Magic Lanthon

               

ইমরান হোসেন মিলন ও আশফাক দোয়েল

প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

জনপ্রিয় নায়ক বনাম এক নায়ক তন্ত্র

ইমরান হোসেন মিলন ও আশফাক দোয়েল

 

অনেকেই অনেক দূর এগিয়েছে, কেবল আমরাই পিছিয়েছি- এই বাস্তবতা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির যেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খাটে সেই ক্ষেত্রটির নাম যে চলচ্চিত্র তা খুব একটা বিতর্কের দাবি রাখে না। বিনোদনের এই মাধ্যমটি সম্পর্কে এ কথা বলাও মনে হয় খুব একটা ভুল হবে না যে, সেই ১৯৫৬ সালের শুরুটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ, শুরুতে আমাদের চলচ্চিত্রের মান যা ছিল আজ অব্দি সেই মান উর্ধ্বমুখী হয় নি; কেউ ইচ্ছে করলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ঘেটে দেখতে পারেন। সেখানে দেখবেন, যত পিছনে যাওয়া যাবে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার চিহ্ন তত বেশি পাওয়া যাবে। শুরুর কথা বলছিলাম। শুরুতে আমাদের চলচ্চিত্রে কিন্তু আজকের মতো এত হতাশার ছাপ ছিল না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলচ্চিত্রের শুরুটাও যে আমাদের চেয়ে খুব ভাল ছিল এমনটি নয়। অথচ আজকের ভারতের চলচ্চিত্রের সাথে আমাদের চলচ্চিত্রের শিল্পমানের ফারাক এতটাই যে, কোনো তুলনা করার মতো অবস্থাও নেই। কারণ, আমরা পিছিয়েছি আর তারা এগিয়েছে।

যাই হোক মোদ্দা কথা, আমরা পিছিয়েছি। পিছানোর পিছনে কারণও আছে- একথা বলা বাহুল্য। কী কী সমস্যায় পিছিয়েছি সেকথাও অনেকের জানা। আর এরকম সাধারণ একটি কারণ হলো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির একেক সময় একেক বিশেষ নায়কের উপর নির্ভরশীলতা। অর্থাৎ এক নায়ক তন্ত্র। বিষয়টি নিয়ে শুরুর দিকে আমরা তেমন একটা মাথা ঘামাই নি। তাই বর্তমানে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এক নায়ক তন্ত্রের সমস্যা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে; যেখান থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। কঠিন বলছি এ কারণে যে, অনেক আগেই এ সমস্যার সৃষ্টি। আর ঠিক সময়ে রোগের চিকিৎসা না করলে যা হয়, অবস্থা এখন তাই।

এক নায়ক তন্ত্র অন্যান্য সমস্যার ফল- একথা যেমন সত্য; তেমনি এ কথাও মিথ্যা নয় যে, এই তন্ত্র আরও নতুন নতুন ‘যন্ত্রণা’র জন্ম দিয়েছে। এই আলোচনায় আমরা সেই ‘যন্ত্রণা’র কথাই বলার চেষ্টা করব। তবে এক্ষেত্রে এক নায়ক তন্ত্রের বেড়ে ওঠার ইতিহাসটাও বলা জরুরি বলে আমরা মনে করছি। পাশাপাশি, এই এক নায়ক তন্ত্রের সাথে জড়িত আছে নায়ক এর ডিসকোর্স তাই এ লেখায় সে আলোচনাও কিছুটা প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

নায়কের ডিসকোর্স  এক নায়কের আধিপত্য

চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বয়স যত, নায়ক কথাটির বয়স কিন্তু তত নয়। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের আমলেও নায়কের আবির্ভাব হয় নি। যদিও তখন কেন্দ্রীয় চরিত্রের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু নায়ক বলতে সাধারণত আমরা যা বুঝি তার সাথে কেন্দ্রীয় চরিত্রের পার্থক্য রয়েছে। গীতি আরা নাসরীনের কথা সেই পার্থক্য ধরতে আমাদের সহায়তা করবে। তার মতে ‘নায়ক হবে যা কিছু ভালো তার প্রতিভূ। সৎ, সরল, সংগ্রামী, সাহসী, আবেগপ্রবণ। আর হবেন রুচিশীল যার মধ্যে থাকবে শালীনতা। অনিশ্চিত আধুনিকতা নয়, তিনি ঐতিহ্যের সপক্ষে। মেলোড্রামাটিক হলেও গুছিয়ে কথা বলতেন তিনি। যাত্রার গন্ধমাখা অতি অভিনয়রীতি, আবেগের আতিশয্য লেগে ছিল এই অপেক্ষাকৃত নতুন গণমাধ্যমটির নায়ক চরিত্রে। মূলত গ্রামের ছেলে হতেন নায়ক, কিন্তু ভাষা শহুরে।’

মূলত এসব বৈশিষ্ট্য নিয়েই নায়কের প্রথম ব্যবহার দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০৩ সালে। এডউইন এস. পোর্টারের বিশ্ববিখ্যাত নির্বাক চলচ্চিত্র ছবি দ্য গ্রেট ট্রেন রোবারি’তে। এতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন ব্রঙ্কো বিলি। এই ব্রঙ্কো বিলির মাধ্যমেই বিশ্ব চলচ্চিত্রে নায়ক ধারণাটির বিকাশ লাভ করে। পর্যায়ক্রমে যার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে। নায়কের উল্লিখিত ধারণাকে মূলে রেখে নির্মিত হতে থাকে একের পর এক চলচ্চিত্র।

আমাদের আজকের আলোচনা এই নায়ক নিয়ে নয়। নায়কের এই বৈশিষ্ট্য যে অভিনেতার ওপর আরোপ করা হয়, অর্থাৎ যিনি নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন তার জনপ্রিয়তা নিয়ে। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে কীভাবে তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিভূ হয়ে ওঠেন। বাংলা চলচ্চিত্রের এই এক নায়ক তন্ত্র নিয়ে কথা বলার আগে হিন্দি চলচ্চিত্র বা বলিউড নিয়ে দু-চার লাইন বলতে চাই। আমির খান, সালমান খান বা শাহ্‌রুখ খান নায়ক মানেই সেই চলচ্চিত্র হিট। নায়কের সবচেয়ে ‘অপব্যবহার’ এই বাক্যটির মধ্যেই। একটু খুলেই বলি পাঠক। প্রথমেই স্বীকার করে নিলাম নায়ক একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট। কিন্তু, আরও অনেক কিছুর সমন্বয়ে চলচ্চিত্র, অনেক কিছুর সমন্বয়েই চলচ্চিত্র শিল্প।

কাহিনী, চিত্রনাট্য, সঙ্গীত, ক্যামেরা, সেট, অভিনয় দক্ষতা এরকম অনেক কিছুর সফল সমন্বয়েই একটা চলচ্চিত্র সফল হয়। হওয়ার কথাও তাই। কেবল নায়ক দিয়েই তো চলচ্চিত্র হয় না, হওয়ার কথাও নয়; তাই না? কিন্তু তাই তো হচ্ছে। এখন আর সিনেমা করতে অন্য কিছুর খুব একটা দরকার মনে করেন না অনেকেই। ফলে কী হচ্ছে; চলচ্চিত্রের কাহিনী ও পুরো চলচ্চিত্র শিল্পই নায়কের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর তাই যদি না হয়, তবে দাবাং হিট হয় কোন গুণে? অথবা, বাংলাদেশের কিং খান কী শিল্পগুণ দাবি করে?

যাই হোক। আজকের আলোচনা আমাদের ‘কিং খান’ বা আমাদের এক নায়ক তন্ত্র নিয়ে। সেই আলোচনা শুরু করছি।

রাজ্জাক টু শাকিব; ভায়া সালমান  মান্না

আলোচনা রাজ্জাকের আগ থেকেই শুরু করতে হবে। এ কথা কম-বেশি সবাই জানি, বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ। নির্মিত হয় ১৯৫৬ সালে। তারপর থেকে প্রায় প্রতি বছর নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে আমাদের এখানে। ’৫৬ থেকে পরবর্তী আট-নয় বছরে গোটা সাতেক হবে। জাগো হুয়া সাভেরা, আকাশ আর মাটি, আসিয়া, কখনো আসেনি, সূর্যস্নান, কাঁচের দেয়াল ইত্যাদি। এই চলচ্চিত্রগুলোতে তখন পর্যন্ত ‘ব্রঙ্কো বিলি’ বা নায়ক ছিল না। তবে এসব চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রের উপস্থিতি ছিল।

একই সময় কলকাতায় উত্তম কুমার মোটামুটিভাবে ‘ব্রঙ্কো বিলি’ হয়ে গেছেন। শেষমেষ এমন হলো যে, নায়ক মানেই উত্তম কুমার। পরবর্তীতে আমাদের এখানে যেটা মনে করা হতো রাজ্জাককে। যদিও রাজ্জাকের শুরুটা একটু দেরিতে; ষাটের দশকে। বলা যায়, ‘ব্রঙ্কো বিলি’ বা নায়কের ধারণা কলকাতা হয়ে ঢাকা এসেছে। কারণ রাজ্জাকের নায়কত্বে উত্তম কুমারের নায়কত্বের ছাপ ছিল লক্ষণীয়।

রাজ্জাক যখন ১৯৬৬ তে তেরো নাম্বার ফেকু আস্তাগড় লেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই জগতে পা রাখলেন তখন কিন্তু আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কিন্তু তাতে রাজ্জাকের কোনো সমস্যা হয় নি। কারণ, রাজ্জাকই সেই অভিনেতা যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম ব্রঙ্কো বিলি কিংবা উত্তম কুমারের মতো অভিনেতা সাজেন।

শুরু হলো রাজ্জাকের রাজত্ব। ৬০’র দশকেই বেহুলা, আনোয়ারা, আবির্ভাব, কাগজের নৌকা, নীল আকাশের নীচে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে রাজ্জাক ‘নায়ক’ বনে যান। একইভাবে তিনি পার করেন ৭০’র দশকও। তখন পর্যন্ত আনোয়ার হোসেনও কিন্তু জনপ্রিয়। কিন্তু, ওই যে বললাম! আনোয়ার হোসেন ভাল অভিনেতা হলেও রাজ্জাকের সাথে তার মোটাদাগে একটাই পার্থক্য- উত্তম কুমারের মতো জনপ্রিয়তা নিয়ে। কারণ আনোয়ার হোসেন নবাব সিরাজদ্দৌলা, পরশমনি, শহীদ তিতুমীর, জীবন থেকে নেয়া, স্মৃতিটুকু থাক, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী প্রভৃতি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একজন ভাল অভিনেতা হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন, নায়ক হিসেবে নয়।

রাজ্জাকের কথা বলছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজ্জাকের জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। একের পর এক যেমন; জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন ইত্যাদি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে নায়ক হিসেবে এককভাবে জনপ্রিয় থেকে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন। তবে রংবাজ চলচ্চিত্র রাজ্জাককে আলাদাভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। কারণ, সাধারণ ধারণার বাইরে এসে এখানে দেখানো হয় যে, নায়কও মদ খেয়ে মাতাল হতে পারে!

রাজ্জাক যখন জনপ্রিয়তার চরম তুঙ্গে তখনো ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কয়েকজন নায়ক হিসেবে অভিনয় করতেন। ৭০’র শেষ এবং ৮০’র দশকের শুরুর এই সময়ের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিতে আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, জাফর ইকবাল, ওয়াসিম, ফারুক, সোহেল রানা নায়ক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বলা যায় কেউ কেউ জনপ্রিয়ও হন। কিন্তু রাজ্জাকের মতো দীর্ঘসময় নয়। মধুমিতা (১৯৭৮), রাঙা ভাবি (১৯৮৯), কসাই (১৯৮০), পিতা মাতা সন্তান (১৯৯১) প্রভৃতি সিনেমায় আলমগীর প্রশংসিত হন। এর আগে বুলবুল আহমেদও  সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), দেবদাস (১৯৮২) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একটা সময় ধরে নায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

৮০’র দশকে এসে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, এই সময় ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র বেড়ে যায়। চরিত্রের প্রয়োজনেই এসময় জনপ্রিয় হন জসিম। ৮০’র দশকের শেষে পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল ইলিয়াস কাঞ্চনকে সাথে নিয়ে নির্মাণ করেন বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯)। বলা যায়, এখন পর্যন্ত কম বাংলা চলচ্চিত্রই বেদের মেয়ে জোসনা’র জনপ্রিয়তা ছুঁতে পেরেছে। এই সিনেমার মাধ্যমেই আবার নায়ক হিসেবে পথচলা শুরু করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। একটি নির্দিষ্ট ভক্তমহলও তার তৈরি হয়। কারণ, তিনি রোমান্টিক, অ্যাকশন দুই ধরনের চলচ্চিত্রেই দক্ষতার পরিচয় দেন। কিন্তু চলচ্চিত্রে তার জনপ্রিয়তাকে তিনি নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ডে নিয়ে যেতে পারেন নি।

৯০’র দশকে নায়ক চরিত্রে মান্না, নাঈম, সালমান শাহ্‌, শাকিল খান, রিয়াজসহ বেশ কয়েকজন নতুন মুখের সন্ধান মেলে। এদের মধ্যে নাঈম-শাবনাজ জুটি দু-চারটি ছবি করে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। তবে তা খুব বেশি দূর এগোয় নি। দ্রুত পাওয়া জনপ্রিয়তা, দ্রুত নেমে যায়। এই সময়ে শান্তির বরষণ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন সালমান শাহ্‌। রোমান্টিক ধাঁচের সিনেমা করে সালমান অভাবনীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন।

সালমান এর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে ছিল যে, ১৯৯৬ সালে তার মৃত্যু সইতে না পেরে ভক্তরা আত্মহত্যা করেছেন- এমন একাধিক সংবাদ তখন পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারের পুরোটা সময়ই তিনি এককভাবে জনপ্রিয় হয়ে ছিলেন। কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩) দিয়ে শুরু করে সব মিলিয়ে ২৭টি সিনেমায় তিনি এখন পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম নায়কদের শীর্ষস্থানীয় অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছেন।

সালমান শাহ বেঁচে থাকলে কী হতো বলা মুশকিল। কিন্তু মারা যাওয়াতে যেটি হয়েছে যে, তার জায়গায় কেউ এসে আর দাঁড়াতে পারে নি। মান্না, রিয়াজ, শাকিল খান, আমিন খান, নাঈম, রুবেলসহ অনেকেই চেষ্টা যে করেন নি তা নয়; ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, সালমান শাহ্‌র রোমান্টিক ইমেজকে তারা কেউই ধারণ করতে পারেন নি। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিকে তো টিকে থাকতে হবে, ব্যবসা করতে হবে। এই চিন্তা থেকে ইন্ডাস্ট্রি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আগ্রহী হয়ে পড়ে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রে। এইখানে সব দিক দিয়ে ‘ফিট’ হওয়ায় মান্না আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হতে থাকেন। হঠাৎ করেই সালমানের মতো বিদায় নেন মান্না। তারপর এককভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শাকিব খান; যিনি একসময় মান্নার সহযোগী হিসেবে অভিনয় করতেন। মান্নার মৃত্যুর পর ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন কোনো মুখ না আসায় অথবা না আনায় শাকিব খান এখন একাই একশ। এভাবে বলছি এ কারণে যে, শাকিব খান দেশের বাইরে থাকায় এফডিসিতে ১২দিন শুটিং বন্ধ ছিল।

এই গেল এক নজরে বাংলা চলচ্চিত্রে নায়কের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই আলোচনা এজন্য করতে গেলাম যে পরবর্তী নায়কসংকট বা এক নায়ক তন্ত্রের আলোচনাগুলোতে এই তথ্যগুলো জরুরি।

এক নায়কেই সন্তুষ্ট ছিল ইন্ডাস্ট্রি

রাজ্জাক আসলেন ১৯৬৬ তে। যদিও এর আগে আনোয়ার হোসেন ছিলেন; কিন্তু আনোয়ার হোসেনকে নায়ক হিসেবে আর কয়জন জানেন! রাজ্জাক প্রায় এক যুগ নায়ক হিসেবে রাজত্ব করেছেন। ইতিমধ্যে কিন্তু ফারুক, ওয়াসিম, বুলবুল আহমেদসহ বেশ কয়েকজন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করে টুকটাক দু-একটি সিনেমাও করে ফেলেছেন। কিন্তু রাজ্জাকের রাজত্বে তারা কোনো আসন পান নি। কারণ, পুরো ইন্ডাস্ট্রি তখন নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে নিয়ে ব্যস্ত।

আমরা শুরুতেই বলেছি কী কী উপাদানের মাধ্যমে সাধারণত একটি সিনেমা সফল হয়। যাই হোক, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি শুরুর দিকে প্রায় সব উপাদানকেই প্রাধান্য দিত। কিন্তু ভুল যেটি হয়েছে, তারা নায়কের বেলায় কেবল রাজ্জাক-কেন্দ্রিক হয়েছে। আরও যে কয়েকজন নতুন মুখ এসেছে সেদিকে কারো নজর ছিল না।

একসময় নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের সময় ফুরিয়ে এল। সমস্যা তেমন একটা উপলব্ধি হলো না। কারণ, তখন পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রির অন্য উপাদান যথাযথই ছিল। ফলে আলমগীর, বুলবুল, ফারুক, ওয়াসিমদের নিয়ে চলচ্চিত্র ভালোই চলতে থাকল। জসিম, সোহেল রানার মতো ধারাবাহিকভাবে অনেক নায়ক আসলেন আর গেলেন। কেউ-ই দীর্ঘসময় টিকে থাকা কিংবা রাজ্জাকের মতো জনপ্রিয় হতে পারলেন না।

রাজ্জাকের পর তার সমপর্যায়ের জনপ্রিয়তা অর্জন করেন সালমান শাহ্‌। কিন্তু খেয়াল করার বিষয় হলো, সালমান শাহ্‌’র সময়ও ইন্ডাস্ট্রিতে নাঈম, ওমর সানি, আমিন খান তেমন মূল্যায়িত হন নি। ইন্ডাস্ট্রির নজর এসময়েও ছিল সালমান শাহ্‌’র দিকে। ইন্ডাস্ট্রি মনে করেছিল, আর কাউকে দরকার নেই। সালমান শাহ্‌ থাকলেই চলবে। কিন্তু একজন নায়ক যে চিরদিনই নায়ক থাকেন না, সে কথা স্মরণে ছিল না। ফলে এবার ইন্ডাস্ট্রি সমস্যায় পড়ল সালমান শাহ্‌’র অনুপস্থিতে। রিয়াজ, শাকিল খান, ফেরদৌসসহ এরকম অনেক নায়ককে দিয়েও সালমান শাহ্‌’র জায়গা পূরণ করা গেল না। একটা সময় এসে নায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হলেন মান্না। কিন্তু সালমান শাহ্’র সাথে মান্নার পার্থক্য হলো- প্রথমজন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তার স্বকীয়তা ও দক্ষতা প্রদর্শন করে, আর দ্বিতীয়জন জনপ্রিয় হন কাহিনীর সাথে একটি নির্দিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করে।

যেখানে অভিনয় দক্ষতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চরিত্র। যাই হোক, মান্নাকে দিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প চলছিল। কিন্তু ততদিনে একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল যে, সিনেমাতে আগের উপাদানগুলো যথাযথ নেই; অনেক কিছুই মরে গেছে। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সঙ্গীত, প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে শুরু করে সবকিছুর অধঃপতন লক্ষ্য করার মতো। ফলে দর্শক শ্রেণীরও পরিবর্তন ঘটল। মধ্যবিত্ত থেকে নেমে এল নিম্নবিত্তে। আর নিম্নবিত্তের কাছে মান্না জনপ্রিয়তার কারণ তিনি যেসব সিনেমায় অভিনয় করেছেন; তার বেশির ভাগই শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। যেটি গীতি আরা নাসরীন বলেছেন, নায়ক হিসেবে মান্নার মূল্যায়ন করতে গিয়ে, ‘সামপ্রতিক চলচ্চিত্রগুলো দেখলে আমরা বুঝতে পারব, মান্না সাধারণত ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। কখনো তিনি অপরাধী পুষছেন এমন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সৎ পুলিশ অফিসার, কখনো বা গুণ্ডা বাহিনীর বিরুদ্ধে বস্তি রক্ষায় নিয়োজিত রাগী যুবক, কখনো বা ধনীর ধন কেড়ে এনে গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার দাতা।’ আমাদের সমাজে যেখানে অহরহ নানা ধরনের অপরাধ, প্রভাবশালীদের অন্যায় অত্যাচারে নিম্নশ্রেণীর মানুষ অতিষ্ঠ, তখন মান্না সেসব দর্শকদের কাছে একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর| আর এটিই ছিল তখন তার জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ।

তারপর ২০০৮ সালে মান্নার মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রে মরার উপর খাড়ার ঘা’র মতো আঘাত হানল। নায়কই নেই। কী আর করা যাবে! শেষমেষ একমাত্র শাকিব খান ছিলেন, তাকেই বেছে নেওয়া হলো। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, চলচ্চিত্রে শাকিব খানের প্রথম আবির্ভাব ১৯৯৯ সালে অনন্ত ভালোবাসা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। কিন্তু উত্থান শুরু ২০০৮ সালে। যিনি কিনা দীর্ঘ নয় বছর কোনো হিট ছবি উপহার দিতে পারলেন না (যদিও বিশ্বের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ অভিনয় জীবনের নানা পর্যায়ে এসে সফলতা পাওয়ার উদাহরণ আছে। কিন্তু শাকিব খানের ক্ষেত্রে সেই উদাহরণ কতটা খাটে সেটা বিবেচনার বিষয়), অথচ হঠাৎই নায়ক বনে গেলেন? ‘কিং খান’ হয়ে উঠলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রে? রাতারাতি কী তার অভিনয় দক্ষতা বৃদ্ধি পেল? এসবের উত্তর এককথায় বললে বলতে হয় নায়ক মান্নার মৃত্যু।

আর মান্নার মৃত্যুর পর যদি শাকিব খান না থাকত তা হলে কী হতো; অথবা শাকিব খান যদি ‘মারা’ যান তাহলে কী হবে? কী আর হবে, হয়ত বিকল্প কাউকে খুঁজতে হবে। আর যতদিন খুঁজে পাওয়া না যাবে ততদিন হয়ত এফডিসিতে শুটিং বন্ধ থাকবে। অথচ, আমরা যদি রাজ্জাক, সালমান শাহ্‌, মান্না থাকাকালীন বিকল্প তৈরি করে রাখতাম, তাহলে মনে হয় আজকের এই নায়ক সংকট দেখা দিত না। কিন্তু আমাদের পরিচালক-প্রযোজকরা সবসময় চলচ্চিত্রকে ব্যবসায়িকভাবে মূল্যায়ন করেন। এটি যে একটি শিল্প তা তারা অস্বীকার না করলেও বরাবর উপেক্ষা করেই এসেছেন। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।

নায়িকা কেবল নায়কের প্রয়োজনে 

নায়িকা পপির একটা বক্তব্য দিয়ে শুরু করছি। নায়িকা বলতে কী বোঝাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে পপি একটি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘ওই যে, যিনি নায়কের একক ঘোড়াদৌঁড়ে মাঝেমধ্যে লাগাম টেনে ধরেন। দু-একটি গান গেয়ে আর নেচে দর্শকদের অবসাদ দূর করেন। পরিশেষে সমাপ্ত লেখা ওঠার সময় নায়ককে জড়িয়ে ধরে শুকনো হাসি হাসতে পারেন- তিনিই তো নায়িকা!’

বস্তুত পপির বক্তব্যের সাথে একমত না হয়ে উপায় নেই। এখন পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নায়িকা-নির্ভর কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয় নি। শাবানা, কবরী, ববিতা, নতুন, মৌসুমী, শাবনূরকে নিয়ে দু-একটি করে নায়িকা-নির্ভর সিনেমা হয়েছে। তবে এসব চলচ্চিত্রে নায়িকা কিন্তু নায়কের জায়গায় বসতে পারেন নি। সিনেমার কাহিনীর আরোপিত নারীত্ব-ই নায়িকাকে প্রধান চরিত্রে পরিণত করেছে।

আমাদের চলচ্চিত্রে নায়িকাকে ব্যবহার করা হয়েছে নায়কের প্রয়োজনে। কখনোই এমনটা হয় নি যে, নায়িকার প্রয়োজনে নায়ক চরিত্রটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আমরা যার প্রমাণ হলিউড বা বলিউডের সিনেমায় দেখতে পাই। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প বেরিয়ে আসতে পারে নি। অথচ, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই এসব বৈষম্য উঠে আসার কথা ছিল।

এখন আমাদের চলচ্চিত্রে শাকিব খান একমাত্র নায়ক, একথা বলা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। এখন শাকিব খান নায়িকা হিসেবে যাকে পছন্দ করবেন তিনিই নায়িকা হবেন। যেমন, এখন হয়ত অপু বিশ্বাসকে বেশি চাচ্ছেন, তাই তার অধিকাংশ সিনেমাতে অপু বিশ্বাসকে বেশি দেখা যাচ্ছে। তৈরি হয়েছে শাকিব-অপু জুটি। জুটি প্রথা নিয়ে আপত্তি করার জায়গা নেই। কারণ যুগে যুগে প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিতে জুটি প্রথা চালু ছিল, এখনো আছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনি যখন পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে জুটি বলতে কেবল একটি জুটিকেই বোঝানো হয়- তখন তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে কিন্তু অনেক নায়ক-নায়িকা থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় একসাথে কাজ করার পর তৈরি হয় জুটি। বলিউডের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছে করলে বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে পারেন।

পক্ষান্তরে যেটি হচ্ছে, এই এক নায়ক তন্ত্রের কারণে অভিনয় দক্ষতা থাকার পরও অনেক নায়িকাকে অবসর সময় কাটাতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার এই মাধ্যম ছেড়ে দিয়ে বিকল্প খুঁজে নিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই এখন ছোট পর্দায় কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমী এবং পূর্ণিমার উদাহরণ-ই যথেষ্ট মনে করছি।

পাঠক, পপির কথাই বলতে পারেন। তিনি তৃতীয়বারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ, তার কাছে এখন এমন কোনো সিনেমার প্রস্তাব আসছে না, যেখানে তার সত্যিকার অর্থে অভিনয় করার কোনো জায়গা আছে। তাহলে এই মূল্যায়নের মূল্য কী? হায়রে চলচ্চিত্র! হায়রে নায়িকা! জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও কেবল নায়ক চায় না বলে বসে থাকতে হয়।

এখানে আরও একটি বিষয় উপেক্ষা করা ঠিক হবে না যে, এখন পর্যন্ত আমাদের চলচ্চিত্রে নায়িকা বলে যারা জনপ্রিয় তারা সবাই কিন্তু জনপ্রিয় নায়কের আমলে সৃষ্ট। একথা বলতে চাই না যে- তাদের কারোরই অভিনয় দক্ষতা নেই। কিন্তু কেন জানি তাদের কেউই জনপ্রিয় নায়ক ছাড়া জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে উঠতে পারেন নি।

শাবানা, ববিতা, কবরী- এদের সবাই কিন্তু জনপ্রিয় হয়েছেন রাজ্জাকের বিপরীতে অভিনয় করে। তারপর মৌসুমী অথবা শাবনূরের কথা ধরুন। এরা দু’জনই কিন্তু জনপ্রিয় হয়েছেন সালমান শাহ্‌’র বিপরীতে কাজ করে। আর এখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা অপু বিশ্বাস যিনি কাজ করছেন শাকিব খানের বিপরীতে। এবং অপু বিশ্বাস কিন্তু শাকিবের আগে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন নি।

একই কাহিনী, চলতেই থাকে চলতেই থাকে

রোমান্টিক অথবা অ্যাকশনধর্মী; এই দুইয়ের বাইরে এখন পর্যন্ত যেতে পারে নি আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। একটি সফল কমেডি, সায়েন্স ফিকশন বা ফোকধর্মী সিনেমা যে চলচ্চিত্রের সব উদ্দেশ্যই পূরণ করতে পারে তা মনে হয় আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কখনোই উপলব্ধি করে নি। কারণ উপলব্ধির কোনো প্রয়াস এখন পর্যন্ত তাদের সৃষ্ট কর্মে পরিলক্ষিত হয় নি।

আমাদের চলচ্চিত্রের শুরু কিন্তু মূলত রোমান্টিক সিনেমার মাধ্যমে। প্রায় ৮০’র দশক পর্যন্ত আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এই একটি ধরনের সিনেমা দিয়েই চলতে থাকে। এমন নয় যে সেসময় দর্শক অ্যাকশন বা অন্যান্য ধরনের সিনেমা দেখত না। রোমান্টিক ধারার সিনেমা চলাকালীন কিন্তু রাজ্জাকের অ্যাকশনধর্মী রংবাজ সিনেমাটি দর্শক খুবই ভালোভাবে গ্রহণ করে। তারপরও রাজ্জাক পরবর্তী আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, ফারুকদের সময়েও ইন্ডাস্ট্রির ঝোঁক ছিল রোমান্টিক ধারার দিকে।

একসময় এসে রোমান্টিক ধারা যখন দর্শকের কাছে একঘেঁয়েমি মনে হলো তখন ইন্ডাস্ট্রি বুঝতে পারল ধারা পরিবর্তন করতে হবে। তখন শুরু হলো অ্যাকশনধর্মী। স্বভাবতই রোমান্টিক ধারার অনেক নায়ককে বিদায় নিতে হলো। চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুঁজলে এরকম তথ্য মেলে- কেবল ধারা পরিবর্তনের কারণেই শুরু থেকে আজ অব্দি অনেক নায়ককে চলচ্চিত্র থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। ওয়াসিম, জসিম, রুবেল অ্যাকশনধর্মী সিনেমা করে যখন নিজেদের একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন তখনই আগমন ঘটল সালমান শাহ্‌’র। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের কেয়ামত থেকে কেয়ামত আর সালমান শাহ্‌’র মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি আবারও অ্যাকশন থেকে বেরিয়ে রোমান্টিকে প্রবেশ করে। এতে করে আবার অ্যাকশনধর্মী নায়ক জসিমদের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে হ্রাস পায়। সালমান শাহ্‌’র মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্র অ্যাকশনধর্মীতেই রয়ে গেছে। ফলে, সালমান শাহ্‌’র পর রোমান্টিক কোনো নায়ক জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন নি।

নায়কের যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই সেহেতু প্রশ্ন আসা প্রাসঙ্গিক- রোমান্টিক ধাঁচের নায়করা অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র করতে পারে না কেন? এর প্রাসঙ্গিক উত্তর, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একই সময়ে দু’টি বা তার অধিক কোনো ধাঁচ ছিল না। যেকোনো একটি ধাঁচের সিনেমা দীর্ঘসময় টিকে থাকত। এতে একজন নায়ককে একই ধাঁচে দেখতে দেখতে দর্শক অভ্যস্ত হয়ে যেত। হঠাৎ করে চরিত্রের পরিবর্তন ঘটলে দর্শক তাদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করত না। যে সমস্যাটি বর্তমানে হচ্ছে টিভি নাটকের নায়কদের ক্ষেত্রে। অনেক টিভি নায়কই এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রে এসেছে। কেউ-ই তেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে নি। কারণ ওই একটাই- দর্শক তাদেরকে অন্যভাবে দেখে এসেছে। তাই আমাদের উচিৎ ছিল, একই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা যদি একাধিক ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতাম তাহলে নায়করা এরকম ‘বাতিল’ হয়ে যেত না।

ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসা করবে, ঝুঁকি নেবে না

চলচ্চিত্র একটা শিল্প, একই সাথে ব্যবসা। দুটোই স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রি শুরু থেকে আজ অব্দি দ্বিতীয়টিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রথমটিকে প্রচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ব্যবসা ব্যাহত করে শিল্প ঠিক রাখার মানসিকতা এখন পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রি দেখাতে পারে নি। বরং, তাদের উল্টো মনোভাবটাই বেশি চোখে পড়ে।

পাঠক, এর আগে যে সমস্যাগুলো আলোচনা করলাম সেগুলোকে ইচ্ছে করলে এই সমস্যার ওপর দাঁড় করাতে পারেন। এই সমস্যাগুলো ইন্ডাস্ট্রি অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করত, এটাই স্বাভাবিক| কিন্তু এই উপলব্ধি কোনো পদক্ষেপ সৃষ্টি করতে পারে নি? প্রথমেই বলেছি যে, সবসময় ব্যবসাকেই ইন্ডাস্ট্রি বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। তাই কেবল দু’টি ধারাতেই বারবার আসা-যাওয়া, জনপ্রিয় নায়ক দিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর প্রচেষ্টা, নায়িকাকে উপেক্ষা করা ইত্যাদি।

রোমান্টিক আর অ্যাকশনধর্মীর বাইরে কোনো চলচ্চিত্রের নাম যে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কোনোদিন শোনে নি- বিষয়টি মোটেও কিন্তু তা নয়। টেলিসামাদ, দিলদার, এদেরকে নিয়ে একটা ধারা তৈরি হওয়া কিন্তু মোটেও অসম্ভব কিছু ছিল না। পাশাপাশি সম্ভব ছিল এর সাথে নায়কদেরও যোগ করা। ভারতে কিন্তু এই ধারা বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রির হয়ত আশঙ্কা ছিল যে, অন্য ধারার সিনেমা ব্যবসার জায়গাটি ধরে রাখতে পারবে না! একই আশঙ্কার জায়গা থেকে ইন্ডাস্ট্রি কেবল রাজ্জাক, সালমান, মান্না ও শাকিবদের মতো জনপ্রিয় নায়কের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে, অবসরে রেখেছে পপি-মৌসুমীদের।

এখন...

দেশের সিনেমা হলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো ‘বেঁচে’ আছে সেগুলোর জন্য আমদানি হচ্ছে ভারতীয় বাংলা সিনেমা। তার মানে, আমরা আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হওয়ার ধারাবাহিকতাকে মেনে নিয়েছি। কিন্তু যে যে আঘাত পর্যায়ক্রমে আমাদের এই শিল্পকে ধ্বংস করছে, সেই আঘাতগুলো মোকাবিলা করা কি অসম্ভব? মনে হয় না। কঠিন হতে পারে। কারণ আমাদের সমস্যা অনেক। যেমন শাকিব খান ছাড়া আমাদের এখন নায়ক নেই। কিন্তু শাকিবের পাশাপাশি আরও রাজ্জাক, সালমান শাহ্‌ তৈরি করা অসম্ভব নয়। 

 

লেখক : ইমরান হোসেন মিলন ও আশফাক দোয়েল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় ও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

milonrumcj@yahoo.com

asfaquldoyel@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. মিশেল ফুকোর মতে, ‘ডিসকোর্স হলো একটি বিষয় সম্পর্কে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভাষার ব্যবহার ও চর্চার মাধ্যমে উৎপন্ন জ্ঞানের রেপ্রিজেন্টেশন।’ এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষা এবং এর চর্চা, উৎপন্ন জ্ঞান ও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। নায়ক শব্দটি, এ সংক্রান্ত উৎপন্ন জ্ঞান বা ধারণা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অর্থাৎ কখন থেকে কীভাবে নায়কের উৎপত্তি- তা এখানে আমাদের দেখার বিষয়।

২. নাসরীন, গীতি আরা (১৪১০:১১৫); ‘ভাবপ্রবণ থেকে উন্মাদ: রূপালি-নায়কের বিবর্তন’; দৃশ্যরূপ; সম্পাদনা- মাহমুদুল হোসেন; প্রগ্রেসিভ প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ঢাকা।

৩. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩:৩২); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৪. ‘শাকিব-অপু নেই, এফডিসিও বন্ধ!’; কালের কণ্ঠ; ১১ এপ্রিল ২০১১।

৫. ‘এক নায়কের মৃত্যু, অসংখ্য ভক্তের মুখ’; প্রথম আলো; ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮।

৬. ‘ইন্ডাস্ট্রি চলছে এক নায়ককে কেন্দ্র করে’; কালের কণ্ঠ; ১১ এপ্রিল ২০১১।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন