এই কষ্ট স্বীকার ছাড়া ন্যায্য হয় না। হেকমতের কাছে কিন্তু টাকাটাই মুখ্য না। সে খুবই দানশীল ব্যক্তি। বিভিন্ন জায়গায় অকাতরে দান করে। জহির/কমলার দেহভোগ ছাড়াও, কেবল গান শুনে, নাচ দেখে কিন্তু সে টাকা দিতে পারতো।

যেই পোশাক পরায়ে জহিরকে কমলা বানানো হয়, যে-পোশাক না হলে জহির গানের আসরে নাচের যোগ্য হতে পারতো না, যেই বেশে জহির বালিকার সাজে হেকমতের বিছানায় এলো, সেই পোশাক এখন হেকমতের কাছে অপ্রয়োজনীয়।

গরমের মধ্যে বেশি কাপড়চোপড় না থাকাই ভালো। ঘাগড়া খোলো।

ঘাগড়া খুললে কিন্তু কমলা আর কমলা থাকবে না। জহিরে ফেরত যাবে সে। তার কিশোর শিশ্নও বের হয়ে আসবে। হেকমতের তাতে কোনো সমস্যা নাই। বিছানায় জহির হলেও সমস্যা নাই, কিন্তু নাচের সময় কমলাই হওয়া চাই। বুকে কাঁচুলি, ঠোঁটে রঙ, চোখে কাজল, পিঠ বরাবর চুল আর কোমরের দোলা চাই।

এই ধরনের স্ববিরোধী ব্যাপার বাঙালি সমকামিতার একটা বিশেষ দিক। ঘেটুপুত্র কমলার সফলতা এই স্ববিরোধিতার রূপায়ণে। দুইটা কারণে মূলত এই ধরনের লুকোচুরি, স্ববিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। যারা আসলেই ছেলে-শিশু বা কিশোরের প্রতি আসক্ত, তারা আসলে এক ধরনের মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায়। জমিদার হেকমত যেমন ধর্ম আর ঘেটুপ্রীতির মধ্যে দোল খায়; কাহিনীকার, পরিচালক যদিও পর্দায় এই ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব আনেন নাই। কিন্তু হেকমতের মনে এই জাতীয় খানিক ঝড় উঠলেও উঠে থাকতে পারে। ধর্মভীতি, সমাজসচেতনতা, পরিবারকেন্দ্রিক দায়বোধ ইত্যাদি এক ধরনের ভীতির জন্ম দেয় (ইংরেজিতে যাকে বলে homophobia)। যার জন্যে হয়তো হেকমতেরা রাতে বিনোদন করে ঘাটুছেলের শরীরে শরীর জুড়ায়, আর ভোরের ফজর নামাজে কাঁদো কাঁদো হয়ে দাঁড়ায় সবজান্তা ঈশ্বরের সামনে। মনে মনে সন্তাপ করে। অথবা অবচেতন সমকামিতাকে তারা খুব একটা বুঝে উঠতে পারে না।


ঈ.

হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন বইটি বের হয় ২০০৭ সালের বইমেলায়। এই উপন্যাসে ঘেটুগানের প্রসঙ্গ এসেছে। ধনুশেখ তার বাড়িতে লাখের বাতি জ্বালালো। ...ঘাটুগান শুরু হয়েছে। ...ঘাটুগানের অধিকারী তিনটি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। তিনজনই রূপবান। এরা মেয়েদের ফ্রক পরে মেয়ে সেজেছে। পায়ে নূপুর পরেছে। অধিকারীর ইশারায় গান শুরু হলো। একজন মঞ্চে এসে নারিকেলের মালার বুক চেপে ধরে গান ধরল-আমার মধু যৌবন কে করিবে পান?১২

ঘাটুছেলে ঘরে রাখা যেমন কেবল বড়োলোকের কাজ ছিলো, খালি ক্ষমতাবানের সাধ্যি ছিলো, শিশু-নির্যাতন বা অসম যৌনতার প্রচলন সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে বা মফস্বলে। জসীমউদ্দীনের বউ টুবানির ফুল উপন্যাসে দেখা যায়, পাড়াগাঁয়ের এক লজিং-মাস্টার তার ছাত্রের মন ভুলায়ে দিনের পর দিন তার সঙ্গে গোপন শারীরিক সম্পর্ক চালায়ে যায়। স্কুলের শিক্ষক দ্বারা নির্যাতিত বা শিক্ষক-ছাত্রের অসম সম্পর্কসহ বিভিন্ন ধরনের বাঙালি সমকামিতার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তবে ঘেটুপুত্র কমলার আলোচনায় আলকাপের পালা, লেটো গান, যাত্রাপালা বেশি প্রাসঙ্গিক।

সাইদুর রহমান বয়াতি মানিকগঞ্জের বাউল সাধক। তার জীবনের শুরুতে ছিলো যাত্রার অভিজ্ঞতা। কিশোর বয়সে তদানিন্তন বাসুদেব অপেরায় নাম লেখান। দলে তার নাম হয় ছবিরানী। তিনি পালায় মেয়ের ভূমিকায় নামতেন। এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার ছবিরানী-জীবনের সমাপন। এক লোক একবার ছবিরানী বেশধারী সাইদুর রহমানের গালে কামড় বসায়ে দেয়; রক্ত ঝরতে থাকে। মেয়েদের অভাব থাকায়, যাত্রাপালায় নারীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্যে অল্পবয়সের, মিষ্টি চেহারার ছেলেদের কদর ছিলো। একটু মেয়েলি ধাঁচের হলে আরও ভালো। যাত্রা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের মুসলিম সমাজে প্রচলিত লেটো গানে কিশোররা মেয়ে সেজে নাচ করতো। ঘাটু এবং লেটো নাচের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই।১৩ লেটো নাচের ছেলেদের বলা হতো বাই, ছোকরারাঢ়। রাজকন্যা বা রানী সাজে যারা তাদের বলা হতো রানী। গানে যারা অংশ নিতো সেই কিশোরদের ব্যাঙাচি নামেও ডাকা হতো।

এক কালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুর অঞ্চলে আলকাপ নামের এক লোকনাট্যের প্রচলন ঘটে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলেও আলকাপ বেশ জনপ্রিয় ছিল।১৪ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই আলকাপ নাটককে কেন্দ্র করে লেখেন মায়ামৃদঙ্গ। আলকাপ গানের মূল আকর্ষণ ছিলো নারীর বেশে অল্প বয়সী ছেলেরা। এদের ছোকরা নামে ডাকা হতো। মুস্তাফা সিরাজ এই ছোকরার আবেদনময় রূপ বা মায়াকে অবলম্বন করেছেন এই উপন্যাসে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ওস্তাদ ঝাঁকসু-যিনি আধুনিক আলকাপের জন্মদাতা। তার সঙ্গে দলের ছোকরা শান্তির মানসিক টানাপোড়েনের অংশ দিয়ে শুরু এই উপন্যাস। এই শান্তিকে ঝাঁকসু নাচিয়ে-গাইয়ে হিসেবে তৈরি করেছে, শান্তিকে নিজের কাছেই রেখেছে। এই শান্তির ওপর তার এমন একধরনের ভালোবাসা আছে, যে ভালোবাসা দিতে পারে না তার নিজের তিন স্ত্রীর একজনও। কাহিনীর এক পর্যায়ে শান্তি দল ছেড়ে চলে যায়। নতুন ছোকরা হিসেবে আসে ভানু। এই ছোকরার বয়স একটু বেশি; পরিণত ভাব চেহারায় চলে এসেছে। কিন্তু এই ছোকরারও মেয়েলি ঠাট-ঠমকে কাতর হয়ে ঝাঁকসুর দলের পুরুষদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। কে ওর বেশি কাছের হবে, কে আসর শেষ হলে এর পাশে শুতে পাবে, বা ওর ছোঁয়া পেয়ে নিজেরা কামনায় উদ্দীপ্ত হতে পারে।১৫

ঘেটুপুত্র কমলায় উল্লিখিত ঘেটু গান-নাচের সঙ্গে আলকাপের অনেক মিল থাকলেও মায়ামৃদঙ্গ থেকে ঘেটুপুত্র কমলা অনেকখানি আলাদা। মুস্তাফা সিরাজ দীর্ঘদিন আলকাপের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি তার স্মৃতির কারণেই হোক আর সাহিত্যের খাতিরেই হোক, কাহিনীতে গভীরতা আর মায়ার সৃষ্টি করেছেন। সেই তুলনায় ঘেটুপুত্র কমলার কাহিনী অনেক ভাসাভাসা, দরদের অভাব চোখে পড়ে। এখানকার ঘেটুদলের মধ্যে কেবল পেশাদারি সম্পর্কই খেয়াল করা যায়। একজন বাবা তার ছেলেকে ঘাটুছেলে সাজায়ে নিয়ে এসেছেন। এই একটা জায়গা ছাড়া, বাকি দলের কারও মনের মধ্যেই কাহিনীকার/পরিচালক ঢুকতে চান নাই। বাদ্যযন্ত্রের দল কেবল বাদন করেই ক্ষান্ত, তারা ঘেটুছেলেকে নিয়ে কোনো আগ্রহ বা উদ্বেগ দেখায় না।

চাইলে অনায়াসেই ডান্স-মাস্টারের চরিত্রের আরও খানিক গভীরে ঢোকা যেতো। এই ডান্স-মাস্টার আগে ঘাটুছেলে ছিলো। জমিদার হেকমত বা অন্যকোনো জমিদারের শয়নসঙ্গী তাকেও হতে হয়েছে। তার মনোজগতটাকে-যেকোনোভাবেই হোক, ধরার কোনো চেষ্টা থাকলে ছবিতে বেশ গভীরতা আসতো। অন্য আরেকটা মায়ার জগৎ সৃষ্টি হতে পারতো। ঘেটু হিসেবে তার স্মৃতি পরের দিনগুলোতে কতোখানি, কেমন যন্ত্রনাদায়ক, ক্যামেরা বা সংলাপের ভঙ্গিতে দেখিয়ে দিলে একসঙ্গে দুই দিক থেকে কাহিনীতে নতুনমাত্রা যুক্ত হতো। ডান্স-মাস্টারের চরিত্রের বিশ্লেষণপূর্বক ভিন্নমাত্রা পেতো চলচ্চিত্রটি। আর যে-বড়ো কাজটি হতো তা হলো ঘেটুছেলেদের মানসিক ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ ইঙ্গিত পাওয়া যেতো, তাদের ভবিষ্যত যৌনজীবন কেমন হয়? পরবর্তীতে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে মেনে নিতে সমস্যা হয় কি না? বড়ো হলেও এক ধরনের ভীতি কাজ করে কি না? অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনতাহীন সম্পর্ক চালায়ে যেতে পারে?

মায়ামৃদঙ্গ-এ মুস্তাফা সিরাজ এই কাজটি করে দেখিয়েছেন। আলকাপ পরবর্তী, ছোকরা পরবর্তী জীবনের মানসিক যন্ত্রণার কথা তিনি বেশ গাঢ়ভাবেই তুলে ধরেছেন। আগে আলকাপ ছোকরাদের একজন ছিলো কালাচাঁদ গুনিন। এখন তার বয়স হয়ে গেছে, খুলতে হয়েছে চাঁদির চুড়ি, কাটতে হয়েছে চুল। তবুও আলকাপের ছোকরার স্মৃতি তাড়িয়ে ফেরে, কিন্নরকণ্ঠ ছ্যাঁচর দলের বালক, বর্তমানে বৃদ্ধ কালাচাঁদ গুনিনকে। ...বৃদ্ধাবাসে মনে মনে আজও সে জং না খোলা পা নিয়ে, দীঘল কেশ নিয়ে, শাড়ি ব্লাউজ নিয়ে সাজঘরে। ...বয়স হলেও বেরোতে পারে না নারীর মায়া থেকে আলকাপের মায়া থেকে।১৬


উ.

কমলা জমিদারের বাড়ি আসার পর কোনো না কোনোভাবে সবার মনেই উপরি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। জমিদারের স্ত্রীর ক্ষেত্রে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। আর যেহেতু শৌখিনদার মানুষের স্ত্রীরা ঘেটুপুত্রকে দেখতেন সতীন হিসেবে’, তার মনে হিংসার স্বাভাবিক ও ভয়ানক উদয় হয়।

উপন্যাস মধ্যাহ্নেও স্ত্রীমনের ওপর প্রভাবের নজির এসেছে-ধনুর একমাত্র স্ত্রী কমলা, চিকের পর্দার আড়াল থেকে ঘাটু নাচ দেখছে। তার বুক কাঁপছে। কেন জানি মনে হচ্ছে এই ছেলেটাকে তার স্বামী রেখে দিবে। পালঙ্কে এখন সে আর তার স্বামী শুবে না। তাদের মাঝখানে ঘাটুছেলেটা শুয়ে থাকবে। কী লজ্জা! কী লজ্জা!১৭

হেকমতের স্ত্রী অধিকারবঞ্চিত। নারী-পুরুষ বৈষম্যের অতি বড়ো এক শিকার। স্বামীশয্যা থেকে বঞ্চিত হওয়া হেলাফেলার কথা না। হেকমতের বউ তাই বারবার চোখের জল ফেলে। মনের রাগ মেটাতে কমলা হত্যার আয়োজন করে। কমলা শেষমেশ নিহত হয়। রক্ত গড়ায়ে পড়ে। কিন্তু এক কমলার মরণে কি তার ঘেটু-সমস্যার সমাধান হবে? পরেরবার অন্য ঘেটুপুত্র আসতে পারে। আর একটা ব্যাপার হলো, তার অধিকার হননের ক্ষেত্রে জহির/কমলার কতোখানি দায় ছিলো? বলতে গেলে ছিলোই না। সে এই বাড়িতে এসেছে জীবিকার খাতিরে। কষ্ট সহ্য করে তিন মাস থাকতে পারলে, তার বাবা/দলের অধিকারীর দেওয়া সান্ত্বনা মতে, কতো টাকাপয়সা নিয়া বাড়িতে যাবে, নতুন টিনের ঘর হবে সেই বাড়িতে, মাত্র তো তিনটা মাস। সে না এলে অন্য কোনো ঘেটুছেলে আসতো। ঘেটুপুত্রকে হত্যা করে আসলে কোনো সমাধান হয় না।

জমিদারপত্নীর কাছে কমলা খারাপ ছেলে, অস্পৃশ্য। যদি সমকামিতার জন্যই এই ঘৃণার জন্ম হয়, বিবাহবহির্ভূত দৈহিক সম্পর্কের কারণেই যদি ঘেটুপুত্র এড়ায়ে চলা, তবে সে স্বামীকে কেনো খারাপ বলে না বা ভাবে না? হেকমতকে সে ঘেন্না করতে পারে না বা অস্পৃশ্যও মনে করে না। কিন্তু জহির আর হেকমতের মধ্যে যা কিছু শারীরিক ঘটে, হেকমতই সবসময় উদ্যোগী, আগ্রহী ও সক্রিয়। জহিরের কাজ কেবল সহ্য করে থাকা। হেকমতের কাছে তার স্ত্রীর কোনোই ক্ষমতা নাই। কোনো কিছু বলার অধিকার নাই। জোর করে চৌধুরীকে সে কাছে রাখতে পারে না। অবহেলিত, বঞ্চিত আর অসহায় হয়ে তাই সে বিকল্প রাস্তায় যায়। হেকমত চৌধুরী বহাল তবিয়তেই রয়ে যায়, মাঝখানে কমলার অকাল মরণ হয়। তিন মাসের কষ্টের পর নতুন টিনের ঘরে থাকা, পরীর চেয়েও সুন্দর বোনের কাছে, মায়ের কোলে ফিরে যাওয়া আর হয় না।

জমিদারের নাবালক মেয়ে যৌনতা এখনও বোঝে না। কমলাকে সে অন্য নজরে দেখে। ছেলে না মেয়ে সে বোঝে না; অবাক হয়। সেই থেকে কৌতূহল আর আগ্রহের সৃষ্টি। জহির/কমলার মধ্যে একজন খেলার সঙ্গী সে খুঁজে বেড়ায়। গানের সঙ্গে কমলার নাচ তাকে আমোদিত করে। জহির প্রায় তার বয়সেরই। কিন্তু জমিদার কন্যার মতন সে খেলার রাজ্যে, পুতুল বা ফুলের দেশে থাকতে পারে না। অভিজ্ঞতার তিক্ততার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জমিদারের মেয়ে তাই সবদিক দিয়ে অভাবী, নির্যাতিত, ব্যবহৃত, শৈশবের কোমলতা বঞ্চিত জহিরের বিপরীত চরিত্র।

এখানকার শিল্পী চরিত্রটি শিল্পের অসহায়ত্ব আর পরনির্ভরশীলতার প্রতীক। শিল্পীর কোমল মন, মায়া, সহানুভূতি, সংবেদনশীলতা এই সবকিছু যেনো শক্তিহীন। এমনকি কমলার হত্যাকারী, দাসী ময়নাকে অকুস্থলে দেখেও তা কাউকে জানানোর সাহস তার হয় না। তবু পুরো বাড়িতে, জমিদারের নাবালক কন্যার পর, একমাত্র তার কাছেই জহির একজন স্বাভাবিক মানুষ, গ্রহণযোগ্য কিশোর। এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। জহির তার কাছে দুদণ্ড বসে তার বোনের, মায়ের, খেলার, ভালোলাগার কথা বলে এক ধরনের স্বস্তি লাভ করে।


ঊ.

ধর্ষণেচ্ছায় কমলাকে হেকমতের দ্বিতীয় স্পর্শ শট কাট করে শস্যদানা ভাঙা জাঁতাকল ঘুরে চলা। ঘর্ষণে-পেষণে শস্যদানা নয়, যেন অনাকাঙ্খিত মানবজীবন।১৮ এরও আগে, জমিদারের সঙ্গে কমলার শয়নের প্রথম দৃশ্যের চারপাশবিদারী মাগো চিৎকারসহ কান্নার শব্দের পরপরই কানে আসে শুয়া উড়িলো গানের সুরে দলের বাদ্যযন্ত্রগুলোর দ্রুতবাদন। এর পরপরই চৌধুরীর লজিং মাওলানার কণ্ঠে ফজরের আজানের বিশেষ অংশ-আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম

হেকমতের চরিত্রের একটা বড়ো বৈশিষ্ট্য এই দ্বৈতনীতি। একদিকে রাতের অনৈসলামিক বালক-সঙ্গম, অন্যদিকে ভোরের নামাজের যথাযথ ব্যবস্থা, কড়া নিয়ম। মাগরিব বা এশার জামাতের পরেই ঘেটুগানের আসর। বিভক্ত চরিত্রের পরিষ্কার প্রকাশ-চিত্রশিল্পীর পাশাপাশি বাড়িতে রাখা মাওলানা। এই মাওলানা ঘেটুপুত্রকে মানসিক অনুমোদন দিতে পারে না, আবার হারাম বলে জমিদার সম্মুখে ঘোষণা করার সাহসও তার নাই। মাওলানাও তাই দ্বৈত স্বভাবের দোষে দুষ্ট। এখানে প্রাসঙ্গিক সংলাপ,

মাওলানা : তুমি নামাজে সামিল হওনা ক্যান? চৌধুরী সাব আমারে পুছ করছেন।

সহিস : যেই বাড়িতে ঘেটুপোলা থাকে, সেই বাড়িতে নামাজ! এইডা কেমুন কথা?

ঘোড়ার সহিস সোজাসুজিই ঘেটুপুত্রকে পেতে চায়। ঘেটুপুত্রকে কাছে ডেকে নরম গাল টিপে দেয়। কল্পনায় ঘোড়ার পিঠে জহির/কমলাকে সামনে বসায়ে, সহিস পিছনে ঘন হয়ে বসে। তার কাছে ঘেটুছেলে কেবল বাসনার বিষয়, উপভোগের শরীর। ধর্ম, নীতি তার কাছে বাধা নয়, বাধা হলো টাকা আর ক্ষমতা। সে ঘেটু নিয়ে স্বপ্ন দেখে। তাই মাওলানাকে, নামাজের জামাতকে সে এড়িয়ে চলে। উভয় নাওয়ে পা দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ ওই চরিত্রে পাওয়া যায় না।


ঋ.

‘Sexual abusers of children are as varied as the locations where the abuse takes place. But, more often than not, the absuer is a family member or authority figure and is trusted by the child.’১৯

শিশুরা বিভিন্ন ধরনের যৌন নিপীড়কের মুখে পড়তে পারে-পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে শিক্ষক বা অন্য যেকোনো ধরনের মান্যব্যক্তি এই তালিকায় আসতে পারে। প্রভাবশালী আর সামাজিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে হেকমত অবশ্যই সক্রিয় শিশুকামি। আর একজন শিশু যতোই সহ্য করুক, ব্যাপারটি ধর্ষণের মধ্যেই পড়ে; যৌন অত্যাচারেরই একটি রূপ। এই ধরনের নির্যাতনকারী দৈহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরাবরই স্বার্থপর আচরণ করে। আত্মতৃপ্তিই এদের কাছে মুখ্য। একজন শিশুর ছোট শরীরের ওপর এতোবড়ো চাপ বয়ে যায়! বিশেষ করে শিশু ছেলে হলে, দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে ব্যথার পরিমাণ বেশি হয়। একজন বালক-সম্ভোগকারী তাই তুলনামূলক বেশি ধর্ষকামি (sadist)। হেকমতের মতন দানশীল, পরোপকারী, ধার্মিক আচার-পালনকারী মানুষটি এতোখানি স্বার্থপর আচরণ কেনো করে? কারণ হতে পারে, সে অতিমাত্রায় পুরুষালি থাকতে চায়। সাংস্কৃতিক লিঙ্গপরিচয় (gender) তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রীর কথা শুনে কোনো কাজ তাই সে কখনও করে না। স্ত্রীকে, সন্তানকে সে ভীতির মধ্যে রাখতে ভালোবাসে। তার বসার ভঙ্গিতে বাঙালি সংস্কৃতির পুরুষালি(?) প্রভাব; অতি গম্ভীর কথার ধরনেও সাংস্কৃতিক লিঙ্গ সচেতনতার প্রভাব স্পষ্ট।

অর্থনৈতিক ব্যাপারটিও উল্লেখ করার মতন। হেকমত জহির/কমলাকে টাকার বিনিময়ে দখল করে তিন মাসের জন্যে। তাই হয়তো তার অপরাধবোধ জাগে না। সে হয়তো মনে করে এই ঘেটু রাখার অধিকার তার সামাজিক শক্ত অবস্থানেরই একটি বাড়তি সুবিধা। জহির/কমলা আর জমিদার হেকমতের মধ্যকার সম্পর্ক তাই ব্যবসার, অর্থের। কখনও কখনও নির্দয় শাসক আর অসহায় মজলুমের। এইখানে সমকামিতা আদৌ আছে কি না সন্দেহ জাগে। জহির/কমলার প্রতি হেকমতের যতোখানি আকর্ষণ তার সবখানি শারীরিক। শিশুর মন নারীর মনের মতোই, তার কাছে চরম অবহেলার বিষয়। সে তাই মনের খোঁজ একবারও করে না। তথাকথিত পুরুষের মতন করে সে নিজের দাপট, দখলি ভাব বজায় রেখে চলে। চোখের জল, আবেগ এড়ায়ে চলাই তার কাছে সত্যিকারের ব্যক্তিত্ব, পুরুষত্ব।

জহির/কমলা আর ঘরের স্ত্রী দুইজনই তার মুখাপেক্ষী। কর্তৃত্ব হেকমতের হাতে। দুজনের বিপরীতেই সে সবল। হেকমতকে সমকামি বলা যায়? বিপরীত পোশাকের মাধ্যমে জহিরকে তো কমলা নামের বালিকা বানায়েই রাখা হয়। ঘেটুপুত্রর জায়গায় ঘেটুকন্যা হলেও তার আচরণ কি একই হতো? ঘেটুকন্যা না পাওয়াতেই কি ঘেটুপুত্র ঘরে রাখা?

আবারও জমিদারের চরিত্রের দ্বিমুখী ভাব চোখে পড়ে। সমকামিতা আর বিপরীতকামিতার মাঝামাঝি এক যৌনতার লালন। ঘেটুগান, আলকাপ বা লেটোর ধরনই এই জাতের। এখানে স্বাভাবিক বিপরীতকামিতা বা সহজ সমকামিতার কোনোটাই থাকে না। বিপরীত পোশাকের মধ্যে সমলিঙ্গের মানুষ হারায়, ডুবে-ডুবে যায়, আবার ভেসে উঠে সাঁতরায়।

হেকমতের চরিত্রকে আরও একটু মনোজগতভিত্তিক দেখালে হয়তো তার পক্ষেও কিছু সমর্থন চলে আসতো। হতে পারে হেকমত সমকামিতা, শিশুকামিতা, লিঙ্গবৈষম্য এই ব্যাপারগুলো ঠিক আমলে আনতে পারে নাই। তার কাছে ঘেটুগান পানিবদ্ধ অবসর সময়ের সেরা বিনোদন। ঘেটুগান মানেই ঘেটুপুত্র। সেই ছেলেকে নিয়ে বিছানায় যাওয়া সেই সময়ে অস্বাভাবিক কিছু না। কিছু করার না থাকায় সে ঘেটুগানের আয়োজন করে। হয়তো তার মতন অবস্থাসম্পন্ন অনেক মানুষই এমন আয়োজন করতো। এমনই হয়তো ওই সমাজের রীতি। এতে পাপের বা দোষের কিছু তার মাথায় নাও আসতে পারে।

কিন্তু যেমনই হোক, বিনোদনের বাইরে, কামনা আর অর্থনীতির বাইরে জহির/কমলা আর জমিদারের সম্পর্কে অন্য কিছু অর্থাৎ ভালোবাসা নাই। যেমন করেই দেখা হোক না কেনো, কমলা একধরনের শিকার।

মায়ামৃদঙ্গ-এর ঝাঁকসু আর শান্তির সম্পর্কে ভালোবাসা আছে। বালক সুবর্ণ আর সনাতন মাস্টারের সম্পর্কের অধিকাংশই ভালোবাসার। সনাতন সুবর্ণকে ভালোবেসে ফেলেছিল, যা নিজের মনের কাছে কিছুতেই অস্বীকার করতে পারছিল না। পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেমের অনবদ্য উদাহরণ এই সনাতন-সুবর্ণ।২০ কমলার বাইরের জহিরের প্রতি হেকমতের কি কোনো আকর্ষণ আছে? জহিরকে নিশ্চয়ই হেকমত ভালোবাসে না। তাহলে ঘেটুপুত্র কমলায় আদৌ সমকামিতা আছে?

ছবির একদম শুরুতে প্রদর্শিত প্রোলগের শেষ কথা-আনন্দের কথা ঘেটুগান আজ স্মৃতি। সঙ্গীতের নামে কদাচার বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে বিস্ময়কর এক সঙ্গীত ধারা।

হুমায়ূন আহমেদ এখানে যে-কাজটি করেছেন-শিল্পের একটা ধারাকে তিনি দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছেন। ঘেটুগানের যেনো দুইটা আলাদা অঙ্গ। একটায় নাচ আর গান। আরেক অংশে কদাচার বা অস্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্ক। প্রোলগে পরিচালক বেশ ধারালো ভাষাতেই ঘেটুগানের সঙ্গে প্রচলিত শারীরিক সম্পর্ককে অস্বীকার করেছেন, ঘৃণা দেখিয়েছেন। তাই ছবিটি সমকামিতাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। বরং সমলিঙ্গের প্রচলিত সম্পর্কগুলোর মধ্যে থেকে, এমন একটি ধারাকে তিনি তুলে এনেছেন যেখানে বায়না করে তিন মাস ছোট একটা দেহ দখল করে রাখা হয়। যেখানে দুইজনের বয়সের, শরীরের মাপের ফারাক অনেক। জহির/কমলা জমিদারকে ভয় করে, সহ্য করে; আর জমিদার ভোগ করে, দান করে। ভালোবাসা এখানে একেবারেই নাই। মানসিক আকর্ষণ একদম শূন্য।

ঘেটুপুত্র কমলাকে একটা প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র বলে মনে হয়। ঘেটুগানের বন্দনা করে, কদাচার, অশ্লীলতা এড়ায়ে যাওয়ার আহ্বান বেশ পরিষ্কার মতন ধ্বনিত হয়। প্রোলগের ব্যবহার ছবির প্রোপাগান্ডা-স্বভাবটাকে আরও পোক্ত করে তুলে ধরে। দুনিয়াজোড়া সমকামিতার যে-রূপ, যে-ব্যাপ্তি তার সঙ্গে এই সম্পর্ক যায় না। যারা মূলধারার বিপরীতকামি রক্ষণশীল মনোভাবের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তারাও কিন্তু হেকমত-জহির সম্পর্ককে মেনে নেবে না। তাই এই ছবিতে সমলিঙ্গের সম্পর্ক ঠিক সমকামিতায় উপস্থাপিত না। শক্ত বিপরীতকামি অবস্থান থেকে দেখা অন্য এক ধরনের যৌনতা।


এ.

বান-বন্যায়, প্যাঁচার চোখে মন ভাসে আর ভাসে...

শুকনা জোসনার নেশায়...

রাতভর আমার ভিতরে সব নরম পোড়ে

ভিতরটা সদা-সর্বক্ষণে কেমন জানি সব মনের মতোন...

আগুনে আরও আগুন...স্মরণের মরণ না হইলে...

ফাগুন গুনগুনায়ে আগুন, আগুননন...ফুল আর বুক জ্বলে যায়...

যদি কমলার মরণ না হতো, জহির যদি ঘরে ফিরতো, বোনের সঙ্গে বৃষ্টির জলে, কলার ভেলায় আবার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার বয়স ছাড়ায়ে যদি বড়ো হয়ে উঠতো; তার মানসিকতা আর কামনা-বাসনার বৃদ্ধি কি অন্য সব ছেলের মতন করে হতো? ওই যে-নারকেলের বুক, জমিদারের তিন মাসের রাতগুলো, যৌনোদ্দীপক গান-নাচ, লাল ঠোঁটের স্মৃতি জোরালো হয়ে যেতো না? একবার কমলা হয়ে, তিন মাসের শরীরী অভ্যাস আর স্মৃতি ছেড়ে আবার জহির নামের ছেলে হওয়া কতোখানি সহজ? মায়ামৃদঙ্গ উপন্যাসের ডাক্তার ননীবাবুর মতে, চুল কাটবে, চুড়ি ভাঙবে, পুরুষ হবে? হয়তো হবে-কিন্তু স্মৃতির জ্বালা বড়ো জ্বালা। সে ব্যাটা বাঘের মতো চিবিয়ে খাবে।২১

ছবির শেষের দিকটায়-

এই বছরের মতন ঘেটুপর্ব সমাপ্ত। এখন বছরজুড়ে নানান কাজ, বিভিন্ন ব্যস্ততা শুরু হবে। ঘেটুছেলের এখন আর প্রয়োজন নাই, আবার পানি আসুক তখন দেখা যাবে। শেষ সংলাপের পরপর জমিদার হেকমত পর্দা থেকে ধীরে ধীরে হারায়ে যাচ্ছে। ক্যামেরার চোখে তখন প্রায় শুকনা অগভীর হাওর ওপারে সূর্যের খানিক-লাল-খানিক-হলুদ আভা।

কমলা আর হাওর যেনো একাত্মা ছিলো। যতোদিন ভরা হাওরের উচ্ছ্বাস, গভীরতা অফুরান; ততোদিন কমলার ঘুঙুর ছিলো, কোমরের দোল ছিলো; চোখের কোলে, বুকে-মাথায় বেদনার ভাব ছিলো-অন্তত জীবন ছিলো। এখন শুকনা হাওরের ওইপারে-এইপারে আর কোনো কমলা নাই। ওইপারে মায়ের-বোনের-বাপের কাছে জহিরের নাম হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু কমলার শেষ এখানেই। তার গানের শেষ...ভালো বা মন্দ জীবনের শেষ...

প্রথার কাছে, পরিবার বা বিবাহ নামের রীতির কাছে, অর্থ-সোনার লোভের কাছে, প্রেমহীন কামনার কাছে, সমস্ত জীবিতের কাছে কমলার মৃত অন্তর বিলাপ করে...অভিযোগের যেনো শেষ নেই...অবুঝ সে-অভিযোগ...নির্বিভাগ সেই হাহাকার...

নির্দয়া নিষ্ঠুর পাখি দয়া নাইরে তোর,

পাষাণ সমান হিয়া কঠিন অন্তর।

শুয়া উড়িলো উড়িলো জীবেরও জীবন...

 

লেখক : আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফ্রিল্যান্স লেখালেখি করেন।

muktadir137@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ৮১); বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে তৃতীয় সত্ত্বা চিহ্ন; প্রতিভাস, কলকাতা।

২. রহমান, মতিন; চলচ্চিত্র সমালোচনা : ঘেটুপুত্র কমলা; প্রথম আলো; ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১২।

৩. প্রোলগ, ঘেটুপুত্র কমলা; পরিচালনা-হুমায়ূন আহমেদ; ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, ২০১২।

৪. উইকিপিডিয়ায় এ সংক্রান্তভুক্তি; ইউ আর এল : http://en.wikipedia.org/wiki/clothing_fetish

৫. প্রাগুক্ত; প্রথম আলো; ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১২।

৬. প্রাগুক্ত; প্রোলগ, ঘেটুপুত্র কমলা

৭. উইকিপিডিয়ায় এ সংক্রান্তভুক্তি;http://en.wikipedia.org/wiki/Hyacinth_(mythology)

৮.Hossain, Mashrur Shahid; 'dancing like a man, fighting like a queen: querying queering gendering.' Harvest: Jahangirnagar Studies in Language and Literature; Vol.২৫, ২০১০ : ৬৪। 

৯. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ৮২)।

১০. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ৯০)।

১১. প্রাগুক্ত; Hossain, Mashrur Shahid(২০১০ : ৫৮)।

১২. আহমেদ, হুমায়ূন (২০০৭ : ১১০); মধ্যাহ্ন; অন্যপ্রকাশ, ঢাকা।

১৩. প্রাগুক্ত; আহমেদ, হুমায়ূন (২০০৭ : ১১০)।

১৪. মুকুল, আমিনুর রহমান; লোকনাট্য আলকাপ; ইত্তেফাক; ১৪ এপ্রিল ২০১১।

১৫. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৪২)।

১৬. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৪৪)।

১৭. প্রাগুক্ত; আহমেদ, হুমায়ূন (২০০৭ : ১১০)।

১৮. প্রাগুক্ত; রহমান, মতিন (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২)।

১৯. Betrayed Boys, Website for Sexually Abused Persons. http://www.betrayedboys.com/whatis.html

২০. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৪৫)।

২১. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৪৭)।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন